উপ সম্পাদকীয়

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ প্রসঙ্গে হাইকোর্টের রুল

ব্রজেন্দ্র কুমার দাস প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০২-২০২০ ইং ০০:৫২:৫৭ | সংবাদটি ১২৯ বার পঠিত

সারা বিশ্বের মহৎপ্রাণ ধর্মগুরু, প্রখ্যাত সামাজিক-রাজনৈতিক-সাহিত্যিক-দার্শনিক সহ সর্বপ্রকার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের জন্মের সাথে স্থান-কাল-পাত্র সহ বিভিন্ন ধরনের ইতিহাস জড়িত থাকে। এগুলো যেমন ঠিক তেমনি একটি দেশ, একটি জাতির জন্ম বা পুনর্জন্মের সাথে জড়িয়ে থাকে অনেক ঐতিহাসিক স্থান, ঘটনা, কখনো কখনো বিশেষ বিশেষ শব্দাবলি ইতিহাসকে ঋদ্ধ করে তুলে। এ ক্ষেত্রে আমরা বাংলাদেশ, বাঙালি জাতির কথা ধরে নিতে পারি। একাত্তরের বাংলাদেশ, বাঙালি জাতির নবজন্মকে সমৃদ্ধ করে তুলেছে কিছু কিছু ঐতিহাসিক শব্দ। যেমন- বঙ্গবন্ধু, ছয় দফা, জয়বাংলা, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা, তোমার দেশ, আমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ। বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর। জেলের তালা ভাঙবো শেখ মুজিবকে আনবো, ৩২ নম্বর ধানমন্ডি, ভারত, ইন্দিরা গান্ধী, রাশিয়া, ভেটো, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর, ৯৩ হাজার পাকিস্তানী সৈন্যের আত্মসমর্পণ। বাঙালি আর বাংলাদেশের ইতিহাসে এসব শব্দাবলির কী কোন কিছুর সাথে তুলনা করা চলে!
এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যদি আমরা বিশ্বাস করি তাহলে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, ভাষণের স্থান, সেই স্থানে ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানী সৈন্যের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের উদ্ভোদয়, এর স্মৃতি ধরে রাখা কি জরুরী নয়? কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো জাতীয়ভাবে আমরা সে ঐতিহ্য, স্মৃতিচিহ্ন ধরে রাখতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছি। এ দুঃখজনক ব্যর্থতার কারণে আমাদের নতুন প্রজন্ম বাংলাদেশের গর্বের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেনি। ফলে মুক্তিযুদ্ধ তথা বাংলাদেশের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা-ভালোবাসা তথা দেশপ্রেমের উন্মেষ কাঙ্খিত মাত্রায় ঘটেনি। যে সোহরাওয়ার্দীতে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ দেখেছে মুক্তি পাগল সাড়ে সাত কোটি বাঙালি, বাংলার দামল ছেলে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করলো ৯৩ হাজার সৈন্য নিয়ে নিয়াজী সেই সোহরাওয়ার্দীতে আমাদের শিশুরা দেখছে শিশুপার্ক। ভাবটা এমন যেন বাংলাদেশে কিছুই হয় নি। যুগ যুগ ধরে শিশুরা ঐ ঐতিহাসিক স্থানের ইতিহাসের কিছুই জানতে পারলো না। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে সোহরাওয়ার্দীতে শিশুপার্ক নির্মাণের পেছনে কি কোন সুগভীর রহস্য বা উদ্দেশ্য ছিলো। ঢাকার বুকে শিশু পার্ক নির্মাণের কি অন্য কোন স্থান ছিল না? কেউ যদি প্রশ্ন করে বসে- পাকিদের লজ্জা-শরম মুছে ফেলতেই কি শিশুদের নাম ভাঙ্গানো হলো? তাহলে কি তাদের প্রশ্নটি ভুল হবে।
ভুল যে নয় এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ হলো ০৬-০২-২০২০ তারিখে দেশ রূপান্তর পত্রিকার একটি শিরোনাম এবং সেটি হলো- “বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, সোহরাওয়ার্দী নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা জানতে চায় হাইকোর্ট”। এখানে উল্লেখ্য যে, ৭ মার্চকে ‘জাতীয় ঐতিহাসিক দিবস’ ঘোষণা, যে মঞ্চে বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিয়েছিলেন সেখানে সেই ভাষণের আদলে বঙ্গবন্ধুর তর্জনি উচানো ভাস্কর্য নির্মাণ করা সহ প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চেয়ে ২০১৭ সালে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন অ্যাডভোকেট বশির আহমেদ। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে একই বছরের ২০ নভেম্বর এ নিয়ে আদালত রুল জারি করে। রুলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের যে মঞ্চে সাতই মার্চের ভাষণ দিয়েছিলেন সেটি পুননির্মাণে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না, ভাষণের স্থানটিতে কেন বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণ করা হবে না এবং ৭ মার্চকে কেন জাতীয় ঐতিহাসিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হবে না জানতে চাওয়া হয়। একই ধারাবাহিকতায় বিষয়টি ০৫-০২-২০২০ তারিখে শুনানির জন্য আসে। শুনানি শেষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণের স্থানটি সংরক্ষণ না করা এবং উদ্যানের ভেতরে শিশুপার্ক নির্মাণ নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করে আদালত বলে, বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি ধ্বংস করার উদ্দেশ্যেই এখানে শিশুপার্ক নির্মাণ করা হয়েছিল। এত বছর পরও কেন সেটি এখান থেকে সরানো হয় নি?”
ভাবতে অবাক লাগে, এ দেশে বঙ্গবন্ধু প্রেমিক বা মুজিব সৈনিকের অভাব আছে বলে তো মনে হয়নি, তাহলে মহামান্য আদালত কেন বলবেন, বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি মুছে ফেলা বা ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র কেন আমরা এত বছর পরও রুখে দিতে পারলাম না। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবারই ভেবে দেখার সময় এসেছে বলেই মনে করি। এ ব্যাপারে আমরা যে বা যারাই সংশ্লিষ্ট হই না কেন এ লজ্জা সবার।
আর এটা যে আমাদের শুধু লজ্জা বা ব্যর্থতাই নয়, বঙ্গবন্ধুর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা-ভালোবাসা বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশের লক্ষণও নয়। এটা কারো জন্যই গৌরবের পরিচায়ক হতে পারে না। আর এটা অপ্রিয় হলেও সত্য যে মহামান্য আদালত রুল জারি করেছেন সরকারের প্রতি। আমরা আশা করবো আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নে সদাশয় সরকার আন্তরিকভাবেই সচেষ্ট হবেন।
মহামান্য আদালত বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি ধ্বংস করার উদ্দেশ্যেই এখানে শিশুপার্ক নির্মাণ করা হয়েছিল। এখানে প্রশ্ন এসে যায়Ñযারা শিশুপার্ক নির্মাণ করেছিল তাতে তাদের কি লাভ হবে বা হলো। এই বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু, ৭ মার্চের তো তাদেরও গর্বের বিষয় অন্তত একজন বাঙালি হিসেবে, বাংলাদেশী হিসেবে?
সারা বিশ্ব যেখানে এই চরম সত্যটি স্বীকার করছে; জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করছে সেখানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের স্মৃতি মুছে ফেলে তাদেরওতো কোন লাভ নেই। সংশ্লিষ্ট সবাইকে মনে রাখতে হবে গুণীজনকে যারা সম্মান করে না তারাও কোনদিন সম্মান পাবে না। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধুর চেয়ে গুণী ব্যক্তি কী বাংলাদেশে জন্মেছে? যে যতই চীৎকারে বলি না কেন উত্তরটি হলোÑ জন্মেনি! এ বিষয়ে সব কথার শেষ কথা হলোÑ আমরা যারা বঙ্গবাসী আমরা যদি বঙ্গবন্ধু বা বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি মুছে ফেলবার ব্যর্থ চেষ্টা করি আমরাই ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে যাবো। কারণ বঙ্গবন্ধু আর বাংলাদেশ সমার্থক। এটা বিশ্ব স্বীকৃত। অস্বীকার করার উপায় নেই। আর এটাই চরম সত্য যে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিই বঙ্গবাসীর পাথেয়। অন্তত রাজনীতির ক্ষেত্রে। আবারো বলি বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি মুছতে পারলে লাভ হবে পাকিস্তানের। কোন বঙ্গবাসীরই লাভ নেই। পাকিস্তানীরা আত্মসমর্পণের গ্লানি মুছে ফেলার স্বপ্ন দেখতে পারে। তাতো সম্ভব নয়। বিশ্ববাসী সব জানে।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ক্যাস্পিয়ান সাগরের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব
  • নিজগৃহে আমাদের এই উদ্বাস্তু জীবন
  • বেকারত্ব ও যুবসমাজ
  • আমার হাতেই আমার সুরক্ষা
  • কুড়িগ্রামের সুলতানা সরেবোর
  • স্মার্টফোনের আনস্মার্ট ব্যবহার
  • কোয়ারেন্টাইন না বলে ঘরবন্দি, একঘরে, ছোঁয়াচে বলুন
  • বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের বন্ধু
  • করোনা ভাইরাস ও করুণ পরিস্থিতি
  • পানির অপচয় রোধ করতেই হবে
  • বিশ্বনবী (সা) এর মিরাজ
  • বিদ্যুৎসাশ্রয় এবং আমাদের করণীয়
  • বেঁচে থাকি প্রাণশক্তির জোরে
  • রক্ত দিন জীবন বাঁচান
  • নদীকে না দেখলে নদীও আমাদের দেখবে না
  • করোনা ভাইরাসে থমকে গেল পৃথিবী
  • করোনা ভাইরাসে আমাদের করণীয়
  • বঙ্গবন্ধুর মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন
  • বঙ্গবন্ধু ও আমাদের শিশুরা
  • করোনা ভাইরাস ও দেশের অর্থনীতি
  • Developed by: Sparkle IT