উপ সম্পাদকীয়

ভোটের প্রতি জনগণের অনীহা কেন?

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০২-২০২০ ইং ০০:২৬:১০ | সংবাদটি ৯৬ বার পঠিত

১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণের সিটি নির্বাচন। রাজধানী ঢাকার এই দুই সিটি নির্বাচনে নজিরবিহীন কম ছিল ভোটার উপস্থিতি। ঢাকা উত্তর সিটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আতিকুল ইসলাম মোট ভোটারের মাত্র ১৪ দশমিক ৮৪ শতাংশের সমর্থন নিয়ে মেয়রের চেয়ারে বসছেন। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে মোট ভোটারের ১৭ দশমিক ৩০ শতাংশের সমর্থন নিয়ে মেয়রের দায়িত্ব নিচ্ছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপস। ভোট পড়ার হার ঢাকা উত্তরে ২৫ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং ঢাকা দক্ষিণে ২৯ শতাংশ। অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এবার নজিরবিহীন কম সংখ্যক ভোটারের সমর্থন নিয়ে মেয়রের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের দুই প্রার্থীকে। ভোর্টে পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দিন দিন ভোটের প্রতি মানুষের অনীহা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভোট কেন্দ্রে যেতেই চান না জনগণ।
ভোটের প্রতি জনগণের এই অনাস্থা হুট করে সৃষ্টি হয়নি। এই সমস্যাটি ধাপে ধাপে সৃষ্টি হয়েছে। ২০১৪ সালের এক তরফা নির্বাচন ভোটের প্রতি জনগণের অনাস্থা চরম আকার ধারণ করে। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়ার হার ছিল ৮০%। এটা নির্বাচন কমিশনের দেয়া তথ্য। আবার নির্বাচন কমিশন এই তথ্যও প্রকাশ করেছে যে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১০৩টি আসনের ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছিল। এটা কী করে সম্ভব। ভোটার তালিকা প্রকাশের অনেক পরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ সময়ে অনেকে মারা যান, আবার কেউ কেউ বিদেশ চলে যান। মৃত ব্যক্তির পক্ষে কি ভোট দেয়া সম্ভব? ভোটের দিন কেউ বিদেশ থাকলে তার পক্ষে ভোট দেয়া কি সম্ভব? এমতাবস্থায় শতভাগ ভোট পড়বে কি করে? নিশ্চয়ই তা ইঞ্জিনিয়ারিং। শুধু তাই নয়; একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে বিএনপির অভিযোগ, ‘সিংহভাগ কেন্দ্রে ভোটের আগের রাতে আওয়ামী লীগ ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রেখেছিল’। এজন্য বিএনপি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ‘মিড নাইট ইলেকশন’ বলে অভিহিত করেছে। ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ না করা, বিরোধী দলের সহিংসতা, এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা বিজয়ী হওয়ায় নির্বাচন নিয়ে ভোটারদের অনীহার সূচনা ঘটে। এরপর ২০১৪ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও ভোট কারচুপির ব্যাপক ও দৃশ্যমান অভিযোগ এবং এসব অভিযোগের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের নিষ্ক্রিয়তা ভোটারদের মধ্যে চূড়ান্ত অনীহা তৈরি করে। সাম্প্রতিক একটি জরিপে দেখা গেছে, বেশির ভাগ মানুষ আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে। প্রশ্ন হল, আওয়ামী লীগের ভোটাররাও কি ভোট দিতে যাননি? তারাও কি ভোটের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন? নাকি তাঁদের ধারণা, আমাদের দল তো জয়ী হবেই, এ কারণেই আমাদেরকে ভোট দিতে হবে না।
ঢাকা উত্তর সিটিতে মোট ভোটার ছিল ৩০ লাখ ১২ হাজার ৫০৯ জন। এর মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৭ লাখ ৬২ হাজার ১৮৮ জন। প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষ ভোটকেন্দ্রে যাননি। আওয়ামী লীগের প্রার্থী আতিকুল ইসলাম ৪ লাখ ৪৭ হাজার ২১১ ভোট পেয়েছেন অর্থাৎ তিনি মোট ভোটারের ১৪ দশমিক ৮৪ শতাংশের সমর্থন নিয়ে মেয়র হয়েছেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে মোট ভোটার ছিল ২৪ লাখ ৫৩ হাজার ১৫৯ জন। এর মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৭ লাখ ১৩ হাজার ৫০ জন। প্রায় ৭১ শতাংশ মানুষ ভোটকেন্দ্রে যাননি। ৪ লাখ ২৪ হাজার ৫৯৫ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের শেখ ফজলে নূর তাপস। তিনি মোট ভোটারের ১৭ দশমিক ৩০ শতাংশের সমর্থন পেয়ে মেয়র হয়েছেন। মাত্র ১৫-১৭% ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হবেন? রাজধানীর মত জনবহুল রাজনীতির কেন্দ্রস্থলে(!) এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ও হতাশাজনক। বিষয়টি নিয়ে গোটা বিশ্বব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ কি এতই রাজনীতিবিমুখ ও নির্বাচন বিমুখ? প্রাচীনকালে বর্গীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, অত্যাচারী জমিদারের বিরুদ্ধাচরণ, ব্রিটিশ শাসকের অবসান, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ, এরশাদ বিরোধী আন্দোলন, তথাকথিত ১/১১-এসব কিছুই দিবালোকের ন্যায় প্রমাণ করে এদেশের মানুষ কোনো দিনই ভোট ও রাজনীতি বিমুখ ছিল না। বরং এদেশের মানুষ নির্বাচন ও ভোট নিয়ে উৎসব তৈরি করে, আনন্দে মেতে উঠে। ভোটকে উৎসবে পরিণত করা এখানকার মানুষের পুরানো ঐতিহ্য। নির্বাচনের সময় পাড়া-মহল্লায় চায়ের দোকানেও চলে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ। বাসে, লঞ্চে এবং চায়ের দোকানের মালিকরা একসময় বিরক্ত হয়ে ‘রাজনৈতিক আলাপ নিষিদ্ধ’ কথাটি লিখে রাখতেন দৃশ্যমান স্থানে। ভোট-নির্বাচনের এমন আমেজ, এমন ঐতিহ্য গেল কোথায়? ঢাকা সিটি নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের নিয়ে যারা বড় বড় শোডাউন করেছেন, শুধু তারাই যদি ভোট দিতেন তবুও ৫০% ভোট কাস্ট হয়ে যেত। কিন্তু এই শোডাউনকারী নেতারাই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের দিক ভোটকেন্দ্রে যাননি। ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের কম উপস্থিতি এটাই প্রমাণ করেছে।
ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের নজিরবিহীন কম উপস্থিতি সুস্থ রাজনীতির জন্য অশনি সংকেত। বিশেষ করে গণতন্ত্রের জন্য মহাবিপদ। ভোটাধিকার নাগরিকের জন্মগত রাজনৈতিক অধিকার, নাগরিকদের শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক অধিকার। সকলে যাতে এ অধিকার প্রয়োগ করতে পারে সে ব্যাপারে সকল কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সরকারের উচিত।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ক্যাস্পিয়ান সাগরের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব
  • নিজগৃহে আমাদের এই উদ্বাস্তু জীবন
  • বেকারত্ব ও যুবসমাজ
  • আমার হাতেই আমার সুরক্ষা
  • কুড়িগ্রামের সুলতানা সরেবোর
  • স্মার্টফোনের আনস্মার্ট ব্যবহার
  • কোয়ারেন্টাইন না বলে ঘরবন্দি, একঘরে, ছোঁয়াচে বলুন
  • বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের বন্ধু
  • করোনা ভাইরাস ও করুণ পরিস্থিতি
  • পানির অপচয় রোধ করতেই হবে
  • বিশ্বনবী (সা) এর মিরাজ
  • বিদ্যুৎসাশ্রয় এবং আমাদের করণীয়
  • বেঁচে থাকি প্রাণশক্তির জোরে
  • রক্ত দিন জীবন বাঁচান
  • নদীকে না দেখলে নদীও আমাদের দেখবে না
  • করোনা ভাইরাসে থমকে গেল পৃথিবী
  • করোনা ভাইরাসে আমাদের করণীয়
  • বঙ্গবন্ধুর মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন
  • বঙ্গবন্ধু ও আমাদের শিশুরা
  • করোনা ভাইরাস ও দেশের অর্থনীতি
  • Developed by: Sparkle IT