ইতিহাস ও ঐতিহ্য

জীবনের শেষক্ষণে অর্থ-স্বর্ণ সবই জড়পদার্থ

সেলিম আউয়াল প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৩-২০২০ ইং ০০:৪২:৩৯ | সংবাদটি ৩৫৯ বার পঠিত
Image

টাকা অথবা সোনাদানা জীবনের শেষ মুহূর্তে শুধুই জড়পদার্থÑএই গভীর সত্যটি গভীরভাবে উপলদ্ধি করেছেন মুস্তান সিরুর রহমান চৌধুরী। তিনি তখন সদ্য যোগ দেয়া পুলিশ কর্মকর্তা। সারদা ট্রেনিং সেরে যোগ দিয়েছেন আসামের রাজধানী শিলং শহরে পুলিশ বাহিনীতে, ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের ২ জানুয়ারি। প্রথা অনুযায়ী পুলিশ প্রশাসনের বিভিন্ন শাখায় হাতেকলমে দু’বছর কাজ শেখার কথা ছিলো, কিন্তু দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ শুরু হওয়ায় তাকে তড়িগড়ি পোস্টিং দেয়া হয় আসামের সদর শহর ডিব্রুগড়। ডিব্রুগড়ের দিনগুলোতে তিনি জেনেছেন যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং অবাক হয়ে দেখেছেন যুদ্ধ এলাকা থেকে পালিয়ে আসা পকেটে টাকা সোনাদানা থাকা ধনাঢ্য মানুষের করুণ মৃত্যু, জীবনের শেষক্ষণে সেইসব ধনাঢ্য মানুষের কাছে থাকা অর্থ-স্বর্ণ সবই জড়পদার্থে পরিণত হয়েছিলো। আবার গরীব মানুষ যাদের টাকাপয়সা- সোনাদানা নেই, যারা শুকনো ছাতু আর পানি নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিলো, তারা বেঁেচ গেছে। তিনি লিখেছেনÑ‘সেই সময় (১৯৪২ সাল) জাপানিরা সমস্ত বার্মা দখল করে ফেলেছে। তখন লক্ষ লক্ষ ভারতীয় যারা বার্মায় ব্যবসা, বাণিজ্য, চাকুরি এবং বিভিন্ন কাজে নিযুক্ত ছিল, তারা তাদের সবকিছু ফেলে জান নিয়ে পালিয়ে আসতে শুরু করে আসামে। জলপথ প্রথমেই জাপানিদের অধিকারে চলে যায়। তাই একমাত্র স্থলপথে হিমালয় পর্বতমালা অতিক্রম করে আসামের লক্ষিমপুর জেলার লিদু ও মার্গারিটা পৌঁছা ছাড়া এদের আর কোন উপায় ছিল না। কারণ বার্মা দখল হওয়ায় সেখানে বসবাসরত ভারতীয়রা উত্তরে আসামের দিকে সরে আসতে থাকে। তাদের আশা ছিল মিত্রশক্তি হয়তো কোন জায়গায় জাপানিদের রোধ করতে সক্ষম হবে। কিন্তু ধুরন্ধর ব্রিটিশরা তা করেনি বা করতে মনোযোগী হয়নি। ফলে ভারতীয়রা উত্তরে সরতে সরতে হিমালয়ের দুর্গম পাদদেশে মিচিনা পর্যন্ত চলে আসে। এখান থেকে ভারতের নিকটতম স্থান আসামে পৌঁছার একমাত্র উপায় হিমালয় পর্বত অতিক্রম করা। এটা যে কত দুর্গম ও দুরুহ কাজ তা চিন্তুা করার সময়ও তাদের ছিল না। ফলে এই পথে আসতে গিয়ে ৭০ থেকে ৮০ ভাগ ভারতীয়ই পথে মারা পড়ে। অনেক ধনবান ব্যক্তি টাকাকড়ি ও সোনাদানা নিয়ে এই পথে রওয়ানা হন। তাদের সেই সম্পদ তাদের বাঁচাতে পারেনি। কেবলমাত্র গরীব লোক যারা সংগে শুকনা ছাতু ও পানি নিয়ে রওয়ানা হয়েছিল, তারাই হিমালয়ের এই অঞ্চল (ভারত-বার্মা সীমান্ত)-এর দুর্গম ‘পাটকাই’ পর্বতমালা অতিক্রম করে আসামের লক্ষিমপুর জেলার লিদু ও মার্গারিটা পৌঁছাতে সক্ষম হয়।
‘মার্কিন বিমান বহরের মাধ্যমে ব্রিটিশদের উদ্ধারের পর কিছু সংখ্যক ভারতীয় নারী ও শিশুকে উদ্ধার করে মিচিনা থেকে দীনজান বিমান ঘাঁটিতে নিয়ে আসে। তাদেরও অধিকাংশই ছিল এংলো-বার্মিজ। ডিব্রুগড় শহরে তাদের জন্য শিবির খোলা হয়। এখান থেকে তাদেরকে নৌপথে ব্রহ্মপুত্র নদী দিয়ে কলকাতায় স্থানান্তর করা হয়। আমাকে এইসব শিবিরের শরণার্থীদের দেখাশুনার দায়িত্বে নিয়োজিত করা হয়। শরণার্থীদের তালিকা লিপিবদ্ধ করাই ছিল আমার প্রধান কাজ। তাদের সংখ্যা এক স্টিমারের উপযোগী হলেই কলকাতার পথে রওয়ানা করে দেওয়া হতো। শরণার্থী শিবিরগুলো কড়া প্রহরাধীন ছিল। স্থানীয় লোকদের সঙ্গে তাদের মেলামেশা করার কোন সুযোগ ছিল না। এর কারন একটাইÑযুদ্ধের পরাজয়ের কাহিনী ব্রিটিশরা স্থানীয় ভারতীয়দের শুনতে দিতে নারাজ। এদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে যুদ্ধের ভয়াবহতার অনেকটাই জানতে পেরেছি। সরাসরি বোমার আঘাতে যা ক্ষতি হয়, তারচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় বোমার ঝাঁকুনি ও শব্দে। বাড়িঘর ভেঙ্গে পড়ে। শব্দে অধিকাংশ শিশু কানের পর্দা ফেটে মারা যায়। বোমার শব্দে মানুষ পাগলের মতো ছুটতে গিয়ে প্রাণ হারায়। পায়ে হেঁেট যে সব শরণার্থী লিদু ও মার্গারিটায় পৌঁছেছিল তাদের কাহিনী আরোও করুণ। এমনও হয়েছে এক বন্ধু তার মৃত বন্ধুর পকেট থেকে টাকা কড়ি নিয়ে রওয়ানা হয়েছে, কিন্তু পথের ক্লান্তিতে কিছুক্ষণ পর সেও মারা গেছে।’
মুস্তান সিরুর রহমান চৌধুরী নিজের এইসব অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন তার পুলিশ বাহিনীতে পয়ত্রিশ বছর নামের আত্মজীবনীতে। ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দের পরবর্তী সময়ে তিনি আত্মজীবনী লেখায় হাত দেন। ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে আত্মজীবনীটি ছাপার উদ্যোগ নেয়া হলেও বইটি তিনি আর দেখে যেতে পারেননি। এর ৫/৬ মাস পরেই তিনি ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুর প্রায় চৌদ্দ বছর পর তার পুত্র মাহবুবুল আলম চৌধুরী পারিবারিক উদ্যোগে ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে আত্মজীবনীটি বের করেন।
দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ কতো তাড়াতাড়ি মানুষের জীবন পাল্টে দিয়েছিলো, আত্মজীবনীতে তার বর্ণনা এসেছেÑ‘শ্রমিক মজুরী বেড়ে যায় দশগুণ। সৃষ্টি হয় ভূইফোঁড় ঠিকাদারের। আলিগঞ্জ চা বাগানে আলিম নামে আমার এক বাবুর্চি সাত টাকা বেতনে কাজ করতো। সে কিছুদিন শ্রমিকের কাজ করে হয়ে যায় ঠিকাদার ও পরে লক্ষ লক্ষ টাকার মালিক। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ এইভাবে অনেকের ভাগ্য বদলিয়ে দেয়। টাকা পয়সার লেনদেন কল্পনাতীতভাবে বেড়ে যায়। সমাজদেহে এর প্রতিক্রিয়া হয় মারাত্মক। সামাজিক মূল্যবোধ এর অধঃপতন ঘটায় চরমভাবে। যে কোন উপায়ে অজস্র টাকা রোজগারই তখন নীতি হয়ে যায়। কোন ঠিকাদার একই কাজের বিলের টাকা তিনবার আদায় করে মাত্র এক বোতল বিলিতি মদের বিনিময়ে। M.E.S. বা Militery Engineering Service-এর উচ্চ পদস্থ ব্রিটিশ কর্মকর্তা যাদের দুর্নীতির কথা কখনও কল্পনা করা যায়নি, তারাও বিল পাশ করেছে মদের বোতল ও ঘুষের বিনিময়ে, দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ আমাদের দেশের অবক্ষয় ঘটিয়েছে এইভাবে।’
দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের সময় এক জেনারেলের যুদ্ধক্ষেত্র পরিদর্শণের বর্ণনা দিয়েছেন তিনিÑ‘১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দ প্রথমদিকে মার্গারিটা থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার জনাব আজির উদ্দিন আহমদ প্লুরোসি (Pluracy) রোগান্ত হলে তাকে দুই মাসের ছুটি দেওয়া হয়। সহসা কোন অভিজ্ঞ অফিসার না পাওয়াতে আমাকে অস্থায়ীভাবে সেখানে নিয়োগ দেয়া হয়। তখনও দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ চলছে। মার্গারিটা ঘাঁটি (Base) করে মিত্র শক্তির বার্মা পুনর্দখলের কাজ শুরু হয়েছে। এখানে প্রতিষ্ঠিত করা হয় M.E.S. 20th General hospital (২০তম হাসপাতাল) বিশাল এলাকা জুড়ে। অত্যাধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা ও সরঞ্জাম রাখা হয় এই হাসপাতালে। বার্মায় যুদ্ধে আহত সৈন্যদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয় এখানে। এই সময় মার্কিন জেনারেল স্টিলওয়েল সীমান্ত পরিদর্শণে আসেন। তিনসুকিয়া রেলজংশন থেকে একটি খোলা ট্রাক যাচ্ছিল ৬/৭ জন কৃষ্ণাঙ্গ সৈন্য নিয়ে। পথিমধ্যে ট্রাক থামিয়ে জেনারেল উঠে পড়েন ট্রাকে। পরণে সাধারণ সৈনিকের পোষাক। সৈন্যরা বিয়ার পান করছিল। জেনারেলও শরিক হয়ে যান তাদের সাথে। একই বোতল থেকে এক এক চুমুক বিয়ার খেয়ে তিনি আবার সৈন্যদের ফিরিয়ে দিচ্ছেন। তারা কেউ জানতেই পারলো না তিনি কে এবং কোথায় যাচ্ছেন। শুধু জেনারেলের দেহরক্ষীদের দু’টি জিপ ট্রাকখানার সামনে ও পিছনে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে তাকে সন্তর্পণে অনুসরণ করে চলছিল।’
পুঁিজপতিরা যে কতো ভয়াবহ মনোবৃত্তি পোষণ করে তা ফুটে উঠেছে তার বর্ণনায়Ñ‘যুদ্ধ শেষ হবার কারণে ডুমডুমার আশেপাশের সব মিলিটারি ক্যাম্প গুটিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হয়। সেনাবাহিনীর অস্ত্র ও গোলাবারুদ গর্ত করে তাতে ফেলে পুড়িয়ে ধ্বংস করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। দিনরাত এই কাজ চলতে থাকে কয়েক মাস যাবত। মার্কিন সৈন্যরা তাদের আসবাবপত্র, ফ্রিজ, পেট্রোমাক্স বাতি ইত্যাদি সব একত্র করে তার উপর দিয়ে ট্যাংক চালিয়ে সব ধ্বংস করে দেয়। কারণ ইংরেজ সরকারের কড়া নির্দেশ ছিল যাতে ঐ সকল বস্তু স্থানীয় ভারতীয়দের কাছে বিক্রি বা হস্তান্তর করা না হয়। কারণ ঐসব বস্তুর বিক্রেতা ইংরেজ কোম্পানিগুলো তাদের স্থানীয় বাজার হারাবে।’
ডিব্রুগড় থানায় দায়িত্ব পালনকালে একটি চুরির ঘটনা লিখেছেন। বলরাম নামের চোরকে ধরার পর চোরের কাছ থেকে বিশ ভরি সোনা উদ্ধার করেন। চোর জানায় বাকী সবটুকুন সোনা সে সেকরার (স্বর্ণকার) কাছে বিক্রি করেছে। মুস্তান সিরুর তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে যে মন্তব্য করেন, একজন চোরের প্রতিও পাঠককে সহানুভূতিশীল করে তুলেÑ‘বলরাম কথিত দুই সেকরার দোকান থেকে সোনা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। কারন সেকরারা ক্রয়কৃত সোনা সঙ্গে সঙ্গেই গলিয়ে ফেলে। এই সেকরারাই সোনা চুরিতে মূখ্য ভূমিকা পালন করে। তারা অপরাধীদের প্রলুদ্ধ করে স্বর্ণ চুরিতে উৎসাহ দেয় এবং চোরাই সোনা নামমাত্র দামে ক্রয় করে লাভবান হয়। ফলে চোর যত বেশী সোনা চুরি করুক না কেন সে গরীবই থেকে যায়। তার ঘরের চালে খড় থাকে না, বউয়ের গায়ে ছেড়া কাপড় ছাড়া অন্য কিছু জোটেনা। তাঙ্কিদার (চোরাই মালের ক্রেতা)-রা সব সময় অপরাধীদের আর্থিক চাপের মধ্যে রাখে যাতে সে তার ন্যূনতম সাংসারিক চাহিদা মিটাতে বার বার অপরাধে লিপ্ত হতে বাধ্য হয়। অনেক ক্ষেত্রে এরা অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে থাকে। উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারীদের সাথে উঠাবসা করে। মাঝে মাঝে রাজনীতির বুলি আওড়ায় আর নেপথ্যে অঙ্গুলি নির্দেশ করে সমস্ত অপরাধ জগৎ পরিচালনা করে, তাদের গায়ে আঁচড়ও পড়ে না। যত দুর্ভোগ তা হয় নিঃস্ব চোরদের। সে ধরা পড়ে। মার খায়, জেল খাটে এবং এককালে মারা যায়। তার বৌ, ছেলেমেয়েরা চোরের অপবাদ বহন করে অনাহারে, অর্ধাহারে কালাতিপাত করে।’
দেশভাগ কতো শতো ঘটনার জন্ম দিয়েছিলো, তার কতোটুকুন লেখা হয়েছেÑ‘তখনকার আলোচিত স্লোগান ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ অনেকের মতো আমার কাছেও প্রিয় ছিল। তাই সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়াতে পাকিস্তানে আসার জন্যে অতি তাড়াহুড়ো করে ১২ই আগস্ট ১৯৪৭ সালে আমার তখনকার কর্মস্থল আসামের ডিব্রুগড় থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে যাত্রা করি যেন ১৪ ই আগস্টের পূর্বেই নুতন দেশ পাকিস্তানে পৌঁছাতে পারি। তখন আমার স্ত্রী অন্তস্বত্তা এবং প্রসবকাল প্রায় উপস্থিত। এই সময় ডিব্রুগড় থেকে সিলেট প্রায় ৫০০ মাইল পথ ট্রেনে অতিক্রম করা মোটেই সহজ ছিল না। কিন্তু সে সব খেয়াল করার সময় কোথায়? তাই আমার দ্বিতীয় পুত্র রেফাত আলম ট্রেনের স্টেশনেই জন্মলাভ করে নিতান্ত অসময়ে।’
দেশ ভাগের পর ভারত থেকে পূর্ববঙ্গে আসা মানুষের দুর্গতির চিত্র আমাদের সাহিত্যে খুব কমই এসেছে। একজন পুলিশ কর্মকর্তা প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে পূর্ববঙ্গে আসা মানুষের দুর্গতির বর্ণনা দিয়েছেন এবং একইভাবে বর্ণনা দিয়েছেন পূর্ববঙ্গ থেকে আতংকিত মানুষের দেশত্যাগেরÑ‘জলপাইগুড়ি জেলাতে মুসলমানগণ সংখ্যালঘু হলেও তাদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ও প্রতিষ্ঠাবান অনেকে ছিলেন। এদের অন্যতম নবাব মোসাররফ হোসেন গং সহ কয়েকজন চা-বাগান মালিক কংগ্রেস ভাবাপন্ন ও দেশ বিভাগের বিরোধী ছিলেন। তাদের আশা তারা অন্তত ভারতে শান্তিতে বসবাস করতে পারবেন। কিন্তু তাদেরও শেষ রক্ষা হয়নি। অবশেষে তারাও ভারত ছেড়ে পূর্ব পাকিস্তানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। দাঙ্গা যদিও ১৯৪৬ সাল থেকে শুরু হয় তবে তা তীব্র আকার ধারন করে ১৯৫০ সালের শুরুর দিকে। দলে দলে মুসলমানেরা ঘরবাড়ি বিষয় সম্পত্তির মায়া ত্যাগ করে শুধু প্রাণটুকু নিয়ে আশ্রয় নেয় রংপুর দিনাজপুর ও পাশর্^বর্তী জেলাগুলোতে। এসব শরণার্থীদের জন্য দিনাজপুর জেলার সীমান্ত থানা পঞ্চগড়ে আশ্রয়শিবির স্থাপন করা হয়। এমনি সময় দেবীগঞ্জ থানার উত্তরে ভাওলাগঞ্জ হাটের নিকটবতী ২/৩ গ্রামের পাঁচ শতাধিক হিন্দু পরিবার এক রাতের অন্ধকারে ঘরবাড়ি বিষয় সম্পত্তি ছেড়ে ভারতের পথে পাড়ি জমায়। যাত্রাপথে পাটগ্রাম ও বুড়িমারি চেকপোস্টের নিকট তাদের থামিয়ে পূর্ণ নিরাপত্তার আশ^াস দিয়ে নিজ গ্রামে ফিরে যাবার অনুরোধ করা সত্বেও কাজ হয়নি। ঘটনার খবর পেয়ে আমি গ্রামগুলোতে গিয়ে অবাক হয়ে যাই। সুন্দর পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন ঘরবাড়িÑ গোলাভরা ধান, বস্তাবন্দী চাল, গোয়াল ভরা গরু-ছাগল সবই আছে, কেবল গৃহস্বামী নিরুদ্দেশ। আমার কাজ অনেক বেড়ে যায়। একটা নিরাপদ বাড়িতে ছাউনি করি। দুইশত আনসার তলব করে পরিত্যক্ত বাড়িগুলি থেকে ধান চাল গরু ছাগল একত্রিত কে তালিকাভুক্ত করে তা পাহারার ব্যবস্থা করি। এভাবে পল্লীবাসীদের গৃহত্যাগী হওয়ার কোন কারণ আমি খুঁজে পাই নাই। গ্রামগুলো নিরঙ্কুশ হিন্দু অধ্যুষিত। আমি হলপ করে বলতে পারি কোন মুসলমান এদের কেশ স্পর্শ করে নাই। মানসিক ব্যধিজনিত উন্মাদনা ছাড়া এর কোন কারন খুঁজে পাওয়া যায় না। গ্রামের কোন মাতব্বর হয়তো পঞ্চগড় আশ্রয় শিবির দেখে থাকবে এবং ভারতীয় মুসলিমদের উপর নির্যাতনের কাহিনী শুনে তাদের উপর অনুরুপ নির্যাতনের আশংকায় বুদ্ধিহারা হয়ে এমন বিপদসংকুল পথে তারা পা বাড়িয়েছে।’
পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসা কর্মকর্তাদের মানসিকতাও তিনি বর্ণনা করেছেনÑ‘ পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভের পরও এরকম মনেবৃত্তি পুরোপুরি চালু ছিল। তারা মনে করতেন পূর্ব পাকিস্তান বিজিত রাজ্য বা মালে গনিমত। সুতরাং এ দেশবাসী তাদের খেদমতে হাজির থাকা চাই। এরূপ মনেবৃত্তির পেছনে গোয়ার্তুমি ছাড়া আর কি থাকতে পারে? কোন সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিই অস্বীকার করতে পারবেন না যে পাকিস্তান স্বাধীনতা আন্দোলনের উন্মেষ ঘটে পূর্ব পাকিস্তানেই। মুসলিম লীগ যার জন্মভূমি ঢাকা, এই মুসলিম লীগের মাধ্যমেই অর্জিত হয় পাকিস্তান। স্বাধীনতা আন্দোলনে পূর্ব পাকিস্তানবাসীর অবদান অনেক অনেকগুণ বেশী। দেশ বিভাগের ফলে উপরস্থ কর্মকর্তার অভাব ঘটেছিল তাই পশ্চিম পাকিস্তান থেকে যোগ্য অযোগ্য যে কোন লোক দিয়ে উচ্চ পদগুলি দখল করে নেওয়া হয়। এ যেন সাদা চামড়া আর কালা আদমির ব্রিটিশ মনোবৃত্তির পুনরাবৃত্তি।’
চমৎকার একটি অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন তিনিÑ‘এখানে একটি কথা বলার চেষ্টা করি। তা হলো দেশের সাধারণ মানুষের বিশ^াস, নিজের ঘরে বন্দুক থাকলে অপরাধীদের প্রতিহত করা যায়। কিন্তু আমার দীর্ঘ ৩৫ বৎসরের অভিজ্ঞতায় এমন একটি নজিরও পাইনি যাতে নিজস্ব বন্দুক দিয়ে ডাকাত প্রতিহত করা গেছে। তবে বিত্তবানরা মানসিক দুশ্চিন্তা থেকে বন্দুকের কারনে কিছুটা মুক্ত থাকেন এটা ঠিক। ডাকাতরা বন্দুকওয়ালা বাড়িতে বন্দুক নিস্ক্রিয় না করা পর্যন্ত আক্রমন করে না। তাই বন্দুক থাকা বাড়িতে ডাকাতির আশংকা কিছুটা কম। কিন্তু যখন আক্রমন হয় তখন তা হয় ভয়াবহ এবং প্রাণঘাতি।’
মুস্তান সিরুর রহমান চৌধুরীর জন্ম ১৯১৮খ্রিষ্টাব্দে সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলার ফুলবাড়ি গ্রামে। তিনি ১৯৩৯ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত পয়ত্রিশ বছর ক্রমান্বয়ে ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে বিভিন্ন পদে কর্মরত ছিলেন এবং পুলিশ সুপার হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি ২০০০ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ শে মার্চ সিলেট শহরের একটি ক্লিনিকে ইন্তেকাল করেন।

 

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বালাগঞ্জের বাতিঘর বাংলাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়
  • বঙ্গবন্ধু ও গান্ধীজী
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক ছিলেন ‘মেশিনম্যান’
  • একটি যুদ্ধ : একটি শতাব্দী
  • বালাগঞ্জের প্রাচীন জনপদ শিওরখাল গ্রাম
  • ভাটিপাড়া
  • সময়ের সোচ্চার স্বর সোমেন চন্দ
  • বঙ্গবন্ধুর সিলেট সফর ও কিছু কথা
  • বায়ান্নতেই লিখেছিলেন ‘ঢাকাই কারবালা’
  • জীবনের শেষক্ষণে অর্থ-স্বর্ণ সবই জড়পদার্থ
  • কমরেড বরুণ রায়
  • বঙ্গবন্ধু ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
  • নারী ভাষাসৈনিকদের কথা
  • মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবীর ওসমানী
  • ভাটির বাতিঘর সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ
  • মাওয়ের লংমার্চের ৪ বছর পর সিলেটিদের লং মার্চ
  • শহীদ মিনারের ইতিকথা
  • সিলেটের লোকসংগীত : ধামাইল
  • পর্যটক ইবনে বতুতার কথা
  • বই এল কোথা থেকে?
  • Image

    Developed by:Sparkle IT