সম্পাদকীয় সব বড় (মহৎ) লোকের মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে উৎপত্তি হয়েছে। ইমারসন

দৃপ্ত শপথের দিন

প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০২-২০২০ ইং ০১:২৬:১১ | সংবাদটি ৯৯ বার পঠিত

এসেছে ফাগুনের দখিনা হাওয়া। পলাশ, শিমুল, কৃষ্ণচ’ূড়ার রঙে সেজেছে বাঙালির মন। অথচ এই অপার আনন্দের মাঝেও আছে কষ্ট-বেদনা। কারণ, আমাদের জাতীয় জীবনে এক বেদনাবিধুর ঘটনা ঘটে গেছে এই ফাল্গুনে। সেই দিনটি হচ্ছে বায়ান্নের একুশে ফেব্রুয়ারি। আজ সেই দিন। বাঙালি জাতির জন্য একটা শোকাবহ স্মরণীয়, বরণীয় দিন। আজ শহীদ দিবস, ভাষা দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বাঙালির শপথ নেয়ার দিন একুশে, বাঙালির মাথা তুলে দাঁড়াবার দিন একুশে। একুশে হচ্ছে ত্যাগ আর চেতনার অঙ্গীকারে উজ্জীবিত হওয়ার দিন। বাংলা ও বাঙালির স্বাতন্ত্র্য সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার দিন। মহান একুশে শুধু ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠা নয়, নিজেদের আত্ম সম্মানবোধ জাগিয়ে তোলার দিনও এটি। আর দিনটি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবেও সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে। আজকের এই দিনে আমরা একুশের অমর শহীদদের প্রতি জানাচ্ছি সশ্রদ্ধ সম্মান।
একুশে ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবস যতোদিন পালিত হবে, ততোদিন বিশ্বে মানুষের মধ্যে নিজেদের মাতৃভাষার প্রতি মমত্ববোধ জেগে থাকবে। বাঙালির সকল চেতনার উৎস মহান একুশে। একাত্তর যতোটুকু গুরুত্ব নিয়ে এসেছিলো আমাদের কাছে, তেমনি গুরুত্ব নিয়ে এসেছিলো বায়ান্নোও। আমাদের হাজার বছরের লালিত স্বপ্ন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছিলো একাত্তরে। আর এই স্বাধীনতার বীজ রুপিত হয় বায়ান্নোতে। বায়ান্নোতে ভাষার জন্য আন্দোলন হয় এ দেশে। যা বিশ্বের ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা। বিশ্বের প্রতিটি মাতৃভাষাপ্রিয় মানুষের কাছেই এই ভাষার আন্দোলন একটি বৃহৎ এবং অর্থবহ ঘটনা। বায়ান্নোতে তখনকার শাসকগোষ্ঠী চেয়েছিলো এদেশের মানুষের প্রাণপ্রিয় মাতৃভাষা বাংলার পরিবর্তে উর্দুকে এদেশের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে। বাংলা মায়ের বীর সন্তানেরা তা মেনে নেয়নি। রাস্তায় নামে তারা। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগানে মুখরিত হয় রাজপথ। আন্দোলন থামাতে ১৪৪ ধারা জারি করে শাসকগোষ্ঠী। গুলি করে মিছিলে। অগণিত শহীদের রক্তে রঞ্জিত হয়ে বাংলা ভাষা মর্যাদা লাভ করে মাতৃভাষায়। আর বায়ান্নোতেই বাঙালিরা নিজেদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হওয়ার মন্ত্র শেখে। আর সেখান থেকেই সূচনা হয় স্বাধীকার আন্দোলনের, স্বাধীনতা সংগ্রামের। যার চূড়ান্ত রূপ হচ্ছে একাত্তরের ষোলোই ডিসেম্বর স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়। মহান একুশে বাংলা মায়ের সন্তানদের যে অমর মন্ত্রে বলীয়ান করেছে, সেই মন্ত্রে উজ্জীবিত হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দেশপ্রেমিক মানুষেরা। এই গৌরব আর সম্মানকে সমুন্নত রাখতে হবে। আর এই দায়িত্ববোধ থেকেই আমরা প্রতিটি একুশেতে ফুলে ফুলে ভরে তুলি শহীদ মিনার, প্রভাতফেরীতে অংশ নেই, আয়োজন করি নানা অনুষ্ঠানের। কিন্তু এইসব গতানুগতিক আনুষ্ঠানিকতায় ভাষার জন্য আত্মদানকারী মহান বীর সৈনিকদের রক্তের ঋণ পরিশোধ হবার নয়। যদি ভাষা আন্দোলনের এই ৬৮ বছর পরেও এদেশে অন্তত অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষ না থাকতো, যদি বাঙালির আবহমান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য যথাযথভাবে পালন করা হতো, যদি বাংলা ভাষার বিকৃত রূপ উপস্থাপনের প্রতিযোগিতা না হতো-তবে হয়তো এইসব শহীদের রক্তের ঋণ কিছুটা হলেও পরিশোধ করা সম্ভব হতো। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছেনা। এদেশ নিরক্ষরের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি এই ভাষাকে বিকৃত করা হচ্ছে নানাভাবে। বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধ্বংস করার নানা প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে।
মহান একুশের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছে একটা স্বাতন্ত্র্যবোধ। সেই সঙ্গে আছে মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকারের বিষয়টিও। বীর বাঙালিরা সেই অধিকার আদায় করে বিশ্ববাসীকে বুঝিয়ে দিয়েছে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে কীভাবে সোচ্চার হতে হয়, কীভাবে অধিকার সমুন্নত রাখতে হয়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হচ্ছে, সেই শহীদদের স্বপ্নকে অপমানিত করার মতো অনেক ঘটনাই ঘটে চলেছে এই দেশে। এখানে প্রতিনিয়ত বাড়ছে নিরক্ষরদের সংখ্যা, ভুল বানানে অশুদ্ধ বাংলা ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ঐতিহ্য ধ্বংস করার। বিকৃত করার হীন অপচেষ্টা চলছে। এটা আমাদের ব্যর্থতা। প্রতিনিয়ত এই ব্যর্থতা আমাদের কষ্ট দেয়। যারা বিশ্বের বুকে ভাষার দাবিতে আত্মত্যাগের বিরল ঘটনার জন্ম দিতে পারে, তাদের পক্ষেই এই ভাষাকে এদেশের প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া এবং প্রতিটি মানুষকে সাক্ষর করে তোলার পাশাপাশি এই ভাষার সম্মান রক্ষা করার গুরু দায়িত্ব পালন করা সম্ভব। আজকের এই ঐতিহাসিক দিনে আমরা সেই মহৎ কাজটি করার শপথ নেবো। শহীদ স্মৃতি অমর হোক, চির জাগরুক থাকুক একুশের চেতনা।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT