উপ সম্পাদকীয়

ইসহাক কাজল : মেহনতি মানুষের বন্ধু

জামান মাহবুব প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০২-২০২০ ইং ০০:৪৮:১০ | সংবাদটি ৮৯ বার পঠিত

পড়ন্ত বিকেলের ম্লান আলো এসে পড়েছে জিন্দাবাজারস্থ সুরমা প্রিন্টার্সের লাগোয়া সমস্বর সাহিত্য বাসর (পরবর্তীতে সমস্বর লেখক ও শিল্পী সংস্থা)-এর ছোট্ট পরিসরের অফিস কক্ষে। এক পাশে একটা টেবিল, চারপাশে খান ছয়েক চেয়ার। মেঝেতে সাদা ধবধবে চাদর-বিছানো। ১৯৬৯ সালের শরৎকালের সেই বিকেলে একজন দু’জন করে তরুণ কবি-সাহিত্যিকদের অনেকেই এসে পড়েছেন। কবি দিলওয়ারকে ঘিরে এঁদেরই কেউ কেউ মেতে উঠেছেন নানা গাল-গল্পে।
রোববারের নিয়মিত সাপ্তাহিক সাহিত্য আসর শুরু হতে তখনো খানিকটা দেরি। কানে গেল পাশ থেকে মাহমুদ হক বলছেন : ওই জামান মাহবুব। সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র। গল্প লেখে। ফাঁকে কথাটা বলা, তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে সালাম করতেই তিনি হেসে বললেন : ‘আমি ইসহাক কাজল। পড়াশোনা মদনমোহন কলেজে। প্রবন্ধ লিখি।’ পরনে সাদা পাজামা পাঞ্জাবি। হালকা পাতলা গড়ন। ঠোঁটে এক চিলতে গোঁফ। মুখে হাসি। প্রথম দেখাতেই ভালো লেগে যায়।
সেদিনের সাহিত্য-আসরে ইসহাক কাজল যে প্রবন্ধটি পড়েন, সেটি সুরমা উপত্যকার চা-শ্রমিক আন্দোলন সম্পর্কিত। বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে রয়েছে চা-বাগান। এসব চা-বাগানে কাজ করে অসংখ্য চা-শ্রমিক। তাদের জীবন-সংগ্রামের নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে প্রবন্ধটিতে। আমার কাছে বিষয়টি একেবারেই নতুন। কারণ এর আগে চা-শ্রমিক সম্পর্কে তেমন কিছু জানার সুযোগ হয়নি। প্রবন্ধটির ভাষা ও বর্ণনা ছিল আগ্রহ-উদ্দীপক। পঠিত লেখার ওপর আলোচনাকালে বিদগ্ধজনেরা তাঁর প্রবন্ধটির ভূয়সী প্রশংসা করলেন। অনেক পরে ২০০৬ সালে ইসহাক কাজল এ সম্পর্কে তাঁর গবেষণামূলক ‘সুরমা উপত্যকার চা-শ্রমিক আন্দোলন : অতীত ও বর্তমান’ গ্রন্থটি প্রকাশ করেন, যা দেশে-বিদেশে নন্দিত হয়।
কিশোর বয়সে লেখালেখি চর্চায় যাঁকে গুরু হিসেবে বিবেচনা করতাম, তিনি অকাল প্রয়াত কবি মাহমুদ হক। ইসহাক কাজল ছিলেন তাঁরই ঘনিষ্ট বন্ধ্।ু সেই সুবাদে সমস্বরের সাহিত্য আসর কিংবা জিন্দাবাজারস্থ ছাপাঘরের আড্ডায় তাঁর নিকট সান্নিধ্য লাভের সৌভাগ্য আমার হয়েছে। তিনি মার্জিত স্বভাবের একজন রুচিশীল, স্বল্পভাষী ও সজ্জন লোক। অন্যকে আকৃষ্ট করার মত বিরল গুণ তাঁর রয়েছে।
‘সমন্বর’ অবলুপ্ত এবং ‘ছাপাঘর’ জিন্দাবাজার থেকে স্থানান্তরিত হওয়ায় ইসহাক কাজলের সাথে আমার যোগাযোগ অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা শেষে আমি ১৯৮১ সালের ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ শিশু একাডেমি সিলেট জেলা শাখার জেলা সংগঠক পদে চাকরিতে যোগদান করি। শিশুদের প্রতিভা বিকাশের লক্ষ্যে নানামুখি সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে ব্যস্ত হয়ে ওঠায় সাহিত্যিক বন্ধুদের সাথে আমার মেলামেশা তেমন আর হতো না। তবে জানতাম, সাংবাদিকতার পাশাপাশি ইসহাক কাজল রাজনীতিতেও সক্রিয় রয়েছেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের শ্রম সম্পাদক, সিলেট জেলা শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি, জেলা হকার্স ইউনিয়ন ও সমবায় সমিতির সভাপতি ও বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা শাখার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
একদিন শুনলাম, ২০০০ সালে ইসহাক কাজল লন্ডনে পাড়ি জমিয়েছেন। সেখানেও তিনি পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাকেই বেছে নেন। লন্ডন থেকে দেশে এলে কালেভদ্রে তাঁর সাথে আমার দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে। মনে হতো, তিনি একটুও বদলাননি। স্বভাব-চরিত্রে সেই আগেকার ইসহাক কাজল।
কবি মাহমুদ হক মারা যান ১৯৮৮ সালের ২১ মার্চ। বন্ধুর প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে ইসহাক কাজল সিলেট ডাইজেস্টের ১৯৯৯ সালের সেপ্টেম্বর সংখ্যায় এবং লন্ডনের সাপ্তাহিক জনমত পত্রিকার ২০০৪ সালের ২ জুলাই সংখ্যায় বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এ ছাড়া ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁরই সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় স্মারকগ্রন্থ ‘স্মৃতিতে মাহমুদ হক’। এতে আমারও স্মৃতিচারণমূলক একটা লেখা ছিল। স্মারকগ্রন্থ সম্পর্কে ড. সেলু বাসিত লিখেছেন, ‘ইসহাক কাজল সম্পাদিত ‘স্মৃতিতে মাহমুদ হক’ শুধু স্মৃতি নয়, বিস্মৃতির অতল থেকে তুলে আনা সিলেটের সামাজিক-সাংস্কৃতিক এবং সাহিত্য বিকাশের ঐতিহাসিক উপাদানের অংশ-বিশেষ।’
লন্ডনে প্রবাস জীবন যাপন করলেও মা ও মাটির প্রতি ইসহাক কাজলের অপরিসীম দরদ, সুগভীর টান। তাঁর রাজনীতি, সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চা আবর্তিত হয়েছে অফুরন্ত সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ এবং এখানকার মেহনতি মানুষের সুখ-দুঃখ-আনন্দ-বেদনাকে ঘিরেই। আর এখানেই তিনি সার্থক, অনন্য।
২০২০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বরেণ্য সাংবাদিক, বাংলা একাডেমি প্রবাসী পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক বীর মুক্তিযোদ্ধা ইসহাক কাজলের জীবনাবসান হয়। সমাপ্ত হলো একটি বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের।
লেখক : সাবেক জেলা সংগঠক, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, সিলেট।

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ক্যাস্পিয়ান সাগরের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব
  • নিজগৃহে আমাদের এই উদ্বাস্তু জীবন
  • বেকারত্ব ও যুবসমাজ
  • আমার হাতেই আমার সুরক্ষা
  • কুড়িগ্রামের সুলতানা সরেবোর
  • স্মার্টফোনের আনস্মার্ট ব্যবহার
  • কোয়ারেন্টাইন না বলে ঘরবন্দি, একঘরে, ছোঁয়াচে বলুন
  • বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের বন্ধু
  • করোনা ভাইরাস ও করুণ পরিস্থিতি
  • পানির অপচয় রোধ করতেই হবে
  • বিশ্বনবী (সা) এর মিরাজ
  • বিদ্যুৎসাশ্রয় এবং আমাদের করণীয়
  • বেঁচে থাকি প্রাণশক্তির জোরে
  • রক্ত দিন জীবন বাঁচান
  • নদীকে না দেখলে নদীও আমাদের দেখবে না
  • করোনা ভাইরাসে থমকে গেল পৃথিবী
  • করোনা ভাইরাসে আমাদের করণীয়
  • বঙ্গবন্ধুর মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন
  • বঙ্গবন্ধু ও আমাদের শিশুরা
  • করোনা ভাইরাস ও দেশের অর্থনীতি
  • Developed by: Sparkle IT