ধর্ম ও জীবন

ইসলাম ও বিজ্ঞানে খতনার উপকারিতা

মো. জহিরুল আলম শাহীন প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-০২-২০২০ ইং ০০:০৯:০২ | সংবাদটি ১৮৭ বার পঠিত

ইসলাম একটি বিজ্ঞান সম্মত ধর্ম। ইসলাম ধর্মে সব কিছুই স্বাস্থ্য সম্মতভাবে করতে বলা হয়েছে। ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক এবং শেষ নবী ও রাসুল হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর কথা, কাজ, আচার-আচরণ, ইশারা-ইঙ্গিত তথা সব কর্মকান্ডকে ইসলামের শরিয়তের পরিভাষায় সুন্নত বলা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা:) থেকে এমন কোনো সুন্নত বর্ণিত নেই যা বিজ্ঞানের দিক থেকে ক্ষতিকর। হযরত মুহাম্মদ (সা:) তাঁর উম্মতের জন্য যে সব বাণী আদেশ, নিষেধ করে গেছেন তা কোরআন ও সুন্নাহর পাশাপাশি বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই উপকারি ও মঙ্গলজনক। তা আমরা মেনে চললে আমাদের জীবন বিপদমুক্ত থাকবে। নবীজী ছিলেন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ডাক্তার। তিনি ছিলেন তাঁর উম্মতের শ্রেষ্ট রূহানী ডাক্তার মহান আল্লাহ মহান গ্রন্থ আল-কোরআনে মানব জাতির সকল সমস্যার সমাধান দিয়েই নবীজীর ওপর নাযিল করেছেন। অসুখ-বিসুখে নবীজী নানা কাজ-কর্ম ও আমল করতে বলে গেছেন। যা মেনে চললে আমাদের যেমন স্বাস্থ্য রক্ষা পাবে তেমনি নানা রোগ থেকে মুক্ত থাকা যাবে। রাসুল (সা:) এর যত সুন্নত আছে তার মধ্যে ‘খতনা’ উল্লেখযোগ্য। খতনা মুসলমানদের অনুসরণীয় স্বাস্থ্য বিধি।
সাধারণ ভাষায় খতনাকে মুসলমানি বলে। আমাদের সমাজে মুসলমানি নামেই বেশি পরিচিত। হযরত ইবরাহিম (আ:)-কে মুসলিম জাতির পিতা বলা হয়। তাই তার অনুসৃত কিছু ইবাদত ও আচরণের অনুশীলন উম্মতে মুহাম্মাদির জন্যও অনুসরণীয় করে দেওয়া হয়েছে। তেমনি খতনা হলো সকল নবী (আ:) এর একটি সুন্নত। হযরত ইব্রাহিম (আ:) এর পর সকল নবী রাসুল খতনা করেছেন। খতনা একজন পুরুষের জীবন ঘনিষ্ট স্বভাবকর্ম। ইসলামের ইতিহাস প্রমাণ করে হযরত ইবরাহিম (আ:) ঐশী নির্দেশে ৯৯ বছর বয়সে, হযরত ইসমাঈল (আ:) ১৩ বছর বয়সে এবং হযরত ঈসা (আ:) ৮ বছর বয়সে খতনা করেছেন। এটি মূলত ইবরাহিম (আ:) এর একটি সুন্নত। এ ব্যাপারে কয়েকটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। ইসলাম গ্রহণ করলে নবী করিম (সা:) খতনা করার আদেশ করেছেন এবং নবীজীর নির্দেশ মেনেই তা পালন করা ওয়াজিব, অসংখ্য হাদিস শরীফে এ সুন্নত পালনের জন্য বেশ উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। হযরত আবু হুরায়রা (রা:) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, ফিতরাত অর্থাৎ মানুষের জন্মগত স্বভাব পাঁচটি। (১) খতনা বা মুসলমানি দেওয়া, (২) নাভীর নিচের চুল পরিষ্কার করা, (৩) বগলের পশম উপড়ে ফেলা, (৪) নখ কাটা, (৫) গোঁফ খাটো করা। (সহিত বুখারী, সুনানে নাসায়ি)
খতনা হচ্ছে লিঙ্গের অগ্রভাগের ত্বক বা চামড়া কেটে বাদ দেওয়া। এ চামড়া লিঙ্গের মুন্ড বা মাথাকে ঢেকে রাখে। খতনা আরবি শব্দ। ইংরেজিতে বলা হয় ঈরৎপঁসপরংরড়হ (সারকামসিশন)। মুসলিম জাতি ছাড়া খ্রিষ্ট ও ইহুদি ধর্মে খতনা ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। তাছাড়া অন্য আরো ধর্মের অনুসারীও এখনও খতনা করে থাকেন। নবী করিম (সা:) এর নির্দেশিত পদ্ধতি এই খতনা বর্তমান সময়ে বড় বড় ডাক্তার, কবিরাজ, গবেষক, বৈজ্ঞানিকগণ গবেষণায় প্রমাণ করেছেন যে, মুসলমানি বা খতনা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারি। যা নানা রোগ হতে মানব দেহকে রক্ষা করে। ২০০৭ সালের ২৮ মার্চ জাতিসংঘ খতনাকে এইচআইভি বা এইডস রোগের প্রতিরোধের একটি উপায় হিসেবে অনুমোদন দিয়েছে। জাতিসংঘের দুইটি প্রতিষ্ঠানের ওয়াল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন এবং ইউএএ এইডসের গবেষণায় প্রমাণ করেছেন যে পুরুষের জননেন্দ্রিয়ের অগ্রভাগের চামড়ার নিচে আর্দ্র ও স্যাতস্যাতে পরিবেশে এইচআইভি ভাইরাস বেশ ভালোভাবেই বাসা বেঁধে থাকে। সে চামড়া কেটে ফেললে এইচআইভি আক্রান্ত মহিলাদের সঙ্গে যৌন মিলন ঘটলেও এইডস আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়। এ ব্যাপারে ওয়াল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের এইডস প্রোগ্রামের পরিচালক কেভিন ডি কক বলেন যে, খতনা করার এ অনুমোদন এইডস প্রতিরোধে বিরাট ভূমিকা পালন করতে পারে। একটু চিন্তা করুন নবী রাসুলের নির্দেশিত পথ আজ জাতিসংঘ সংস্থা প্রমাণ করে অনুমোদন করেছে এবং এইডসের প্রতিরোধক হিসেবে ঘোষণা করেছে। তাই বলা যায় ইসলাম কত দূরদর্শী। চিকিৎসা বিজ্ঞান বলে, স্ত্রী পুরুষ উভয়ের যৌনাঙ্গে বিশেষ ঘর্মগ্রন্থি রয়েছে। এগুলো থেকে এক প্রকার তরল পদার্থ নির্গত হয়। যার নাম ‘শ্লেমা’। এই শ্লেমা কারসিনোজেনিক অর্থাৎ ক্যান্সার সৃষ্টিতে সাহায্য করে। দেখা যায় যে সমাজে পুরুষের খতনা করার রেওয়াজ প্রচলিত। সে সমাজে পুরুষদের পুরুষাঙ্গের ক্যান্সার অনেক কম। এইডস রোগ সংক্রান্ত বিশ্ব বিখ্যাত গবেষক মেলবোন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর অব অবস্টেট্রিকস ডঃ রোজার শর্ট তার সহযোগী গবেষক ডঃ রবার্ট সজাবোকে খতনা নিয়ে গবেষণা করে এবং তার ফলাফল প্রকাশ করেন যে, এইডস নামক প্রাণঘাতী রোগে প্রতিষেধক হলো খতনা। উল্লেখ্য যে এইডস নামক প্রাণঘাতী রোগের কার্যকর কোন ঔষধ এখন পর্যন্তও আবিষ্কৃত হয়নি। অথচ আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে বিশ্বনবীর নির্দেশিত আদেশ ছিল খতনা করার। জাতিসংঘ খতনাকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে মুসলিম সমাজের সুন্নাতের গুরুত্ব সত্য প্রমাণিত হলো এবং বিশ্বে ইসলামের বিজয়ের গুরুত্ব ঘোষিত হলো।
খতনা করাতে হবে শৈশবকালে। বয়স যত বাড়তে থাকে লিঙ্গের চামড়া তত পুরু ও শক্ত হতে থাকে। পরে তা করতে অনেক অসুবিধা হয়। তাই শিশুকালে যত সম্ভব করে নেওয়া ভালো। তবে আমাদের দেশে এখনও গ্রামের হাজাম দিয়ে মুসলমানি বা খতনা করিয়ে থাকেন। এসব হাজামরা অনেক সময় চামড়া কাটার সময় বেশি কেটে ফেলেন। ফলে যে রক্তক্ষরণ শুরু হয় তা বন্ধ করা যায় না। ফলে শিশুকে বাঁচানো কষ্ট হয়ে দাঁড়ায়। তাই অভিভাবকদের উচিত অভিক্ষ চিকিৎসকের নিকট নিয়ে খতনা করা। এটা নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত।
সন্তানের প্রতি মুসলমান পিতামাতার অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো তাকে ঠিক সময়ে খতনা করানো। এটি ইসলামের রীতি ও সুন্নত। হাদিস শরীফে জন্মের সপ্তম দিনেই খতনা করানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের মতে ছেলে সন্তান জন্মের সপ্তম দিনে খতনা করানো উত্তম। তবে তা পরেও করানো যায়। পরে করানো নিষিদ্ধ নয়। হজরত জাবির (রা:) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) আদরের নাতি হযরত হাসান ও হোসাইনের জন্য আকিকা করেন এবং তাদের খতনা করান সপ্তম দিনে (বায়হাকি)। হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, শিশু জন্মের সপ্তম দিনে সাতটি বিষয় সুন্নত। তার মধ্যে অন্যতম হলো তার নাম রাখা ও খতনা করানো। এ সময়ে খতনা করানোর নানা উপকারিতা রয়েছে। এ সময় শিশুর লিঙ্গের চামড়া খুব পাতলা ও নরম থাকে। এ সময় খতনা দিলে তা তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায়। অপরদিকে শিশু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে থাকে ও ওঠে। খতনা করা শরীর অধিক পাক পবিত্র, পরিচ্ছন্ন থাকে। প্রস্রাবের পথের সংক্রমণের সমস্যা প্রতিরোধ হয়। যৌন রোগ কম হয়। প্রস্রাব করতে জ্বালাপোড়া করে না। প্রস্রাব আটকানোর ভয় থাকে না। স্বাস্থ্য ভালো থাকে। নানা রোগের ঝুঁকি কম থাকে। শিশুর বয়স সাত হয়ে যাবার আগেই খতনা করে নেওয়া খুবই দরকার। এরপর হতে বয়স বাড়তে থাকলে নানা রোগে আক্রমণ করে। স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের মতে বিবাহিত মুসলিম ও ইহুদী পুরুষদের খতনা করা থাকায় তাদের জীবন সঙ্গী স্ত্রীদের জরায়ুতে ক্যান্সার হওয়ার হার যা খতনা করান না তাদের তুলনায় অনেক কম হয়।
আমাদের সমাজে ও মুসলমানিকে নিয়ে বা ঘিরে বেশ জাকজমক অনুষ্ঠান হয়। যা সমাজের সবার পক্ষে সম্ভব হয় না। আসলে ইসলাম কী বলে। যার সামর্থ আছে তিনি দাওয়াত দিয়ে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় জনকে খাওয়াতে পারেন তাতে কোনো দোষ নেই। কিন্তু এটা যেন আমাদের সমাজের স্থায়ী উৎসবে বা অনুষ্ঠান পরিণত না হয় তার দিকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। এ সুন্নতকে ঘিরে লোক দেখানোর বা প্রদর্শনীর জন্য খরচ করা ইসলামের প্রকৃতির সাথে মিল খায় না। এ কারণে নিজের ওপর কোনো কিছু করতেই হবে তা আদৌ শরিয়তের দৃষ্টিতে উচিত নয়। হযরত ওসমান বিন আবিল আস (রা:)-কে এক ব্যক্তি নিজের বাড়িতে খতনা উৎসবে যোগদানের জন্য দাওয়াত করেছিলেন। কিন্তু তাতে তিনি যোগদান করেননি। তখন তাকে সে উৎসবে না যাওয়ার কথা জিজ্ঞেস করা হলে, তিনি বলেন, নবী করিম (সা:) এর যুগে আমরা কোনো খতনার উৎসবে যোগ দিতাম না। এবং ডাকাও হতো না। এ ঘটনা হতে বুঝা যায় এ খতনা কোনো উৎসবের নয়। এ উৎসব সাদাসিধেভাবে পালন করা উত্তম। আল্লাহ আমাদেরকে তার হুকুম ও তার রাসুলের পথ শেখানো পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT