ধর্ম ও জীবন

গীবত হারাম হওয়ার রহস্য

আখতার হোসাইন প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-০২-২০২০ ইং ০০:০৭:৫২ | সংবাদটি ৬৫৩ বার পঠিত
Image

শৃংখলাই শৃংখল মুক্তির একমাত্র পথ। শৃংখলা সর্বপ্রকার অশান্তি থেকে নাজাত দেয়। আর নাজাতের জন্যই আল্লাহ তা’য়ালা ধর্মীয় অনুশাসনগুলো আমাদের দিয়েছেন। কারণ, তিনি চান মানব সমাজ সুখ-শান্তি, সংহতি আর আনন্দ লোকের প্রাণ-চাঞ্চল্যে সুশৃংখলভাবে জীবন-যাপন করুক। যেন তারা চিরস্থায়ী আনন্দলোকে পুনরায় ফিরে আসতে পারে। কিন্তু জীবন বিধানের অনুশাসনগুলো অনুসরণ না করার কারণে এত সুখ-শান্তি সব ম্লান হয়ে গেছে। এ অনুশাসনগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হল ‘গীবত’। আর গীবত হল-কোন ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার এমন দোষ-ত্রুটি সমালোচনা করা যা শুনলে সে মনে কষ্ট পায় (সহীহ মুসলিম)। এ কষ্ট পাওয়া থেকেই শুরু হয় সকল অশান্তি। যার কারণে পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তা মুসলিম ভাইয়ের গীবত করাকে হারাম ঘোষণা করেছেন (সূরা হুজুরাত-১২)। গীবত ভয়াবহ একটি জীবাণুর মত জীবন নাশক। হযরত আয়শা সিদ্দিকা রাদিআল্লাহু তা’য়ালা আনহা বলেন: আমি বললাম সুফিয়া এমন বেঁটে যে,এ দোষই তার জন্য যথেষ্ট। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেন: হে আয়শা তুমি এমন একটি কথা বললে, যদি তোমার এ কথাটি সমুদ্রে ফেলে দেয়া হয় তবে সমস্ত সমুদ্রের পানিকে তা বিষাক্ত করে দিবে (সুনানে আবু দাউদ)। পবিত্র জীবন-বিধানে এসেছে, যারা পশ্চাতে ও সম্মুখে অপরের দোষ চর্চা করে বেড়ায়, সৃষ্টিকর্তা তাদের জন্য জাহান্নামে চিরস্থায়ী শাস্তির ব্যবস্থা করে রেখেছেন (সূরা হুমাযাহ-১)।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন: আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে নিকৃষ্টতম লোক হলেন তারা, যারা পরোক্ষ নিন্দা করে, বন্ধুদের মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করে এবং নিরপরাধ লোকদের দোষ খুঁজে বেড়ায় (মিশকাত)। তিনি আরো বলেন: তোমরা অপরের গীবত করোনা, তাদের দোষ অনুসন্ধান করোনা। জেনে রাখ! যে ব্যক্তি অপরের দোষ অনুসন্ধান করে, স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা তার দোষ অনুসন্ধান করেন। আর সৃষ্টিকর্তা যার দোষ অনুসন্ধান করেন তাকে স্বগৃহেও লাঞ্চিত করে দেন (সহীহ মুসলিম)। তিনি আরো বলেন: তোমরা একে অন্যের এমন সব দোষ-ত্রুটি দেখা ও বলা থেকে বিরত থাক যা তোমার মধ্যেও আছে (মিশকাত)।
গীবত হারাম করার রহস্য হল-কারো উপস্থিতিতে তার দোষ-ত্রুটি প্রকাশ করলে প্রতিরোধের আশংকা থাকে। এ কারণে সামনা সামনি দোষ-ত্রুটি বলা খুব কম হয়ে থাকে। ফলে গোনাহও কম হয়। পক্ষান্তরে কারো অনুপস্থিতিতে গীবত করলে এর কোন প্রতিরোধকারী থাকেনা। তাই নীচ থেকে নীচতর ব্যক্তি কোন উচ্চতর ব্যক্তির গীবত অনায়াসে করতে পারে। কোন প্রতিরোধ না থাকার কারণে এ ঝগড়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়। এতে মানুষ লিপ্তও হয় বেশি। ফলে গোনাহও হয় বেশী (হুমাযাহ-১, মা’রিফুল কুরআন)। মানুষ যাতে সুশৃঙ্খলভাবে, সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারে সেজন্যে গীবত করাকে মৃত মুসলিম ভাইয়ের মাংস ভক্ষণের সমতুল্য অপরাধ প্রকাশ করে। পবিত্র জীবন বিধানে এর নীচতা-হীনতা এবং নিষিদ্ধতা চরম ঘৃণার সাথে তুলে ধরা হয়েছে (সূরা হুজুরাত-১২)। আসলে অযোগ্য, অদূরদর্শী, অজ্ঞ, দুর্বল ও অসচেতন লোকেরাই মানুষের দোষ-ত্রুটি খোঁজে। ইসলামের শুরুতে এরকমই একটি ঘটনা পাওয়া যায়। যাতে গীবতের পরিণতি ও সকল মানুষের মর্যাদা তুলে ধরা হয়েছে।
মক্কা বিজয়ের সময় যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত হাবশি বেলাল রাদিআল্লাহু আনহুকে মুয়াজ্জিন নিযুক্ত করেন, তখন মক্কার অমুসলিম কুরাইশদের একজন বলে উঠল, আল্লাহকে ধন্যবাদ যে, আমার পিতা এ কুদিন দেখার আগেই মারা গেছেন। হারিস ইবনে হিশাম বলল, মুহাম্মাদ মসজিদে হারামে আযান দেয়ার জন্য এক কালো কাক ছাড়া অন্য কোন মানুষ পেলনা? আবু সুফিয়ান বলল, আমি কিছু বলবনা, কারণ আমার আশংকা হয় যে, কিছু বললে আকাশের মালিক মুহাম্মাদের কাছে তা পৌঁছে দিবেন। এ সব কথা বার্তার পরিপ্রেক্ষিতে হযরত জিব্রাইল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সব জানিয়ে দিলেন। নবীজীর কাছে তারা এসব স্বীকারও করল। তখন নবীজী বললেন : জেনে রাখ! গর্ব ও ইজ্জতের বিষয় প্রকৃতপক্ষে ঈমান ও তাক্বওয়া। যা বেলালের মধ্যে আছে তোমাদের মধ্যে নেই। তাই বেলাল তোমাদের চেয়ে উত্তম এবং সম্ভ্রান্ত (তাফসিরে মাযহারী)।
হযরত ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু বলেন : দুনিয়ার মানুষের কাছে ইজ্জত হল ধন-সম্পদের নাম আর মহান আল্লাহর কাছে ইজ্জত হল, সকল অন্যায় থেকে বেঁচে থাকার নাম (মা’রিফুল কুরআন)। পবিত্র কুরআনে এসেছে: যে ভালো কাজে সাহায্য করবে সে উপকৃত হবে। আর যে মন্দ কাজে সাহায্য করবে সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কেননা সৃষ্টিকর্তা সবই দেখছেন (সূরা নিসা-৮৫)। ধর্মের অনুশাসন নিয়ে আর কোন বাড়াবাড়ি বা জোর জবরদস্তি নেই। ইসলামই যে আলোর পথ তা এখন সুস্পষ্ট (সূরা বাকারা-২৫৬)। হযরত কাতাদাহ থেকে বর্ণিত। কিয়ামতের দিন লেখা-পড়া না জানা ব্যক্তিও তার আমলনামা পড়ে ফেলবে। আল্লামা ইস্পাহানী হযরত আবু উমামার একটি রেওয়ায়েতে বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: কিয়ামতের দিন মানুষের হাতে যখন আমলনামা দেয়া হবে, তখন কতক লোক বলবে, হে আল্লাহ! আমার অমুক অমুক সৎকর্ম আজ কোথায়? আল্লাহ তা’য়ালা তখন জবাব দিবেন: তোমাদের গীবত তোমাদের সৎকর্মকে ডিলেট বা মুছে দিয়েছে (সূরা বানি ঈসরাইল-১৩, তাফসিরে মাযহারী, তারগীব ও তারহীব)। হযরত মাইমুন রাদিআল্লাহু আনহু বলেন: একদিন আমি স্বপ্নে দেখলাম জনৈক সঙ্গী ব্যক্তির মৃত দেহ পড়ে আছে এবং এক ব্যক্তি আমাকে বলছে একে ভক্ষণ কর। আমি তখন বললাম কেন ভক্ষণ করব? সে বলল, তুমি অমুক ব্যক্তির সঙ্গী গোলামের গীবত করছো। আমি বললাম আল্লাহর কসম আমি তো তার সম্পর্কে কখনো ভাল-মন্দ বলিনি। সে বললো হ্যাঁ একথা ঠিক, তবে তুমি তার গীবত শুনেছো এবং এতে তুমি সম্মত রয়েছিলে। এ ঘটনার পর থেকে হযরত মাইমুন রাদিআল্লাহু আনহু কখনো কারো গীবত করেননি এবং তাঁর মজলিসে কারো গীবত করতে দেননি (তাফসিরে মা’রিফুল কুরআন)।
হযরত আবু সাঈদ ও জাবির রাদিআল্লাহু আনহু এর বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : গীবত ব্যভিচারের চেয়েও জঘন্য একটি অপরাধ। সাহাবায়ে কিরাম রিদওয়ানুল্লাহি তা’য়ালা আলাইহিম জিঙ্ঘাসা করলেন, এটা কিরূপে? তিনি উত্তর দিলেন : এক ব্যক্তি ব্যভিচার করার পর তাওবাহ করলে এ গুনাহ মাফ হয়ে যায়। কিন্তু গীবত করার পর তাওবাহ করলে এ গুনাহ মাফ হয়না যতক্ষণ না যার গীবত করা হয়েছে সে ক্ষমা করে না দেয়। এ কারণে গীবত ব্যভিচারের চেয়েও মারাত্মক (বায়হাকী)
গীবাতের হুকুম : পারস্পরিক ভালবাসা এবং সামাজিক সুশৃংখল বজায় রাখার জন্য পবিত্র জীবন বিধানে তিনটি জিনিষ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তা হল-(১) কোন মুসলমানকে ঠাট্টা ও উপহাস করা। (২) কাউকে দোষারূপ করা। (৩) কাউকে অপমান করা। ধর্মের নিয়ম হল-যে পুরুষ অপর পুরুষকে নিয়ে উপহাস করে, সে আল্লাহর কাছে উপহাসকারী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হতে পারে, কেননা সে জানেনা যে, সম্ভবত এই ব্যক্তি তার সততা, আন্তরিকতা ইত্যাদির কারণে আল্লাহর কাছে তার চেয়ে উত্তম ও শ্রেষ্ঠ (মা’রিফুল কুরআন)। তাই কোন ব্যক্তির বাহ্যিক অবস্থা দেখে তাকে নিশ্চিত রূপে ভাল অথবা মন্দ বলে দেয়া জায়েজ নয়। বরং নিয়ম হল-যে ব্যক্তিকে মন্দ অবস্থা ও কুকর্মে লিপ্ত দেখ,তার এ অবস্থাকে মন্দ মনে কর কিন্তু তাকে হেয় ও লাঞ্ছিত করার অনুমতি শরীয়াতে নেই। কারণ-আমরা যার বাহ্যিক কাজ-কর্মকে খুব ভাল মনে করছি, সে আল্লাহর কাছে নিন্দনীয় হতে পারে। আবার যার বাহ্যিক কাজ-কর্ম ও অবস্থা মন্দ, তার অভ্যন্তরীণ অবস্থা ও অন্তর্গত গুণাগুণ তার কুকর্মের কাফ্ফারা হয়ে যেতে পারে (তাফসিরে কুরতুবী)।
হযরত আয়শা সিদ্দিকা রাদিআল্লাহু তা’য়ালা আনহা বলেন : একদা এক বিপন্ন ব্যক্তি কতকগুলি মেয়েলোকের সম্মুখ দিয়ে যাচ্ছিল, এমন সময় তারা তাকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করে। অতঃপর তাদের কয়েকজন ঐ বিপন্ন লোকটির মত হয়ে যায় (আদাবুল মুফরাদ, পৃষ্ঠা নং-৩৯৭)। আমর ইবনে শুরাহবিল বলেন: কোন ব্যক্তিকে বকরির স্তনে মুখ লাগিয়ে দুধ পান করতে দেখে যদি আমার হাসির উদ্রেক হয়,তবে আমার আশংকা হয় যে, কোথাও কি আমি এরূপ হয়ে যাই? হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহু বলেন: আমি নাকি কুকুর হয়ে যাই এই ভয়ে কোন কুকরকেও উপহাস করতে আমার ভয় হয় (মা’রিফুল কুরআন, কুরতুবী, পৃষ্ঠা-১২৮২)। কারো দোষ বের করা, দোষ প্রকাশ করা, দোষের কারণে ভর্ৎসনা করা হারাম (হুজুরাত-১১) যেভাবে একে অন্যকে হত্যা করা হারাম। এর মানে হল-অন্যকে হত্যা করা মুলত নিজেকে হত্যা করার শামিল। কেননা প্রায়ই এরূপ হয়ে যায় যে, একজন আরেক জনকে হত্যা করলে তার সমর্থকরা তাকেও হত্যা করে ফেলে। এটা না হলেও প্রকৃত সত্য হল-আমাদের বিপদে-আপদে প্রথমেই মুসলমান প্রতিবেশী ভইয়েরা এগিয়ে আসে। এ দিক দিয়ে মুসলমান ভাইকে হত্যা করা মানে নিজেকে একা করে ফেলা। হস্তপদবিহীন করে হত্যা করে ফেলার ন্যায় (বানি ইসরাঈল-৩৩)।
জনৈক জ্ঞানী বলেন : তোমার মধ্যে ও দোষ আছে, মানুষের চক্ষু আছে, তারা দোষ দেখে। তুমি কারো দোষ বের করলে সেও তোমার দোষ বের করবে। তাই মুসলিম ভাইয়ের দুর্নাম মানে নিজেরই দুর্নাম। হযরত আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: কোন বান্দাহ যদি অপর কোন বান্দার দোষ দুনিয়াতে গোপন রাখে,স্বয়ং আল্লাহ তা’য়ালা তার দোষ-ত্রুটি বিচার দিবসে গোপন রাখবেন (সহীহ মুসলিম)। হযরত আবু হায়সামের বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ কোন দোষ দেখল এবং গোপন করল, সে যেন কোন জীবন্ত প্রোথিত কন্যা সন্তানকে কবর থেকে তুলে জীবন দান করল (আদাবুল মুফরাদ)।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : যে ব্যক্তি কোন মুসলমানকে এমন গোনাহ দ্বারা লজ্জা দেয় যা থেকে সে তাওবাহ করেছে। আল্লাহ তা’য়ালা তাকে ঐ গোনাহে লিপ্ত করে ইহকাল ও পরকালে লাঞ্ছিত করার দায়িত্ব গ্রহণ করেন (বুখারী ও মুসলিম, কুরতুবী হযরত আনাস বর্ণিত হাদীসে নবীজী বলেন: মি’রাজে গমণকালে আমি দেখলাম একদল লোক পিতলের নখ দ্বারা তাদের মুখমন্ডল ও বুক আঁচড়াচ্ছে। আমি জিব্রাইলকে জিজ্ঞেস করলাম এরা কারা? তিনি বললেন এরা দুনিয়াতে গীবত করতো এবং মানুষের ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলতো (সুনানে আবু দাউদ)।
আসুন আমরা আমাদের পরিবার-পরিজন, দেশ-জাতি এবং নিখিল বিশ্বের সকল মানুষ জীবন যাপনের চমৎকার এ বিজ্ঞানগুলো অনুশীলন করে একটি সুখী ও সুন্দর জীবনে প্রবেশ করি।

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT