ইতিহাস ও ঐতিহ্য

মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবীর ওসমানী

মোঃ জিয়ারত হোসেন খান প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০২-২০২০ ইং ০০:০৬:২৫ | সংবাদটি ৫৮৩ বার পঠিত
Image

১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ। এ যুদ্ধ সংগঠিত ও পরিচালনায় যার নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে, তিনি বাঙালি জাতির দুর্যোগের অকুতভয় কান্ডারী, সমর নায়ক বঙ্গবীর জেনারেল মহম্মদ আতাউল গণী ওসমানী। বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা বলতে গেলেই সেই পলাশীর কথা চলে আসে। ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন পলাশীর প্রান্তরে বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর, ঘসেটি বেগম, রায় দুর্লভ, জগত শেঠ গংদের চরম বেঈমানির কারণে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা ব্রিটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর কাছে যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করেন এবং পরিবার পরিজনসহ তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী। অস্তমিত হয় বাংলার স্বাধীনতার সূর্য। বাংলাসহ পুরো ভারত উপমহাদেশ চলে যায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর দখলে। পরবর্তীতে আমরা ব্রিটিশ কলোনিয়াল রাষ্ট্রে পরিণত হই। প্রায় দুইশ বছরের গোলামীর শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়ে পুরো ভারতবর্ষ। আর বাংলা, বাঙালি, বাংলা সাংস্কৃতিক কথা উঠলেই প্রথমে যার নাম চলে আসে, তিনি হলেন বাংলার সেই শ্রেষ্ঠ নেতা যিনি ১৯৪০ সালে তৎকালীন বৃটিশ ভারতে বাংলা নামের একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের চিন্তা তথা প্রস্তাব পেশ করেন। বাংলার স্বাধীনতার কথা উঠলেই হৃদয়ের মানসপটে ভেসে উঠে শেরে বাংলা এ. কে ফজলুল হক এর কথা। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতার কথা স্মরণ করতে যাই, তখনই মানস পটে ভেসে উঠে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মজলুম জননেতা মাওলানী ভাসানী, মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডার-ইন-চিফ বঙ্গবীর জেনারেল ওসমানী প্রমুখের কথা।
১৯৫২ সালে ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগানে মিছিল বের করলে এই মিছিলে পাক জান্তা গুলি করলে সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত শফিউলসহ নাম না জানা অনেকেই শহীদ হন। সেই ভাষা আন্দোলনেই রোপিত হয় বাঙালির স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন। অতঃপর একের পর এক আন্দোলনের মাধ্যমে পাকিস্তানী সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় বাঙালি জাতি। ধীরে ধীরে বাঙালির সকল সংগ্রাম ও আন্দোলনের অগ্রনায়ক হিসেবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আবির্ভূত হন। যৌবনের ২৩ বছর তিনি কারাবরণ করেন বাঙালির অধিকার আদায়ের জন্য। ১৯৬৬ সালে ছয় দফা ঘোষণা করে পাকিস্তানি শাসকদের ভীত কাঁপিয়ে দেন। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী বুঝতে পারে স্বায়ত্ব শাসনের নামে শেখ মুজিবুর রহমান এই দেশকে আলাদা রাষ্ট্রে পরিণত করতে চান, তাই তারা ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র’ নামে মিথ্যা মামলায় বঙ্গবন্ধুসহ তাঁর অনুসারী অনেককেই জড়িত করে দেশদ্রোহী হিসাবে শেখ মুজিবুর রহমানকে ফাঁসি দেওয়ার পাঁয়তারা ও ষড়যন্ত্র করেছিল। ফোঁসে ওঠে বাঙালি জাতি, আন্দোলনের গণজোয়ারে ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানে শেখ মুজিবকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। জেল থেকে বের হওয়ার পর শেখ মুজিবকে ছাত্র সমাজের পক্ষ থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। তিনি পরিণত হন বাঙালির একক নেতা হিসেবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যখন জীবন বাজি রেখে বাঙালির অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করছেন, সংগঠিত করছেন জাতিকে স্বাধীনতা আদায়ের জন্য, ঠিক সেই সমসাময়িক কালে আরেক বাঙালি বীর সন্তান পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভিতরে বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিয়োজিত। তাঁর অতিবাঙালি প্রেমে পাকিস্তান সামরিক শাসক অতিষ্ঠ ছিল। এই চৌকস সেনানায়ক বঙ্গবীর ওসমানী তাদের চক্ষুশুলে পরিণত হন। বাঙালি সেনাদের স্বার্থ রক্ষার্থে অসম সাহসী ওসমানী নিজের পদোন্নতির তোয়াক্কা করেননি। ১৯৬৭ সালে ১৬ ফেব্রুয়ারি কর্ণেল পদে থাকা অবস্থায়ই ওসমানী পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। বিশেষ করে সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকাকালীন সময়ে ‘টাইগার ওসমানী’ ‘পাপা টাইগার’ বঙ্গশার্দুল ইত্যাদি নামে সুপরিচিত ছিলেন। তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভিতরে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট গড়ে তোলেন। তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে দুই থেকে ছয় ব্যাটালিয়ানে উন্নীতকরণ এবং সেনাবাহিনীতে বাঙালির সংখ্যা শতকরা ২ থেকে শতকরা ১০ ভাগে বৃদ্ধি করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে অধিকহারে বাঙালিদের নিয়োগের উজ্জল দৃষ্টান্ত রেখেছিলেন। কর্ণেল ওসমানী ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে জাতীয়তাবাদী চেতনায় গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজী নজরুল ইসলামের ‘চল চল চল’ গানটিকে বেঙ্গল রেজিমেন্টের মার্চ সঙ্গীত মনোনীত করে সরকারীভাবে অনুমোদন করিয়ে নেন। এছাড়া দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা’ ও বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙ্গা মাটির পথ’ গান দুইটির সুর পাকিস্তান সামরিক বাদ্যযন্ত্রে বাজানোর প্রচলন করেন।
বাঙালি জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘বঙ্গবীর ওসমানীর বীরত্বগাঁথা ও দেশপ্রেম এর কথা সম্যক অবগত ছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন দেশের অধিকার আদায়ে আমাদের জাতিকে সশস্ত্র সংগ্রাম করার প্রয়োজন হতে পারে। তাই তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে ওসমানীর সংগে যোগাযোগ করে তাঁকে দেশের স্বার্থে আওয়ামী লীগে যোগদানের জন্য অনুরোধ করেন। অতঃপর ওসমানী তাঁর বড় ভাই নূরুল গণি ওসমানীর অনুমতি নিয়ে ১৯৭০ সালে জুলাই মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে জয়ী হয়। আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বালাগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ ও বিশ্বনাথ এ-চার থানা নিয়ে গঠিত নির্বাচনী এলাকায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে সংসদ সদস্য (এমএসএ) নির্বাচিত হন। ১২ এপ্রিল ১৯৭১ প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রে ভাষণ দেন। ঐ ভাষণে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবকাঠামো গঠনের উল্লেখ করে এম. এ. জি ওসমানীকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি (সি.ইন.সি) হিসেবে ঘোষণা দেন। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার শপথ গ্রহণ করেন। ঐদিন গঠিত মুজিবনগর সরকারে ওসমানীকে করা হয় মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ। ওসমানীর নির্দেশনা অনুযায়ী সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। প্রতিটি সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে এক একজন সেনাবাহিনীর অফিসারকে নিয়োগ দেয়া হয়। বিভিন্ন সেক্টর ও বাহিনীর মাঝে সমন্বয়সাধন করা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে যোগাযোগ রাখা, অস্ত্রের যোগান নিশ্চিত করা, গেরিলা বাহিনীর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রভৃতি কাজ সাফল্যের সাথে পালন করেন ওসমানী। তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর প্রধান হিসেবে দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য তরুণের মত উদ্দাম গতিতে ছুটে বেড়িয়েছেন এক সেক্টর থেকে আরেক সেক্টরে, মুক্তিযুদ্ধের বিশাল রণাঙ্গণে। ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর মধ্যে সমন্বয় গঠনেও তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিসংগ্রামে ওসমানীর হাতে কোনও নৌবাহিনী ছিল না। নিয়মিত নৌবাহিনীর কিছু অফিসার যারা তাঁর সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতেন তাদেরকে নিয়ে এবং কিছু সংখ্যক গেরিলা যুবক নিয়ে একটি নৌ-কমান্ডো বাহিনী গঠন করেন। আগস্টের মাঝামাঝিতে তাঁরা নদীপথে শত্রু চলাচল প্রায় বন্ধ করে দেন। নৌবাহিনী গঠনের ফলে একটা বড় ধরনের সংকটের অবসান হলেও দেশ স্বাধীন হবার আগে আগে আরও একটা সংঙ্কট ওসমানী অনুভব করেন। সেটা হচ্ছে তাঁর হাতে কোনও বিমানবাহিনী ছিল না। শেষের দিকে দুটি হেলিকপ্টার, একটি অটার ও একটি ডাকোটা নিয়ে ছোট্ট একটি বিমানবাহিনী গঠন করেছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নিজ দক্ষতা ও কৌশল প্রয়োগ করে তিনি মুক্তিবাহিনীকে সুসংগঠিত করেন। তিনি দিকনির্দেশনা এবং অনুপ্রেরণা দান করে গেরিলা যোদ্ধাদের এবং প্রয়োজনে নিয়মিত পর্যবেক্ষণও করতেন। ফলে পাকিস্তানি বাহিনী পরাজিত হতে বাধ্য হয়। ওসমানীর এই বিশাল সাফল্যের কারণে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর তাঁকে কর্ণেল ওসমানী থেকে জেনারেল পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জেনারেল ওসমানীকে সবসময় ‘মাইডিয়ার বঙ্গবীর জেনারেল’ বলে সম্বোধন করতেন । জাতির ইতিহাসের মহিরুহ সদৃশ্য জেনারেল ওসমানী ছিলেন বহু বিরল গুণের অধিকারী। ওসমানীর ব্যক্তিত্ব, দেশপ্রেম, সততা, আদর্শ ও বিশ্বাসের প্রতি অবিচল আস্থা, ন্যায়পরায়ণতা, নির্লোভ, সময়নিষ্ট, স্পষ্টবাদিতার কারণে তিনি অমর হয়ে থাকবেন। কঠোর নীতিবোধ, রাজনৈতিক সততা ও পরমত সহিষ্ণুতার এক মূর্ত প্রতীক ছিলেন এই মহান যোদ্ধা। ব্যক্তিগত জীবনে ওসমানী ছিলেন সদালাপী ও অমায়িক। কিন্তু অন্যায়ের বিরোধিতা ও প্রতিবাদের ক্ষেত্রে ছিলেন অটল, অবিচল। আপন বিশ্বাসে অটল ছিলেন ধর্মানুরাগী ও ব্যক্তিত্বের অধিকারী ওসমানী। মিথ্যাচারিতাকে তিনি মনে প্রাণে ঘৃণা করতেন।

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বালাগঞ্জের বাতিঘর বাংলাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়
  • বঙ্গবন্ধু ও গান্ধীজী
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক ছিলেন ‘মেশিনম্যান’
  • একটি যুদ্ধ : একটি শতাব্দী
  • বালাগঞ্জের প্রাচীন জনপদ শিওরখাল গ্রাম
  • ভাটিপাড়া
  • সময়ের সোচ্চার স্বর সোমেন চন্দ
  • বঙ্গবন্ধুর সিলেট সফর ও কিছু কথা
  • বায়ান্নতেই লিখেছিলেন ‘ঢাকাই কারবালা’
  • জীবনের শেষক্ষণে অর্থ-স্বর্ণ সবই জড়পদার্থ
  • কমরেড বরুণ রায়
  • বঙ্গবন্ধু ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
  • নারী ভাষাসৈনিকদের কথা
  • মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবীর ওসমানী
  • ভাটির বাতিঘর সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ
  • মাওয়ের লংমার্চের ৪ বছর পর সিলেটিদের লং মার্চ
  • শহীদ মিনারের ইতিকথা
  • সিলেটের লোকসংগীত : ধামাইল
  • পর্যটক ইবনে বতুতার কথা
  • বই এল কোথা থেকে?
  • Image

    Developed by:Sparkle IT