উপ সম্পাদকীয়

ভাষা আন্দোলন এবং একুশে

মোহাম্মদ আব্দুল হক প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০২-২০২০ ইং ০০:৪১:৫২ | সংবাদটি ২৬০ বার পঠিত

ভাষা মানুষের এক অতুলনীয় সম্পদ। এই যে আমরা অপরের বোধগম্য মনের কথা প্রকাশ করছি, ছোট্ট শিশুটি মা-বাবাকে মিষ্টি করে ‘মা’ ও ‘বাবা’ বলে ডাকছে, এসব কিছুই সম্ভব হচ্ছে আমাদের ভাষার জন্যেই। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের বা দেশের মানুষের ভাষা একই রকম নয়। একেক জাতির ভাষা আলাদা ধরণের। প্রত্যেক জাতির ভাষা তার কাছে মায়ের মতো আদরনীয়। তেমনি আমাদের বাংলাভাষা আমাদের কাছে এক অতি আপনার ধন। তবে বাঙালি জীবনে বছর ঘুরে যখন ফেব্রুয়ারি মাস আসে তখন বাংলাভাষার মানুষেরা নিজেদেরকে আরো নিবিড়ভাবে চিনতে পারে। ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে আমরা মূলত একুশের চেতনায় আন্দোলিত হই। গত শতাব্দীর বায়ান্ন সালের একুশে ফেব্রুয়ারি হচ্ছে আমাদের ভাষা আন্দোলনের বিজয়ের মাইলস্টোন। ইতিহাস জানতে হবে।
বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের শুরু মূলত উনিশ শত সাতচল্লিশ খ্রীস্টিয় সালেই। ভারত উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয় গত শতাব্দীর ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে। ১৪ আগস্ট পাকিস্তান স্বাধীন হয় এবং ১৫ আগস্ট স্বাধীন হয় ভারত। পাকিস্তান এক অদ্ভুত মানচিত্র নিয়ে আবির্ভূত হয়, যা মধ্যখানে ভারত নামক রাষ্ট্র রেখে পূর্বপাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান নিয়েই উদ্ভাসিত হয়। তখন ওই পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশ ‘পূর্ববঙ্গ’ নামেই পরিচিত ছিলো, যা পরে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নাম ধারণ করে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জাতি বুঝতে পারে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদেরকে নানানভাবে অধিকার থেকে বঞ্চিত করার পায়তারা করছে। এখন আমরা জানছি পাকিস্তান স্বাধীন হবার পরে নতুন করে প্রকাশিত চিঠির খাম বা এনভেলাপ, পোস্টকার্ড, মানিঅর্ডার ফরম ইত্যাদিতে উর্দু ও ইংরেজি ভাষায় লেখা হতো, কোথাও বাংলা লেখা হতো না। এ থেকেই প্রথম দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকার ছাত্র সমাজ এবং সকল শিক্ষিত শ্রেণির মাঝে ক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে। তখন অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের নভেম্বর মাসে ঢাকার নীলক্ষেত্রে এক প্রতিবাদ সভা হয়। ওই সময়ে যেসব স্লোগান হয় তা হলো ‘সবকিছুতে বাংলা চাই, উর্দুর সঙ্গে বিরোধ নাই’ ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, উর্দু বাংলা ভাই ভাই’ ইত্যাদি।
রাষ্ট্রভাষা বাংলা ভাষার পক্ষে জোড়ালো আন্দোলন শুরু হয়ে যায় ওই বছর ২৭ নভেম্বর পশ্চিম পাকিস্তানের করাচিতে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা একমাত্র উর্দু করার সুপারিশ প্রস্তাবের পর থেকেই। উল্লেখ্য যে, তৎকালীন পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতায় পশ্চিম পাকিস্তানের প্রভাব ছিলো। তারা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠেছিলো; কিন্তু এদিকে পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাভাষার বাঙালিরাও বিশেষ করে প্রগতিশীল ছাত্র সমাজ তাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ছিলো অনড়। আন্দোলন চলছে। এরই এক পর্যায়ে ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে কিছু কর্মসূচী নিয়ে পাকিস্তানের গর্ভনর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা আসেন। তিনি ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে অর্থাৎ রাজধানী ঢাকার বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যোনে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন। বাংলার ছাত্র সমাজ প্রতিবাদ করে গর্জে উঠে। এর তিনদিন পর ১৯৪৮ খ্রীস্টিয় সালের ২৪ মার্চ ঢাকার কার্জন হলে জিন্নাহ ঘোষণা করেন ‘পাকিস্তানের শিক্ষার মাধ্যম হতে হবে উর্দু।’ তখন থেকেই আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধর্মঘট, সাধারণ ধর্মঘট, সেক্রেটারিয়েট-এসেম্বলি ঘেরাও কর্মসূচী পালন করা হয়। আন্দোলন চলতে থাকে। আর এরই প্রেক্ষিতে এক পর্যায়ে এ অঞ্চলের নির্যাতিত জনতার নেতা মাওলানা ভাষানীর নেতৃত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ১৯৫২ খ্রীস্টিয় সালের ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘ভাষা দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং হরতাল চলবে। ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় আইন পরিষদের বাজেট অধিবেশন শুরু হবে, তাই আন্দোলনের জন্যে এই দিনটিকে বেছে নেয়া হয়।
এদিকে বাংলার মানুষের চেতনাকে দমিয়ে রাখতে ২০ ফেব্রুয়ারি অনির্দিষ্টকালের জন্যে ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। কিন্তু বাংলা মায়ের সূর্য সন্তানদের চেতনাকে ওরা দমিয়ে রাখতে পারেনি। ঠিকই ১৯৫২ খ্রীস্টিয় সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় জনাব গাজিউল হকের নেতৃত্বে সভা শুরু হয়ে যায়। পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দলে দলে কোথাও চারজন করে আবার কোথাও দশজন করে মিছিল করতে থাকে। যখন ছাত্র সমাজ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বিভিন্ন স্থানে মিছিলে মিছিলে ঢাকার আকাশ প্রকম্পিত করে তুলে, তখনই বেপরোয়া পুলিশ গুলি শুরু করে মিছিলের উপর। আহারে বাংলা মায়ের সন্তান। পুলিশের গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়ে বাংলা ভাষার সন্তানেরা। ওই দিনই রক্তে রঞ্জিত হয় বাংলার মৃত্তিকা আর সবুজ ঘাস। শহীদ হয় সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউর এবং আরো অনেকে। তখন শহীদের রক্তের বদলা নিতে এগিয়ে আসে সাধারণ জনতা। অবশেষে পাকিস্তান সরকার বাধ্য হয় এবং বাংলাভাষাকেও রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়। এ বিজয় হলো গৌরবের ও আনন্দের। পৃথিবীতে ইতিহাস রচিত হয় ভাষার মর্যাদা রক্ষার্থে মানুষের ত্যাগের কারণে। আমরাই একমাত্র জাতি যারা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে আন্দোলন করে জীবন দিয়েছে।
শাসকদের অন্যায় সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার মর্যাদা বাঙালি জাতি আদায় করে নিলো বায়ান্নের একুশে ফেব্রুয়ারি। সেই একুশে এখন আন্তর্জাতিক মর্যাদা পেয়ে আমাদের গৌরব হিমালয় পর্বত শিখরের উপরে উঠিয়েছে। আমরা মানি মা, মাতৃভাষা ও মাতৃভূমি একই সূত্রে গাঁথা। এই চরম সত্য কথাটি সারা দুনিয়া মানলো। বিশ্বে এখন আমরা মর্যাদার আসন পেয়েছি। মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থাকলেই বিশ্বে নিজেদের মর্যাদার ভিত্তি মজবুত হয়। আমরা তা পেরেছি। আমরা যেনো ভুলে না যাই, আমাদের ভাষা ও ভাষা আন্দোলন আজ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেরেছে। কিভাবে হলো তা জেনে রাখা দরকার। কানাডা প্রবাসী বাঙালিদের একটি সংগঠন ‘মাদার ল্যাঙ্গোয়েজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ সর্বপ্রথম উদ্যোগ নেয়ার পরেই জাতিসংঘের পরামর্শ মতে ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৯৯ বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে পাঠানো হয়। তারপর ২৮ অক্টোবর ১৯৯৯ বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষামন্ত্রী প্যারিসে ইউনেস্কোর সাধারণ অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করার প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। তখন আমাদের উক্ত প্রস্তাবের পক্ষে আরও ২৭টি দেশ সমর্থন দেয়। তারপরে ওই বছরেই অর্থাৎ ১৯৯৯ খ্রীস্টিয় সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর ৩১তম সম্মেলনে বাঙালির প্রাণের তারিখ ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’কে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের স্বীকৃতি দেয়া হয়। সেই থেকে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি।’ গানটি সারা পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষের প্রাণে প্রাণে বেজে ওঠে একই সুরে। এসব ইতিহাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বাঙালিকে মনে রাখতে হবে।
ভাষা আন্দোলন এবং বায়ান্নের একুশে এখন বাঙালি জাতির গৌরবময় ঐতিহ্য। আজকে আমরা বাংলা ভাষার মানুষেরা বিশ্বাস করি আমাদের প্রেরণায় রয়েছে বায়ান্ন। এই বায়ান্নের প্রেরণায় উজ্জীবিত থেকেই আমরা ১৯৭১ খ্রীস্টিয় সালে যুদ্ধ করে স্বাধীন দেশ বাংলাদেশ পেয়েছি। আমাদের এই দেশে বাংলা ভাষাভাষি সকল ধর্মের মানুষ মিলে মিশে আছে সু-সাম্প্রদায়িক এক মহান বাঙালি জাতি। আমাদের বাঙালি হৃদয়ের চেতনায় একাত্তর সদাজাগ্রত। বায়ান্নর পথ ধরে এসেছে একাত্তুরের বিজয়। তাই বারবার বলি একুশ আমায় পথ দেখায়।
লেখক ঃ কবি ও প্রাবন্ধিক

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ক্যাস্পিয়ান সাগরের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব
  • নিজগৃহে আমাদের এই উদ্বাস্তু জীবন
  • বেকারত্ব ও যুবসমাজ
  • আমার হাতেই আমার সুরক্ষা
  • কুড়িগ্রামের সুলতানা সরেবোর
  • স্মার্টফোনের আনস্মার্ট ব্যবহার
  • কোয়ারেন্টাইন না বলে ঘরবন্দি, একঘরে, ছোঁয়াচে বলুন
  • বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের বন্ধু
  • করোনা ভাইরাস ও করুণ পরিস্থিতি
  • পানির অপচয় রোধ করতেই হবে
  • বিশ্বনবী (সা) এর মিরাজ
  • বিদ্যুৎসাশ্রয় এবং আমাদের করণীয়
  • বেঁচে থাকি প্রাণশক্তির জোরে
  • রক্ত দিন জীবন বাঁচান
  • নদীকে না দেখলে নদীও আমাদের দেখবে না
  • করোনা ভাইরাসে থমকে গেল পৃথিবী
  • করোনা ভাইরাসে আমাদের করণীয়
  • বঙ্গবন্ধুর মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন
  • বঙ্গবন্ধু ও আমাদের শিশুরা
  • করোনা ভাইরাস ও দেশের অর্থনীতি
  • Developed by: Sparkle IT