সাহিত্য

আহমদ ছফা ও প্রজন্মের দায়

মুস্তাফিজ সৈয়দ প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০২-২০২০ ইং ০০:৩৮:৫২ | সংবাদটি ১০৪৭ বার পঠিত

১৯৪৩ সালের ৩০ জুন চট্টগ্রাম জেলার চন্দ্রনাইশ থানার হাশিমপুর ইউনিয়নের গাছবাড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ঔপন্যাসিক, কবি, চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবী আহমদ ছফা। তাঁর পিতার নাম হেদায়েত আলী ও মা আছিয়া খাতুন। দুই ভাই ও চার বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয় সন্তান। আহমদ ছফার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার শুরু তাঁর বাবার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দক্ষিণ গাছবাড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ১৯৫৭ সালে পিতৃগ্রামের নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। ছাত্রজীবনের তারুণ্যের সূচনালগ্ন হতেই তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যোগ দেন। বিপ্লবী সূর্যসেনের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে প্রভাবিত হয়ে তাঁর কয়েকজন বন্ধু মিলে চট্টগ্রাম দোহাজারী রেললাইন উড়িয়ে দেন। ১৯৬২ সালে চট্টগ্রাম নাজিরহাট কলেজ হতে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন এবং এই বছরে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। কিন্তু পড়াশোনা চালিয়ে যান নি। শিক্ষকদের সাথে অভিমান করেই বাংলা বিভাগ ছেড়ে দেন। ১৯৬৭ সালে বি-বাড়িয়া কলেজ হতে প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে ২য় শ্রেণিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭০ সালে এম.এ পরীক্ষা দেয়ার পূর্বেই বাংলা একাডেমীর পিএইচডি গবেষণা বৃত্তির আবেদন করেন এবং তিন বছরের ফেলোশীপের জন্য মনোনীত হোন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ১৮০০ খ্রি: থেকে ১৮৫৮ খ্রি: পর্যন্ত বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব, বিকাশ এবং বাংলার সাহিত্য- সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে এর প্রভাব। পিএইচডি গবেষণা কর্মের নিমিত্তে জ্ঞানতাপস জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক স্যারের সাথে পরিচিত হোন।
১৯৭১ সালে প্রাইভেটে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে এম.এ পরীক্ষা দেন এবং তাঁর মৌখিক পরীক্ষা হয় মার্চের ২১ তারিখে। এই ছিল আহমদ ছফার একাডেমিক ক্যারিয়ার। আহমদ ছফা একাডেমিক শিক্ষা যতটা পেয়েছেন তাঁর চেয়ে বেশি সমৃদ্ধ তাঁর নিজস্ব চিন্তাধারা ও বুদ্ধিবৃত্তির চির সৌন্দর্যময় জগৎ। তিনি যেমন উচ্চ স্তরের চিন্তনের অধিকারী ছিলেন তেমনি ছিলেন অতিমাত্রায় বহুমাত্রিক প্রতিভাধর এবং মানবিক চেতনা সম্পন্ন। মানবিক মুক্তিই ছিল তাঁর হৃদয়ের নিরব কথা। আহমদ ছফার লেখনী যেকোন বয়সের পাঠকের কাছে চির সঞ্জীবনী চির যৌবনা চির অধরা অপ্সরী রূপের কিন্নরী। ওমর খৈয়ামের কবিতার ছন্দে- “রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে কিন্তু বই সে অনন্ত যৌবনা”।
ছফা আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিয়েছেন ২০০১ সালের ২৮শে জুলাই। বুদ্ধিবৃত্তি ধারার জ্ঞান অন্বেষণকারীরা এখনো তাঁর সৃষ্টিশীল সাহিত্য শৈলীতে ডুব দেয় নির্ভাবনায়, পরম আনন্দ বিলাসে। ছফার লেখনী মাঝে তাজমহলের সৌন্দর্যের সাথে দারুণ মিল রয়েছে। তাজমহলকে বিভিন্ন দিক হতে দেখলে যেমন বিভিন্ন আঙ্গিকে এর রূপ ফুটে ওঠে তেমনি ছফা রচনাবলীও এমন সৌন্দর্যের নিরব উদাহরণ। সাহিত্য হচ্ছে সাহিত্যিকের মন, বস্তু- অবস্তুজগত ও নিজের প্রকাশভঙ্গি। মনের মাধুরী মিশিয়ে বস্তুজগতের নানা বিষয়ের ইতিবাচক প্রকাশভঙ্গির সরব অবস্থান সৃষ্টি করেছেন গণবুদ্ধিজীবী সমাজবিজ্ঞানী ছফা।
আহমদ ছফা সমাজের পরিবর্তন নিয়ে ভাবতেন, মানুষের উন্নয়ন নিয়ে পরিকল্পনা করতেন। এসব কিছুই তুলে ধরতেন তাঁর বিশ্লেষণধর্মী ক্ষুরধার লেখনীতে। তিনি কখনো অন্যায়ের সাথে আপস করেন নি বরং রাষ্ট্রীয় পেশিশক্তির বিপক্ষে তিনি কলমশক্তির ব্যবহার করেছেন নিপুণভাবে। আমাদের দেশীয় শিক্ষার কথা নিয়েও তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ ও সত্য প্রকাশকারী। ৭২/৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সেমিনারে পাঠ করা আহমদ ছফার “শিক্ষার দর্শন” প্রবন্ধটি। আমরা সবাই জানি যে শিক্ষার কাজ হচ্ছে মানুষের আচরণের কাঙ্খিত ইতিবাচক পরিবর্তন। আপনি আপনার নিজের কাছে প্রশ্ন রাখেন, আসলেই কি আমাদের আচরণের কাঙ্খিত পরিবর্তন হচ্ছে কিনা? আমাদের দেশে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়েছে ঠিক তবে এটাও বলতে হবে আমরা প্রকৃত মানবতার শিক্ষা থেকে এখনো বঞ্চিত আছি মানে সহজ কথায় বলতে হয় আমরা জাতিগতভাবে সার্টিফিকেট ও কর্মমুখী শিক্ষা অর্জন করছি অথচ মানবিকতার শিক্ষা খুব একটা নেই। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের আচরণের কাঙ্খিত ইতিবাচক পরিবর্তন। আচরণের পরিবর্তনের মাধ্যমেই একজন মানুষ মানবিক হয়ে ওঠে। ছফার “শিক্ষা দর্শন” প্রবন্ধে বলা হয়- ইউরোপীয় রেনেসাঁর পূর্বে শিক্ষার দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল অতীন্দ্রবাদে প্রোথিত। “মানুষ জানবে কেন? বুঝবে কেন? জ্ঞান লাভ করবে কেন? এই সব কেন-র জবাব প্রাচীন জগৎ দিয়েছে- কোন এক অলৌলিক সত্তায় তাকে বিশ্বাসী হতে হবে।” মানুষ অজানাকে জানতে চায়, বুঝতে চায়। অজানাকে জানার মাধ্যমেই সত্তার পরিচয় আবিষ্কৃত হয়। প্লেটো গ্রিসে গার্ডিয়ানদের যে শিক্ষাব্যবস্থার সুপারিশ করেছিলেন তার চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল পরমসত্তার স্বরূপ উপলদ্ধি। পরম সত্তার উপলদ্ধি বলতে ছফা বুঝিয়েছেন মানুষ যেন মানবিক হয়। মানবিকতার মাঝে শিক্ষার্থীরা খুঁজে পাবে পরম সত্তার সন্ধান। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় দেখা যায়- আমরা শিক্ষিত হচ্ছি, সফল হচ্ছি কিন্তু কে কতটা মানবিক হতে পেরেছি। মানবিক হওয়াই শিক্ষার মূল লক্ষ্য তথা পরম সত্তার সানিধ্য লাভ। আহমদ ছফা অভিমত পোষণ করেন যে “ পরম সত্তার বিষয়ের জ্ঞানের বলেই মানুষের সুস্থ সমাজ সৃজন সম্ভব।” আহমদ ছফার লেখা সম্পর্কে তাঁরই শিক্ষক জ্ঞানতাপস জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক স্যার বলেছেন “ ছফার রচনাবলি গুপ্তধনের খনি এবং তার সাহিত্যকর্ম স্বকীয় এক জগতের সৃষ্টি করে যে জগতে যেকোন পাঠক হারিয়ে যেতে পারবে।” এই ছিল গুরুর কাছে প্রিয় শিষ্যের সাহিত্যকর্মের যথার্থ মূল্যায়ন। কতটা আপন করেই নিতে পেয়েছিলেন বলেই শিষ্য সম্পর্কে এমন দরদমাখা উক্তি করতে পেরেছিলেন রাজ্জাক স্যার। আহমদ ছফার রচনাসম্ভার সৃষ্টিশীল এবং পরিপূর্ণ। ড.সলিমুল্লাহ খানের ভাষ্যমতে - “কাজী নজরুল ইসলামের পরে বাংলা সাহিত্যে আহমদ ছফাই শ্রেষ্ঠ মুসলমান লেখক।” আহমদ ছফার রচনাসম্ভার যেন সমুদ্র জলবক্ষে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মনিমুক্তো। তাঁর উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- সূর্য তুমি সাথী (১৯৬৭), দোলো আমার কনকচাঁপা(১৯৬৮), জাগ্রত বাংলাদেশ (১৯৭১), বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস (১৯৭২), জল্লাদ সময়(১৯৭৫), দুঃখের দিনে দোহা (১৯৭৫), সিপাহী যুদ্ধের ইতিহাস(১৯৭৯), বাঙালি মুসলমানের মন (১৯৮১), গো-হাকিম (১৯৭৭), ফাউস্ট (মূল- জার্মান লেখক য়োহান ভোলফ্ গাঙ ফন গ্যোতে-১৯৮৬), একজন আলি কেনানের উত্থান-পতন (১৯৮৯), মরণবিলাস (১৯৮৯), অলাতচক্র (১৯৯৩), গাভী বিত্তান্ত (১৯৯৫), অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী (১৯৯৬), পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ (১৯৯৬), যদ্যপি আমার গুরু (১৯৯৮), লেনিন ঘুমাবে এবার (১৯৯৯), বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশ রাষ্ট্র (২০০১) ইত্যাদি।
আহমদ ছফার মৃত্যুর ১৯ বছর হলো। তবুও তিনি পাঠকমহলে বুদ্ধিবৃত্তির চর্চার পথে যেন শুদ্ধ প্রতীক, অবিশ্বাস্য আলোকধারার বাতিঘর। সেই বাতিঘর হতে এখনো আলো জ্বলছে স্বপ্রতিভ মহিমায় আর সেই আলোরেখায় উৎসুক ছফামুখী মানুষেরা খুঁজে নেয় বুদ্ধিবৃত্তির বিন্যাসের নবনির্যাস। যে নির্যাসে প্রাণের মাঝে, মনের মাঝে সঞ্চারিত হয় এক অমীয়ধারা। বুদ্ধিবৃত্তি ও শৈল্পিক কথাসাহিত্যের অমর নাম আহমদ ছফা, আমরা তাঁর কাছে জাতিগতভাবে ঋণী। আহমদ ছফার কাছে প্রজন্মের দায়বদ্ধতা রয়েছে। সেই দায়বদ্ধতা আসলে কী? প্রজন্মের দায়বদ্ধতা হলো ছফা যেমনটা চেয়েছেন তেমনটা না হোক অন্তত এ প্রজন্মে আমরা আমাদের নিজেদের জায়গা থেকে নিজেকে মানবিক হিসেবে গড়ে তুলি। মানবিকতা হলো মানুষের মুক্তি আর পরম সত্তার সন্ধান লাভ। একজন শিক্ষার্থীকে মানবিক করাই শিক্ষার মূল্য লক্ষ্য। আদর্শ মনুষ্যত্ব অর্জনই হলো শিক্ষা। যখন একজন শিক্ষার্থী আদর্শ মনুষ্যত্ব অর্জন করতে পারে তখন সে এমনিতেই মানবিক হয়ে উঠবে কেননা মানবিকতা ছাড়া আদর্শ মনুষ্যত্ব অর্জিত হয় না। আর্দশ মনুষ্যত্ব অর্জন করতে গেলে অবশ্যই একজন শিক্ষার্থীর বুদ্ধিবৃত্তির সৃজনময় বিন্যাস করবে। সেই বিন্যাস ও আদর্শ মনুষ্যত্ব অর্জনের মাধ্যমে কিছুটা হলেও প্রজন্মের দায়বদ্ধতার হিসাব কষে নতুন বৃদ্ধিবৃত্তির জাগরণ হবে এবং আরো জন্ম হবে আগামী প্রজন্মের নয়া ছফা।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT