বিশেষ সংখ্যা

বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষা চর্চা

দুলাল শর্মা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০২-২০২০ ইং ০১:১৪:০৮ | সংবাদটি ৩১১ বার পঠিত
Image

আজ বাংলা ভাষার বিশ্বায়নের প্রশ্ন যদি তুলতে হয়, তাহলে তার ক্রমবিকাশের ধারা বিশ্লেষণ করলে এমন কথা বলা যায়, বিভিন্ন ভাষার সংমিশ্রণে প্রাচীনকাল থেকেই সীমিত পরিসরে ঘটে গিয়েছে তার বিশ্বায়ন। বর্তমানেও তার বিকাশ এবং বিশ্বায়ন ঘটে চলেছে দ্রুত গতিতে। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, একটি পরিপূর্ণ বিকশিত সমৃদ্ধশালী ভাষার ক্ষেত্রে বিকাশ এবং বিশ্বায়নের সুযোগ থাকে কি-না? এর উত্তর-সভ্যতার ক্রমবিকাশ যেমন একটি চলমান প্রক্রিয়া তেমনি সভ্যতা-সংস্কৃতির ধারক হিসেবে ভাষার ক্রমবিকাশেরও থেমে থাকার সুযোগ নেই। এখানে বিশ্বায়ন মানে বাঙালির নির্দিষ্ট ভৌগলিক সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্বে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষার চর্চা। অন্য ভাষাভাষীর ওপরে তার প্রভাব বিস্তার এবং একেই সঙ্গে অন্য ভাষার শব্দপুঞ্জকেও ধীরে ধীরে নিজের মৌখিক কিংবা লিখিত মাতৃভাষার আশ্বস্থ করে নেওয়া।
ভাষার বিশ্বায়ন, ভাষার সংমিশ্রণ প্রাচীনকালেও বহুবার হয়েছে অপ্রতিরোধ্যভাবে এবং এভাবেই পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছে নতুন নতুন উচ্চারণে নতুন নতুন মাতৃভাষা। প্রাচীনকালে ভাষা বিশ্বায়নের প্রক্রিয়া চলেছে এক দেশের অন্য দেশকে বিজিত করার মাধ্যমে, ব্যবসা-বাণিজ্যের মধ্য দিয়ে কিংবা ধর্ম প্রচারের প্রসারতায়। মধ্যযুগের শেষভাগে, আধুনিক যুগের আরম্ভে সেটা হয়েছিল উপনিবেশ তৈরির ভিতর দিয়ে। বর্তমানে আরও অনেক ভাষার মত বাংলা ভাষার সৃজনপ্রক্রিয়াও প্রবাহমান রয়ে গেছে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নে। আজ আন্তর্জাতিক বিশ্বের লক্ষ-লক্ষ বাঙালি অন্তজালে পাঠ করছেন বাংলা ভাষার সংবাদপত্র, টেলিভিশন চ্যানেলে দেখছেন মাতৃভাষার বিভিন্ন অনুষ্ঠান। দেশের বাইরে নিজেরা বাংলা ভাষা চর্চা করছেন প্রতিনিয়ত।
ভবিষ্যত প্রজন্মকে সংযুক্ত করছেন তাদের শেকড় সংস্কৃতির সঙ্গে। প্রবাস জীবনের নানা উৎসব অনুষ্ঠানে বাঙালির ঐতিহ্য, বাঙালির সংস্কৃতি যেমন-চর্চিত হচ্ছে, তেমনি প্রভাব সীমিত আকারে হলেও প্রতিফলিত হচ্ছে বিভিন্ন দেশের জনগণের জীবন-যাপনে-মননেও। বাংলা ভাষা বিশ্বে আজ একটি সুপরিচিত ভাষা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বের ৬ হাজার ৯শ’ ৯টি ভাষার মধ্যে বাংলা ভাষার স্থান পঞ্চম। কেননা সেন্সাস রিপোর্ট অনুযায়ী সারাবিশ্বের বাঙালি পপুলেশন এখন প্রায় আট’শ কোটিরও কাছাকাছি। বাংলা বাংলাদেশের প্রধানতম ভাষা।
বিশ্বায়নের কারণে অন্যসব সভ্য জাতির মাতৃভাষার মত বাঙালির মাতৃভাষাতেও বিভিন্ন ভাষার সংযোজন ঘটে চলছে নিরন্তর। কারণ যে জাতি বহির্বিশ্বে যত বেশি কর্মতৎপর, যতবেশি অন্যান্য জাতির সঙ্গে তার সংযোগ সাধন ও ভাবের আদান-প্রদান, তার মাতৃভাষার সঙ্গে, সংস্কৃতির সঙ্গে অন্যের ভাষার, অন্যের সংস্কৃতির মিশ্রণ তত বেশি স্বাভাবিক। কিন্তু নিজের মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসার আবেগ তাতে কখনো ব্যাহত হয়নি বাঙালির। বাঙালি জাতি তার চেতনা জননীর পরই জন্মভূমির এবং মাতৃভাষার অবস্থান। কেননা-অবয়ব যেমন কোন বস্তু কিংবা ব্যক্তির সুনির্দিষ্ট অস্তিত্বকে প্রতীয়মান করে, তেমনি ভাষার মাধ্যমেই মানুষ নির্দিষ্ট জাতি আর তার সংস্কৃতির ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। যতকাল একটি জাতির মাতৃভাষা অস্তিমান থাকে, ততকাল বেঁচে থাকে তার নিজস্ব সংস্কৃতি এবং যতকাল সেই সংস্কৃতিকে জাতি ধারণ করে থাকে, মাতৃভাষা মাতৃভূমির অস্তিÍত্বও মানুষ টিকিয়ে রাখে ততকাল। মাতৃভাষা তাই কেবল মনোভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়। সভ্য পৃথিবীর বুকে জাতির অস্তিত্বমান থাকারও একটি প্রধানতম শর্ত তাই। সে কারণে ভারত বিভাজনের পরে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং পরবর্তী খাজা নাজিম উদ্দিন উর্দুকেই যখন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেন, সেদিন প্রতিরোধ করেছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী সুধী সমাজ। এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল গণ সমাবেশ আর আন্দোলনের কঠোর কঠিন সূচনাপর্ব। অধ্যাপক নুরুল হক ভূঁইয়া, এসেম্বলি সদস্য শামসুল হক সহ আরও অনেকে সংখ্যাগুরু বাঙালির মাতৃভাষার বিরুদ্ধে এই অবিবেচক অবিচারকে মেনে নিতে পারেননি।
উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার বিপক্ষে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন এসেম্বীলর সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। (একাত্তরে শহিদ হয়েছিলেন) পাকিস্তান গণপরিষদে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তাব তুলেছিলেন তিনি। বলেছিলেন মাতৃভাষার কথা বলার, রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করার অধিকার বাঙালির জন্মগত। তার প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়েছিলেন তৎকালীন পূর্ব বাংলার বিশিষ্ট আইন প্রণেতা প্রেমহরি বর্মন, ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত এবং শ্রীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। পরবর্তীকালে এই আন্দোলনেরই বিয়োগান্তক প্রকাশ ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সালাম, রফিক, জব্বার, বরকতের রক্তে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হয়ে উঠে। তাদের এই আত্মবলিদান বিফলে যায়নি। ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগের মূল্যায়ন হয়ে ভাষা শহিদ দিবসকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দানের ভিতর দিয়ে।
বাঙালি জাতি আপন শিল্প এবং সংস্কৃতি রক্ষার জন্য, মাতৃভাষার লালন এবং সমৃদ্ধি স্থাপনের স্বপ্নে ভালোবাসার আকর্ষণ জন্মেছিল তার চেতনায়। একবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে সেই স্বপ্নেই পরিণতি পেল, সুললিত বাংলাভাষায় জাতিসংঘের জনসমুদ্রে দুই বাঙালি প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতাদানে। তাদেরই একজন বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অপরজন তারই সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা। আজ বাংলাভাষা এই শত-সহ¯্র মাতৃভাষার সমারোহে বিশ্বের দরবারে অলংকৃত করে রেখেছে একটি গৌরবময় আসন। বাঙালির বাংলাভাষা বিকশিত হতে হতে বাঙালির ভালোবাসায়, বাঙালির চৈতন্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে মহাসমারোহে। ছড়িয়ে পড়েছে গোটা জগতের কোণে কোণে, তার অস্তিত্ব বিকাশের মহানতম প্রতিভূ হয়ে।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

বিশেষ সংখ্যা এর আরো সংবাদ
  • বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় কবি নজরুল
  • বঙ্গবন্ধুর জীবনালোচনায় কিছু কথা ও কাহিনী
  • বঙ্গবন্ধুকে কাছে থেকে দেখার টুকরো স্মৃতি
  • মুজিববর্ষের তাৎপর্য
  • মাতৃভাষা আন্দোলন ও সিলেট
  • ভাষাশহীদদের প্রতি কৃতজ্ঞতা : ইসলামি দৃষ্টিকোণ
  • দেশে বিদেশে গৌরবের শহীদ মিনার
  • বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষা চর্চা
  • মানুষ জন্মগত বিজয়ী, পরাজয় মানে না
  • মুক্তিযুদ্ধ ও নদী
  • আমাদের মুক্তিযুদ্ধ
  • তিনি আজও আমার সব কর্মের প্রেরণা
  • রাগীব আলীর উন্নয়নের পৃষ্ঠপোষক
  • একজন বিচক্ষণ সম্পাদক আমার মা
  • একজন মহীয়সী নারী
  • রাবেয়া খাতুন চৌধুরী ও সিলেটের ডাক
  • অনন্যা
  • স্মৃতিতে ভাস্বর রাবেয়া খাতুন চৌধুরী
  • বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী এক মহীয়সী নারীর কথা
  • তিনি বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী
  • Image

    Developed by:Sparkle IT