ইতিহাস ও ঐতিহ্য

মাওয়ের লংমার্চের ৪ বছর পর সিলেটিদের লং মার্চ

সেলিম আউয়াল প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০২-২০২০ ইং ০০:৪৯:০৩ | সংবাদটি ৫৩২ বার পঠিত
Image

চীনের লংমার্চের কথা প্রায় সবাই-ই জানেন। ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ অক্টোবর মাও সেতুং-এর নেতৃত্বে এই লং মার্চ হয়েছিলো। মাও সেতুং তার পরিবারের সদস্যসহ প্রায় এক লাখ কমিউনিস্ট নিয়ে দক্ষিণ চীন থেকে যাত্রা শুরু করে উত্তর পশ্চিম চীনের শেনসি প্রদেশে পৌঁছেন। যাত্রাপথ মোটেই সোজা ছিল নাÑবিরুদ্ধপক্ষের নানা প্রতিকুলতা মোকাবেলা আর তুষারঢাকা বিশাল পর্বতমালা, বিস্তৃত জলাভূমি আর ধূ ধূ প্রান্তর পেরিয়ে, ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৫-এর প্রায় এক বছরে তারা যখন গন্তব্যে পৌছেন তখন তারা ছিলেন প্রায় আট হাজার, বাকী সবাই-ই পথে মারা যান। লং মার্চে চীনা লাল ফৌজ ঠিক কতোটা পথ পাড়ি দিয়েছিলো তা নিয়ে অবশ্য মতভেদ আছে। চীনা সরকারের ভাষ্যমতে লং মার্চে অংশগ্রহণকারীরা ২৫ হাজার লি বা ১২,৫০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছিলেন। অবশ্য পশ্চিমা পণ্ডিতদের ধারণা আসল দৈর্ঘ্য ছিলো এর অর্ধেক। এতো দীর্ঘ না হলেও সিলেটের মানুষও পরিচালনা করেছিলো একটি লং মার্চ এবং এটি ছিলো মাও সেতুংয়ের লং মার্চের চার বছর পর ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে। সেই লংমার্চের কথা লিখেছেন বরুই রায় তার আত্মজীবনী সংগ্রামী স্মৃতির মোহনায় গ্রন্থে। প্রসুন কান্তি রায় (বরুণ রায়) [জন্ম: ১০ নভেম্বর ১৯২২, মৃত্যু: ৯ ডিসেম্বর ২০০৯] বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, জাতীয় সংসদ সদস্য ছিলেন।
বরুণ রায় সিলেটিদের লং মার্চের কথা লিখেছেন-‘আইনসভায় গিয়ে বাবা কৃষকদের ন্যায্য অধিকার নিয়ে কথা বলতেন এবং বিখ্যাত ‘শ্রীহট্ট প্রজাস্বত্ব আইন’ বিল আকারে উপস্থাপন করেন।... প্রজাস্বত্ব আইন পাশ হওয়ার জন্য কৃষকরা আসাম পার্লামেন্ট ঘেরাও-এর উদ্দেশ্যে সিলেট থেকে রওয়ানা দেয়। মুসলিম লীগ সরকার এই যাত্রা বানচাল করার উদ্দেশ্যে ডাউকি থেকে শিলং অবধি বাস লাইন বন্ধ করে দেয়। নিরুপায় হয়ে নেতাকর্মীরা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পায়ে হেঁেট শিলং যাত্রা করেন। সিলেট থেকে প্রায় ৮৫ মাইল জায়গা হাঁটতে হাঁটতে অনেকের পা ফুলে গিয়েছিল। এই ঘটনা তৎকালীন সময়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে।’
বরুণ রায়ের জন্ম ভারতে পাটনায় (বর্তমান ভারতের বিহার রাজ্য), নানার বাড়িতে। বরুণ রায়ের পরিবার ছিলো একটি রাজনীতি সচেতন পরিবার। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে তার রাজনীতির হাতেখড়ি। তিনি ইতিহাসের নানা ঘটনার সাক্ষী হলেও তেমন কিছু লিখে যাননি। তার সাথে মৌখিক কথোপকথনের লিখিত রূপ দিয়েছেন গবেষক দীপংকর মোহান্ত। দীপংকর মোহান্তের অনুলিখিত স্মৃতিগ্রন্থই হচ্ছে ‘সংগ্রামী স্মৃতির মোহনায়’। গ্রন্থটি অমর একুশে বইমেলা ২০১০-এ প্রকাশ করে ঢাকার উৎস প্রকাশন। প্রকাশক মোস্তফা সেলিম লিখেছেন-‘বরুণদা শেষপর্যন্ত বই আকারে প্রকাশিত তাঁর স্মৃতি পুস্তক দেখে যেতে পারেননি। বিগত ৯ ডিসেম্বর ২০০৯ তারিখে সুনামগঞ্জ শহরে বরুণ রায় দেহত্যাগ করেন। এজন্য আমার আক্ষেপ রয়ে গেল। তিনি বেঁচে থাকবেন গণমানুষের অন্তরে।’
বরুণ রায় ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী হিসেবে জেল থেকে নির্বাচন করে বিজয়ী হন। আশির দশকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তিনি আবার আন্দোলনের পুরোভাগে ছিলেন। ১৯৮৬ সালে তিনি কমিউনিস্ট পার্টি থেকে ৮ দলের প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছিলেন। এ সময় একজন সাংসদের নানা সুযোগ থাকলেও তিনি রেলওয়ের প্রথম শ্রেণিতে না চড়ে তৃতীয় শ্রেণির টিকেট করে ঢাকা যাতায়াত করতেন।
বরুণ রায়ের আত্মজীবনীর আকারটি ছোট হলেও প্রচুর তথ্য রয়েছে তাতে। তিনি সিলেটে কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ করেছেনÑ‘১৯১৭ সালে রাশিয়ায় বিপ্লবের প্রভাবে ভারতে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্বপ্নে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার তোড়জোড় চলতে থাকে। বাংলাদেশে ত্রিশের দশকেই কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে উঠে। আমাদের সিলেট জেলার শ্রীমঙ্গল নিবাসী বিখ্যাত বিপ্লবী ফণীন্দ্রনাথ দত্ত বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক হয়েছিলেন। তখন পার্টি ছিলো ‘বে-আইনী’। গোপন অবস্থায় থেকে কাজ করতে হতো। আত্মগোপন অবস্থায় ফণী বাবুর নাম ছিল ‘পানিনি দত্ত’। সেকালের জেলফেরত বিপ্লবীদের সহসাই কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিতে দেখা গেছে। ৩৫-৩৬-এর দিকে কলকাতায় বসে সিলেট জেলার কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম হয়। সুনামগঞ্জের বিখ্যাত বিপ্লবী নেতা লালা শরদিন্দু দে’র সিলেট শহরস্থ নিজ বাসায় সুরমা উপত্যকা কমিউনিস্ট পার্টির কমিটি গড়ে উঠে। ঐ সময় বাড়ির ‘কেয়ার টেকার’ ছিলেন মধ্যনগরের কমরেড লালমোহন রায়। আমার জানা মতে প্রথমে পার্টির পাঁচজন সদস্য ছিলেন। তারা হলেন দিগেন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত, লালা শরদিন্দু দে, অমরেন্দ্র কুমার পাল, চিত্তরঞ্জন দাস, চঞ্চল কুমার শর্মা ও দীনেশ চৌধুরী।’
বরুণ রায় ১৯৩৭ সালের নির্বাচনী জনসংযোগের বর্ণনা দিয়েছেনÑ‘১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইনের অধীনে নির্বাচন হয়েছিলো। ভোট ব্যবস্থা ছিল বিভেদমুলক। আসাম প্রাদেশিক পরিষদে ১৯৩৭ সালে জেনারেল সিট, সিডিউলকাস্ট সিট ও মুসলিম সিট ছিলো। বাবা তখন ‘জেনারেল সিট’ থেকে লাঙল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন। তিনি কংগ্রেসের প্রার্থী হলেও কিন্তু ভেতরে ভেতরে ছিলেন মার্কসবাদী এবং কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার প্রাথমিক কাজেও তখন ব্যস্ত ছিলেন। এই নির্বাচন তখন খুব জমে ওঠেছিলো। আমি, বাবা ও তার সমর্থকদের সাথে বহু জায়গায় গিয়েছি। করুণাসিন্ধু রায়ের প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন গৌরারং-এর জমিদার নগেন্দ্র চৌধুরী। দিন নেই রাত নেই বাবা বিভিন্ন পাড়ায় গিয়ে বড় বড় সমাবেশে কৃষকদের ওপর অত্যাচারের কাহিনী তুলে ধরে তাদের অধিকার দেয়ার কথা বলতেন এবং ব্রিটিশ শাসক ও ধনীরা যে আমাদের শোষণ করছে তাও গ্রাম্যভাষায় বুঝিয়ে দিতেন। সে সময় আমাদের গ্রামাঞ্চলে মাইকের প্রচলন আসেনি; বড় গলায় কিংবা চৌঙ্গা মুখে লাগিয়ে ভাষণ দেয়া হতো। আধুনিককালের মতো স্টেজ, গেইট ইত্যাদি ছিল না। এই ভোটে বাবাকে সাহায্য করে লালা শরদিন্দু দে ও চন্দ্রবিনোদ দাস প্রমুখ। ভোটের ফলাফলে দেখা যায় বাবা ৪৩০৩২ ভোট পেয়েছিলেন। নগেন্দ্র চৌধুরী জমিদারদের স্বল্প সংখ্যক ভোট লাভ করেন।’
বানিয়াচঙ্গের ম্যালেরিয়ার কথা তিনি লিখেছেন-‘দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষদিকে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ফলে যখন জনজীবন বিপর্যস্ত তখন হবিগঞ্জের বানিয়াচঙ্গে মহামারিরূপে ম্যালেরিয়া দেখা দেয়। এই সংক্রামক রোগটি একটি গ্রামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ... বানিয়াচঙ্গে ম্যালেরিয়ার ভয়ে অনেক লোক মাসের পর মাস অনাহারে ঘরে বসেই অতিবাহিত করে। মৃত লোককে সৎকারের লোকও পাওয়া যেত না। বিভিন্ন ঘরবাড়ি ‘ছাড়া বাড়ি’র মতো পড়ে ছিল। এই এলাকায় দীর্ঘদিন বিয়ে-শাদিও বন্ধ ছিল। এই সময়টা বর্ণনাতীত। আমি তখন কমিউনিস্ট পার্টির তরুণ কর্মী হয়ে স্বেচ্ছাসেবক হয়ে উপদ্রুত এলাকায় আমাদের টিমের সাথে সেখানে গিয়েছিলাম।... বানিয়াচঙ্গে গিয়ে দেখি ধনীলোকদের মধ্যে যাদের এলাকার বাইরে থাকা-খাওয়ার জায়গা ছিল তারা এলাকা ছেড়েছিলেন। কিন্তু গরিব লোক বেশি মারা গিয়েছিল। তখন সেখানে ডাক্তার নেই, কোনো কোনো বাড়ি গিয়ে দেখি শুধু শিশুরা বেঁচে আছে। ঔষধ খাওয়ানোর কোন লোক নেই। বাজার, দোকান, বাড়ি জনশূণ্য হয়ে পড়ে আছে। জ¦র আসার পর রোগী মারা যেত। কোনো রোগীকে সকালে ঔষধ খাইয়ে এলে বিকালে গিয়ে দেখতাম সেই রোগীটি ঘরে মরে পড়ে আছে। হয়তো বা তার অবুঝ শিশুটি লাশের পাশে বসে কাঁদছে।
‘বানিয়াচঙ্গ রক্ষা’ নামে একটি আন্দোলনও তখন গড়ে ওঠে। সাহায্য আদায়ের জন্য কমিউনিস্ট পার্টির একটি স্কোয়াড গান করে। হেমাঙ্গ বিশ^াস গান রচনা করেছিলেনÑভারতবর্ষের সেরা গ্রাম/চল্লিশ হাজার লোকের ধাম/হাজার হাজার নরনারী মরছে অসহায়।’
ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গে লিখেছেনÑ‘১৯৪৮ সালে বাংলা ভাষা প্রশ্নে পূর্ব-পশ্চিমের দ্বন্দ্ব প্রথম রাজনৈতিক সংকট রূপে দেখা দেয়। তখন তমদ্দুন লাইনে প্রতিবাদ চলে। সিলেটে ‘মুসলিম সাহিত্য সংসদ’-কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা তরুণ মুসলিম চিন্তাবিদরা বাংলাকেই রাষ্ট্র ভাষা করার পক্ষে বক্তব্য রাখেন। ক্রমে মাহমুদ আলী, আব্দুস সামাদ আজাদ প্রমুখ যারা একসময় পাকিস্তান সৃষ্টির লড়াই-এর কর্মী ছিলেন, তারাও পাকিস্তান সরকারের ইসলামি চেতনার ভিত্তি থেকে সরে আসেন।’
বরুণ রায় জীবনের ২৩টি বছরই জেলে কাটান। এছাড়াও দীর্ঘ পাঁচ বছর তিনি আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিক্স করেছেন। তিনি লিখেছেনÑ‘১৯৬৪ সালে নির্বাচনের পূর্বে আমি ছাড়া পাই। এবার জেল থেকে বেরিয়ে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে যোগদান করি। কিন্তু ১৯৬৫ সালে ১ জানুয়ারি আমার নামে ওয়ারেন্ট আসে।... সেদিনই আত্মগোপনে চলে যাই। আবার টানা পাঁচ বছর বিভিন্ন ছদ্মবেশে, ছদ্মনামে কৃষক সেজে, ব্যবসায়ী সেজে সুনামগঞ্জের পশ্চিমাঞ্চলে কৃষকদের সংগঠিত করি। সে সময় কখনও এক জায়গায় থাকিনি। মাথায় হুলিয়া নিয়ে এদিক-ওদিক গেলেও পুলিশ আমাকে সর্বদাই খোঁজ খবর নিয়েছে। গ্রেফতারের জন্য কয়েক জায়গায় হানাও দিয়েছে। কিন্তু কৃষকরা আমাকে ভালোবাসত বলে কেউ আমার সম্পর্কে কোন তথ্য দেয়নি। দিনের বেলা বিভিন্ন লোকের রান্নাঘরে কিংবা গোয়ালঘরে আমি শুয়ে থাকতাম। প্রায় রাত্রি বেলা ৯-১০টার পর ঘর থেকে বাহির হয়ে পার্টির কাজ করতাম এবং সূর্য উঠার আগেই ঘরে যেতাম।... পাঁচ বছর কখনো শহরে প্রকাশ্যে যাইনি। পায়ে হেঁেট সুনামগঞ্জ-সিলেট- মৌলভীবাজার জেলার গ্রামাঞ্চলে গিয়েছি।’

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বালাগঞ্জের বাতিঘর বাংলাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়
  • বঙ্গবন্ধু ও গান্ধীজী
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক ছিলেন ‘মেশিনম্যান’
  • একটি যুদ্ধ : একটি শতাব্দী
  • বালাগঞ্জের প্রাচীন জনপদ শিওরখাল গ্রাম
  • ভাটিপাড়া
  • সময়ের সোচ্চার স্বর সোমেন চন্দ
  • বঙ্গবন্ধুর সিলেট সফর ও কিছু কথা
  • বায়ান্নতেই লিখেছিলেন ‘ঢাকাই কারবালা’
  • জীবনের শেষক্ষণে অর্থ-স্বর্ণ সবই জড়পদার্থ
  • কমরেড বরুণ রায়
  • বঙ্গবন্ধু ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
  • নারী ভাষাসৈনিকদের কথা
  • মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবীর ওসমানী
  • ভাটির বাতিঘর সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ
  • মাওয়ের লংমার্চের ৪ বছর পর সিলেটিদের লং মার্চ
  • শহীদ মিনারের ইতিকথা
  • সিলেটের লোকসংগীত : ধামাইল
  • পর্যটক ইবনে বতুতার কথা
  • বই এল কোথা থেকে?
  • Image

    Developed by:Sparkle IT