শিশু মেলা

বিজয়গাঁথায়

সুলতান মাহমুদ প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০২-২০২০ ইং ০০:৫২:৪৪ | সংবাদটি ২৬১ বার পঠিত

একাত্তরে খুব ছোট ছিলাম। যখন একটু বড় হলাম, মুক্তিযুদ্ধের গল্প, মা-বাবা কাকাদের মুখে মুখে শুনতাম। খুবই শুনতে ইচ্ছে হতো। বঙ্গবন্ধুর বজ্রকন্ঠের ভাষণ। তন্ময় হয়ে শুনতাম। সেই সময়ের কিছু ঘটনা, মা-বাবা দাদীর মুখে অনেক শুনেছি। মার মুখ থেকে শুনা-তিনি বলতেন, সেই সময়টা খুব খারাপভাবে কেটেছে। সবাই আমরা মহা আতংকের মধ্যে ছিলাম যুদ্ধকালীন সময়টাতে।
তোদের করিম চাচা তখন কলেজে পড়ে। যুবক বয়স। রক্ত গরম। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনে শুনে দেশের জন্যে কিছু করার জন্যে অস্থির হয়ে উঠে। সারাদেশ জুড়ে চলছে অবাধে গণহত্যা, জুলুম অমানবিক নির্যাতন। বাড়ি ঘর, বাজার, দোকান পাট জ্বালানো হচ্ছে। এসব খবর প্রতিদিন শুনতে শুনতে মনটা হাহাকার করে কেঁদে উঠে। আমাদের সবারই তখন মনের অবস্থা একই রকম।
দিনে রাতে ভয়ে ডরে মারাত্মক আতংকের মধ্যে আমরা ছিলাম। যেনো দেশে কিয়ামত নেমে এসেছে। কখন জানি কোন সময় হানাদার হায়েনারা গ্রামে আক্রমণ করে বসে। গ্রাম বাড়ি ঘর ছেড়ে কোথায় যাবো যাওয়ার জায়গা নেই। রাস্তাঘাটে মানুষ দল বেঁধে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্যে হন্যে হয়ে দিক বিদিক ছুটাছুটি করছে।
এরই মধ্যে একদিন রাতের বেলা তোদের করিম চাচার মা-বাবা আমাদের বাড়িতে চলে এলো। এসেই হাউ মাউ কান্না। যেনো তাদের কলিজায় কেউ দাউ মেরে কোঁপাচ্ছে। কান্নার কারণ জানতে চাইলেই বলে উঠলো তাদের করিম মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেছে। দেশকে হানাদারমুক্ত করে ঘরে ফিরবে। বলছে আর হুঁ হুঁ করে কেঁদেই চলছে। আমরা মানে, তোর বাবা, দাদী এবং অন্যরা সবাই করিম মিয়ার মা বাবাকে বুঝাতে লাগলাম। কি আর করার আছে। পাক নরপশুরা যা শুরু করেছে তাতে তো কোন বিবেকবান মানুষই ঘরে বসে থাকতে পারে না। দেশের জন্য একটা কিছু করতেই হবে।
আমরা তাদের বুঝাতে চেষ্টা করলাম, দেশের জন্যে যুদ্ধে গেছে, অন্যায়, অত্যাচার, নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে, এর চেয়ে ভাল কাজ আর কী হতে পারে। মা-বাবার মনতো এ সব সান্ত¦না কী আর বুঝে। নাকি বুঝানো যায়? কেঁদে কেটে আর কী হবে মামাজান, যা হবার তা তো হয়েই গেছে। আমরা সবাই আল্লাহর কাছে দোয়া করি আল্লাহতায়ালা যেনো আমাদের করিম মিয়াকে বিজয়ী বেশে আমাদের মাঝে আবার ফেরৎ দেন। আমি মামা চাচীকে সান্ত¦নার স্বরে বললাম।
তারা কেঁদে কেঁদে বলতে থাকে।
‘তোমরা জান না বউমা ঐ হারামীর বাচ্চা হানাদার বাহিনীরা আমাদের বাড়িতেও হামলা করবে। আমাদের ছেলে মুক্তিযুদ্ধে গেছে বলে আমাদেরকেও একে একে মেরে ফেলবে। আমাদের মধ্যে কিছু মোনাফেক বেঈমান তৈরি হয়েছে তারা ঠিকই পাক বাহিনীকে খবরটা দিবে। আমি মুক্তিযোদ্ধার বাবা- ঠিক ঠিক এ খবরটা তারা শত্রুপক্ষকে জানাবে।
আমাদের ঘর বাড়ি জ্বালাবে, আমাদেরে মেরে ফেলবে। আমরা এখন কই যাবো গো। আবার সকরুণ বিলাপ করে কান্না। তাদের কান্না আর থামানো যাচ্ছে না।
অবশেষে তোর বাবা সিদ্ধান্ত দিল, মামা কোন চিন্তা করো না। যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তোমরা আমাদের বাড়িতেই লুকায়ে থাকবে। নামাজ পড়বে আর আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাক যেনো আমাদের করিম মিয়া ভাল থাকে।
সেদিন থেকেই তারা আমাদের বাড়িতেই থাকতে লাগলেন। ছেলের চিন্তায় চিন্তায় উনারা প্রায় খাওয়া দাওয়া ছেড়েই দিলেন। দিনরাত কেবল কাঁদেন আর কাঁদেন। দিনে রাতে বারবার পথপানে চেয়ে থাকেন, করিম মিয়া বুঝি ফিরে এলো। চোখের জলে আল্লাহকে ডাকতে থাকেন। যাই হউক এভাবেই মাস দুয়েক পার হলো। এক রাতে হঠাৎ করে আমাদের ঘরের দরজায় ঠোকা। আস্তে আস্তে দরজায় কে যেনো কড়া নাড়ছে। তখন রাত গভীর। এমনিতেই রাতের বেলায় আমরা ভয়ে ডরে তটস্থ হয়ে থাকতাম। ঘরের দরজায় ঠোকার শব্দে আমার তো জ্ঞান হারাবার জোগাড়। তোর বাবাকে আস্তে আস্তে ডেকে তুললাম। কিন্তু আমরা কেউই সাহস করে বলতে পারছিলাম না, দরজায় কে? কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে গেলাম। হাত পা অবশ হয়ে আসতে লাগল। মনে হচ্ছে আযরাইল জান কবজ করার জন্যে ঘরে ঢুকছে। আমাদের পক্ষ থেকে কোন প্রকার সাড়া শব্দ না পেয়ে ঘরের দরজায় ঠোকার শব্দ জোরে থেকে জোরে হতে লাগল। তোকে তখন বুকে জড়িয়ে ধরে আমি নিঃশব্দে কাঁদছিলাম আর আল্লাহকে ডাকছিলাম, মাবুদ তুমি রক্ষা কর। আমার নিষ্পাপ ছেলের ওছিলায় তুমি আমাদের প্রতি রহম কর।
আসলে অবস্থা এমন হয়েছে কোথাও একটু ঠুক ঠাক শব্দ হলেও আতংকে চমকে উঠি। এই বুঝি পাক আর্মিরা এলো। আমাদের গ্রামটা একেবারে অজপাড়া গাঁ। থানা সদর থেকে গ্রামে আসার (বিশেষ গাড়ী দিয়ে) মোটেই কোন রাস্তা নেই। তারপরও গ্রামবাসী সবাই মিলে কাঁচা পাকা রাস্তার মোড়ে মোড়ে পালা ক্রমে রাতের বেলায় পাহারা দেয়। পাক আর্মিরা আসে কী না। সাথে সাথে যেনো তারা খবরটা গ্রামবাসীর ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়। সে রকম ব্যবস্থায় করা হয়েছে। পাক আর্মিরা তো সহজে এখানে আসার কথা নয়। তারপরও ভয় থেকে যায়।
দরজায় ঠক ঠক শব্দ হয়েই চলেছে। এক সময় তোর বাবা সাহস করে বিছানা থেকে উঠলো। খাট থেকে নামলো। আস্তে করে করে বললো ‘কে’ ও পাশ থেকে মৃদুভাবে শব্দ এলো ‘ভাইজান, আমি তোমাদের আঃ করিম। প্রথম বার উত্তরটা শুনে আমরা সিওর হতে পারছিলাম না। তাই দ্বিতীয় বার আমি প্রশ্ন করলাম, কে আপনে, সঠিক করে বলুন।
এবার আমাদের আঃ করিম স্পষ্ট ভাষায় এবং জোরে সুরেই উত্তর দিল, ভাবীসাব আমি আঃ করিম, তোমরা আমাকে চিনতে পারছ না। এবার আমরা তার কন্ঠস্বরে সিওর হলাম, এ আমাদের আঃ করিম। আমাদের শরীরে যেন জান ফিরে এলো। আনন্দ খুশিতে আমি বাতি জ্বালালাম, আর তোর বাবা দরজা খুলে দিল। ওরা চারজন নিঃশব্দে ঘরে প্রবেশ করলো। ওদের চার জনই অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। মাথায় গামছা বাধা। কি জংলী চেহারা হয়েছে চেনা যায় না। মুখভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি। চোখে হিং¯্র প্রতিবাদী প্রতিরোধের ভাষা। আঃ করিম মিয়া আস্তে আস্তে ফিসফিসিয়ে বললো, ‘খবর কী? শুনলাম মা বাবা নাকী এখানে, তোর বাবা দরজা লাগিয়ে দিল। হেরিকেনের আলো কমিয়ে দিল। চিন্তা করিস না ভাই, ওনারা এখানেই ভাল আছে। তারপর নিঃশব্দে করিমের মা বাবাকে ডেকে আনা হলো, কোন প্রকার কান্না কাটির শব্দ করতে নিষেধ করা হলো। এতে মহাবিপদ হতে পারে। মামা, মামী (করিমের মা-বাবা) ছেলেকে কাছে পেয়ে এতো খুশী হলো, যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আনন্দ খুশিতে আমাদের চোখে বরষার ঢল নামলো। আঃ করিম বলল, ভারত থেকে ট্রেনিং শেষে গত চার দিন ধরে হেঁটে হেঁটে এ পর্যন্ত এসেছি। দিনের বেলায় তো আসা যায় না। দিনে কোথাও নির্জন বন বাদাড়ে লুকিয়ে থাকি আর রাতের আঁধারে চুপি চুপি হেঁটে আসি। খাওয়া দাওয়া নেই বললেই চলে। শুধুমাত্র মা বাবার সাথে দেখা করার জন্যই এসেছি। আনন্দ খুশির মিলন মেলায় পরিণত হলো আমাদের ঘরে। তোর দাদী করিমকে বুকে জড়িয়ে মরা কান্না জুড়ে দিল।
আমি, তোর দাদী খাবার আয়োজন করতে লাগলাম। তিন তিনটে বড় মোরগ জবাই করা হলো। তোর বাবা রাত্রি বেলা অসময়ে গোয়ালঘরে ঢুকে গাভী দোহন করে কিছু দুধ আনলো।
আমার মুক্তিযোদ্ধা ভাইদের তৃপ্তি সহকারে খাওয়ালাম। ওরা খুবই ক্লান্ত। আমাদের বাড়ির পিছনটায় বাঁশ ঝাড়ের আড়ালে একটা গরুর খড় রাখার ঘর ছিল। ওটাতে সাধারণত কেউ যায় না। ও ঘরেই ওদের বিশ্রামের ব্যবস্থা করা হলো। বাইরে থেকে ‘ও ঘরে তালা লাগিয়ে দেওয়া হলো। এখানে ওরা দু’দিন বিশ্রাম নেবে। তারপর তাদের টার্গেট মোতাবেক বিভিন্ন জায়গায় অপারেশন চালাবে।
দীর্ঘ নয় মাস পর দেশ স্বাধীন হলো। আমাদের আঃ করিম মিয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা বেশে দেশে ফিরে এলো। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সরকার তখন তার চাকুরীর ব্যবস্থা করে দিল।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT