বিশেষ সংখ্যা

ভাষাশহীদদের প্রতি কৃতজ্ঞতা : ইসলামি দৃষ্টিকোণ

ইমদাদুল হক যুবায়ের প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০২-২০২০ ইং ০১:২৮:৪২ | সংবাদটি ৫০৩ বার পঠিত
Image

মহান আল্লাহ মানুষকে যত ক্ষমতা দিয়েছেন সেগুলোর অন্যতম হলো মানুষের কথা বলার ক্ষমতা। এ ক্ষমতাই মানুষকে অন্য সকল প্রাণী থেকে পৃথক ও বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করেছে। এ বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন- “দয়াময় আল্লাহ, তিনি শিক্ষা দিয়েছেন কুরআন, সৃষ্টি করেছেন মানুষ, তিনি তাকে শিক্ষা দিয়েছেন ভাব প্রকাশের ক্ষমতা বা কথা বলার ক্ষমতা।” (সূরা আর-রাহমান, আয়াত : ১-৪)
পৃথিবীর সকল মানুষ যেমন মহান আল্লাহর প্রিয় সৃষ্টি, তেমনি সকল ভাষাও আল্লাহর প্রিয় সৃষ্টি। সুতরাং কোনো ভাষাকে অন্য ভাষা থেকে আল্লাহর কাছে অধিক মর্যাদাময়, প্রিয় বা ঘৃন্য ভাষা বলে মনে করার কোনো অবকাশ নেই। প্রত্যেক মানুষের কাছে নিজের পিতা-মাতা ও দেশের যেমন মর্যাদা ও গুরুত্ব, তেমনি গুরুত্ব ও মর্যাদা তার মাতৃভাষার। মাতৃভাষার গুরুত্ব সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন- “স্বজাতির ভাষা বা মাতৃভাষা ছাড়া আমি কোনো রাসূলই প্রেরণ করিনি।” (সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ৪) তাইতো পৃথিবীর মানুষ, প্রকৃতি ও অন্যান্য সকল সৃষ্টির বৈচিত্র্যের ন্যায় ভাষার বৈচিত্র্যও আল্লাহর কুদরতের মহা-নিদর্শন।
মাতা, মাতৃভাষা আর মাতৃভূমি এ তিনটি পরম শ্রদ্ধার বস্তু। মাতৃভাষা বাংলা মোদের খোদার সেরা দান। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা হওয়ার পিছনে রয়েছে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের সুদীর্ঘ ইতিহাস। ১৯৪৭ -এর পূর্ব থেকেই অনেক বাঙালি মুসলিম উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি করতে থাকেন। আবার অনেক মুসলমান ও রাজনৈতিক নেতা এ দাবির প্রতিবাদও করেন এবং তাঁরা এ দাবিও করেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা অবশ্যই বাংলা হতে হবে।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের স্বাধীনতা লাভের পরও এ বিষয়ে বিতর্ক চলতে থাকে। তমদ্দুন মজলিস, অন্যান্য সংস্থা ও ব্যক্তি পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা ও পূর্ব-পাকিস্তানের সরকারী ভাষা বাংলা হিসেবে ঘোষণা করার জোর দাবি জানায়, যা ক্রমান্বয়ে এদেশের মানুষের গণদাবিতে পরিণত হয়। ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ এ দাবির পক্ষে ঢাকায় সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। ১৯ মার্চ পাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেল মোহাম্মাদ আলী জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তান সফরে আসেন। গণমানুষের দাবিকে উপক্ষো করে তিনি ঢাকায় অনুষ্ঠিত দু’টি সভাতেই বক্তৃতায় একমাত্র উর্দুকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন। এ সময় সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।
১৯৫২ সালের শুরু থেকে ভাষা আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ মোড় নেয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে সর্বাত্মক হরতাল, জনসভা ও বিক্ষোভ মিছিল আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু সরকার পাল্টা ১৪৪ ধারা জারি করে। ছাত্ররা ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করলে মিছিলে নির্বিচারে পুলিশ গুলি চালায়। এতে রফিক উদ্দীন আহমদ, আব্দুল জব্বার, আবুল বরকত, আব্দুস সালামসহ অনেকে শহীদ হন এবং আরো অনেক আহত হন।
নিজের কিংবা দেশের সম্পদ বা স্বীয় অধিকার আদায়ের জন্য কথা বলে, দাবি আদায়ের চেষ্টা করে যদি কেউ নিহত হন, তবে সে ব্যক্তি শহীদ হন বলে হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে। তাই এদেশের মানুষের মাতৃভাষায় অধিকার রক্ষার জন্য কথা বলে বা সংগ্রাম করে যাঁরা নিহত হয়েছেন তাদের মৃত্যু শহীদী মৃত্যু; যা বিভিন্ন হাদীস দ্বারা প্রতীয়মান হয়।
এ সকল শহীদদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব হলো প্রথমত তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, দ্বিতীয়ত জান্নাতে তাঁদের উচ্চ মাকামের জন্য দোয়া করা এবং তৃতীয়ত মাতৃভাষার সর্বোচ্চ মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তাঁদের রেখে যাওয়া দায়িত্ব যথাযথভাবে আঞ্জাম দেওয়া। চতুর্থত আমাদের প্রিয় মাতৃভাষাকে সমৃদ্ধ করে আন্তর্জাতিক মর্যাদার স্বর্ণশিখরে পৌঁছে দেয়ার প্রানান্তকর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা।
ভাষা আল্লাহ প্রদত্ত মহা নেয়ামত। ব্যক্তি বা জাতীয় জীবনে কোনো নেয়ামত অর্জনে যাঁদের অবদান রয়েছে তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অংশ; যা ইসলামের নির্দেশ। সুতরাং জাতি, ধর্ম-বর্ণ, দল-মত নির্বিশেষে আমাদের মাতৃভাষা বাংলা হওয়ার পিছনে যে বা যাঁরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য অবদান রেখেছেন, জীবন দিয়েছেন বা পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, তাঁদের সকলের প্রতি হৃদয়, মন ও মুখ দিয়ে আমাদের ব্যক্তিগত ও জাতীয়ভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। সকল প্রকার পক্ষপাতিত্ব পরিত্যাগ করে তাঁদের ত্যাগের সঠিক তথ্য পরবর্তী প্রজন্ম ও বিশ্বকে জানানো, লিপিবদ্ধ ও সংরক্ষণ করা উচিত। তাঁদের মধ্যে যাঁরা জীবিত রয়েছেন তাদের যথাযথ প্রতিদান প্রদানের চেষ্টা করা আমাদের নৈতিক ও ঈমানী দায়িত্ব।
তাই মাতৃভাষার জন্য সকল প্রকার ত্যাগ স্বীকারকারীদের অবদানের প্রতিদান দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তাঁদের বদান্যতার স্বীকৃতি ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অন্যতম দিক হলো ভাষার জন্য যাঁরা জীবন দিয়েছেন তাঁদের কথা স্মরণ করা, স্বীকৃতি দেওয়া, আলোচনা ও প্রশংসা করা। বিভিন্ন হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “কেউ তোমাদের কোনো উপকার বা কল্যাণ করলে তাঁর প্রতিদান দিবে এবং তাঁর জন্য দোয়া করবে।” (বুখারী, খন্ড-৬, পৃ. ২৬৩১) অন্য হাদীসে এসেছে- “যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ নয় সে আল্লাহর প্রতিও অকৃতজ্ঞ। সে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ যে মানুষের প্রতি সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ।” (আহমদ, আল-মুসনাদ, খন্ড-৫, পৃ. ২১২)
তাই কাউকে কিছু প্রদান করলে সে তাকে -এর প্রতিদান দিবে। যদি প্রতিদান দিতে না পারে তবে সে তাঁর গুণকীর্তন ও প্রশংসা করবে। যে ব্যক্তি উপকারীর গুণকীর্তন ও প্রশংসা করল সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল। আর যে উপকারীর উপকারের কথা গোপন করল সে অকৃতজ্ঞ। ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায় যে, কোনো অমুসলিম কাফিরও কোনো কল্যাণ করলে রাসূলুল্লাহ (সা.) তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও প্রশংসা করতেন এবং তাকে যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে স্মরণ করতেন। সুতরাং পূর্ববর্তী বা পরবর্তীকালে সৃষ্ট কোনো মতভেদ, দলভেদ, শত্রুতা বা অন্য কোনো কারণে কারো অবদান অস্বীকার করা, গোপন করা বা অবমূল্যায়ন করা কঠিন পাপ ও আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞতার অপরাধ; যা আমাদের ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে আল্লাহর শাস্তি এবং আখিরাতে অকল্যাণ বয়ে আনবে। তাই আমাদের দায়িত্ব হলো আখিরাতে কল্যাণের উদ্দেশ্যে ভাষা শহীদদের জন্য সর্বদা দোয়া করা, সাদকায়ে জারিয়া হিসেবে তাঁদের স্মৃতিতে মসজিদ, মাদরাসা, এতিমখানা ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা।
মাতৃভাষা বাংলাকে ভালোবাসতে হবে, সম্মান ও সমৃদ্ধ করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
মাতৃভাষার প্রতি সম্মান দেখানোর অর্থ হলো-মাতৃভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করা। কঠিন বিষয়কে সহজভাবে উপস্থাপনের জন্য বাংলা ভাষার সকল জ্ঞান অনুসন্ধানী ছাত্র-শিক্ষক এর দায়িত্ব মাতৃভাষা বাংলায় গভীর পান্ডিত্য অর্জনের পাশাপাশি মাতৃভাষায় উচ্চাঙ্গের সাহিত্যিক মান অর্জনে চেষ্টা করা; যেন স্বীয় বক্তব্য, লেখনি ইত্যাদির মাধ্যমে সকল বাঙালি শ্রোতার হৃদয় আলোড়িত হয়।
পরিশেষে বলব, মাতৃভাষার প্রতি অবহেলা না করে আল্লাহ প্রদত্ত অসংখ্য নেয়ামতের সাথে সাথে ভাষার মতো মহা নেয়ামতেরও যথার্থ মুল্যায়ন করতে হবে। সর্বোপরি আমাদের গৌরব ও অহংকার মহান ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা দিতে হবে। আমাদের মাতৃভাষা যাতে বিজাতীয় সংস্কৃতিতে ভরে না যায় সে দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। ইসলামী সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে বাংলা ভাষায় অন্তর্ভুক্ত করে এটাকে আরও সমৃদ্ধ করতে হবে। মুসলিম উম্মাহর অন্যান্য ভাষা, যেমন- আরবি, ফার্সী, তুর্কি, সোহেলী, মালয়ী ইত্যাদি ভাষায় পারদর্শী হয়ে এসব ভাষায় রচিত মূল্যবান গ্রন্থাদি বাংলায় অনুবাদ করতে হবে। তাফসীর, হাদীস, ফিকহ ও ইসলামী জ্ঞানের অন্যান্য সকল শাখায় বাংলা অনুবাদ কর্মের বিশাল ভান্ডার গড়ে তুলতে হবে আমাদের মাতৃভাষা বাংলায়।

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

বিশেষ সংখ্যা এর আরো সংবাদ
  • বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় কবি নজরুল
  • বঙ্গবন্ধুর জীবনালোচনায় কিছু কথা ও কাহিনী
  • বঙ্গবন্ধুকে কাছে থেকে দেখার টুকরো স্মৃতি
  • মুজিববর্ষের তাৎপর্য
  • মাতৃভাষা আন্দোলন ও সিলেট
  • ভাষাশহীদদের প্রতি কৃতজ্ঞতা : ইসলামি দৃষ্টিকোণ
  • দেশে বিদেশে গৌরবের শহীদ মিনার
  • বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষা চর্চা
  • মানুষ জন্মগত বিজয়ী, পরাজয় মানে না
  • মুক্তিযুদ্ধ ও নদী
  • আমাদের মুক্তিযুদ্ধ
  • তিনি আজও আমার সব কর্মের প্রেরণা
  • রাগীব আলীর উন্নয়নের পৃষ্ঠপোষক
  • একজন বিচক্ষণ সম্পাদক আমার মা
  • একজন মহীয়সী নারী
  • রাবেয়া খাতুন চৌধুরী ও সিলেটের ডাক
  • অনন্যা
  • স্মৃতিতে ভাস্বর রাবেয়া খাতুন চৌধুরী
  • বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী এক মহীয়সী নারীর কথা
  • তিনি বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী
  • Image

    Developed by:Sparkle IT