উপ সম্পাদকীয়

মাইক্রোপ্লাস্টিক ও পরিবেশ

তামান্না ফেরদৌস প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০২-২০২০ ইং ০০:৫২:২০ | সংবাদটি ৭৯ বার পঠিত

মাইক্রোপ্লাস্টিক হচ্ছে প্লাস্টিকের অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি অংশ। যে সকল প্লাস্টিকের আকার ২ মাইক্রোমিটার থেকে ৫ মিলিমিটারের মধ্যে, সে সকল প্লাস্টিককে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। মাইক্রোপ্লাস্টিক সাধারণত নারডল নামে পরিচিত। নিত্যব্যবহার্য প্লাস্টিক বর্জ্য, কলকারখানা থেকে নির্গত বর্জ্য পদার্থে মিশে থাকা প্লাস্টিক প্রতিনিয়ত পরিবেশের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। তাপমাত্রা, ক্ষুদ্র অণুজীব এবং নানা কারণে এসব প্লাস্টিক ভেঙে যায় এবং পরিণত হচ্ছে ক্ষুদ্র প্লাস্টিকে বা মাইক্রোপ্লাস্টিকে। ২০১৪ সালের প্রথম জাতিসংঘ পরিবেশ সম্মেলনে সামুদ্রিক প্লাস্টিক বর্জ্য দূষণ ‘শীর্ষ দশ জরুরি পরিবেশগত সমস্যাগুলো’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয় এবং মাইক্রোপ্লাস্টিকের ওপর বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ২০১৫ সালে দ্বিতীয় জাতিসংঘ পরিবেশ সম্মেলনে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ পরিবেশ এবং পরিবেশবিজ্ঞান গবেষণার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈজ্ঞানিক সমস্যা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ও ওজোন হ্রাসের পাশাপাশি মাইক্রোপ্লাস্টিক একটি বড়ো বৈশ্বিক পরিবেশগত সমস্যা হয়ে ওঠে। আকারে ক্ষুদ্র হওয়ায় এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানে যেমন মাটি, পানি, বাতাসের সঙ্গে সহজেই মিশে যাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের বাস্তুসংস্থান। নদীর স্রোত, বৃষ্টি, বন্যা ইত্যাদি বিভিন্ন উপায়ে এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক পুকুর, নদী এবং সমুদ্রে গিয়ে জমা হচ্ছে। সামুদ্রিক মাছসহ স্বাদুপানির মাছ এদের খাবার হিসেবে গ্রহণ করছে। ফলে এরা সহজেই প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে। খাদ্যশৃঙ্খলের প্রথম স্তরের খাদককে দ্বিতীয় স্তরের খাদক ভক্ষণ করে, দ্বিতীয় স্তরের খাদককে তৃতীয় স্তরের খাদক ভক্ষণ করে, তৃতীয় স্তরের খাদককে সর্বোচ্চ স্তরের খাদক ভক্ষণ করে। এভাবে খাদ্যশৃঙ্খলের পর্যায়ক্রমিক পরিক্রমায় মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহে প্রবেশ করছে যা শুধু মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারকই নয় বরং প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করতে এক বিরাট হুমকিস্বরূপ।
আমাদের দেশে বিভিন্ন ধরনের নিত্যব্যবহার্য কসমেটিক্স পণ্য, পরিষ্কারক পণ্য যেমন ডিটারজেন্ট, ফেইসওয়াশ, স্ক্রাব, ক্রিম ইত্যাদিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে মাইক্রোবেড তথা মাইক্রোপ্লাস্টিক। এমনকি টুথপেস্টেও ব্যবহার করা হচ্ছে মাইক্রোবেড। দেশে উত্পাদিত এবং বাইরে থেকে আমদানিকৃত এইসব পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক বিদ্যমান যা দেশের বাজার বা মার্কেটগুলোতে অহরহ পাওয়া যাচ্ছে। এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক কোনো প্লাস্টিক থেকে প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরিকৃত মাইক্রোপ্লাস্টিক নয় বরং ইঞ্জিনিয়ারিং উপায়ে তৈরিকৃত মাইক্রোপ্লাস্টিক যা এসব পণ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব পণ্য ব্যবহারের ফলে একদিকে যেমন আমাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে অন্যদিকে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতিসাধিত হচ্ছে। এসব কসমেটিক্স পণ্য ব্যবহারের পর তা পানির সঙ্গে মিশে ভেসে যাচ্ছে খাল, নদী কিংবা সমুদ্রে। বর্তমানে অনেক বোতলজাত পানিতেও পাওয়া গিয়েছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। এছাড়াও টি-ব্যাগ থেকে তৈরিকৃত চায়ে মিশে যেতে পারে মাইক্রোপ্লাস্টিক। সাধারণত টি-ব্যাগ প্রাকৃতিক ফাইবার দ্বারা তৈরি হলেও তা এঁটে দিতে ব্যবহার করা হয় প্লাস্টিক। উচ্চতাপমাত্রার প্রভাবে এসব থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক চায়ে ছড়িয়ে যেতে পারে। প্রায় ৯৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ফুটন্ত পানিতে ১১.৬ বিলিয়ন ন্যানোপ্লাস্টিক তথা সেকেন্ডারি মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির কথা জানিয়েছেন কানাডার ম্যাক গিল ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক। এছাড়াও কাপড়ে ব্যবহৃত সিনথেটিক ফাইবার যেমন:পলিস্টার, নাইলন ইত্যাদি থেকেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে।
বাংলাদেশে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ একেবারেই নতুন একটি বিষয় এবং নির্মাতা ও ভোক্তা কেউই মাইক্রোপ্লাস্টিকের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সচেতন নয়। আর তাই মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ লোকচক্ষুর অন্তরালে এক ভয়ংকরগতিতে এগিয়ে চলছে। অন্যান্য উন্নত দেশের তুলনায় বাংলাদেশে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তুলনামূলক অনেক কম। এছাড়া বলা হয়ে থাকে যে নদীনালা খালবিলের দেশ বাংলাদেশ। ফলে পানির অবিরাম প্রবাহ দেশের অধিকাংশ প্লাস্টিক বয়ে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের একমাত্র সাগর বঙ্গোপসাগরে। আকারে ক্ষুদ্র হওয়ায় বিভিন্ন ট্রিটমেন্টপ্ল্যান্ট পেরিয়েও সহজে চলে যাচ্ছে এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক। মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহ ক্ষতির হাত থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হলে সরকারি-বেসরকারিভাবে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত। এছাড়া অতীতে উৎপাদিত প্লাস্টিক বর্জ্য যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। জোর দিতে হবে প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, রিসাইক্লিং-এর ওপর। পাশাপাশি মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং এর ভয়াবহ দিক সম্পর্কে জনসাধারণকে অবহিত করতে হবে এবং সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
লেখক : শিক্ষার্থী।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ক্যাস্পিয়ান সাগরের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব
  • নিজগৃহে আমাদের এই উদ্বাস্তু জীবন
  • বেকারত্ব ও যুবসমাজ
  • আমার হাতেই আমার সুরক্ষা
  • কুড়িগ্রামের সুলতানা সরেবোর
  • স্মার্টফোনের আনস্মার্ট ব্যবহার
  • কোয়ারেন্টাইন না বলে ঘরবন্দি, একঘরে, ছোঁয়াচে বলুন
  • বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের বন্ধু
  • করোনা ভাইরাস ও করুণ পরিস্থিতি
  • পানির অপচয় রোধ করতেই হবে
  • বিশ্বনবী (সা) এর মিরাজ
  • বিদ্যুৎসাশ্রয় এবং আমাদের করণীয়
  • বেঁচে থাকি প্রাণশক্তির জোরে
  • রক্ত দিন জীবন বাঁচান
  • নদীকে না দেখলে নদীও আমাদের দেখবে না
  • করোনা ভাইরাসে থমকে গেল পৃথিবী
  • করোনা ভাইরাসে আমাদের করণীয়
  • বঙ্গবন্ধুর মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন
  • বঙ্গবন্ধু ও আমাদের শিশুরা
  • করোনা ভাইরাস ও দেশের অর্থনীতি
  • Developed by: Sparkle IT