ধর্ম ও জীবন

আমার নামাজ আমার অনুভুতি

মুন্সি আব্দুল কাদির প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-০২-২০২০ ইং ০০:০৯:৪৮ | সংবাদটি ৬৮৭ বার পঠিত
Image

আল্লাহ তায়ালা প্রতিদিন কত সুন্দর ভাবে আমাদেরকে তাঁর দিকে ডাকেন। আমি ডাকে সাড়া দিয়ে মসজিদে হাজির হই। হাজির হওয়ার পূর্বেই আল্লাহ তায়লা অযু করার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তায়লা চান বান্দা এক্বেবাবে পুতপবিত্র হয়ে তাঁর দরবারে হাজির হবে।
আমরাও এভাবেই হাজির হই। কিন্তু চিন্তা করে দেখিনা যে আসলেও আমি বাহ্যিকভাবে পবিত্র হলেও আত্মীকভাবে পবিত্র হতে পেরেছি কি না। প্রতি রাকাত নামাজে আমি আল্লাহ তায়ালার নিকট সুরা ফাতেহার মাধ্যমে আমার অনেক নিবেদন মাওলার নিকট পেশ করি। আমি সরল সঠিক পথ কামনার পরপরই আমার সরল সঠিক পথটি কেমন হবে, কাদের অনুসরনীয় পথ চাই মাওলার নিকট এই কামনা ব্যক্ত করতে থাকি। একবার নয়, দুই বার নয়। বার বার প্রতি রাকাতে বলতে থাকি, সিরাতাল্লাজিনা আনআমতা আলাইহিম। হে আল্লাহ, তুমি যাদের উপর সন্তুষ্ট হয়েছ তাদের পথে আমাদের চালিত কর।
আমার এই চাওয়ার সাথে, আমার হৃদয়ের অনুভুতি, মনের চাহিদা, আমার দৈনন্দিন আমল, রহমত প্রাপ্ত আল্লাহর প্রিয়দের নামাজের নমুনা আমার চিন্তায় থাকা উচিত। আমি প্রতিবারেই তাদের মত হওয়ার নিবেদন করি। আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে অনুসরন করার কথা কিছু জানি এবং বলি।
সাহাবাগন (রা.) তাবেয়ী, তাবে তাবেয়ী, তার পরবর্তী আল্লাহ ওয়ালাগনের জীবন সম্পর্কে খুব বেশী জানার চেষ্টা করি না এবং তাদের মত হওয়ার চেষ্টার তাগাদা আমার অন্তরে কতটুকুন তাও কি ভেবে দেখেছি। আমি মাওলার নিকট দোয়া করি, আমার পুরো জীবন যেন তোমার প্রিয়দের মত হয়। আমার চলা, বলা, আমার উঠা, বসা, আমার লেনদেন, সামাজিকতা, আমার ইবাদত, অর্থাৎ জীবন চলার সকল ক্ষনে যেন তাদের মতই আমার জীবন পরিচালিত হয়। কখনো যেন লালতপ্রাপ্তদের মত আমার জীবন না চলে। কখনো ভুলবশত আমার দ্বারা কোন ভুল হয়ে গেলে, সাথে সাথে যেন তাওবাকারীদের দলে সামিল হয়ে যেতে পারি।
এই সব আল্লাহ ওয়ালাদের নামাজ ও অন্যান্য ইবাদতও ছিল সর্ব সুন্দর। নামাজে তারা প্রেমাস্পদের সাক্ষাত লাভে ধন্য হতেন, হৃদয়ের দূঃখ- ব্যথা, কষ্ট- ক্লেষ নামাজের মাধ্যমে সব কিছু দুর হয়ে যেত। নামাজে বিপদ চলে এলেও অনেক সময় নামাজ থেকে সরাতে পারতো না। তারা প্রিয়তমের সাক্ষাতে দুনিয়ার সব কিছু থেকে হারিয়ে যেতেন।
নামাজ ছাড়াও অন্যান্য ক্ষেত্রেও তাদের জীবন ছিল প্রভুর প্রেমে ভরপুর। প্রভুর সন্তুষ্টি লাভের জন্য তাদের সারা দিনের কাজ, রাতের ঘুম সবকিছু নিবদ্ধ ছিল। প্রভুর নির্দেশিত পথে তারা ছিলেন অটল অবিচল। আমি প্রতিদিন মাওলার নিটক সিরাতাল্লাজিনা আনআমতা আলাইহিম বলতে থাকি। এই বলার সাথে যদি চাওয়ার অনুভুতি জাগ্রত হত, কতইনা ভাল হত। বলা যায় সোনায় সোহাগারূপে আমার সামনে হাজির পেতাম। আমার প্রতিবারের চাওয়ার সাথে, আমার জীবন আল্লাহর প্রিয়দের জীবনের সাথে মিলানো যায় কি না আমি কি একবারও ভেবে দেখেছি ? না শুধু প্রতিদিন প্রতিবার বলেই যাচ্ছি, সিরাতাল্লাজিনা আনআমতা আলাইহিম। আমার বাকপটুতা, আমার লেবাস পোষাক, আমার আরাম আয়েশ, আমার বাসস্থান, আমার বাহন হয়তো তাদেরকে ছাড়িয়ে যাবে।
আমার অর্থ-পদ লাভের বাসনা, চেষ্টা, তদবির হয়তো অনেক এগিয়ে। কিন্তু মাওলাকে পেতে আমার তাগাদা, আকুতি তাদের সাথে কোনভাবেই মেলানো যায় না। মিলানোর কথা বললেও সেখানে মুনাফেকি লুকিয়ে থাকে। লোক দেখানো ভাব জাগ্রত হয়। সবখানে কেন যেন লুকোচুরি আর তামাশা মেশানো। সিরাতাল্লাজিনা আনআমতা আলাইহিম বলার সময় আমার চেহারার ভাব ভঙ্গিমা, আমার হৃদয়ের অবস্থা আসলেও কি কোন দানশীলের নিকট চাওয়ার অবস্থা বুঝায়। আমার চাওয়া কি কোন অভাবগ্রস্ত, ভিক্ষুক অথবা কোন বিপদগ্রস্ত বা কোন সাহায্য প্রার্থীর মত। আমি মুখে সিরাতাল্লাজিনা আনআমতা আলাইহিম বলছি আর আমার মন কত জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, আমি কি একটুও চিন্তা করছি। সত্যিই আমি যদি চিন্তা করতাম তবে, আমার নামাজ দিন দিন সুন্দর হতে থাকত, আমার ব্যক্তি জীবন, সামাজিক জীবন, অর্থনৈতিক জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন সবখানেই সুন্দরের দিকে পরিবর্তন চোখে পরত। কিন্তু আজ আমার সবখানেই বৈপরিত্য লক্ষ্য করা যায়। কোনটার সাথে কোনটার মিল বুঝা খুব কঠিন হয়ে দাড়িয়েছে।
হেন অবস্থায় বাহ্যিকভাবেও নামাজের সৌন্দর্য পরিলক্ষিত হয় না। নামাজ যেন এক তাড়াহুড়োর কাজ হয়ে দাড়িয়েছে, সব চেয়ে কষ্টকর আর বিপদজনক এক কাজের নাম নামাজ হয়ে পড়েছে। কারন নামাজের সাথে অমার দেহের সম্পর্ক থাকলে আত্মার সম্পর্ক যেন মরে গেছে। নামাজ দ্বারা আমার আত্মা সজীবতা লাভ করতে পারছেনা। নামাজ আত্মার খোরাক না হয়ে জটিলতা হয়ে গেছে। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, নামাজ আামর চোখ জুড়ায়, নামাজের মধ্যে আমি আনন্দ ও প্রশান্তি লাভ করি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক দিন বিলালকে ডেকে বলেন, হে বিলাল, নামাজে ডেকে অর্থাৎ আজান দিয়ে আমার হৃদয়কে প্রশান্তিতে ভরে দাও।
আসলে একটু ভেবে দেখিতো, মসজিদে যখন আজান হয়, আমার হৃদয় কি আনন্দিত হয়? আমার হৃদয় কি নামাজে প্রশান্তিতে ভরে যায়? কই নাতো। সালাম ফিরানোর পর আমি কি আমার প্রভুর সাক্ষাত লাভের তৃপ্তি অনুভব করি ? আমার অন্তরে কি সুখ সুখ অনুভব করে ? আমার দু চোখ থেকে প্রিয়তমের সাক্ষাতের আনন্দে দু ফোটা আনন্দের অশ্রু দু গাল বেয়ে প্রবাহিত হয় ? আমার চেহারায় কি নুরের জ¦লক দেখা যায় ? সব মিলিয়ে আমার অবস্থা কী দাড়ায় ?
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা আমাকে যেভাবে নামাজ পড়তে দেখ, ঠিক সেভাবে নামাজ আদায় করো। সাহাবাগন ছিলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদর্শের মুর্ক প্রতিক। যখন নামাজের সময় হতো আলী রাঃ কাঁপতে শুরু করতেন এবং তার চেহারা পরিবর্তন হয়ে যেতো। যখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, কি কোন অসুবিধা হয়েছে? তখন তিনি জবাব দিলেন, এমন একটি আমানতের সময় শুরু হচ্ছে, যার ভার আকাশ, পৃথিবী, পাহাড়ের উপর দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা সে ভার বহন করতে অপারগতা প্রকাশ করে। আমি এখন সে আমানতের ভার গ্রহন করতে যাচ্ছি।
যাতুর রিকা যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি যায়গায় অবতরন করলেন, তখন তিনি আহবান করলেন, কে আছো আজ আামাদের পাহারাদার হবে। এই আহবানে একজন আনসার ও একজন মুহাজির এগিয়ে এলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে একটি উপত্যকায় পাহারা নিযুক্ত করলেন। উপত্যকায় পৌছার পর মুহাজির সাহবী ঘুমিয়ে পড়লেন। আর আনসার সাহাবী নামাজে দাড়িয়ে গেলেন। এই অবস্থায় সুযোগ বুঝে এক মুশরিক আনসার সাহাবীকে লক্ষ্য করে তীর নিক্ষেপ করে। তীরটি সাহাবীর গায়ে লাগে। সাহাবী তীরটি বের করে নেন, নামাজ চালিয়ে যেতে লাগলেন। মুশরিক আরো একটি তীর ছুড়ে। এটিও সাহাবীর গায়ে লাগে। আবারো তীরটি বের করে নামাজ চালিয়ে যেতে থাকেন। এদিকে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। যখন তৃতীয় তীরটি সাহাবীকে আঘাত করে তিনি আর দাড়িয়ে থাকতে পারলেন না। এ সময় মুহাজির সাহাবীর ঘুম ভেঙ্গে যায়। এটা দেখে মুশরিক পালিয়ে যায়। মুহাজির সাহাবী সাথীর রক্তাক্ত অবস্থা দেখে বলেন, সুবহানাল্লাহ। প্রথম তীর নিক্ষেপের পর আমাকে কেন আপনি জাগাননি। সাহাবী জবাব দিলেন, আমি এমন ্একটি সুরা তেলাওয়াত করছিলাম যা ছাড়তে আমার আমি পছন্দ করিনি।
আমার প্রতি দিনের নামাজে, প্রতি রাকাত নামাজে তাদের মত হওয়র জন্য দোয়া করব এবং তাদের মত হওয়ার চেষ্টা করব। হে আল্লাহ তুমি আমার নামাজ, আমার সব ইবাদত কবুল কর। আমীন।

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT