উপ সম্পাদকীয়

পেপার বুক হোক নিত্যসাথী

গোলাম সারওয়ার প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০২-২০২০ ইং ০৪:১৮:৪৩ | সংবাদটি ৭৩৭ বার পঠিত
Image

একটা সময় ছিল বই পড়ার। কম-বেশি সবাই বই পড়ত। সবার ঘরে ঘরেই বই পড়ার একটা হিড়িক ছিল। একটা ছড়া বা কবিতার বই, মজার কোনো গল্পের বই কিংবা রহস্যময় কোনো উপন্যাস পেয়ে শেষ না করা পর্যন্ত নেশা থেকে যেত।
হ্যাঁ, বই পড়াও একটা নেশা, তবে ভালো নেশা। বই পড়লে মস্তিষ্কের অনেক জট খুলে যায়। চিন্তা-গবেষণার স্পেস বড় হতে থাকে। নতুন নতুন আইডিয়া কিংবা উদ্ভাবনী ভাবনারও জন্ম হয়। কিন্তু দুঃখের সাথেই বলতে হয় বই না পড়ার কারণে আমাদের মস্তিষ্কের সে জটগুলো এখন আর খুলে যাবার সমূহ সম্ভাবনা দেখছি না! জটগুলো যেন ক্রমেই জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। ফলে মাথা-ব্যথা, খিঁচুনী বেড়ে যাচ্ছে। ব্রেইন স্ট্রোক হচ্ছে, চোখেরও জ্বালা ধরছে! চিন্তা-গবেষণার স্পেসগুলো ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে এবং এক সময় ছোট হতে হতে বিলীন হয়ে যেতে পারে স্পেস। তখন চিন্তা-গবেষণার স্পেস বলতে আর কিছুই থাকবে না।
এইডেড স্কুলে ক্লাস সিক্সে পড়তাম ১৯৭৪ সালে। তখন এনামুল মুনীর, শামসুল বাসিত শেরো, মুরাদ, মিলাদ আমার ক্লাসমেট ছিল। এনাম এবং শেরো বর্তমানে সিলেটের সংস্কৃতি অঙ্গনের সাথে জড়িত। এনাম আর মিলাদ তখন খুব সিনেমা দেখত। প্রায়ই ক্লাসে এসে বই দেখার গল্প করত। রাজ্জাক-কবরী-শাবানা-র কথা বেশ অবাক হয়েই শুনতাম। কিন্তু বই দেখার কথা বুঝতামই না। কারণ বই তো পড়তে হয়, বই আবার দেখবে কি করে? পরে বুঝলাম বই মানে সিনেমা! ১৯৭৪ সালে আমারও প্রথম দেখা বাংলা চলচ্চিত্র খসরু এবং শাবানা অভিনীত বাদশা। তখন থেকেই জানতাম সিনেমা-চলচ্চিত্রকেও বই বলা হতো। এরপর থেকে সিনেমা-টিভিতে তথাকথিত অনেক বই দেখেছি কিন্তু কখন যে সিনেমা-টিভির বই আমাদের কাগজের বইকে অনেকাংশেই গ্রাস করেছে, তা অনেক দেরীতে বুঝেছি।
সিনেমা-টিভির পর এলো ফেসবুক। এক্কেবারে পেপারবুক শেষ করে দেয়ার জন্যই যেন নাজিল হলো ফেসবুক। পড়ার টেবিলে বসতে হয় না। কাগজ-কলম লাগেনা। যখন-তখন, যেখানে-সেখানে জায়গা করে নিয়েছে ফেসবুক। পড়ালেখার বই বাদ, আউট বই বাদ, অফিস-আদালতের কাজ-কামও বাদ। আগে তো ফেসবুক! ইউটিউব! ইমো! মেসেঞ্জার! কী এক নেশারে বাবা! হাঁটতে গেলেও স্মার্টফোন সামনে রেখে হাঁটতে হয়। কী জানি কি মিস হয়! রিক্সায়, গাড়িতে, নৌকায়-কোথায় নেই? ঘুম থেকে উঠেই ফেসবুক, ঘুমকে হারাম করতেও ফেসবুক! বিশ্বের আর কোনো দেশে এভাবে ফেসবুক ইউজ করে কি-না আমার জানা নেই। তবে বাংলাদেশে ফেসবুকের ব্যবহার আমার বর্ণনার চেয়েও ভয়াবহ!
বাংলাদেশে দু’টি পণ্য সব জায়গায় পাওয়া যায়। নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য চাল-ডাল-তেল-নুনের চেয়েও এভেইলেবল। চাল-ডাল-তেল পেতে বাজারে যেতে হয়, ধারে কাছে পাওয়া যায় না। জামা-কাপড় কিনতেও মার্কেট প্লেসে যেতে হয়। কাগজ-কলম কিনতেও দূরে কোনো বাজারে যেতে হয়। কিন্তু যে দু’টি পণ্য খুব কাছে এবং সর্বত্র পাওয়া যায় সেগুলো হচ্ছে : বিড়ি-সিগারেট এবং অনলাইন-ইন্টারনেট। চাইলেই জিবি-এমবি, ফ্লেক্সিলোড পাওয়া যায়। চাইলেই বিড়ি-সিগারেট পাওয়া যায়। সহজ লভ্যতার কারণেও এসব পণ্যের ব্যবহার দিন দিনই বাড়ছে।
ফেসবুক, ইউটিউভ, মেসেঞ্জার, ইমো সুফলের চেয়ে কুফলই বয়ে আনে বেশি। ফেসবুক পেইজেই থাকে লোমহর্ষক ছোট ছোট গল্প দেখার সুযোগ, যা উঠতি বয়স্কদের জন্য রীতিমত হুমকিস্বরূপ। এসবের প্রভাবে আমাদের দেশে অনেক লোমহর্ষক কাহিনীও ঘটে গেছে, যা কারোরই অজানা নয়। ফেসবুক এসেছিল মানুষ যাতে সহজে যোগাযোগ করতে পারে, ভাবের আদান-প্রদান করতে পারে। কিন্তু ভাবের এই আদান-প্রদান করতে গিয়েই বেশিরভাগ মানুষ বিপথগামী হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে আমাদের দেশের স্টুডেন্টরা পেপারবুক ছেড়ে দিয়ে ফেসবুকের নেশায় এত বেশি বুঁদ হয়ে থাকে যে বলতে গেলে কমই বলা হবে। ফোন কোম্পানী এবং অনলাইন প্রোভাইডার কোম্পানীগুলোর শক্ত মার্কেটিং পলিসির কারণেও এদের ফেসবুক থেকে ফিরিয়ে আনা যাচ্ছে না। তারুণ্যের শক্তিগুলো বৃথাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
বই যাতে আমাদের নিত্য সঙ্গী হয়, সেইজন্য প্রতি বৎসর বইমেলা হয়। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণেও বইমেলা হয়। সিলেট-চট্টগ্রাম-ঢাকা-সর্বত্রই বইমেলা হয়। বইমেলাকে প্রাণের মেলাও বলা হয়। প্রকাশনার স্টলগুলোতে বেশ সুন্দর করেই বই সাজানা থাকে। শুধু গান শুনে, আড্ডাবাজি করে কিংবা ঘোরাঘুরি করে সময় কাটানোর জন্য বইমেলা নয়। গান, আড্ডা, ঘোরাঘুরি হবে, হোক। কিন্তু বই হাতে নিয়ে ছুঁয়ে দেখতে হয়। প্রচ্ছদ, ছাপা, কাগজ ভালো লাগলে কেন নয় বই? বই কিনুন, বই পড়ুন। বই পড়তে অন্যকে উৎসাহিত করুন, প্রিয়জনকে উপহার দিন। প্রিয় সৈয়দ মুজতবা আলীর একটা কথা সব সময় মনে রাখুন : বই কিনে কেউ কোনোদিন দেউলিয়া হয়না।
বিনা খরচে বই কিংবা পত্রিকা পড়ার জন্য এই সিলেট শহরেই বিশাল ৩টা গ্রন্থাগার রয়েছে। সিলেট স্টেডিয়ামের পূর্বে আগে যেটিকে প্রান্তিক চত্বর বলা হতো, সেই প্রান্তিক চত্বরেই রয়েছে সরকারি গ্রন্থাগার, দরগাহ গেইট সংলগ্ন কেন্দ্রিয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ এবং সুরমা নদীর পাড়ে সারদা হলের পশ্চিমে পৌর পাঠাগার। আমার এক খন্ড অবসরে প্রায়ই ওসবে যাওয়া হয়। বই কিংবা পত্রিকার পাতায় ঘন্টার পর ঘন্টা চলে যায় ...। আমার সবচেয়ে আসা-যাওয়া প্রান্তিক চত্বর সংলগ্ন সরকারি লাইব্রেরীতে। সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান সারের আমলে এই নতুন ভবনটি নির্মিত। যখন টিনশেড ছিল তখন থেকেই আমার পদচারণা। বইপত্র পড়ার জন্য বেশ নিরিবিলি একটা পরিবেশ রয়েছে সেখানে। দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসছি সেখানেও কেউ বই পড়তে চায় না। সবাই পত্রিকা নিয়ে ব্যস্ত। শেলফে থাকা বইগুলো অবশ্য বেশ পুরনো, জীর্ণশীর্ণ! নতুন বই খুব কমই পাওয়া যায় এসব লাইব্রেরীতে। ফলে সব লাইব্রেরীতে বই পড়ার চেয়ে পাঠক-পাঠিকা পত্রিকা নিয়েই ব্যস্ত থাকেন বেশি।
ফেসবুকের এই যুগে প্রচুর পেপারবুক বইও পড়ি। না, কখনও নিজেকে দেউলিয়া মনে হয়নি। বই কিংবা পত্রিকা পড়ে নিজেকে সমৃদ্ধই মনে হয়েছে। সমৃদ্ধ হবেন? তাহলে বেশি করে পড়ুন। যেখানে ভালো লাগে সেখানেই পড়ুন এবং যা ভালো লাগে তাই পড়ুন। সমৃদ্ধ জীবন আসবেই।
লেখক : কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT