বিশেষ সংখ্যা

মাতৃভাষা আন্দোলন ও সিলেট

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০২-২০২০ ইং ০১:৩০:০২ | সংবাদটি ১৪৮ বার পঠিত

১৯৪৭ সালের ২৯ জুলাই দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রখ্যাত ভাষাবিদ ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ লিখিত প্রবন্ধ প্রকাশের পরপরই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। আলোচনার সূচনায় গতি সঞ্চার করে সিলেটে তমদ্দুনে মজলিস কর্তৃক ১৯৪৭ সালে সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত পুস্তিকা ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা, না ঊর্দু। সিলেটের প্রাচীনতম পত্রিকা আল-ইসলাহ-এ ১৯৪৭ সালের আগস্টে প্রকাশিত সম্পাদকীয়-‘বাংলার পরিবর্তন এবং অন্য কোনও ভাষা রাষ্ট্র ভাষা হোক, ইহা কখনও সমর্থন করিতে পারি না।’ ১৯৪৭ সালের নভেম্বরে মুসলিম সাহিত্য সংসদে ভাষা নিয়ে আলোচনা সভায় লিখিত প্রবন্ধ পাঠ করেন শিক্ষাবিদ মুসলিম চৌধুরী। সমসাময়িককালে মুসলিম সাহিত্য সংসদ সম্পাদক মুহম্মদ নুরুল হক কর্তৃক সরকারী আলিয়া মাদ্রাসায় আহূত লেখক, বুদ্ধিজীবীদের সভায় সভাপতিত্ব করেন সাহিত্যিক মতিন আহমদ। মুখ্য বক্তা ডঃ সৈয়দ মুজতবা আলি বাংলার সপক্ষে জোরালো বক্তব্য পেশ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম সভা হয় ১৯৪৭ সালের ৬ ডিসেম্বর। তার আগে তৎপরতা ছিল না বললেই হয়। এর আগেই রাষ্ট্রভাষা নিয়ে প্রথম জনসভা অনুষ্ঠিত হয় সিলেটে। প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ মাহমুদ আলি এবং দেওয়ান মুহাম্মদ আজরফ রচিত প্রবন্ধ ও সম্পাদকীয়তে ‘নওবেলাল’ পত্রিকা ছিল উচ্চকন্ঠ ১৯৪৮-এর জানুয়ারী মাসে। ১৯৪৮ সালের ১১ জানুয়ারী পাকিস্তান সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রী আব্দুর রব নিস্তারের সিলেট পরিভ্রমণকালে মুসলিম ছাত্র ফেডারেশন এবং জোবেদা খাতুন চৌধুরীর নেতৃত্বে মহিলা দল ডেপুটেশন দিয়ে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার দাবি জানান।
১৯৪৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী নাজিম উদ্দিনের কাছে বাংলা ভাষার দাবি নিয়ে স¥ারকলিপি প্রদান করেন জোবেদা খাতুন চৌধুরী, সৈয়দা সাহারাবানু, সৈয়দা লুৎফুন্নেসা খাতুন, সৈয়দা নাজিমবুন্নেসা খাতুন, রাবেয়া খাতুন প্রমুখ সিলেটের নেতৃস্থানীয়রা।
১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারী পাকিস্তান গণ পরিষদের সভায় তৎকালীন জনৈক সদস্যকে বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি এবং মুখ্যমন্ত্রী নাজিমউদ্দিন প্রদত্ত উত্তেজক বক্তৃতার প্রতিবাদে ৮ মার্চ সিলেটের গোবিন্দ পার্কে তমদ্দুনে মজলিস ও মুসলিম ছাত্র ফেডারেশন কর্তৃক আহূত মাহমুদ আলির সভাপতিত্বে সভা হামলা চালিয়ে ভঙ্গ করে দেয় বাংলা ভাষা বিরোধী বাহিনী।
এ-সভায় উপস্থিত ছিলেন ছাত্র ফেডারেশনের মকসুদ আহমদ, বরুণ রায়, অনিমেষ ভট্টাচার্য প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। মকসুদ আহমদ ছিলেন সভার ভিতরে এবং বাকিরা ছিলেন নেতৃত্বের নির্দেশে। হামলায় সভা ছত্রভঙ্গ হওয়ার ফলে সকসুদ আহমদ বিচ্ছিন্ন হয়ে যান বাকীদের থেকে। অ্যাডিশনাল এস পির ছেলে হওয়া সত্ত্বেও মারাত্মকভাবে প্রহৃত হন মকসুদ আহমদ। বন্দর বাজারের কাপড়ের দোকানের কর্মচারীরা আহত মকসুদ আহমদকে রাস্তা থেকে তুলে এনে তার ভগ্নিপতির থানার কোয়ার্টারে পৌঁছে দেয়।
লোকমুখে আহত হওয়ার খবর জেনেও মকসুদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে অপারগ হন আন্দোলনকারীরা। এস পি সাহেবের বাংলোতে প্রবেশের চেষ্টা করে জ্যোতির্ময়। এস পি সাহেবের হুঙ্কার ‘আমার ছেলে মকসুদ মারা গেছে অনেক আগে’। থানার এক কনস্টেবলের সহায়তায় মকসুদের বার্তা ও নির্দেশ পেয়ে কোয়ার্টারের পেছনের দেওয়াল টপকে জ্যোতির্ময় প্রবেশ করে দেখা করে এবং মকসুদের মুখেই সমস্ত ঘটনা শুনে ওই পথেই বেরিয়ে আসে। মকসুদের বোন ও ভগ্নিপতি ভয়ঙ্কর কম্যুনিস্ট-বিরোধী না হওয়ায় সাক্ষাৎ সম্ভব হয়। নাদুস-নুদুস ছেলে মারাত্মক আহত হয়েছিল এবং সমস্ত শরীর থেকে রক্তপাত হয়েছিল।
এ-জঘন্য আক্রমণের প্রতিবাদে ১০ মার্চ গোবিন্দ পার্কে মুসলিম মহিলা লীগ এক সভা আহবান করে। বিরোধীরা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের দুশমন ইত্যাদি অপপ্রচার শুরু করলে প্রশাসন দু‘মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করা সত্ত্বেও বাংলার পক্ষে জনমত ক্রমশই প্রবল হতে থাকে। ‘নওবেলাল’ পত্রিকা প্রচারে মুখ্য ভূমিকা নেয়। এতে অত্যাচারের মুদ্রিত বিবৃতি প্রচারিত হয়। আন্দোলনের এ পর্যায়ে বিশেষ ভূমিকা নেন পীর হবিবুর রহমান, আসদ্দর আলি, এ জেড আব্দুল্লাহ, হাজারী প্রমুখ। কম্যুনিস্ট বিরোধিতা ওদের মধ্যে ছিলই না বরং ঘনিষ্ঠ ছিলেন ওরা।
আন্দোলনের এ পর্যায়ে অবদানকারীরা হলেন আব্দুর রহিম, মতছির আলি, মণিরউদ্দিন, সৈয়দ মোতাহের আলি, আব্দুল হামিদ, আব্দুল মুহিত, সৈয়দ সোয়ার বকত, উবেদ জায়গীরদার, নাজিরউদ্দিন আহমেদ, সোনাওর আলি, ইছাক মিয়া, জমিরউদ্দিন, সৈয়দ আকমল হোসেইন, আব্দুল মজিদ, দেওয়ার ফরিদ গাজী, কমরেড বরুণ রায়, তারা মিয়া, মুজিবুর রহমান, আহমদ কবীর চোধুরী প্রমুখ নেতৃবৃন্দ।
১৯৪৮ সালের ১৬ মার্চ গভর্নর জেনারেল জিন্নাহ সাহেব, মুখ্যমন্ত্রী নাজিমউদ্দিনের উর্দুর সপক্ষে বক্তৃতা প্রদানের ফলে আন্দোলনে বেগ সঞ্চারিত হয়ে দানা বাঁধতে থাকে বহু জায়গায়। ১৯৪৯ সালের ৭ ফেব্রুয়ারী ঢাকা শহরে গঠিত হয় সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ। পীর হবিবুর রহমানের নেতৃত্বে সিলেটে নতুন ভাবে সংগঠিত হয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। সদস্য নির্বাচিত হন মাহমুদ আলি,আব্দুর রহিম, নুরুর রহমান, সাহাদাত খান, মতচ্ছির আলি, মনিরউদ্দিন, মওলানা সাখাওয়াতুল আম্বিয়া, হাজারী মাহমুদ, মতাহির আলি প্রমুখ। ঢাকায় আন্দোলনে গতি সঞ্চারিত হয়। অগ্রণী ভূমিকায় অনেক স্থানেই ছিলেন সিলেটি ছাত্ররা।
১৯৪৭ সালে শুরু মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলন লাগাতার না হলেও স্তিমিত হয়নি সিলেটে ১৯৫২ পর্যন্ত। সাংবাদিকতায় নিযুক্ত সিলেটের সংবাদকর্মী সিলেট, ঢাকা সহ বিভিন্ন জায়গায় সংবাদ মাধ্যমে বাংলা ভাষার পক্ষে প্রচারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেন।
ঢাকার মিছিল ও প্রচারে অংশগ্রহণ করেন সিলেটের জাকারিয়া খান চৌধুরী, শাহ এম এস কিবরিয়া, রাহশন আর বাচ্চু, আহমদ কবীর চৌধুরী, ডঃ আখলাকুর রহমান, এম এস আলি, মাহবুব বারী, আব্দুল মুহিত, সদরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী, মোয়াজ্জেম আহমদ চৌধুরী, এম সাইফুর রহমান, মুহম্মদ ইলিয়াস প্রমুখ ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গাজিউল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সিলেটের আব্দুস সামাদ আজাদ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার প্রস্তাব দেন এবং তা গৃহীত হয়। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মিছিলে আসুরিক গুলি চালনায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসসহ রাজপথ রক্তাক্ত হয় অসংখ্য শহিদের রক্তে। একুশ চিহ্নিত হয় শহিদ দিবস হিসাবে এবং পরবর্তীতে একুশে হিসাবে। আগুনের মত ছড়িয়ে পড়ে মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলন। ঢাকায় গুলিবর্ষণের আগে বড় জনসমাবেশ হয় সিলেটে। বর্বর গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে ২২ ফেব্রুয়ারী হরতাল পালিত হয় সিলেটে। শোক মিছিল বের হয়। শাহজালাল মাজারে গায়েবী জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। হাজার হাজার লোক সমাগম হয়। পত্র-পত্রিকাসহ ধর্মীয় নেতারাও বাংলাভাষার দাবির সমর্থনে পা মিলিয়েছিলেন।
একুশে স্বীকৃতি আদায় করল মাতৃভাষা বাংলার। আন্তর্জাতিক স্তরে ইতিহাস সৃষ্টি করল। একুশে হলো তোমার-আমার-সবার। বাঙ্গালী জাতীয়তা নবজন্ম লাভ করলো।
বিশ্ব প্রাঙ্গণে একুশে-কে এগিয়ে নিলেন সিলেটের সন্তানেরা। ১৯৯৯ সালের ১২ নভেম্বর ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর ৩০তম অধিবেশনে ২১ ফেব্রুয়ারীকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রস্তাব পেশ করেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সিলেটের সুসন্তান মোয়াজ্জেম আলি। প্রস্তাব হল গৃহীত। রক্তেমাখা একুশে স্বীকৃতি লাভ করল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে। একুশে তাই অমর।

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

বিশেষ সংখ্যা এর আরো সংবাদ
  • বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় কবি নজরুল
  • বঙ্গবন্ধুর জীবনালোচনায় কিছু কথা ও কাহিনী
  • বঙ্গবন্ধুকে কাছে থেকে দেখার টুকরো স্মৃতি
  • মুজিববর্ষের তাৎপর্য
  • মাতৃভাষা আন্দোলন ও সিলেট
  • ভাষাশহীদদের প্রতি কৃতজ্ঞতা : ইসলামি দৃষ্টিকোণ
  • দেশে বিদেশে গৌরবের শহীদ মিনার
  • বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষা চর্চা
  • মানুষ জন্মগত বিজয়ী, পরাজয় মানে না
  • মুক্তিযুদ্ধ ও নদী
  • আমাদের মুক্তিযুদ্ধ
  • তিনি আজও আমার সব কর্মের প্রেরণা
  • রাগীব আলীর উন্নয়নের পৃষ্ঠপোষক
  • একজন বিচক্ষণ সম্পাদক আমার মা
  • একজন মহীয়সী নারী
  • রাবেয়া খাতুন চৌধুরী ও সিলেটের ডাক
  • অনন্যা
  • স্মৃতিতে ভাস্বর রাবেয়া খাতুন চৌধুরী
  • বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী এক মহীয়সী নারীর কথা
  • তিনি বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী
  • Developed by: Sparkle IT