উপ সম্পাদকীয়

একুশে ফেব্রুয়ারি

রঞ্জিত কুমার দে প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০২-২০২০ ইং ০১:১৫:২৯ | সংবাদটি ৯৩ বার পঠিত

১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ থেকে ইংরেজরা বিদায় নিলেও নতুন করে শুরু হয়েছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ। পাকিস্তান রাষ্ট্রের দু’টি অংশ ছিল। একটি পূর্ব ও অপরটি পশ্চিম পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তানিদের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী প্রথমেই চক্রান্ত করে বাঙালির প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমি বাংলাকে নিয়ে। ১৯৪৮ সালের ২১শে মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সভায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকেই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা বলে ঘোষণা করেন। এর তিনদিন পর ২১শে মার্চ কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সমাবর্তন অনুষ্ঠানেও তিনি একই কথার পুনরুল্লেখ করেন। বাঙালিরা তাঁর এ ঘোষণাকে মেনে নিতে পারেনি। তারা আন্দোলন সংগ্রাম শুরু করে। ১৯৫২ সালের ২৬শে জানুয়ারি পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকায় এক জনসভায় উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেয়। এরপর মাতৃভাষা রক্ষার দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের আন্দোলন সংগ্রাম আরও বেগবান হয়। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। মাতৃভাষা বাংলাকে রক্ষার দাবিতে সেদিন যারা আন্দোলন করছিলেন পাকিস্তানি পুলিশ তাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়।
মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় সেদিন জীবন দিয়েছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার এবং নাম না জানা আরও অনেকেই। তদানীন্তন শাসকগোষ্ঠী বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষার স্বীকৃতিদানে বাধ্য হয়। ভাষার দাবিতে শহিদদের স্মরণে ১৯৫২ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি রাতে নির্মিত হয় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার। এরপর থেকে প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি শহিদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মাধ্যমে ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। দিনব্যাপি চলে নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বর্তমানে ২১শে ফেব্রুয়ারি শুধু বাঙালির একার নয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। সেই থেকে সারা বিশ্বের এ দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে।
১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে তৎকালীন বাঙালি মানুষের চেতনার পরিপক্কতার কথা ভেবে। ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন এদেশের স্বাধীনতার অনুপ্রেরণা। এই প্রেরণাই আমাদের উপহার দিয়েছে ১৯৭১ এর বহু কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা। ৫২-এর সূত্র ধরেই বিশ্বের মানচিত্রে স্থান করে নিয়েছিল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। ইউনেস্কোর সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ২১শে ফেব্রুয়ারির স্বীকৃতি বাঙালির জন্যে এ উজ্জ্বল বাঁকচিহ্নের সূচক। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও দিবসটি পালনের তাৎপর্য জাতিসংঘে উপস্থাপন করে এবং ২১শে ফেব্রুয়ারিকে সবচেয়ে গৌরবজনক তারিখ হিসেবে উল্লেখ করে। ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে, যুদ্ধ করেছে একমাত্র বাঙালিরা। এ রক্তদান আত্মাহুতির কারণেই বাংলাদেশের প্রস্তাবিত তারিখটিকেই জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দেয়।
মহান একুশ আজ পালিত হচ্ছে বিশ্বভাষা দিবস হিসেবে। বাংলাদেশের বাইরে ব্রিটেন, আমেরিকা, জাপানসহ বেশ কয়েকটি দেশ বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত শহিদ মিনারের অনুরূপ শহিদ মিনার করে ভাষা শহীদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি দিয়ে থাকেন। আজ আমরা গর্ব করে বলতে পারি বাঙালিরাই একমাত্র জাতি যারা মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে বুকের রক্ত ঢেলে দিতে দ্বিধা করেনি। বিশ্ববাসী স্বীকৃতি দিয়েছে আমাদের ভাষা শহিদদেরকে। জাতিসংঘের মহাসচিব এ দিবসটি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কাছে বার্তা প্রেরণ করেন। এ দিবসটি পালনের মাধ্যমে বিশ্ববাসী তাদের জাতিসত্তার প্রধান বিবেচ্য বিষয় মাতৃভাষার গুরুত্ব উপলব্দি করতে সক্ষম হবে।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসটিকে বিশ্বের প্রায় ১৮৮টি দেশ পালন করছে। ফলে তারা বাংলা ভাষাভাষীদের সংস্কৃতি, সাহিত্য ও সভ্যতাকে জানতে আগ্রহী হবে। বাংলার বিখ্যাত সব কবি-সাহিত্যিকদের সৃষ্টি সম্পর্কে জানবে। বিশ্বের দরবারে বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি একটি বিশিষ্ট স্থান লাভ করবে। বিশ্ব জানবে, বাঙালিরাই একমাত্র জাতি, যারা ভাষার জন্যে যুদ্ধ করেছে।
বিশ শতকের শেষ প্রান্তে এসে জাতিসংঘের বিজ্ঞান, শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কো মাতৃভাষাগুলোর অধিকার এবং একে মর্যাদাপূর্ণভাবে টিকিয়ে রাখতে যে অনন্য-সাধারণ সংগ্রামের সূচনা করল, তা সমগ্র বিশ্বের ভাষাপ্রবাহে অসামান্য-অবদান রাখবে। একই সাথে এদিন বিশ্বের বৃহৎ ভাষাগুলোর পাশে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অবহেলিত ভাষাগুলোও বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা খুঁজে পাবে। কাল থেকে কালান্তরে মাতৃভাষার প্রতি বাঙালি জাতির দায়িত্ব শতগুণে বেড়ে গেল।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ক্যাস্পিয়ান সাগরের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব
  • নিজগৃহে আমাদের এই উদ্বাস্তু জীবন
  • বেকারত্ব ও যুবসমাজ
  • আমার হাতেই আমার সুরক্ষা
  • কুড়িগ্রামের সুলতানা সরেবোর
  • স্মার্টফোনের আনস্মার্ট ব্যবহার
  • কোয়ারেন্টাইন না বলে ঘরবন্দি, একঘরে, ছোঁয়াচে বলুন
  • বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের বন্ধু
  • করোনা ভাইরাস ও করুণ পরিস্থিতি
  • পানির অপচয় রোধ করতেই হবে
  • বিশ্বনবী (সা) এর মিরাজ
  • বিদ্যুৎসাশ্রয় এবং আমাদের করণীয়
  • বেঁচে থাকি প্রাণশক্তির জোরে
  • রক্ত দিন জীবন বাঁচান
  • নদীকে না দেখলে নদীও আমাদের দেখবে না
  • করোনা ভাইরাসে থমকে গেল পৃথিবী
  • করোনা ভাইরাসে আমাদের করণীয়
  • বঙ্গবন্ধুর মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন
  • বঙ্গবন্ধু ও আমাদের শিশুরা
  • করোনা ভাইরাস ও দেশের অর্থনীতি
  • Developed by: Sparkle IT