তফসীরে মাযহারীতে বর্ণিত আছে : এ আয়াতের দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, এ সম্প্রদায়ের যেসব ক্রিয়াকর্ম সর্বসম্মত, তা আল্লাহর কাছে প্রশংসনীয় ও গ্রহণীয়। কারণ, যদি মনে করা হয় যে, তারা ভ্রান্ত বিষয়ে একমত হয়েছে, তবে তাদের নির্ভরযোগ্য সম্প্রদায় বলার কোন অর্থ থাকে না।
ইমাম জাস্সাস বলেন : এই আয়াতের দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, প্রত্যেক যুগের মুসলমানদের ইজমাই আল্লাহর কাছে গ্রহণীয়। ‘ইজমা শরীয়তের দলীল’-এ কথাটি প্রথম শতাব্দী অথবা বিশেষ কোন যুগের সাথে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত নয়। কারণ, আয়াতে সমগ্র সম্প্রদায়কেই সম্বোধন করা হয়েছে। যারা আয়াত নাযিলের সময়ে বিদ্যমান ছিলেন, তারাই শুধু মুসলিম সম্প্রদায় নন; বরং কিয়ামত পর্যন্ত যত মুসলমান আসবে, তারা সবাই মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত। সুতরাং প্রতি যুগের মুসলমানই 'আল্লাহর সাক্ষ্যদাতা'। তাদের উক্তি দলীল। তারা কোন ভুল বিষয়ে একমত হতে পারে না।
কা’বা শরীফ সর্বপ্রথম কখন নামাযের কেবলা হয় : হিজরতের পূর্বে মক্কা মোকাররমায় যখন নামায ফরয হয়, তখন কা'বা গৃহই নামাযের জন্যে কেবলা ছিল, না বায়তুল মোকাদ্দস ছিল-এ প্রশ্নে সাহাবী ও তাবেয়িগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন : ইসলামের শুরু থেকেই কেবলা ছিল বায়তুল মোকাদ্দাস। হিজরতের পরও ষোল/সতের মাস পর্যন্ত বায়তুল-মোকাদ্দাসই কেবলা ছিল। এরপর কাবাকে কেবলা করার নির্দেশ আসে। তবে রসূলুল্লাহ (সা.) মক্কায় অবস্থানকালে হাজরে আসওয়াদ ও রোকনে ইয়ামানীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে নামায পড়তেন যাতে কা'বা ও বায়তুল-মোকাদ্দাস উভয়টিই সামনে থাকে। মদীনায় পৌঁছার পর এরূপ করা সম্ভবপর ছিল না। তাই তার মনে কেবলা পরিবর্তনের বাসনা দানা বাঁধতে থাকে। (ইবনে কাসীর)
অন্যান্য সাহাবী ও তাবেয়িগণ বলেন : মক্কায় নামায ফরয হওয়ার সময় কা'বা গৃহই ছিল মুসলমানদের প্রাথমিক কেবলা। কেননা, হযরত ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আ.)-এর কেবলাও তাই ছিল। মহানবী (সা.) মক্কায় অবস্থানকালে কাবাগৃহের দিকে মুখ করেই নামায পড়তেন। মদীনায় হিজরতের পর তার কেবলা বায়তুল মোকাদ্দাস সাব্যস্ত হয়। তিনি মদীনায় ষোল/সতের মাস পর্যন্ত বায়তুল মোকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায পড়েন। এরপর প্রথম কেবলা অর্থাৎ, কাবাগৃহের দিকে মুখ করার নির্দেশ অবতীর্ণ হয়। বনু সালমার মুসলমানরা যোহর অথবা আসরের নামায থেকেই কেবলা পরিবর্তনের নির্দেশ কার্যকর করে নেন। কিন্তু কেবার মসজিদে এ সংবাদ পরদিন ফজরের নামাযে পৌছালে তারাও নামাযের মধ্যেই বায়তুল মোকাদ্দাসের দিক থেকে কা'বার দিকে মুখ করে নেন। (ইবনে কাসীর, জাসসাস)
এখানে ‘ঈমান’ শব্দ দ্বারা ঈমানের প্রচলিত অর্থ নেয়া হলে আয়াতের মর্ম হবে এই যে, কেবলা পরিবর্তনের ফলে নির্বোধেরা মনে করতে থাকে যে, এরা ধর্ম ত্যাগ করেছে কিংবা এদের ঈমান নষ্ট হয়ে গেছে। উত্তরে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের ঈমান নষ্ট করবেন না। কাজেই তোমরা নির্বোধদের কথায় কর্ণপাত করো না। কোন কোন হাদীসে এবং মনীষীদের উক্তিতে এখানে ঈমানের অর্থ করা হয়েছে নামায। মর্মার্থ এই যে, সাবেক কেবলা বায়তুল মোকাদ্দাসের দিকে মুখ করে যেসব নামায পড়া হয়েছে, আল্লাহ তাআলা সেগুলো নষ্ট করবেন না; বরং তা শুদ্ধ ও মকবুল হয়েছে। [চলবে]

'/> SylheterDak.com.bd
ধর্ম ও জীবন

তাফসিরুল কুরআন

প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-০২-২০২০ ইং ০০:০৩:৫৬ | সংবাদটি ২১৮ বার পঠিত
Image


মূল : মুফতি মুহাম্মদ শফী
অনুবাদ : মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
সূরা : বাক্বারাহ [পূর্ব প্রকাশের পর]
সাক্ষ্যদানের জন্যে ন্যায়ানুগ হওয়া শর্ত : মুসলিম সম্প্রদায়কে ভারসাম্যপূর্ণ তথা ন্যায়ানুগ করা হয়েছে যাতে তারা সাক্ষ্যদানের যোগ্য হয়। এতে বুঝা যায়, যে ব্যক্তি আদেল বা ন্যায়ানুগ নয়, সে সাক্ষ্যদানেরও যোগ্য নয়। আদেলের অর্থ সাধারণতঃ নির্ভরযোগ্য করা হয়। এর সম্পূর্ণ শর্ত ফেকাহ গ্রন্থসমূহে উল্লেখিত রয়েছে।
ইজমা শরীয়তের দলীল : ইমাম কুরতুবী বলেন, ইজমা (মুসলিম ঐকমত্য) যে শরীয়তের একটি দলীল, আলোচ্য আয়াতটি তার প্রমাণ। কারণ, আল্লাহু তা'আলা এ সম্প্রদায়কে সাক্ষ্যদাতা সাব্যস্ত করে আপরাপর সম্প্রদায়ের বিপক্ষে তাদের বক্তব্যকে দলীল করে দিয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় যে, এ সম্প্রদায়ের ইজমা বা ঐকমত্যও একটি দলীল এবং তা পালন করা ওয়াজিব। সাহাবীগণের ইজমা তাবেয়িগণের জন্যে এবং তাবেয়িগণের ইজমা তাদের পরবর্তীদের জন্যে দলীল স্বরূপ।
তফসীরে মাযহারীতে বর্ণিত আছে : এ আয়াতের দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, এ সম্প্রদায়ের যেসব ক্রিয়াকর্ম সর্বসম্মত, তা আল্লাহর কাছে প্রশংসনীয় ও গ্রহণীয়। কারণ, যদি মনে করা হয় যে, তারা ভ্রান্ত বিষয়ে একমত হয়েছে, তবে তাদের নির্ভরযোগ্য সম্প্রদায় বলার কোন অর্থ থাকে না।
ইমাম জাস্সাস বলেন : এই আয়াতের দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, প্রত্যেক যুগের মুসলমানদের ইজমাই আল্লাহর কাছে গ্রহণীয়। ‘ইজমা শরীয়তের দলীল’-এ কথাটি প্রথম শতাব্দী অথবা বিশেষ কোন যুগের সাথে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত নয়। কারণ, আয়াতে সমগ্র সম্প্রদায়কেই সম্বোধন করা হয়েছে। যারা আয়াত নাযিলের সময়ে বিদ্যমান ছিলেন, তারাই শুধু মুসলিম সম্প্রদায় নন; বরং কিয়ামত পর্যন্ত যত মুসলমান আসবে, তারা সবাই মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত। সুতরাং প্রতি যুগের মুসলমানই 'আল্লাহর সাক্ষ্যদাতা'। তাদের উক্তি দলীল। তারা কোন ভুল বিষয়ে একমত হতে পারে না।
কা’বা শরীফ সর্বপ্রথম কখন নামাযের কেবলা হয় : হিজরতের পূর্বে মক্কা মোকাররমায় যখন নামায ফরয হয়, তখন কা'বা গৃহই নামাযের জন্যে কেবলা ছিল, না বায়তুল মোকাদ্দস ছিল-এ প্রশ্নে সাহাবী ও তাবেয়িগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন : ইসলামের শুরু থেকেই কেবলা ছিল বায়তুল মোকাদ্দাস। হিজরতের পরও ষোল/সতের মাস পর্যন্ত বায়তুল-মোকাদ্দাসই কেবলা ছিল। এরপর কাবাকে কেবলা করার নির্দেশ আসে। তবে রসূলুল্লাহ (সা.) মক্কায় অবস্থানকালে হাজরে আসওয়াদ ও রোকনে ইয়ামানীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে নামায পড়তেন যাতে কা'বা ও বায়তুল-মোকাদ্দাস উভয়টিই সামনে থাকে। মদীনায় পৌঁছার পর এরূপ করা সম্ভবপর ছিল না। তাই তার মনে কেবলা পরিবর্তনের বাসনা দানা বাঁধতে থাকে। (ইবনে কাসীর)
অন্যান্য সাহাবী ও তাবেয়িগণ বলেন : মক্কায় নামায ফরয হওয়ার সময় কা'বা গৃহই ছিল মুসলমানদের প্রাথমিক কেবলা। কেননা, হযরত ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আ.)-এর কেবলাও তাই ছিল। মহানবী (সা.) মক্কায় অবস্থানকালে কাবাগৃহের দিকে মুখ করেই নামায পড়তেন। মদীনায় হিজরতের পর তার কেবলা বায়তুল মোকাদ্দাস সাব্যস্ত হয়। তিনি মদীনায় ষোল/সতের মাস পর্যন্ত বায়তুল মোকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায পড়েন। এরপর প্রথম কেবলা অর্থাৎ, কাবাগৃহের দিকে মুখ করার নির্দেশ অবতীর্ণ হয়। বনু সালমার মুসলমানরা যোহর অথবা আসরের নামায থেকেই কেবলা পরিবর্তনের নির্দেশ কার্যকর করে নেন। কিন্তু কেবার মসজিদে এ সংবাদ পরদিন ফজরের নামাযে পৌছালে তারাও নামাযের মধ্যেই বায়তুল মোকাদ্দাসের দিক থেকে কা'বার দিকে মুখ করে নেন। (ইবনে কাসীর, জাসসাস)
এখানে ‘ঈমান’ শব্দ দ্বারা ঈমানের প্রচলিত অর্থ নেয়া হলে আয়াতের মর্ম হবে এই যে, কেবলা পরিবর্তনের ফলে নির্বোধেরা মনে করতে থাকে যে, এরা ধর্ম ত্যাগ করেছে কিংবা এদের ঈমান নষ্ট হয়ে গেছে। উত্তরে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের ঈমান নষ্ট করবেন না। কাজেই তোমরা নির্বোধদের কথায় কর্ণপাত করো না। কোন কোন হাদীসে এবং মনীষীদের উক্তিতে এখানে ঈমানের অর্থ করা হয়েছে নামায। মর্মার্থ এই যে, সাবেক কেবলা বায়তুল মোকাদ্দাসের দিকে মুখ করে যেসব নামায পড়া হয়েছে, আল্লাহ তাআলা সেগুলো নষ্ট করবেন না; বরং তা শুদ্ধ ও মকবুল হয়েছে। [চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT