পাঁচ মিশালী

বঙ্গবন্ধু : এক পাকিস্তানি সাংবাদিকের দৃষ্টিতে

উর্দু থেকে অনুবাদ : সৈয়দ মবনু প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০২-২০২০ ইং ০০:১১:৫৩ | সংবাদটি ৪৮৮ বার পঠিত


বঙ্গবন্ধুর মা-বাবার জবানন্দী:
গোটা পূর্ব পাকিস্তানব্যাপি ছিলো গৃহযুদ্ধ। প্রতিদিন কোন না কোন ঘটনার খবর মিলতো। শুধু রাজধানী ঢাকা নয়, গোটা প্রদেশ সার্বক্ষণিক আতংকিত থাকতো। রাজধানীতে রাজনৈতিক উত্তেজনা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছিলো। কিন্তু কোলকাতা মুজিবনগরের বাংলাদেশ রেডিও অথবা রাত ৮টার বিবিসি বাংলা সংবাদ ছাড়া পরিস্থিতি জানার কোন মাধ্যম ছিলো না। রাজধানীতে নেতাদের সাথে খুব কমই দেখা হতো। মাঝেমধ্যে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কোন নেতা কিংবা নেতাদের গ্রুপ ঢাকায় আসতেন, তাদের কাউকে কাউকে কেন্দ্র করে সভা-সমিতিতে কারো কারো সাথে দেখা হতো। গৃহযুদ্ধের দিনগুলোতে উদাস হয়ে থাকতে হতো। সাংবাদিক হিসাবে বলতে পারি, ঐ দিনে উত্তরমেরুর মৌসুম ছিলো এবং সমস্ত প্রদেশে শীত ছিলো।
জুনের দিকে খবর পাওয়া যায় শেখ মুজিবুর রহমানের বাবা এবং মা-কে চিকিৎসার জন্য পোস্টগ্রেজুয়েট মেডিক্যাল হাসপাতাল (সাবেক শাহবাগ হোটেল) ভর্তি করা হয়েছে। তাঁর পিতামাতা আমাকে খুব জানতেন। এক সন্ধ্যায় তাঁদেরকে দেখতে উপস্থিত হই হাসপাতালে তাঁদের রোমে। আমি তাঁদেরকে সালাম করি। শেখ মুজিবুর রহমানে পিতা শেখ লুৎফুর রহমান সালামের উত্তর দিয়ে জিজ্ঞাস করেন; ‘শেখ মুজিবুরের খবর কী?’ আমি কিছু বলার আগেই শেখ মুজিবুর রহমানের মা বলেন; ‘আপনার স্মরণ নেই আগের জ্যোতিষি কী বলেছে?’ একজন সাংবাদিক হিসাবে তাঁদের কথাবার্তা আমাকে মাথানত করে দেয়। শেখ লুৎফুর রহমান বলে ওঠেন; জ্যোতিষী কী বলবে? ওরা তো এমনি সত্য-মিথ্যা বলতে থাকে।’ বেগম লুৎফুর রহমান বলেন; ‘তার অতীতের সকল কথা সত্য প্রমাণিত হয়েছে। এজন্য তাঁর একথাও সত্য প্রমাণিত হবে।’ আমি জানতে চাইলাম; জ্যোতিষীর কোন কথা? শেখ লুৎফুর রহমান ঘুরে আমাকে দেখেন এবং বলেন, ‘আরে মিয়া, এই কথায় কী আছে?’ কিন্তু বেগম সাহেবার তখন বলার সুযোগ এসে যায়। তিনি তাঁর ছেলে সম্পর্কে বেশি থেকে বেশি বলতে চেষ্টা করেন। তিন মাস থেকে তাঁরা মুজিবনগর রেডিও এবং বিবিসি ছাড়া কারো কাছ থেকে কিছু শোনার পক্ষে ছিলেন না। তিনি বলেন, ‘একজন জ্যোতিষী বলেছেন, আমাদের ছেলে মুজিব একদিন অনেক বড় কিছু হবে। তবে তাঁর জীবনে অনেক তোফান আছে। সে সকল তোফান অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে পারবে। এই কথাগুলো জ্যোতিষী মুজিবের ছোটবেলা বলেছিলেন।’ এই দিন তাঁদের সাথে এতটুকু কথাই হয়। কারণ, তখন সেখানে শেখ মুজিবের স্ত্রী ফজিলাতুননেসা ও তাঁর ছেলে শেখ রাসেল উপস্থিত ছিলো।
পরের দিন সন্ধ্যায় আবার সেই হাসপাতালে যাই এবং এভাবে যেতে থাকি পূর্ব পাকিস্তানের শেষ দিন পর্যন্ত। সেই সময়ে শেখ মুজিবের মা-বাবার সাথে আলোচনা থেকেই অনেক তথ্য সংগ্রহ করি। বেশির ভাগে শেখ মুজিবের মা-ই কথা বলতেন। তখন তাঁর পিতা মুখ বন্ধ করে তা শোনতেন। আবার যখন তাঁর পিতা বলতেন তখন তাঁর মা খুব মন দিয়ে কথাগুলো শোনতেন এবং মাঝেমধ্যে লুকমা দিতেন। শেখ মুজিবের মা তাঁর বংশ সম্পর্কে যা বলেছেন তা কিছুটা এরকম; তাঁদের পূর্বপুরুষ আরব থেকে চট্টগ্রামে এসেছিলেন। সেখান থেকে কেউ কেউ ফরিদপুরের টুঙ্গিপাড়া এসে বসতি শুরু করেন। ধীরে ধীরে তাঁদের বংশ এবং সম্পদ বৃদ্ধি পেতে থাকে। আমাদের কেউ কেউ রাজনীতিতেও অংশ নেন। মুসলিমলীগ গঠনকালে আমি ঢাকায় ছিলাম। শেখ সাহেব (মুজিবের বাবা) মুসলিম লীগের প্রথম দিকের সদস্য। নবাব সলিমুল্লাহের নিকটতম বন্ধু এবং খাজা আসগরীর পিতার দুই নাতির মধ্যে একজন ছিলেন। শেখ সাহেব (লুৎফুর রহমান) বলেন, ‘আমি মুসলিম লীগের শফি গ্রুপের সাথে সম্পর্ক রাখতাম। পরে যখন কায়দে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ ঐক্যবদ্ধ হয় তখন কায়দে আজমের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করি। পাকিস্তান হওয়া পর্যন্ত যত নির্বাচন হয়েছে সবগুলোতে আমি মুসলিমলীগের সাথে থেকেছি। সেই সময় সবার ভোট দেওয়ার অধিকার ছিলো না। আমাদের ভোটার এলাকা টুঙ্গিপাড়ায় সর্বমোট ভোট ছিলো সাত শো, যার মধ্যে মুসলিম লীগ পেয়ে যেতো সাড়ে চার শো। আমাদের গ্রামে সামান্য হিন্দু ছিলো, তাদের তেমন প্রভাব ছিলো না। মুজিবুর রহমানের জন্ম ১৭ মার্চ ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে। সে গ্রামের মাদরাসায় কোরআন পড়ে এবং দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করে। অতঃপর তাঁকে স্কুলে ভর্তি করি। আমার স্মরণ আছে, সে কোনদিন পরীক্ষায় ফেইল করেনি। স্কুলে সে ফুটবলের ভালো খেলোয়ার ছিলো। হাইস্কুলের পর তার কোলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তির সুযোগ আসে।’
এই সময় বেগম সাহেবা (বঙ্গবন্ধুর মা) আটকিয়ে বলেন, ‘আপনি তার বিয়ের বিষয়ে তো কিছু বলেননি?’ শেখ সাহেব (বঙ্গবন্ধুর পিতা) হাসতে হাসতে বলেন, ‘এটা তুমি-ই বলো।’ বেগম সাহেবা বলতে শুরু করেন, ‘আমরা ১৩ বছর বয়সে শেখ মুজিবকে বিয়ে করিয়েছি। তখন তার স্ত্রী ফজিলাতুন নেসার বয়স মাত্র তিন। তাদের বিয়ে অনুষ্ঠান হয় পাকিস্তান সৃষ্টির দু বছর পর।’ আমি তাঁর পিতার কাছে জানতে চাইলাম, ‘ তিনি কবে রাজনীতিতে এলেন?’ উত্তরে তিনি বলেন, ‘রাজনীতি আমাদের রক্তে মিশে ছিলো। আমাদের বংশের সবাই রাজনীতিতে ছিলো। ঘরে বেশিরভাগ সময় জাতীয় অবস্থা এবং জাতির উন্নয়ন নিয়ে কথা হতো। তাই বলতে পারি, শেখ মুজিবের বোধ-বুদ্ধির চোখ খোলার পর থেকে রাজনীতির সাথে জড়িত। স্কুলে সে প্রায় বক্তব্য দিতো। কোলকাতা কলেজে যাওয়ার পর বড় বড় মিটিং-এ সে বক্তব্য দিতে শুরু করে। শেরে বাংলা এবং হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী তাকে খুব স্নেহ করতেন। কলেজে সে এক বছরের থেকে বেশি ফুটবল গ্রুপে ছিলো। তার নিকটতম বন্ধুদের মধ্যে ছিলো জহুর উদ্দিন, ফজলুল কাদের চৌধুরী, মসিউর রহমান, আনোয়ার এবং আবিদ জুবেরি। ওরা ফুটবল মাঠেও একেঅন্যেও সাথী ছিলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বাংলায় দুর্ভিক্ষ হলে লাখের মতো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন বাংলায় মুসলিম লীগের শাসন ছিলো এবং বেশির ভাগ ক্ষতিগ্রস্ত মুসলমানেরাই ছিলো। শেরে বাংলা এবং মুসলিম লীগের অন্যান্য বিরোধীরা তখন খুব গরম বক্তব্য দিতে শুরু করেন। সেই সময় খাজা নাজিমুদ্দিন বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি মানুষের প্রতিবাদের মুখোমুখি দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। তিনি পদত্যাগ করলে মুসলিম লীগ সোহরাওয়ার্দীকে নেতা এবং প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করে। তিনি মন্ত্রী পরিষদ গঠন করেন। এই পরিষদে অন্যান্যের মধ্যে মুহাম্মদ আলী বগুড়া, মাওলানা তমিজ উদ্দিনও ছিলেন। ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে নির্বাচনের মৌসুম শুরু হলে বাংলার একদল নেতা আমাদের এলাকায় মিটিং করেন। হিন্দু নেতারাও এসেছেন। সুভাষ চন্দ্র বসুর বড়ভাই সুরাত চন্দ্র বসুও এসেছিলেন। অনেক বড় সভা হয়েছিলো। তবে মুসলমানেরা জনসভা শেষে ভদ্র ভাষায় বলে দিয়েছে, ‘আমরা আপনাকে শ্রদ্ধা করি, তবে আপনার প্রার্থীকে ভোট দেবো না।’
সুরাত চন্দ্র বসু কংগ্রেস নেতা ছিলেন, তিনি এই পরিস্কার বক্তব্যের প্রশংসা করেন এবং নিজের প্রতিনিধিকে বলেন নির্বাচন থেকে সড়ে দাঁড়াতে। শেষ পর্যন্ত শেরে বাংলার প্রজা পাটির সাথে মুসলিম লীগের মোকাবেলা হয়। ৭ শ’ ভোটের মধ্যে প্রজাপাটি ভোট পায় ৫৯টি আর মুসলিমলীগ ৬৪৮টি। এই নির্বাচনে মুজিবও মুসলিমলীগের পক্ষে প্রচার কাজে জড়িত ছিলো। মাওলানা তমিজ উদ্দিন, শহিদ হোসেন সোহরাওয়ার্দী এবং অন্যান্য নেতারাও সেই সময়ে আমাদের গ্রামে এসেছেন। এই সময় মুসলিম লীগ বিজয়ের আনন্দে উল্লোসিত। সাতগ্রাম মিলে উৎসব হয়। আখনি পাকানো হয়। সেই সময় আমাদের অঞ্চলে বিদ্যুৎ ছিলো না। ঘি দিয়ে প্রদীপ জ্বালিয়ে আলোকিত করা হয়েছিলো।’ শেখ লুৎফুর তাঁর স্মরণকে শব্দ দিয়ে উচ্চারণ করছিলেন এবং ধারাবাহিকভাবে বলে যাচ্ছিলেন; ‘সোহরাওয়ার্দী সাহেব শেখ মুজিবের গর্দনে হাত রেখে আমাকে বলেন, ‘শেখ সাহেব বাংলার রাজনীতি একদিন আপনার ছেলেকে টেনে নিয়ে যাবে।’ সোহরাওয়ার্দী তখন যুবক এবং আমাদের রাজনীতির জন্য আইকন।’ তাঁর মুখে নিজের ছেলের প্রশংসা শোনে গর্বে আমার মাথা বড় হতে থাকে। পাকিস্তান হওয়ায় সকল মুসলমানের ঘরের ছাদে আলো জ্বলে, আমাদের ঘরের ছাদে, দরজার সামনে এবং চার দেয়ালেও। ১৯৪৭টি বাতি জ্বালানো হয়, যার মধ্যে ২৫ সের ঘি ব্যবহার করা হয়েছে। আমরা সবাই পাকিস্তানের জন্মে খুব খুশি হই।’ এই সময় শেখ মুজিবের মা আবার তাঁর বাবাকে টিপ্পনি কেটে বলেন, ‘তুমি তো তা বললে না যে, শেখ মুজিব ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির সম্মেলনে উপস্থিত ছিলো। মুজিব কোলকাতা থেকে ৫০০ বাইসাইকেলের মিছিল নিয়ে দিল্লি গিয়েছিলো। সে সেই সময় এই মিছিলে যোগ দিতে ফিলিপস-এর নতুন সাইকেল খরিদ করে, যার মূল্য সেই সময়ের ত্রিশ রুপি। সে যখন দিল্লি থেকে ফিরে আসে তখন অনেক খুশি ছিলো। সে বলতেছিলো এখন আর কোন শক্তি নেই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকে আটকাতে পারে। এরপর যখন বিহারে মুসলিম গণহত্যা হলো তখন বাংলা থেকে মুসলিম লীগের সাহায্যকারি গ্রুপ সেখানে যায়। সেই গ্রুপে আমার ছেলেও ছিলো। তারা সেখানের সংঘাতপূর্ণ এলাকায় দু’মাস থেকে সাহায্য করে। অতঃপর ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য কোলকাতা ক্যাম্পে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে তারা রাতদিন কষ্ট করে। সবচে আশ্চর্য্যজনক কথা হলো, যে বিহারের মুসলমানদের জন্য আমরা এত কষ্ট করলাম তারা বেশির ভাগেই আমাদেরকে বিপদের সময় সাহায্য করেনি এবং কেউ কেউ আমাদেরকে শত্রু মনে করতে লাগে।’
আমি বেগম সাহেবার কাছে জানতে চাইলাম, লাইলপুর (বর্তমান ফয়সলাবাদ) জেলে আপনার ছেলের অবস্থা কেমন, তা কি আপনি জানেন? তিনি বলেন, ‘তার শারিরিক এবং মানসিক গঠন এমনই যে সে সব রকমের নির্যাতনে ধৈর্য্য ধরতে পারে। সে যে অবস্থায়-ই হোক, ভালো থাকবে। সে তার নীতিতে সবসময় দৃঢ়। জ্যোতিষি বলেছে, ‘পাকিস্তানের জেলে তাকে কিছুই করতে পারেনি।’ আমি জানতে চাইলাম, এ কি কোন নতুন জ্যোতিষী? তিনি বলেন, ‘না, সেই পুরাতন জ্যোতিষী যে ছোটবেলা মুজিব সম্পর্কে যা বলেছিলো সবই সত্য হয়েছে। জানতে চাইলাম, আমি কি সেই জ্যোতিষীর সাথে সাক্ষাৎ করতে পারি? তিনি বলেন, যদি কোনদিন তোমার উপস্থিতিতে এসে যায় তবে অবশ্যই। নতুবা তার কোন ঠিকানা আমার জানা নেই। তার যখন ধ্যানভঙ্গ হয় তখন আমাদের কাছে আসে কিংবা পরিবারের কারো কাছে যায়।’
এখন যা বলছি তা ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসের শেষ সন্ধ্যার কথা। ইয়ার মার্শাল আসগর খান এবং তাঁর সেক্রেটারি জেনারেল মুখলিসুজ্জামান খান শেখ মুজিবুর রহমানের বাবা শেখ লুৎফুর রহমান ও মাকে স্মরণ করলেন। আমি যখন মুজিবের মা-বাবার রোমে প্রবেশ করি তখন সেই রোমে একজন বৃদ্ধলোক প্রবেশ করেন। শেখ লুৎফুর তার দিকে ইশারা করে আমাকে বলেন, ‘নেন, আপনার মেহমান এসে গেছেন।’ আমি প্রশ্নবোধক চোখে তাকে দেখলাম। তিনি বললেন, ‘উনি আব্দুল মালিক চৌধুরী।’ আমি বিষয়টি বুঝতে পারছিলাম না। তিনি বললেন, ‘এই সেই জ্যোতিষি যিনি মুজিব সম্পর্কে ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন।’ এরই মধ্যে আব্দুল মালিক চৌধুরী চেয়ারে বসে গেলেন। তিনি বস্তার ব্যাগ থেকে একটি কাগজের বুন্দা বের করলেন। এরপর তারা বাংলায় কথা শুরু করেন এবং তিনি বারবার কাগজের দিকে দৃষ্টি দিতে থাকেন। অনুমানিক ত্রিশ মিনিট পর্যন্ত তারা কথা বলেন। বেশির ভাগ সময় তিনিই কথা বলেছেন। শেখ মুজিবের মা-বাবা মন দিয়ে তার কথা শোনছিলেন। জ্যোতিষী আব্দুল মালিক চৌধুরী যা বললেন তার মর্মার্থ হলো, ‘আমি আপনাদেরকে প্রথমেও বলেছি পাকিস্তান জেলে মুজিবের কিছু হবে না। আমি আরও জ্ঞানিদের (জ্যোতিষী) কাছে মুজিবের নাম বলেছিলাম, তারা হাতের রেখা দেখা ছাড়াই আমার সাথে সহমত হয়েছেন। সে তিন-চার মাসের মধ্যে জেল থেকে বেরিয়ে আসবে। পৃথিবীতে তার প্রচার ও মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। তার বিপদের দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে। সে হেফাজতে এবং ভালোভাবে ঢাকায় এসে যাবে।-----আগামী বছর জানুয়ারির প্রথম সাপ্তাহে তার জন্য এবং আমাদের সবার জন্য খুশির সংবাদ রয়েছে। আমি তো আপনাকে তার ছোটবেলাই বলেছি যে, তার জীবনে অনেক তোফান আসবে, কিন্তু সে নিজেই একটি তোফানের নাম। তার কিছুই হবে না। মৃত্যু আসবে এবং তার পাশ দিয়ে চলে যাবে। তবে এইখানে তার জীবনের জন্য বেশি ভয় রয়েছে। এখানে তার জীবনের হেফাজতের জন্য বেশি ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। নিজের লোকদের কর্তৃক তার বেশি ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।’
আব্দুল মালিক চৌধুরী পেশাদার কোন জ্যোতিষী নয়। এটা তাঁর সখ। তিনি যার হাত দেখতেন এবং কথা বলতেন তার কাছ থেকে কোন টাকা নিতেন না। তাঁর ক্ষুদ্র ক্ষেত-খামার ছিলো। তবে বেশিরভাগ সময় লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। চৌধুরীর সাথে আমার দ্বিতীয় এবং শেষ দেখা ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসের শেষ সাপ্তাহে, প্রধানমন্ত্রীর ভবনে। তিনি সেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। তিনি আমাকে দেখে খুব উৎফুল্লের সাথে গলায় গলা মিলিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, ‘দেখেছো আমি কি বলেছিলাম?’ আমি সামনের দিকে গর্দান হেলিয়ে বললাম, আপনি শতভাগ সত্য বলেছিলেন। তিনি মুচকি হেসে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে প্রবেশ করলেন। তাঁকে কেউ কিছু বললো না। সবাই তাকে চিনতো। যখন তিনি প্রধানমন্ত্রীর অফিসে প্রবেশ করেন তখন শেখ মুজিবুর রহমান চেয়ার থেকে উঠে এসে তাঁকে অভ্যর্থনা করেন এবং হাল-হকিকত জানতে চেষ্টা করেন। অতঃপর চা-নাস্তার ব্যবস্থা হয়। চৌধুরী তখন আমাকে বলেন, ‘তিনি প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষকও ছিলেন।’ শেখ মুজিব তখন হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়েন। এরপর শেখ সাহেব নিজে উঠে গিয়ে তাঁর গুরুর জন্য চা তৈরি করেন এবং এগিয়ে দেন। সাথে অনুরোধ করেন অন্য নাস্তা গ্রহণের জন্য। আব্দুল মালিক চৌধুরীকে তাঁর এই শিষ্যের ব্যবহার মুগ্ধ করেছিলো। তিনি তখন কাঁদতে ছিলেন। বাম হাত দিয়ে তিনি চোখ মুচেন। সম্ভবত এটাই আব্দুল মালিক চৌধুরীর জন্য গর্বের কারণ ছিলো যে, তাঁর শিষ্য নতুন একটি দেশের প্রতিষ্ঠাতা এবং ইতিহাসে নিজের অবস্থান স্থায়ীভাবে করে নিতে সক্ষম হয়েছে। আমরা সেখানে থাকতে আরও তিনজন রোমে প্রবেশ করেন; একজন আই এইচ এম কামরুজ্জামান, দ্বিতীয়জন জেনারেল উসমানী এবং তৃতীয়জন তাহির উদ্দিন ঠাকুর। ঠাকুর পাকিস্তান পার্লামেন্টের সর্বশেষ নির্বাচিত সদস্য। নির্বাচনের পূর্বে তিনি দৈনিক ইত্তেফাকের চীফ রিপোর্টার ছিলেন। আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় তিনি শেখ মুজিবের কাছিকাছি হয়ে ঘনিষ্টতা অর্জন করেন। পরে আওয়ামীলীগের অনেক বড় বড় নেতার বিরোধীতার পরও শেখ মুজিব তাকে কুমিল্লার এক আসন থেকে আওয়ামী লীগের টিকেটে নির্বাচনের সুযোগ দেন। শেখ সাহেব ঠাকুরকে মনে করতেন তার ছেলে জামাল, কামাল এবং রাসেলের মতো চতুর্থ ছেলে। কিন্তু এই ঠাকুরকে দেখেই চৌধুরী সাহেবের মুখ কালো হয়ে যায় এবং চিৎকার দিতে থাকেনÑ ওনি কোন সাহেব? শেখ মুজিব তাঁকে ঠাকুরের পরিচয় দিলেন। ঠাকুর কানে কানে কিছু বলে চলে যায়। সে যাওয়ার পর চৌধুরী সাহেব শেখ সাহেবকে যা বললেন তার সারমর্ম হলো, ‘এই লোক থেকে সাবধান থাকবে। তার মধ্যে চতুরতা রয়েছে।’ শেখ সাহেব হেসে বললেন, ‘সে তো আমার চতুর্থ সন্তান।’ চৌধুরী তখন বললেন,‘ শাহ জাহানকেও তার ছেলে ক্ষতি করেছিলো।’ চৌধুরীর এই কথার প্রভাবে এতটুকু হয় যে, তাহির উদ্দিন ঠাকুরকে অন্য কোন দায়িত্বে না দিয়ে মন্ত্রী পরিষদে প্রচার বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
ধানমন্ডীর ৩২ নম্বারে শেখ মুজিবুর রহমানের মা-বাবার সাথে আমার শেষ দেখা হয়। সেদিন আমি বুঝতে পারি তাঁরা তাঁদের ছেলে এবং নাতি-নাতিনের সাথে আমার প্রশংসা করেছেন। বলেছেন, আমি তাঁদের অনুপস্থিতিতে প্রায় এসে তাঁদের দুজনকে দেখে গেছি এবং খবরাখবর রেখেছি। সাথে উপহার সামগ্রীও নিয়ে যেতাম। সেই সময় আমি যখন তাঁদেরকে দেখতে যেতাম তখন মূলত আলোচ্য বিষয় থাকতো খবরাখবর। আব্দুল মালিক চৌধুরীর সাথে আমার আর দেখা না হলেও তাঁর এক শিষ্যের সাথে একবার দেখা হয়েছে। তখন তিনি আমাকে বলেছিলেন, তাঁর গু

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT