ইতিহাস ও ঐতিহ্য

শহীদ মিনারের ইতিকথা

মোহাম্মদ ফয়জুর রহমান প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০২-২০২০ ইং ০০:০৯:৪৪ | সংবাদটি ৪৫৯ বার পঠিত
Image

৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারির পর পরই স্লোগান ওঠে ‘শহীদ স্মৃতি অমর হোক।’ ভাষা শহীদদের স্মৃতিকে অমর করে রাখতেই নির্মিত হয় শহীদ মিনার। শুরু থেকেই শহীদ মিনার আমাদের জাতীয় ঐক্যের প্লাটফর্মে পরিণত হয়। প্রশ্ন হলো, কেমন করে শহীদ মিনার নির্মিত হয়? কি করলে শহীদ মিনারটি জাতীয় ঐক্যের প্লাটফর্ম হিসেবে অক্ষুণ্ন থাকবে?
৫২-র ২১শে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষায় ১৪৪ ধারা ভাঙ্গতে গিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের সম্মুখে ও আশেপাশে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন সালাম, জব্বার, বরকত, রফিক, আউয়াল, অলিউল্লাহ। পুলিশের নিষ্ঠুর অ্যাকশনের প্রতিবাদে ২২শে ফেব্রুয়ারি সারা ঢাকায় স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ মিছিল হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের মিছিলেও পুলিশ গুলি চালায়। ২২ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে শহীদ হন শফিউর সহ নাম না জানা আরো কয়েকজন।
২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে যারা শহীদ ও আহত হন তাদেরকে চিকিৎসার জন্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। ভাষা শহীদ ও আহতদের দেখে ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসক ও ছাত্রদের বুকে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। চোক বেঁয়ে ঝরতে থাকে অশ্রু। ২২ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকা মেডিকেল হোস্টেলের ছাত্ররাই পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেন ভাষা শহীদদের স্মৃতি রক্ষার জন্যে শহীদ মিনার নির্মাণের।
তখনকার ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র সাইদ হায়দারের নেতৃত্বে শরফুদ্দীন, মওলা, হাশেম, জাহিদ, আলিম, বদরুল আলম, আহমদ রফিক, জিয়া প্রমুখ ২২ ফেব্রুয়ারি রাতেই কলেজ হোস্টেলে বসে শহীদ মিনারের একটি পরিকল্পনা ও নকশা তৈরি করেন। (ডা: সাঈদ হায়দারের সাক্ষাৎকার, ভাষা আন্দোলন সাতচল্লিশ থেকে বায়ান্ন, মোস্তফা কামাল, পৃ: ২৬২-২৭০)।
আসে ২৩ ফেব্রুয়ারি। ২৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা থেকেই মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের ছাত্ররা হোস্টেলের সম্মুখের যে স্থানে বরকত শহীদ হয়েছিলেন সে স্থানের অদূরে শহীদ মিনার নির্মাণ শুরু করেন।
তখন মেডিকেল কলেজ সম্প্রসারণের কাজ চলছিলো। তাই ক্যাম্পাসে ইট, বালু, সিমেন্ট স্তূপাকারে ছিলো রাখা। এছাড়া সে সময় মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে প্রায় ৩০০ ছাত্র ছিলেন আবাসিক। তদুপরি ছিলেন কয়েকজন পিয়ন-চৌকিদার। সে রাতে পিয়ন চৌকিদার সহ হোস্টেলের সকল ছাত্র শহীদ মিনার নির্মাণে অংশগ্রহণ করেন। একদল ইট বয়ে আনেন, একদল বালু বয়ে আনেন, একদল সিমেন্ট বয়ে আনেন, একদল পানি বয়ে আনেন। একপক্ষ সিমেন্ট-বালু-পানি মিশিয়ে কাই তৈরি করে দেন। দু’জন রাজমিস্ত্রী এসে সহযোগিতার হাত বাড়ান। সবাই মিলে গভীর রাত পর্যন্ত পরিশ্রম করে নির্মাণ করেন প্রথম ‘শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ’ অর্থাৎ শহীদ মিনার। পরদিন সকাল ১০ টায় শহীদ শফিউরের পিতা মাহবুবুর রহমানকে দিয়ে উদ্বোধন করানো হয়। প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণের কৃতিত্ব মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের ছাত্রদেরই বেশি।
শহীদ মিনার নির্মিত হওয়ার পর থেকে ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর ঢল নামে। পাকিস্তান সরকার তা সহ্য করতে না পেরে ২৬ ফেব্রুয়ারি বিকেলেই শহীদ মিনার গুড়িয়ে ফেলে। সরকারের কঠোর দমন নীতির কারণে- দীর্ঘ দিন শহীদ মিনার পুননির্মাণ সম্ভব হয়নি।
৫২ গেলো, ৫৩ গেলো, ৫৪ তে যুক্তফ্রন্ট সরকার পূর্ববাংলায় ক্ষমতায় আসে। ৩ এপ্রিল ৫৪ শেরে বাংলা ফজলুল হকের নেতৃত্বে পূর্ববাংলায় গঠিত হয় যুক্তফ্রন্ট সরকার। যুক্তফ্রন্ট সরকার পূর্ব বাংলায় ২১ ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস এবং শহীদ দিবসকে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করে। কিন্তু নানা অজুহাত দেখিয়ে মাত্র ৫৬ দিন পরই ৩০মে ৫৪ পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার শেরে বাংলার নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙ্গে দেয়?
আবুল হোসেন সরকারের নেতৃত্বে কৃষক-শ্রমিক পার্টি পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক সরকার গঠন করে। পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী আবুল হোসেন সরকার আবার শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন এবং ২১শে ফেব্রুয়ারি ৫৬ সকাল ৯ টায় আনুষ্ঠানিকভাবে তা উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী আবুল হোসেন সরকার, আওয়ামী লীগ প্রধান মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং শহীদ বরকতের মা হাসিনা বেগম। আবুল হোসেন সরকারের আমলে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস হিসেবে পূর্ববাংলায় সরকারি ছুটির দিন কার্যকর হয়। কিন্তু ৫৬’র সেপ্টেম্বরেই আবুল হোসেন সরকার পরিচালিত কৃষক-শ্রমিক পার্টির সরকারকেও বরখাস্ত করে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার।
১৯৫৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। আতাউর রহমান খানের আমলে প্রধান প্রকৌশলী এম.এ জব্বারকে শহীদ মিনার নির্মাণের ব্যবস্থা করতে দায়িত্ব দেয়া হয়। জনাব জব্বার শহীদ মিনারের জন্যে পরিকল্পনা ও নকশা আহ্বান করেন। প্রতিযোগিতায় শিল্পী হামিদুর রহমানের পরিকল্পনা ও নকশা অনুমোদন লাভ করে। শিল্পী হামিদুর রহমানের নকশা অনুসারের তারই দিক নির্দেশনায় ৫৭-র নভেম্বর থেকে শুরু করে ৫৮-র ২১শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এসে শহীদ মিনারের ভিত, মঞ্চ ও ৩টি স্তম্ভের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয়। ১৯৫৮ সালের অক্টোবর থেকে দেশে মার্শাল’ল জারি হওয়ায় পূর্ব পাকিস্তানে আতাউর রহমান খান সরকারের বিলুপ্তি ঘটে এবং শহীদ মিনার নির্মাণের কাজও পূর্ণতা পাওয়ার আগেই বন্ধ হয়ে যায়।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৯৫৬ সালে দেশে একটি সংবিধান প্রণিত হয়। এ সংবিধান ২৯ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় সংসদে সর্বসম্মতিতে গৃহীত হয় এবং ২৩ মার্চ থেকে দেশে বলবত হয়। এ সংবিধান রাষ্ট্র প্রধানের পদবী গভর্নর জেনারেলের বদলে প্রেসিডেন্ট হিসেবে আখ্যায়িত করে। ৫৬’র সংবিধান অনুসারে মেজর জেনারেল (অব:) ইস্কন্দর মীর্জা গভর্ণর জেনারেলের বদলে প্রেসিডেন্ট পদবীতে ভূষিত হন।
১৯৫৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সংসদ অধিবেশনে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে বাকবিতন্ডা, হাতাহাতি ও মারামারি শুরু হয়। এক পর্যায়ে স্পীকার শাহেদ আলীর মাথায় কে একজন চেয়ার দিয়ে আঘাত করেন। এ আঘাতের ফলে তিনদিন পর স্পীকার শাহেদ আলীর মৃত্যু হয়। এ ঘটনাকে অজুহাত করে প্রেসিডেন্ট ইস্কন্দর মীর্জা ৭ অক্টোবর ১৯৫৮ দেশে মার্শাল’ল জারি করেন। মার্শাল’ল জারি করেই ইস্কন্দর মীর্জা শহীদ মিনার নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেন, শহীদ দিবসের ছুটি বাতিল করে দেন এবং শহীদ মিনারে গিয়ে সমাবেশ করতে সামরিক ব্যারিকেড তৈরি করেন।
২৭ অক্টোবর ১৯৫৮ জেনারেল আইয়ূব খান এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইস্কন্দর মীর্জাকে উৎখাত করে নিজে প্রেসিডেন্টের আসনে বসেন। (বাংলাদেশ রাজনীতি সরকার ও শাসনতান্ত্রিক উন্নয়ন ১৭৫৭-২০০০ ডঃ হারুন-অর-রশিদ পৃ: ২২২)
আসে ১৯৬২ সাল। পূর্বপাকিস্তানের গভর্ণর তখন লেঃ জেনারেল আজম খান। গভর্ণর আজম খান বাঙালিদের অধিকারের প্রতি অনেকটা নমনীয় হয়ে পড়েন। তিনি শহীদ মিনার নির্মাণের জন্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ডঃ মাহমুদ হোসেনকে সভাপতি করে, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীকে সদস্য সচিব করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর মমতাজ উদ্দীন আহমদ, ভাষা বিজ্ঞানী ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, ডঃ মুহাম্মদ এনামুল হক, ডঃ কাজী মোতাহার হোসেন, অধ্যক্ষ মুহম্মদ আবদুল হাই, ডঃ সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন, বাংলা একাডেমির পরিচালক সৈয়দ আলী আহসান, ইসলামিক একাডেমির পরিচালক আবুল হাসিমকে সদস্য করে ১৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি পরামর্শ কমিটি করে দেন। এ পরামর্শক কমিটি শিল্পী হামিদুর রহমানের নকশাকে একটু সহজ ও সংক্ষিপ্ত আকারে উপস্থাপন করেন। এবং এভাবেই শহীদ মিনার নির্মাণের পরামর্শ দেন।
হামিদুর রহমানের নকশার সহজীকৃত রূপ অনুসারেই ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৩র মধ্যে পূর্ণাঙ্গ শহীদ মিনার নির্মাণের কাজ সমাপ্ত করা হয়। ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৬৩ সকালে শহীদ বরকতের মা হাসিনা বেগমকে দিয়ে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করানো হয়, পূর্ণাঙ্গভাবে নির্মিত শহীদ মিনার। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ৭১ এর ২৬ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কামানের গোলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে শহীদ মিনার। (একুশে ফেব্রুয়ারি ও শহীদ মিনার- রফিকুল ইসলাম)।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২-১৯৭৩ সালে হামিদুর রহমানের সংক্ষিপ্ত নকশা অবলম্বনে আবার নির্মিত হয় শহীদ মিনার। এ মডেলেই শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয় কলেজ ভার্সিটিসহ দেশের স্থানে স্থানে এবং শহীদ মিনার স্থিতি লাভ করে।
শহীদ মিনার ভাষা আন্দোলনের মর্মবেদনার প্রতীক। পেছনে উদীয়মান সূর্য। সম্মুখে ৫টি স্তম্ভ বিশিষ্ট মিনার। ৫টি স্তম্ভের মধ্যের স্তম্ভটি দেশমাতৃকার প্রতীক। দেশ মা কোনো শহীদ সন্তানদের শোকে সম্মুখে ঝুকে আছেন। দুই পাশে দুটি করে ছোট ছোট আরো ৪টি স্তম্ভ। এ স্তম্ভগুলো ভাষা শহীদদের প্রতীক। প্রতীকী এ শহীদ মিনার বাঙালির চেনার উৎস ও ঐক্যের প্লাটফরম। একই সাথে আমাদের শহীদ মিনার আজ বিশ্বের মাতৃভাষা প্রেমিকদেরও দিকদর্শী উন্মুক্ত পাঠশালা।
ভাষা আন্দোলনের সিঁড়ি বেয়েই এসেছে আমাদের স্বাধীনতা। তাই শহীদ মিনার একদিকে আমাদের ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতীক অপর দিকে জাতীয় ইস্যু বাস্তবায়নে চেতনার উৎস এবং জাতীয় ঐক্যের প্লাটফরম।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বালাগঞ্জের বাতিঘর বাংলাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়
  • বঙ্গবন্ধু ও গান্ধীজী
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক ছিলেন ‘মেশিনম্যান’
  • একটি যুদ্ধ : একটি শতাব্দী
  • বালাগঞ্জের প্রাচীন জনপদ শিওরখাল গ্রাম
  • ভাটিপাড়া
  • সময়ের সোচ্চার স্বর সোমেন চন্দ
  • বঙ্গবন্ধুর সিলেট সফর ও কিছু কথা
  • বায়ান্নতেই লিখেছিলেন ‘ঢাকাই কারবালা’
  • জীবনের শেষক্ষণে অর্থ-স্বর্ণ সবই জড়পদার্থ
  • কমরেড বরুণ রায়
  • বঙ্গবন্ধু ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
  • নারী ভাষাসৈনিকদের কথা
  • মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবীর ওসমানী
  • ভাটির বাতিঘর সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ
  • মাওয়ের লংমার্চের ৪ বছর পর সিলেটিদের লং মার্চ
  • শহীদ মিনারের ইতিকথা
  • সিলেটের লোকসংগীত : ধামাইল
  • পর্যটক ইবনে বতুতার কথা
  • বই এল কোথা থেকে?
  • Image

    Developed by:Sparkle IT