ইতিহাস ও ঐতিহ্য

নারী ভাষাসৈনিকদের কথা

মোহাম্মদ ফয়জুর রহমান প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০২-২০২০ ইং ০০:০৬:৫৮ | সংবাদটি ১৬১ বার পঠিত

ভাষা আন্দোলনের সিঁড়ি বেয়ে এসেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের ভূমিকা ছিলো গৌরবজনক। নারী ভাষাসৈনিকদের কথা ভাষা আন্দোলন চর্চায় অবশ্যই উল্লেখযোগ্য।
তমদ্দুন মজলিস কর্তৃক ভাষা আন্দোলনের সূচনা থেকে নারীরাও ভাষা আন্দোলনের নেতা কর্মীদের সমর্থন ও সহযোগিতা করতেন ঘরোয়াভাবে। পঞ্চাশে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি’ গঠিত হওয়ার পর ভার্সিটির ছাত্রীরাও ভাষা আন্দোলনের জন্যে নিজেদের মাঝে সংগঠিত হতে থাকেন।
তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র একজন ছাত্রীর স্বাথে কথা বলতে হলে প্রক্টরের অনুমতি লাগতো। এমনিভাবে একজন ছাত্রী একজন ছাত্রের সাথে কথা বলতে হলে প্রক্টরের অনুমতি নিতে হতো। অনুমতি না নিয়ে কথা বললেই ছাত্র-ছাত্রী উভয়কে ১০ টাকা করে জরিমানা দিতে হতো। এমন রক্ষণশীল নিয়ম-নীতির কারণে ছাত্রদের সাথে ছাত্রীরা ভাষা আন্দোলনের মিটিং মিছিলে যোগদান করতে পারতেন না। তবে, বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি যখন ক্যাম্পাসে সভা করতেন তখন ভার্সিটির ছাত্রীরাও দলবদ্ধ হয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে বক্তব্য শুনতেন। সে সময় সমগ্র ঢাকা ভার্সিটিতে ছাত্রী সংখ্যা ছিলেন মাত্র ৮০ থেকে ৮৫ জন।
খ্যাতিমান নারী ভাষাসৈনিকরা হলেন, ড. শাফিয়া, ড. সুফিয়া আহমদ, শামসুন নাহার আহসান, রওশন আরা বাচ্চু, সারা তৈফুর মাহমুদ, মহুয়া নুরুন নাহার, ড. হালিমা খাতুন, খোরশেদা খানম, নাদেরা বেগম, রোকেয়া সুরাইয়া ডলি, সুরাইয়া হাকিম, বেবী, মন্তু, পুতুল, মনোয়ারা, আমিনা বেগম, কাজী খালেদা, নারায়ণগঞ্জ ইস্টার্ন হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা মমতাজ বেগম প্রমুখ।
নেত্রীস্থানীয় নারী ভাষাসৈনিকরা তখন প্রায় সবাই ছিলেন ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্রী। ড. সুফিয়া আহমদসহ মুষ্টিমেয় কয়েকজন বাদে সকলেই থাকতেন ভার্সিটির ছাত্রী হল ‘চামেরি হাউসে’। বর্তমান রোকেয়া হলের পাশেই ছিলো চামেরি হাউস।
ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্রীদের প্রধান নেতৃত্বে ছিলেন শাফিয়া। তিনি চামেরি হাউসে থাকতেন। শাফিয়া ১৯৫০-৫১ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা ইউনিভার্সিটি ওমেন স্টুডেন্ট ইউনিয়নের জিএস এবং ১৯৫১-৫২ শিক্ষাবর্ষে ভিপি ছিলেন। ৫২-তে এসে বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির ডাকে ভাষা আন্দোলন যখন দুর্দমনীয় রূপ ধারণ করে তখন শাফিয়াই ভাষা আন্দোলনের জন্যে ছাত্রীদের সংগঠিত করতেন এবং নেতৃত্ব দিতেন।
১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি সরকার পূর্ব বাংলা আইন পরিষদের বাজেট অধিবেশন আহ্বান করে। বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটিও এ দিন ঢাকা শহরে হরতালের ডাক দেয়। হরতাল সফল করতে অনবরত মিটিং-মিছিল করতে থাকে ছাত্ররা। ক্যাম্পাসে মিটিংয়ের সময় শাফিয়ার নেতৃত্বে ছাত্রীরাও সারিবদ্ধ হয়ে দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে বক্তব্য শ্রবণ করতেন। ছাত্ররা মিছিল নিয়ে বের হলে ছাত্রীরাও পেছনে পেছনে কার্জন হল পর্যন্ত গিয়ে হলে ফিরে যেতেন।
চামেরি হলের ছাত্রীরা ইডেন কলেজসহ ঢাকা শহরের বিভিন্ন গার্লস হাইস্কুলে গিয়ে ভাষা আন্দোলনের প্রতি ছাত্রীদের উদ্বুদ্ধ করতেন। চামেরি হলের ছাত্রীরা গভীর রাত পর্যন্ত জেগে বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির মিটিং মিছিলের পোস্টার প্ল্যাকার্ড লিখে দিতেন। পোস্টার প্ল্যাকার্ড লেখায় পারদর্শী ছিলেন মহুয়া নুরুন নাহার।
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংগ্রাম কমিটির ২১শে ফেব্রুয়ারি আইন পরিষদ ঘেরাওয়ের ঘোষণা ও তৎপরতা সরকারকে চিন্তিত করে তুলে। পূর্ব বাংলার নুরুল আমীন সরকার ১৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারির সিদ্ধান্ত নেয় এবং ২০ ফেব্রুয়ারি মাইকযোগে শহর ব্যাপী ঘোষণা করে। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংগ্রাম কমিটি ১৪৪ ধারা ভাঙতে ইস্পাত কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
আওয়ামী মুসলিম লীগের উদ্যোগে গঠিত সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্ম পরিষদ ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় জরুরি সভা করে। সভায় সামনে নির্বাচন বিলম্বিত না হওয়ার স্বার্থে ১৪৪ ধারা না ভাঙ্গার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পক্ষান্তরে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি’ ২১শে ফেব্রুয়ারি সকাল ১১ টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্র ছাত্রী জমায়েত আহ্বান করে। অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম কমিটির নেতৃস্থানীয় একটি গ্রুপ ২০ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে গোপন সভা করে ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার কর্ম কৌশল প্রণয়ন করেন।
অপরদিকে ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে ছাত্রীনেত্রী শাফিয়া চামেরী হাউসের ছাত্রীদের মধ্য থেকে অগ্রসর কয়েকজনকে বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ করে দেন যাতে তারা ভোরে ঢাকায় বিভিন্ন গার্লস স্কুল ও কলেজে গিয়ে ছাত্রীদের আমতলায় জমায়েতে হাজির করেন। রাতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সকাল বেলা রওশন আরা, সুফিয়া, হালিমা খাতুন, রোকেয়া, শামসুন নাহার প্রমুখ পায়ে হেঁটে ছুটে যান বাংলাবাজার গার্লস হাই স্কুল, আনন্দময়ী গার্লস হাই স্কুল, কামরুননেসা গার্লস হাই স্কুল, মুসলিম গার্লস হাই স্কুল ও ইডেন কলেজে। এ সকল গার্লস স্কুল ও কলেজে ছাত্রীদের দাওয়াত দিয়ে তারা আবার পায়ে হেঁটে প্রায় সাড়ে ১০ টার দিকে ফিরে আসেন ছাত্রীনিবাসে। তাদের আহ্বানে বিভিন্ন বালিকা বিদ্যালয়ের অনেক ছাত্রী এসে শরীক হন আমতলার সমাবেশে। ১১ টার দিকেই আমতলা কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় মাতৃভাষা প্রেমিক ছাত্র ছাত্রী ও অন্যান্যদের উপস্থিতিতে।
মূল সভা আরম্ভ হওয়ার পূর্বে আমতলায় ১৪৪ ধারা ভাঙ্গা না ভাঙ্গা নিয়েও কিছু বিতর্ক দেখা দেয়। যারা ১৪৪ ধারা ভাঙ্গতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ তাদের মধ্যে মিছিলের কৌশল নিয়েও মতপার্থক্য দেখা দেয়। কেউ কেউ ৪ জন ৪ জন করে মিছিল নিয়ে বের হওয়ার পরামর্শ দেন। যুক্তি দেখান, এতে মিছিলও হবে, ১৪৪ ধারা ভাঙ্গাও হবে না।
শাফিয়ার নেতৃত্বাধীন ভার্সিটির ছাত্রীরা ছিলেন ১৪৪ ধারা ভাঙ্গতে অটল-অবিচল। ৪ জন করে মিছিল নিয়ে বের হওয়ার যুক্তি শাফিয়ার পছন্দ হয়নি। তাই তিনি এ যুক্তির প্রতি নারাজি দিয়ে ভার্সিটির ছাত্রীদের নিয়ে কমন রুমে চলে যান। পরে আবদুস সামাদের (আবদুস সামাদ আজাদ) পরামর্শে ১০ জন ১০ জন করে মিছিল নিয়ে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। গৃহীত সিদ্ধান্তটি শাফিয়াকে জানিয়ে ফিরে আসার অনুরোধ করা হয়। শাফিয়া ছাত্র-ছাত্রী ঐক্যের স্বার্থে দলবল নিয়ে আমতলায় ফিরে আসেন।
দুপুর প্রায় ১২ টার সময় আনুষ্ঠানিক সভার কাজ শুরু হয়। আমতলায় ছোট একটি টেবিল ও একটি টিনের চেয়ার বসানো হয়। গত রাতের গোপন বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এম.আর. আক্তার মুকুলের প্রস্তাবে আবু নছর মোহাম্মদ গাজীউল হক সভাপতির আসন গ্রহণ করেন। প্রথম বক্তা আওয়ামী মুসলিম লীগের সেক্রেটারি শামসুল হক ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার পক্ষে বক্তব্য দেন। দ্বিতীয় এবং শেষ বক্তা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক আবদুল মতিন ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার পক্ষে যুক্তিপূর্ণ বক্তৃতা করেন। তার বক্তব্যকে করতালি দিয়ে উপস্থিত ছাত্র-ছাত্রী সমর্থন জানান। এর পরই সভাপতি গাজীউল হক ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন।
এ ঘোষণার পর পরই ১০ জন ১০ জন করে মিছিল পাঠানোর জন্যে মোহাম্মদ সুলতান ভার্সিটি গেইটে চলে যান। কিন্তু পুলিশ হাতের লাঠি দ্বারা গেইট কর্ডন দিয়ে রেখেছে। সরকার সকাল ৮টা থেকে সমগ্র ভার্সিটি এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করেছে। ঢাকা শহর ব্যাপী পুলিশ টহলও দিচ্ছে। এমন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছাত্রদের ১০ জনের প্রথম গ্রুপ মিছিল নিয়ে রাস্তায় বের হয়। সাথে সাথে পুলিশ তাদেরকে গ্রেফতার করে ভ্যানে তুলে নিয়ে যায়। ছাত্রদের দ্বিতীয় ১০ জনের গ্রুপকেও পুলিশ অ্যারেস্ট করে তুলে নেয়।
সুলতান এবার ছাত্রীদের গ্রুপ পাঠান। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগান তুলে শাফিয়ার নেতৃত্বে হালিমা খাতুনসহ ছাত্রীদের ১০ জনের ১টি গ্রুপ পুলিশের লাঠির বেস্টনী ভেঙ্গে মিছিল নিয়ে রাজপথে বের হয়। ছাত্রী দেখে ঢাকা সিটি এসপি মাসুদ মাহমুদ ‘ছোড় দাও’ বলে, তাই পুলিশ তাদেরকে গ্রেফতার করেনি। শাফিয়ার নেতৃত্বাধীন গ্রুপই সাফল্যের সাথে মিছিল করে ১৪৪ ধারা ভাঙ্গে। ২১শে ফেব্রুয়ারি সরকার ঘোষিত ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার কৃতিত্ব ছাত্রীদের তথা নারীর।
পুলিশ ছাত্রদের ছাড় দিচ্ছে দেখে মোহাম্মদ সুলতান চতুর্থ গ্রুপ হিসেবেও মিছিলে ছাত্রীদের পাঠান। ‘সুফিয়া শামসুন নাহার, সারা তাইফুরসহ ১০ জন ছাত্রী’ ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগান তুলে পুলিশের লাঠির কর্ডন ভেঙ্গে মিছিল নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন। তাদের পেছনে আরো বেহিসাব ছাত্রী এবং ছাত্রীদের পেছনে বাধভাঙ্গা স্রোতের মতো ছাত্ররাও মিছিলে যোগ দেন।
কে ছাত্রী কে ছাত্রী নয় সে ভেদ বিচার না করে পুলিশ এবার লাঠি চার্জ করে মিছিলে। পুলিশের লাঠির আঘাতে রওশন আরা হুমড়ি খেয়ে পড়েন পিচঢালা রাস্তায়। আমতলার কাছেই ছিলো মেডিকেল কলেজ ও হোস্টেল। মেডিকেলের ভবন নির্মাণের জন্যে মেডিকেল হোস্টেলের সম্মুখে ছিলো ইট-পাথর-বালু। ছাত্ররা আমতলা ছেড়ে দৌড়ে চলে যান মেডিকেল হোস্টেলের সম্মুখে। আর ইট ভেঙ্গে শিলা বর্ষণের মতো ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকেন পুলিশের ওপর। পুলিশের সাথে ভাষা সৈনিক ছাত্রদের লড়াই বেধে যায়। পুলিশ এবার টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে ছাত্রদের ছত্রভঙ্গ করতে থাকে। কাঁদানে গ্যাসের ঝাঝে এক দল পিছু হটে, অপর দল ছুটে এসে পুলিশের ওপর ইট-পাটকেল ছুড়তে থাকে। ছাত্র-পুলিশ লড়াইয়ে-লড়াইয়ে প্রায় ৩টা বেজে যায়।
পুলিশের লাঠির আঘাত ও কাঁদানে গ্যাস থেকে বাঁচতে গিয়ে ছাত্রীরা এদিক ওদিক ছুটতে থাকেন। পাশে ছিলো কাঁটা তারের বাউন্ডারি ঘেরা প্রফেসর ডক্টর ওসমান গণির বাসভবন। সুফিয়া, সারা তাইফুর, শামসুন নাহার, সুরাইয়া, ডলি কাঁটা তারের বেড়া ফাঁক করে গিয়ে ড. গণির বাসভবনের বারান্দায় আশ্রয় নেন।
বর্তমান শহীদ মিনারের নিকটে ড. গণির বাসভবনের কাঁটা তারের বেড়ার লাগোয়া এক স্থানে ভাঙ্গা রিকশার স্তুপ ছিলো। রওশন আরা আত্মরক্ষার জন্যে সেই ভাঙ্গা রিকশার স্তুপের আড়ালে গিয়ে লুকান। কিন্তু স্থানটি নিরাপদ মনে না হওয়ায় রওশন আরা ড. গণির বাসার সামনে চলে যেতে মনস্থির করেন এবং কাঁটাতারের বেড়া পাড়ি দিতে ভাঙ্গা রিকশার স্তুপের উপর ওঠে লাফ দেন। কিন্তু আক্ষেপ। কাঁটাতারে তার শাড়ি বিধে যায়। হৃদয়বান কে একজন দ্রুত এসে তার শাড়ি ছুটিয়ে দেন। রওশন আরা ড. গণির বাসভবনের বারান্দায় গিয়ে সুফিয়াদের সাথে মিলিত হন। বাসার ভেতরে যাওয়ার আহ্বান আসলেও কেউ ভেতরে যাননি। অবশ্য চেয়ে পানি আনিয়ে পান করেছেন সবাই। কিছুক্ষণ পর মেডিকেলে গিয়ে ফাস্ট এইড নিয়ে গলি পথ দিয়ে ছাত্রী নিবাস চামেরী হাউসে চলে যান।
উদ্ভূত যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন স্কুল থেকে আসা ছাত্রীরা আমতলায় আটকা পড়ে যায়। পুলিশ এসে ভীতসন্ত্রস্ত এসব ছাত্রীদের ট্রাকে তুলে নরসিংদী নিয়ে ছেড়ে দেয়। পরে এ ছাত্রীরা পায়ে হেঁটে এসে নিজ নিজ বাসায় পৌঁছেন।
ছাত্রীরা আত্মরক্ষায় নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে পারলেও ক্যাম্পাস এলাকায় লড়াই থামেনি। ছাত্ররা টিয়ার গ্যাসের ঝাঁঝ মেটাতে দৌড়ে পুকুরে গিয়ে চোখ ধোঁয়ে আবার ছুটে এসে পুলিশের ওপর ইট-পাটকেলের ঝড় বসায়। এতে একের পর এক পুলিশও আহত হতে থাকে। টিয়ার শেলের আক্রমণও অকার্যকর হওয়ায় ঢাকার ডিসি কোরাইশী গুলির নির্দেশ দেন। গুলির নির্দেশ পেয়ে পুলিশ নির্বিচারে পর পর গুলি ছোঁড়ে। পুলিশের গুলিতে ঘটনাস্থলেই শহীদ হন রফিক। সালাম, জব্বার, বরকত গুলিবিদ্ধ হন। তাদের ধরাধরি করে মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়। একুশের রাতেই শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন জব্বার ও বরকত। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি নবাবপুর রোডে শহীদ হন শফিউর। সালাম কয়েক দিন বেঁচে থেকে ৭ এপ্রিল ভাষা শহীদদের কাতারে চলে যান।
২১শে ফেব্রুয়ারি বিকাল ৩ টায় সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। সংসদ চলাকালে সাড়ে ৩ টার দিকে আন্দোলনরত ভাষা সৈনিকদের ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। গুলিবর্ষণের খবরটি সংসদেও পৌঁছে যায়। তখন ভবন ছিলো বর্তমান জগন্নাথ হল এলাকায়। সংসদ সদস্য মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ সংসদ মূলতবি করে গুলিবর্ষণের ঘটনার তদন্তের প্রস্তাব করেন। সংসদ সদস্য আনোয়ারা খাতুনও জোরালো ভাষায় সংসদ মূলতবির প্রস্তাব করেন। স্পীকার আবদুল করিম কারো প্রস্তাবের প্রতি কর্ণপাত করেননি। ফলে মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশের নেতৃত্বে আনোয়ারা খাতুনসহ ৩৫ জন সংসদ সদস্য ওয়াক আউট করেন। সবাই মেডিকেলে গিয়ে আহত নিহতদের তদন্ত করেন। আনোয়ারা খাতুন চামেরী হাউসে গিয়ে ছাত্রীদেরও খবরা খবর নেন।
ভাষা আন্দোলন করায় কোনো কোনো নারীর জীবন বিষাদময় হয়ে ওঠে। নারায়ণগঞ্জের মর্গান হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষিকা মমতাজ বেগম ছাত্র-ছাত্রী ও নারীদের সংগঠিত করে মিটিং-মিছিল করায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। মুসলেখা দিয়ে মুক্তির প্রস্তাব আসলে তিনি মুসলেকা দিতে অস্বীকার করেন। ফলে তার স্বামী তাকে তালাক দেন। মমতাজ বেগমের সংসার ভেঙ্গে দু’টুকরো হয়ে যায়।
একুশের শহীদদের জীবনদানের ফলে রাজনৈতিকভাবে মুসলিম লীগের ভরাডুবি হয় পূর্ব পাকিস্তানে এবং বাঙালিদের উত্থান ঘটে। বাঙালিদের এ উত্থানের ফলশ্রুতিতেই ১৯৫৬ সালে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়া হয় সাংবিধানিকভাবে। এখানেই শেষ নয়। একুশের পথ ধরেই একাত্তরে বাঙালিরা মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন।
একুশের চেতনা বাঙালির অধিকার আদায়ের চেতনা। একুশের চেতনা বাঙালির ঐক্যের চেতনা। একুশের চেতনা সৃষ্টিতে বাঙালি পুরুষের পাশাপাশি বাঙালি নারীরাও ছিলেন। মহান ভাষা আন্দোলনে বাঙালি নারীদের অবদান অন্দরে, রাজপথে, সংসদে জাজ্জ্বল্যমান।

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বালাগঞ্জের বাতিঘর বাংলাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়
  • বঙ্গবন্ধু ও গান্ধীজী
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক ছিলেন ‘মেশিনম্যান’
  • একটি যুদ্ধ : একটি শতাব্দী
  • বালাগঞ্জের প্রাচীন জনপদ শিওরখাল গ্রাম
  • ভাটিপাড়া
  • সময়ের সোচ্চার স্বর সোমেন চন্দ
  • বঙ্গবন্ধুর সিলেট সফর ও কিছু কথা
  • বায়ান্নতেই লিখেছিলেন ‘ঢাকাই কারবালা’
  • জীবনের শেষক্ষণে অর্থ-স্বর্ণ সবই জড়পদার্থ
  • কমরেড বরুণ রায়
  • বঙ্গবন্ধু ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
  • নারী ভাষাসৈনিকদের কথা
  • মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবীর ওসমানী
  • ভাটির বাতিঘর সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ
  • মাওয়ের লংমার্চের ৪ বছর পর সিলেটিদের লং মার্চ
  • শহীদ মিনারের ইতিকথা
  • সিলেটের লোকসংগীত : ধামাইল
  • পর্যটক ইবনে বতুতার কথা
  • বই এল কোথা থেকে?
  • Developed by: Sparkle IT