পাঁচ মিশালী

ফেসবুক

সমিক সহিদ জাহান প্রকাশিত হয়েছে: ২৯-০২-২০২০ ইং ০০:৪৩:৩০ | সংবাদটি ১৩৫ বার পঠিত

আমাদের দেশে ফেসবুক শুরু হয় ২০০৪/২০০৫ সাল থেকে। কম বয়সী ছেলে মেয়েরা আধুনিক প্রযুক্তির এই সামাজিক বন্ধন ব্যবস্থাকে খুব সহজভাবে গ্রহণ করেন। এই সময় দেখা যায় প্রত্যেক ছেলে মেয়ের হাতে মোবাইল ফোন তো আছেই, তার উপর বাড়িতে অথবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটারও ব্যবহার করছে। বলা যায়, মোবাইল ফোন ও কম্পিউটার দুটোই খুব সহজলভ্য বস্তুতে পরিণত হয়। এগুলোর সাথে যুক্ত হয় ইন্টারনেট।
ইন্টারনেট যুক্ত হওয়ার সাথে সাথে সিলেট শহরের অনেকগুলো সাইবার ক্যাফে গজিয়ে ওঠে। সাইবার ক্যাফেগুলোতে কম বয়সী ছেলে মেয়েদের ঝোক বেড়ে গেল। তবে গতানুগতিক সাইবার ক্যাফেগুলো বেশি দিন বেঁচে থাকতে পারলো না। যারা অনেক বেশি অর্থ বিনিয়োগ করল এবং সামাজিক নেটওয়ার্কগুলো অনেক শক্তিশালী ও দ্রুতগতি সম্পন্ন করল, তারাই ব্যবসায় টিকে রইল। সামাজিক নেটওয়ার্ক খুবই শক্তি অর্জন করল। এতে সহায়তা করল বিভিন্ন মোবাইল ও নেটওয়ার্ক কোম্পানি। এরা গ্রাহকদের নিকট বিভিন্ন ধরনের প্যাকেজ প্রোগ্রাম অফার করল। এর কোনটা সপ্তাহের জন্য, কোনটা পনের দিনের জন্য, আবার কোনটা মাস ব্যাপী। কোনটার জন্য এমবি (ম্যাগাবাইট) এবং দিন নির্ধারণ থাকে। যেটা আগে শেষ হবে, তারপরই নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে নেটওয়ার্ক সংযোগ চালু করতে হবে। মাসব্যাপী পেতে হলে সম্পূর্ণ মাসের জন্য প্রায় ১০০০/১৫০০ টাকা জমা দিতে হয়। এজন্য এমবি কোন সমস্যা নয়। তখন রাত নেই দিন নেই ইন্টারনেটে বসে কাজ কর, না হয় ছবি দেখ, আর না হয় তথ্য সংগ্রহ কর।
এরই মধ্যে একদিন আমার বড় ছেলে আমাকে বলল, আব্লু তোমার ই-মেইল একাউন্ট নেই, তোমার জন্য একটা একাউন্ট খুলে দেই। প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারবে। এর আগেও অফিস হতে ই-মেইল একাউন্ট খুলেছিলাম। কিন্তু আমার সমস্যা হল একাউন্টের পাসওয়ার্ড মনে রাখা। প্রত্যেকটি একাউন্টের সাথে একটি করে পাসওয়ার্ড থাকে। এই পাসওয়ার্ড দিয়েই ই-মেইল একাউন্টে যেতে হয়। সঠিকভাবে যদি পাসওয়ার্ড না দেয়া যায়, তবে ই-মেইল একাউন্ট খুলবে না। কম্পিউটারের বদৌলতে ইদানিং স্কুল কলেজের ছেলে মেয়েরা তাদের সাধারণ কথা বার্তায় এই শব্দগুলো ব্যবহার করে যেমন-ওপেন, শাটডাউন, আপলোড, ডাউনলোড, সফটওয়ার, হার্ডওয়ার ইত্যাদি। শব্দগুলোর ব্যাপক ব্যবহারের ফলে মনে হয় এগুলো যেন বাংলা শব্দ হয়ে গিয়েছে। আবার হয়তো কেউ কিছু বুঝতে পারছে না তখন ঠাট্টার ছলে বলা হয়, তোমার রেম এতো স্লো কেন। আমার সমস্যা হল, আমি পাসওয়ার্ড মনে রাখতে পারি না অথবা মনে রাখার চেষ্টাও করি না। আমার বড় ছেলে আমার ব্লেকবেরি মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে জানতে চাইল এটার নম্বর মনে আছে কি না। সহজভাবেই বলি, এটার নম্বর মনে থাকতেই হবে। ছেলে জানালো এতেই চলবে। এর পর সে একটি একাউন্ট খুলে দেয়। এখন আমার আর কোন সমস্যা হয় না একাউন্ট খুলতে অথবা বন্ধ করতে।
গুগল (google) হতে কিভাবে বিভিন্ন তথ্যের জন্য যেতে, তথ্য ডাউনলোড করতে হয় ইত্যাদি জানা হয়ে যায়। ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ব্যবহার করতে শুরু করি। অনেকেই ফ্রেন্ড লিষ্টের মধ্যে চলে আসে। ঈদ, জন্মদিনের শুভেচ্ছা দেয়া নেয়া, সান্ত¦না অথবা কোন আনন্দের বার্তা ইত্যাদি চলতে থাকে। যেকোন অবসরে পকেট থেকে মোবাইল ফোনটি বের করে ফেসবুক চালাই। খবরের মধ্যে কিছু কিছু ব্যতিক্রমী বার্তা আসে। যেমন আপনি লটারিতে লক্ষ টাকা পেয়েছেন, দ্রুত এই নম্বরে যোগাযোগ করুন। এই জাতিয় নম্বরে যোগাযোগ করে অনেকেই রাম-ঠগা খেয়েছেন। একদিন আমার নিকট একটি ম্যাসেজ আসে। পড়ে দেখলাম এক ধনী লোক গাড়ি এক্সিডেন্টে মারা গিয়েছেন। তার ব্যাংক হিসাবে প্রচুর টাকা রয়েছে। যিনি ম্যাসেজটি পাঠিয়েছেন তিনি মৃত ব্যক্তির সলিসিটার (solicitor)। তিনি একজন বিশ্বাসী লোক খোঁজ করছেন। যাকে এই টাকাগুলো দেয়া যায় এবং সে ভাল কোন কাজে টাকাগুলো ব্যবহার করবে। ম্যাসেজটি এসেছে কেরিবীয় অঞ্চলের একটি দ্বীপ দেশ হতে। ম্যাসেজটি কেন জানি একরকম সন্দেহের সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে উত্তর করি এই জাতিয় ম্যাসেজ আমার নিকট আর কখনো পাঠিও না। ওখান হতে পরে অবশ্য আর কোন ম্যাসেজ আসেনি। এর অনেক দিন পর অন্য একটি ছোট ম্যাসেজ আসে। ম্যাসেজটি এমনভাবে লেখা, যেকেউ পড়লেই তার দুর্বলতা জেগে ওঠাই স্বভাবিক। ম্যাসেজটি এইভাবে লেখা, আমি একজন মহিলা। আমি single mother। আমি একটি সমস্যার মধ্যে আছি। যদি কেউ আমাকে একটু সাহায্য করেন তবে আমি চির কৃতজ্ঞ হব। প্রাথমিকভাবে আমি ম্যাসেজটি ইগনোর (ignore) করি। কিছু দিন পর আবারও ম্যাসেজটি আসে। ভাবলাম এর একটা উত্তর দেয়া যেতে পারে। মনে মনে একটি উত্তর ঠিক করে লিখে ফেলি। লিখলাম single mother হয়েছে তাতে সমস্যা কি? তোমার সব চাইতে বড় পরিচয় হল, তুমি মা। একজন মা পৃথিবীতে সবচাইতে সম্মানীয়। তোমার সমস্যার কোন সমাধান আমার নিকট আছে কি না জানি না। তবে সমস্যা প্রকাশ করলে আমি না-পারি কেউ না কেউ সমাধান দিতে পারবে। এই জাতীয় একটি ম্যাসেজ লিখে পাঠিয়ে দিলাম। দু’একদিন যাওয়ার পরই উত্তর আসে। লিখে, আমি আফগানিস্তানে আছি। আমিরিকান সেনাবাহিনীতে কাজ করি। আমার কিছু টাকা আছে। এই টাকাগুলা কোন একজন বিশ্বস্ত মানুষের কাছে রাখতে চাই। যে কারণে আমার একজন বিশ্বস্ত লোকের প্রয়োজন। যে এই অর্থ গচ্ছিত রাখবে তাকে আমি এর একটা অংশ গিফট হিসেবে দিয়ে দিব। তুমি যদি তোমার পূর্ণ ঠিকানা দাও তবে টাকাগুলো পাঠিয়ে দিতে পারি। এর উত্তর দিতে কিছুদিন সময় নেই। আমার অভ্যাস তাৎক্ষণিক কিছু করা। এর মধ্যে ফেসবুকে তার ছবি দেখলাম। কোনটিতে তার সাথে তার দুটি বাচ্চা মেয়ে। আবার কোনটিতে ছিল সেনা পোশাক পরা। উত্তর লিখলাম, কোন গিফট এর প্রয়োজন হবে না। বল তোমার টাকা কিভাবে রাখতে হবে, আর টাকার পরিমাণ কত এবং কবে এসে টাকা নিয়ে যাবে? আমার দ্বারা তোমার কোন সাহায্য হয় তবে নিজেকে ধন্য মনে করব। তোমার টাকা আমার অফিসের ঠিকানায় পাঠিয়ে দিতে পার। নিচে ঠিকানা উল্লেখ করে দিলাম। উত্তর আসতে দেরি হয় নাই। সে বলে, আমি একজন আমেরিকান নারী সৈনিক। বর্তমানে ইউনিটের সাথে আফগানিস্তান অবস্থান করছি। আমার পদবী সার্জেন্ট। আমার এক ট্রাঙ্ক ভর্তি আমেরিকান ডলার রয়েছে। যার পরিমাণ কয়েক মিলিয়ন। ট্রাঙ্কটি বর্তমানে একটি ওয়ারহাউজ (warehouse)-এ রাখা আছে। ওয়ারহাউজটি অতিসত্তর ভেঙ্গে ফেলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। যে কারণে আমি চাচ্ছি ট্রাঙ্কটি অন্য কোন দেশে কিছু দিনের জন্য সরিয়ে রাখতে। অল্প কিছু দিনপর আমার চাকুরির মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। তখন এসে ট্রাঙ্কটি নিয়ে যাব এবং তোমার প্রাপ্য অংশ দিয়ে যাব। একটু বিরতি দিয়ে সংক্ষিপ্ত উত্তর করলাম। তোমার ট্রাঙ্কটি আমার অফিসের ঠিকানায় পাঠিয়ে দাও। এও বললাম, অফিস খুবই নিরাপদ, কোন সমস্যা হবে না। দেখলাম উত্তর আসল। লিখেছে, দেখ এই টাকাগুলো আমি অবৈধভাবে অর্জন করি নাই। তেল খনন কার্যক্রমে সন্তুষ্ট হয়ে উপহার হিসেবে আফগানিস্তান থেকে আমাকে দেয়া হয়। অল্প কয়েক দিনের মধ্যে ওয়ারহাউজটি ভেঙ্গে ফেলা হবে। ইউনিটের প্রত্যেককে নোটিশ দেয়া হয়েছে, যার যার জিনিসপত্রাদি দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে। তাই তোমাকে যে কাজটি করতে হবে, তা হল, দ্রুত তোমার কর্মস্থল হতে একটি সার্টিফিকেট এবং তুমি যে এলাকায় থাক সেটার একটা সার্টিফিকেট পাঠিয়ে দাও। তবেই নিরাপদে ট্রাঙ্কটি পাঠিয়ে দিতে পারব। আমি সেপ্টেম্বর মাসে তোমার বাংলাদেশে আসব। তখন তোমার টাকার অংশ তোমাকে দিয়ে দিব। আর বাকিটা আমি নিয়ে যাব। ম্যাসেজটি মনোযোগ দিয়ে পড়লাম।
মনে হলো সেনাবাহিনীর একজন সার্জেন্টের তৈল খনি খনন কার্যক্রমে কি সম্পর্ক থাকতে পারে? আর কেনইবা তাকে এত টাকা উপহার দেয়া হবে? কেনই বা উপহারের টাকা তৃতীয় একটি দেশে অল্প সময়ের জন্য রাখতে হবে?
মনে পড়ে যায় বেশ কিছু দিন আগের ঘটনা। আমেরিকায় পড়তে যাওয়া আমাদের দেশের এক ছাত্র, গোয়েন্দা বাহিনী এফ.বি.আই. এর পাতানো ফাঁদে পা দিয়ে আটকা পড়েছে। তাকে কেন্দ্র করে দেশের পত্র পত্রিকাগুলোতে প্রচুর প্রতিবেদন ইত্যাদি ছাপা হয়েছে। ভাবলাম গোখরা সাপের গর্তে সাহায্যের হাত প্রবেশ করানো ঠিক হবে না। ধন্যবাদ জানালাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গকে (Mark Zuckerberg)। ফেসবুক শুধু সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমই নয়, ফাঁদও বটে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT