উপ সম্পাদকীয়

শহীদ মিনার সাহসী কথা বলে

ব্রজেন্দ্র কুমার দাস প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০২-২০২০ ইং ০১:২৩:৪৫ | সংবাদটি ১০৬ বার পঠিত

হুমায়ুন আজাদ লিখিত একটি বইয়ের নাম ‘লালনীল দীপাবলি বা বাংলা সাহিত্যের জীবনী’। এ-বইটির সঙ্গী হতে পারে ছোটরা, বড়োরা এবং যারা বাংলা সাহিত্যকে ভালোবাসে তারাও এ-বইটিকে একজন সুহৃদ বন্ধু হিসেবে সঙ্গে রাখতে পারেন। বইটি পড়তে গিয়ে বারবার নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করেছি। বাঙালা সাহিত্যের আবার জীবনী হয় কিভাবে? যার জীবন আছে তারই তো জীবনী থাকে। ইতিহাস বলে বাংলা ভাষারও জীবন আছে। জীবন আছে বলেই তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে বা চিরতরে মেরে ফেলতে যুগে যুগে দেশী বিদেশী ঘাতকের দল নানাভাবে সক্রিয় ছিল। এখনও যে নেই সেটাই বা কেমন করে বলি। বাংলা ভাষা বা বাংলা সাহিত্যকে দানবের হাত থেকে বাঁচাতে শহীদ মিনার সেই কবে থেকে দায়িত্ব নিয়েছে শুধু আমরাই বা কেন, বিশ্ববাসী তার ইতিহাস জানে।
সেই ইতিহাসের আলোকেই হুমায়ুন আজাদ তাঁর ‘শহীদ মিনার : কাফনে মোড়া অশ্রুবিন্দু’ প্রবন্ধে লিখেন-‘চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ের পাশে যেখানে ঝরে পড়েছিলো একুশের শহীদদের রক্ত, সেখানে টলমল করছে শোকের কাফন পরা এ-অশ্রুবিন্দু। এখানে চিরন্তন বাঙালি আর তার সন্তান, ফুল দেয়, হৃৎপিন্ড দেয়। এখানে আসে শাসকেরাও; তাদের আসতে হয় শক্তিতে থাকার লোভে, না এলে টলমল করে উঠবে সিংহাসন, তাই তারা আসে। শাসক সম্প্রদায় সব সময়ই অনান্তরিক, এক ক্ষেত্রেই শুধু আন্তরিক তারা-ক্ষমতায় অবস্থানের ক্ষেত্রে। তাদের বুকে কোন ফুল ফুটে না বলে তারা সরকারি মালি দিয়ে বানিয়ে আনে কৃত্রিম ফুলের তোড়া। শহীদ মিনারে ওই একটি, আর ক্ষমতালুব্ধ আরো কয়েকটি তোড়া পড়ে, যেগুলোর হৃৎপিন্ড নেই, অশ্রু নেই, আছে শুধু ক্ষুধা আর লিপ্সা।
তারা আসে কখনো লোক সরিয়ে দিয়ে, কখনো তাড়া খেতে খেতে। কিন্তু তাদের আসতে হয়, ওই ক্ষমতাসীনদের অনেকেই মনে মনে ঘেন্না করে এ-অশ্রুবিন্দুকে, কিন্তু ফুল নিয়ে না এসে পারে না। যারা আসেনা বিনাশ হয়ে ওঠে তাদের আশুনিয়তি। মন ভরে ফুল ফুটিয়ে আসে অন্যরা, শক্তি যাদের পদতলে নয়, শক্তি যাদের লক্ষ্য নয়; তারা কিছু বাস্তব ফুল রাখে বেদীমূলে, কিন্তু মনে মনে রাখে পৃথিবী ভরে দেয়ার মতো রক্তগোলাপ।’
হ্যাঁ, কিছু লোকের বিরোধীতা সত্ত্বেও বৃহত্তর বাঙালি ছাত্র-ছাত্রী-জনতা মনে মনে রাখে পৃথিবী ভরে দেয়ার মতো রক্তগোলাপ। এই রক্তগোলাপ শুধু বাংলাদেশেই নয় বিশ্বদরবারে বাংলাভাষা, বাংলা সাহিত্যকে নতুন জীবন দান করেছে। বাংলা আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। আর এটাও সত্য যে ১৯৪৮ থেকে একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর এর আগ পর্যন্ত এ বাংলার শাসক গোষ্ঠী লোক দেখানোর জন্যেও শহীদ মিনারের ধারে কাছেও যায়নি। বরং বাংলার কোন স্থানে কোন ভাবে শহীদ মিনার দৃশ্যমান হলেই ক্ষোভের আগুনে জ্বলে উঠেছে, বাংলার সবুজ ঘাসে গুড়িয়ে দিয়েছে শহীদ মিনারের শেষ চিহ্নটুকুও। তারপরও শহীদ মিনার কথা বলেছে বাঙালির মনে প্রাণে-কানে কানে। সে কথাটিই বলেছেন আমাদের ভাষা আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় একজন অন্যতম সাক্ষী আহমদ রফিক তাঁর ‘ভাষা আন্দোলন, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া’ গ্রন্থটিতে। এখানে তিনি আমাদেরকে বিশেষ করে আজকের প্রজন্মকে জানাতে চেষ্টা করেছেন ১৯৫২ সালে ঢাকা থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন সেদিনকার গ্রামে-গঞ্জে উত্তাল একুশের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিলো কিভাবে।
আহমদ রফিক একটা বিষয় স্পষ্ট করে বলেছেন যে ’৫২ সালের পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম লীগ সরকারের মুখ্যমন্ত্রীসহ সবাই ছিলেন বাঙালি। বাংলা সাহিত্য তথা বাংলা ভাষার জীবনী শক্তি নিঃশেষ করে দিতে রফিক, সালাম বরকত সহ বাঙালির রক্তে বাংলার সবুজ ঘাস রাঙিয়ে দিয়েছিলো বাঙালিরাই। অর্থাৎ বাংলার দুশমন বাঙালি। এদেরকে নিয়ে মধ্যযুগের মহৎ কবি আব্দুল হাকিম এদের উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন রেখে ছিলেন-যারা বাংলায় জন্মে বাংলা ভাষাকে ঘৃণা করে তারা কেনো এ দেশ ছেড়ে চলে যায় না? গ্রামে-গঞ্জে কিভাবে একুশের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল কতোগুলো শিরোনাম দেখলেই তা সহজে সবার বোধগম্য হবে। যেমন-টেকনাফ, দুর্গম এলাকায় একুশের উত্তাপ, কক্সবাজার, সাগর অঞ্চল উত্তাল একুশের আন্দোলনে, পঞ্চগড় ও তেঁতুলিয়া, দূর উত্তরের এলাকাও উত্তপ্ত, অখ্যাত জনপদে একুশের মিছিল (গোবিন্দগঞ্জ), সৈয়দপুর, অবাঙালি-অধ্যুষিত শহরে ভাষা আন্দোলন, মেহেরপুর, স্কুল ছাত্রদের তৎপরতায় উত্তাল একুশে, সাতক্ষীরা, পশ্চাৎপদ অঞ্চলও আন্দোলনে সক্রিয়, বাজিতপুর, দূর গ্রাম একুশের ডাক, নড়াইল, প্রথম শহীদ মিনার তৈরির কৃতিত্ব এদেরও, সুনামগঞ্জ, একুশের ডাকে জাগে দূর প্রান্তিক শহর, জামালপুর ভাষা আন্দোলনে বাম রাজনৈতিক চেতনার প্রকাশ, নেত্রকোণা মুসলিম লীগের একাংশ আন্দোলনে যুক্ত, সিলেট, প্রচন্ড দমননীতির মুখেও দমেনি আন্দোলন।
একুশের আন্দোলন আর শহীদ মিনারকে ঘিরে নানান ঘটনা গ্রাম বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলকে সমৃদ্ধ করেছে; এমনি ইতিহাস হয়তো পৃথিবীর ইতিহাসেও বিরল। আমরা অনেকেই মনে করি শহীদ মিনার কথা বলে শুধু ঢাকাসহ বিভাগীয় আর জেলা শহর সমূহে কিন্তু বাংলার হাট-বাজার-গ্রাম-গঞ্জের বায়ান্নর একুশের ডাক যে ঢাকাকে সাহস জুগিয়েছে সে খবর আমরা ক’জনই বা রাখি। অমর একুশের আন্দোলনে গ্রামে গ্রামে কোমলমতি কচি কচি কণ্ঠে ’৫২-তে যেসব শ্লোগান বাংলার আকাশ-বাতাসে আগুন ছড়িয়ে দিয়েছিল সেগুলো স্মৃতির পাতা থেকে হয়তো মুছে যাওয়ার পথে কিন্তু সেদিন সেগুলো ছিল সাহসের প্রতীক। যেমন-‘নুইরা নাজিম দুই ভাই / এক দড়িতে ফাঁসী চাই’, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘রক্তের বদলে রক্ত চাই’, নুরুল আমিনের কল্লা চাই’ ইত্যাদি। এমনিভাবে সারা দেশে যখন বাংলা ভাষা আর শহীদ মিনার রক্ষাকল্পে দুর্গম এলাকা টেকনাফে শ্লোগান ছিলো-‘খুনি নুুরুল আমিনের ফাঁসি চাই’ তখন এই আন্দোলন নস্যাৎ করতে মাঠে নামে পাকিস্তানপ্রেমী অনেক বাঙালি, ওরা উর্দুতে কথা বলে আভিজাত্য প্রকাশ করতে থাকে। সারা দেশ জুড়ে অমর একুশের বিরুদ্ধে সভা/মিটিং করতে থাকে। এই সব উর্দু প্রেমিকদের মধ্যে ছিলেন চট্টগ্রামের ফজলুল কাদের চৌধুরী যাকে ফকা চৌধুরী নামেই মানুষ চিনে-জানে। সারা দেশজুড়েই কিছু ‘ফকার’ দেখা মেলে। এমনি দৃশ্য সিলেটের উচ্চশ্রেণির একাংশের মধ্যেও দেখা যায়। উর্দুর প্রতি ছিল প্রচন্ড রকমের আকর্ষণ। রবীন্দ্রনাথের সিলেট ভ্রমণের সময় অন্যতম প্রধান একজন আমন্ত্রক নাকি উর্দুতে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। এতে করে ওনার কতোটুকু লাভ হয়েছিলো তা তিনিই জানেন।
কিন্তু তাতে দমেনি সিলেটের আন্দোলন। প্রগতিচেতনায় ঋদ্ধ অনেক ব্যক্তি ও পরিবার এদের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ান। যেমন-সৈয়দ মুজতবা আলী, সৈয়দ মোর্তজা আলী ও তাদের পরিবার। রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে সেদিন মাঠে নেমেছিলেন সাপ্তাহিক নওবেলাল সম্পাদক মাহমুদ আলী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ। এমনি ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যেই নেত্রকোণার তৎকালীন মুসলিম লীগের একাংশ রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে মাঠে নামে। সব কিছু বিবেচনায় এনে নির্দ্ধিধায় বলা চলে ’৫২-তে সমগ্র বাংলাদেশটাই হয়েছিল একটা শহীদ মিনার। শহীদ মিনারের ডাকে জেগে উঠেছিল সমগ্র বাংলাদেশ। আজও জেগে আাছে। বাংলা সাহিত্য, বাংলা ভাষা, আর এদের রক্ষক শহীদ মিনার আজ নির্বাক নয়। কথা বলে। মহান একুশের অমরত্বের প্রতীক শহীদ মিনার। ক্ষমতায় যে শাসক সম্প্রদায়ই আসুক ইচ্ছা-অনিচ্ছায় তাদের শহীদ মিনারের পাদদেশে নগ্নপদে দাঁড়াতেই হবে। আর যারা শ্রদ্ধা-ঋদ্ধ চিত্তে রক্তগোলাপ নিয়ে আসবেন তাদের দায়িত্ব অনেক। শহীদ মিনারের কণ্ঠ যারা রোধ করতে সচেষ্ট হবে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে তাদেরকেই। আসুন আমরা সকলে কান পেতে রই প্রতিটি শহীদ মিনারের পাদদেশে। শুনি আর শুনি শহীদ মিনার কোন সাহসী কথা বলে।

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ক্যাস্পিয়ান সাগরের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব
  • নিজগৃহে আমাদের এই উদ্বাস্তু জীবন
  • বেকারত্ব ও যুবসমাজ
  • আমার হাতেই আমার সুরক্ষা
  • কুড়িগ্রামের সুলতানা সরেবোর
  • স্মার্টফোনের আনস্মার্ট ব্যবহার
  • কোয়ারেন্টাইন না বলে ঘরবন্দি, একঘরে, ছোঁয়াচে বলুন
  • বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের বন্ধু
  • করোনা ভাইরাস ও করুণ পরিস্থিতি
  • পানির অপচয় রোধ করতেই হবে
  • বিশ্বনবী (সা) এর মিরাজ
  • বিদ্যুৎসাশ্রয় এবং আমাদের করণীয়
  • বেঁচে থাকি প্রাণশক্তির জোরে
  • রক্ত দিন জীবন বাঁচান
  • নদীকে না দেখলে নদীও আমাদের দেখবে না
  • করোনা ভাইরাসে থমকে গেল পৃথিবী
  • করোনা ভাইরাসে আমাদের করণীয়
  • বঙ্গবন্ধুর মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন
  • বঙ্গবন্ধু ও আমাদের শিশুরা
  • করোনা ভাইরাস ও দেশের অর্থনীতি
  • Developed by: Sparkle IT