ধর্ম ও জীবন

মাতৃভাষা ও ইসলাম

মোঃ দিলশাদ মিয়া প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০২-২০২০ ইং ০৪:১৮:৪৭ | সংবাদটি ২৩৩ বার পঠিত

মানুষকে আল্লাহ তা’য়ালা তার মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য ভাষা দিয়েছেন। মাতৃভাষা তার আবেগ প্রকাশের মাধ্যম। পৃথিবীতে প্রায় ছয় হাজারের মতো ভাষা রয়েছে। ভাষার বৈচিত্র্য আল্লাহ তা’য়ালার কুদরতের নিদর্শন। পৃথিবীর সব ভাষাই আল্লাহর সৃষ্টি। মানুষ সৃষ্টি আর ভাষার ইতিহাস এক সূত্রে গাঁথা। মানুষকে আল্লাহ স্বয়ং ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন। হযরত আদম (আ:) হলেন প্রথম মানব। আল্লাহ তাকে সৃষ্টির পর সৃষ্টির সবকিছুর নাম শিক্ষা দেন। এর মাধ্যমে হযরত আদম (আ:) ভাষা সম্পর্কে অবহিত হন। সূরা ইব্রাহিমের চতুর্থ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন-‘আমি রাসুলগণকে তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করেই প্রেরণ করেছি, যাতে স্পষ্টভাবে তাদের বুঝাতে পারে। সূরা রুমের ২২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-তাঁর আরও একটি হচ্ছে আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। নিশ্চয় এতে জ্ঞানীদের জন্য রয়েছে নিদর্শন। আল্লাহ বলেন-‘দয়াময় আল্লাহ তা’য়ালা মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন কোরআন। সৃষ্টি করেছেন মানুষ। শিক্ষা দিয়েছেন ভাষা বর্ণনার কলা-কৌশল। ভাব প্রকাশের জন্য আল্লাহ মানুষকে কথা বলা শিখিয়েছেন। [সূরা আর রাহমান ১-৪]
আল্লাহ ত’য়ালা সূরা দুখানের ৫৮ আয়াতে ঘোষণা করেন, ‘আমি তো কোরআনকে আপনার ভাষায় সহজ করে নাজিল করেছি, যাতে তারা সহজে উপদেশ গ্রহণ করতে পারে। তা দ্বারা মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা দান করার ইঙ্গিত করা হয়েছে। ভাষার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে আল্লাহ তা’য়ালা সূরা ইউসুফের দুই নম্বর আয়াতে ঘোষণা করেন ‘আমি কোরআনকে আরবি ভাষায় নাজিল করেছি, যাতে তোমরা সহজে বুঝতে পার।”
বোখারী শরীফের হাদীসে বলা হয়েছে ‘রাসুল (সা:) বলেছেন, নিশ্চয় আল্লাহ সব ভাষা জানেন।’ আল্লাহর রাসুল (সা:) নিজেই বলেছেন, তিনি ৩টি কারণে আরবি (মাতৃভাষা) ভালোবাসেন। প্রথমত আল কোরআনের ভাষা আরবি, দ্বিতীয়ত জান্নাতের ভাষা আরবি, তৃতীয়ত তাঁর মাতৃভাষা আরবি। রাসুল (সা:) যেহেতু তাঁর মাতৃভাষাকে ভালোবাসতেন, সেহেতু মাতৃভাষাকে ভালোবাসা রাসুল (সা:)-এর সুন্নত। মুসলমান হিসেবে আমাদেরও কর্তব্য মাতৃভাষাকে ভালোবাসা।
মা আমাদের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র, বিপদের সাথী, দুঃখের আশ্রয়স্থল। মাতৃগর্ভ হতে ভূমিষ্ঠ হয়ে মানুষ মায়ের কাছ থেকেই ভাষা আয়ত্ত করে। জন্ম হতে যে ভাষা উচ্চারণ করে মানুষ মনের ভাব প্রকাশ করে তাই মাতৃভাষা। মাতৃভাষার মাধ্যমেই আমরা নিজেদের জীবনকে, কৃষ্টিকে এবং চিন্তা ধারাকে প্রসারিত করতে পারি। হৃদয়ের গভীরতম প্রদেশের শতমুখী ভাবধারাকে আমরা পরিস্ফুট করতে পারি। দেশের মর্যাদা বাড়াতে এবং দেশকে বিশ্বের বুকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে দরকার শিক্ষার ব্যাপক ও বহুমুখী প্রসার। সে ক্ষেত্রে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষাই অনন্য। মাতৃভাষায় পূর্ণজ্ঞান আহরণের পরই কেবল অন্য ভাষার রস আহরণ বা আস্বাদন করা যায়।
প্রতিটি জাতির প্রত্যেক মানুষের উচিত মাতৃভাষা চর্চায় অধিক যতœবান হওয়া। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। এ ভাষার মর্যাদা আজ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এর জন্য স্বীকার করতে হয়েছে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা। অথচ মাতৃভাষা প্রত্যেক মানুষের জন্মগত অধিকার। আমাদেরই কেবল বিশ্বের বুকে মাতৃভাষার জন্য জীবন দিতে হয়েছিল। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা, প্রাণের ভাষা, হৃদয়ের ভাষা, নিজেকে তুলে ধরার ভাষা। এ ভাষা আমাদের গর্ব-অহংকার। পৃথিবীর বুকে বাংলা ভাষাই একমাত্র ভাষা, যে ভাষা প্রতিষ্ঠার একটি সুনির্দিষ্ট ইতিহাস রয়েছে, যে ভাষার সাথে মিশে আছে বাঙালির তরতাজা রক্ত। তাই মাতৃভাষাকে যথাযথ মর্যাদা ও গুরুত্ব দেয়া উচিত।
মাতৃভাষা আয়ত্ত করা অন্য ভাষার চেয়ে অতি সহজ। স্বদেশের মাটি ও মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, তাদের প্রতি দায়বদ্ধতার চেতনা গড়ে ওঠে মাতৃভাষার মাধ্যমে। উপলব্ধি, ধারণা ও মননের স্বাভাবিক সামর্থ্য গড়ে তোলে প্রথমত ও প্রধানত মাতৃভাষা। মানুষের শিষ্টাচারের প্রকাশ করতে মাতৃভাষার সুন্দর শুদ্ধ ব্যবহারের প্রয়োজন। মাতৃভাষা দ্বারা একটি জাতির সংস্কৃতি, সভ্যতা, সামাজিক, রাজনৈতিক অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেয়ে থাকে।
ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। তাই মাতৃভাষার গুরুত্ব ও তাৎপর্য ইসলামে রয়েছে। রাসুল (সা:) জুম্মার খুৎবা যখন দিতেন তখন উপস্থিত জনতার বোধ্যগম্য ভাষায় বক্তব্য রাখতেন। মাতৃভাষায় খুৎবা প্রদান করেছেন। হযরত মুহাম্মদ (সা:) মাতৃভূমির প্রতি ভালভাষাকে গুরুত্ব প্রদান করে বলেছেন-‘হুববুল ওয়াতান মিনাল ঈমান’ অর্থাৎ স্বদেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ।
মা, মায়ের ভূমি আর মায়ের ভাষার প্রতি প্রেম মানব চরিত্রের সুকুমার বৃত্তিগুলোর অন্যতম। যে দেশের আলো, বাতাসে আমাদের জীবন হয়েছে বিকশিত, আর যে ভাষায় বর্ণালি ছিটায় আমরা প্রতিনিয়ত প্রকাশ করছি আমাদের ভাব, সেই মাতৃভাষার প্রতি আমাদের প্রেম, ভালোবাসা থাকাই স্বাভাবিক। তাই বহু ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন, ‘মাতা, মাতৃভূমি ও মাতৃভাষা আমাদের কাছে সর্বাপেক্ষা মূল্যবান।’
আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। বাংলা ভাষায় আমরা কথা বলি। এ ভাষা লিখে, এ ভাষা পড়ে, এ ভাষায় কথা বলে আমরা যত আনন্দ লাভ করি, এমন আর কোন ভাষায় সম্ভব নয়। কবি রামনিধি গুপ্ত বলেছেন নানা দেশের নানা ভাষা / বিনা স্বদেশি ভাষা মিটে কি আশা? কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন-‘আগে চাই মাতৃভাষার গাঁথুনি, তারপর ইংরেজি শিক্ষার পত্তন।’ নিজের মাতৃভাষা সম্পূর্ণরূপে আয়ত্ত করতে না পারলে তার সম্যক জ্ঞানার্জন সম্ভব হবে না। ১৯৫২-তে এদেশের মাতৃভাষা প্রেমীরা সেই প্রমাণ রেখে গেছে। বিশ্ব ইতিহাসে এই প্রথম মাতৃভাষার জন্য জীবন উৎসর্গের অনন্য ইতিহাস দেখল। এ দেশের মানুষ মা, মাতৃভূমি ও মাতৃভাষাকে একাকার করে ভালোবেসেছেন। রফিক ও সালাম-নাম দু’টি যেমন ৫২-এর ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে গাঁথা আছে, তেমনই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সঙ্গেও রফিক-সালামের নাম মিশে আছে। রফিকুল ইসলাম ও আব্দুস সালাম কানাডার ভ্যানকুভার থেকে এ দিবসটির বীজ বপন করেছিলেন। পরিশেষে আমরা মহান আল্লাহ তা’য়ালার নিকট প্রার্থনা করি যেন-যারা ভাষার জন্য শহীদ হয়েছেন, ভাষা আন্দোলন করে আমাদেরকে মাতৃভাষায় কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছেন। আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের এ ভাষাকে সুরক্ষা করার ব্যবস্থা করেন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT