উপ সম্পাদকীয়

স্বপ্ন দেখা

মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২৯-০২-২০২০ ইং ০০:৩৮:৪৩ | সংবাদটি ৮৮ বার পঠিত

আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষ চান তাদের সন্তানরা ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হোক। এর ফলে সন্তানদের মধ্যে তাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছার পরিবর্তে মা-বাবার আরোপিত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে। একটি গণ্ডির মধ্যে সন্তানদের দৃষ্টিভঙ্গি আবদ্ধ হয়ে যায়। পৃথিবী যে অনেক বড়ো, পৃথিবীর অনেকগুলো যে খোলা জানালা হতে পারে সেটা আমরা আমাদের সন্তানদের বোঝাতে পারি না। কিংবা সেই বড়ো মনোভাবটির শেকড় তাদের মধ্যে গড়ে দিতে পারি না। নিজেদের স্বপ্নগুলোর এভাবেই মৃত্যু ঘটে, অন্যের স্বপ্ন দ্বারা মানুষ তাড়িত হয়ে নিজের ব্যক্তিসত্তা হারিয়ে ফেলে। দৃষ্টিভঙ্গির বহুমাত্রিকতা থেমে যায়, মানুষের মন থেকে ‘দৃষ্টিভঙ্গি বদলালে জীবন বদলে যাবে’ এ ধারণা অপসারিত হয়। মানুষ ক্রমাগত নিজের স্বপ্ন ও লক্ষ্যকে সংকুচিত করতে করতে একদিন যন্ত্র হয়ে যায়। একজনের ছবি আঁকার প্রতি প্রবল আগ্রহ। কিন্তু তাকে আমরা ছবি আঁকতে অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছি না। বরং উলটো তাকে হতাশ করে বলছি, এইভাবে ছবি আঁকতে থাকলে পেটের ভাত জুটবে না। লেখাপড়ায় মন দেবার কথা বলছি। বড়ো বড়ো চাকরির কথা বলে তার ভেতরের সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গিকে বিকশিত হতে দিচ্ছি না। কিন্তু একজন মানুষ ছবি আঁকতে আঁকতে যে চিত্রসম্রাট পাবলো পিকাসো হতে পারে, সে কথা আমরা কখনো বলি না। ছোটোবেলায় পিকাসোকে উদ্দেশ্য করে তার মা তাকে বলেছিলেন, ‘তুমি খুব বড়ো হবে। তুমি যদি সেনাবাহিনীতে যোগ দাও তাহলে জেনারেল হবে। যদি সন্ন্যাসী হও তাহলে পোপের পদ পর্যন্ত অলংকৃত করবে।’
মায়ের স্বপ্নের মতোই বড়ো মাপের মানুষ হয়েছিলেন পাবলো। মায়ের স্বপ্নের সঙ্গে পাবলোর স্বপ্নের ভিন্নতা থাকলেও তিনি বড়ো মাপের চিত্রশিল্পী হয়েছেন। তার মায়ের তথ্যানুসারে জানা যায়, শিশুকালে পাবলোর মুখে প্রথম শব্দ ধ্বনিত হয়েছিল ‘পিজ’ ‘পিজ’! ‘পিজ’ যেটি ‘লাপিজ’ শব্দের সংক্ষিপ্ত উচ্চারণ। ‘লাপিজ’ অর্থ পেনসিল। এই পেনসিল হাতে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে পড়তেন পথেঘাটে। হাতের জাদুকরি শক্তিতে পথঘাটের ভিখারি, অন্ধ, পঙ্গু, কুলি-মজুর, বস্তিবাসী, জেলখালাস দাগি আসামি, ফেরিওয়ালা এসব লোকদের স্কেচ করতেন মনের আনন্দে। পিকাসোর প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিলÍচিত্রকর্ম আঁকার ক্ষেত্রে তিনি ক্রমাগত আগের পর্যায় থেকে সরে এসে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি করেছেন। পুরাতন ধ্যানধারণাকে ভেঙে ভেঙে নতুন ধ্যানধারণার পর্যায় অতিক্রম করেছেন। আর এই সব সৃষ্টির পেছনে তার গভীর আত্মিক যোগ ছিল। আগাগোড়া এক শিল্পীর জীবন তিনি কাটিয়ে গেছেন। তার প্রত্যেকটা ছবির মধ্যেই আসল মানুষটির সন্ধান মেলে। পিকাসোর সৃজনশীলতা কোনো সীমান্ত ছিল না। সবকিছুর ভেতরই তিনি নতুন কিছু খোঁজার চেষ্টা করে গেছেন। যদিও বিনীত হয়ে তিনি বলতেন, ‘আমি কিছু খুঁজি না, আমি পেয়ে যাই।’ মৃত্যুর পরে পৃথিবীতে আজও তিনি বেঁচে আছেন। কারণ তিনি যা স্বপ্ন দেখেছেন, সেই কাজটিই করেছেন। এর ফলে স্বপ্ন তাকে লক্ষ্যে পৌঁছে দিয়েছে।
আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতা জ্যাকমা একটার পর একটা স্বপ্ন বিফল হওয়ার পরও তিনি আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখতেন। কখনো বিফলতায় হতাশ হননি। বরং ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। তার একটি বিখ্যাত উক্তি ছিল এমন :‘একটা বানরের সামনে একটা কলা ও একটা ১০০ টাকার নোট রাখলে বানর কলাটাই নেবে টাকা নয়। কেননা বানর জানে না যে, ১০০ টাকা দিয়ে আরো ১০০ কলা কেনা যায়। ঠিক তেমনি মানুষও কলার মতো চাকরির পেছনে ছোটে, অথচ চাইলে সে ১০০ মানুষকে চাকরি দিতে পারে।’ আমাদের সন্তানদের আমরা এমন করে ভাবাতে অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছি না। বরং তাদের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেয়ে একটা চাকরি পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ করছি। কিন্তু বিষয়টা অন্যভাবে ঘটলে সেটা সবার জন্য আশাপ্রদ হতো। যদি আমরা আমাদের সন্তানদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তাদের শেখাতে পারতাম, তোমরা চাকরির পেছনে ছুটো না বরং তোমাকে এমনভাবে উদ্যোক্তা করে গড়ে তোলো, যাতে করে চাকরি তোমার পেছনে ছুটে। হ্যারি পটার সিরিজের লেখিকা জে কে রাওলিং লেখাপড়ায় খুব একটা ভালো ছিলেন না। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে সুযোগ না পেয়ে এক্সিটর ইউনিভার্সিটিতে তিনি লেখাপড়া করেন। লেখাপড়া শেষ করলেও ভালো কাজ না পেয়ে তিনি পর্তুগালে গিয়ে এমন একজনকে বিয়ে করলেন যিনি কথায় কথায় গায়ে হাত তুলতেন। ১৯৯৩ সালে ৩৮ বছর বয়সে তিনি আবার ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন। জীবনের হিসাব মিলাতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারলেন জীবনের সবকিছুতেই তিনি ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু শত বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও তিনি স্বপ্ন দেখার মানসিকতা হারাননি। ১৯৯৫ সালে খেয়ে না খেয়ে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে থেকেও তিনি হ্যারি পটারের প্রথম সিরিজের বইটি লেখা শেষ করেন। জীবনকে বদলে ফেলার স্বপ্ন ও লক্ষ্য নিয়ে বইটি লিখলেও ১৪টি প্রকাশনা সংস্থা থেকে তা প্রত্যাখ্যাত হয়। অবশেষে ১৯৯৬ সালে ব্লুমসবারি নামের ছোটো একটি প্রকাশনা সংস্থা বইটি বের করেন। অবাক করার মতো বিষয় হলো- ১৯৯৭ সালে বইটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সারা বিশ্বে হইচই পড়ে যায়। রাওলিং বুঝতে পারেন দুঃসময়েও কেউ যদি স্বপ্ন দেখার শক্তি নিয়ে নিজের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে, তাহলে ব্যর্থতা একদিন সফলতায় রূপ নেয়। ২০০৪ সালে রাওলিং পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম সাহিত্যিক হিসেবে কেবল বই লিখে বিলিয়ন ডলারের মালিক হন। যা অসাধ্যকে সাধন করার মতো একটি দৃষ্টান্ত। আমাদের সন্তানদের বলব, তোমরা হতাশ হোয়ো না। নিজেদের স্বপ্ন ও লক্ষ্য তৈরি করো। তবে সেই লক্ষ্য ও স্বপ্নের মধ্যে বাস্তবতা থাকতে হবে। তোমাদের মনে রাখতে হবে পৃথিবীতে এমন কিছু অসাধ্য নেই, যা মানুষ জয় করতে পারে না।
লেখক : অধ্যাপক।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ক্যাস্পিয়ান সাগরের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব
  • নিজগৃহে আমাদের এই উদ্বাস্তু জীবন
  • বেকারত্ব ও যুবসমাজ
  • আমার হাতেই আমার সুরক্ষা
  • কুড়িগ্রামের সুলতানা সরেবোর
  • স্মার্টফোনের আনস্মার্ট ব্যবহার
  • কোয়ারেন্টাইন না বলে ঘরবন্দি, একঘরে, ছোঁয়াচে বলুন
  • বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের বন্ধু
  • করোনা ভাইরাস ও করুণ পরিস্থিতি
  • পানির অপচয় রোধ করতেই হবে
  • বিশ্বনবী (সা) এর মিরাজ
  • বিদ্যুৎসাশ্রয় এবং আমাদের করণীয়
  • বেঁচে থাকি প্রাণশক্তির জোরে
  • রক্ত দিন জীবন বাঁচান
  • নদীকে না দেখলে নদীও আমাদের দেখবে না
  • করোনা ভাইরাসে থমকে গেল পৃথিবী
  • করোনা ভাইরাসে আমাদের করণীয়
  • বঙ্গবন্ধুর মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন
  • বঙ্গবন্ধু ও আমাদের শিশুরা
  • করোনা ভাইরাস ও দেশের অর্থনীতি
  • Developed by: Sparkle IT