ধর্ম ও জীবন

মসজিদের পবিত্রতা ও সৌন্দর্য রক্ষা

নওরোজ জাহান মারুফ প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-০৩-২০২০ ইং ২৩:৫০:৩৪ | সংবাদটি ১৮০ বার পঠিত

বাংলাদেশ মুসলিম প্রধান দেশ। এই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় মুসলিম। দেশে আড়াই লক্ষেরও বেশী মসজিদ রয়েছে। শহর, নগর, গ্রাম-গঞ্জের এইসব মসজিদগুলোতে প্রতিদিন হাজার হাজার মুসল্লির আগমন ঘটে। ধর্মীয় বিধান মতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত মসজিদে গিয়ে আদায় করার নিয়ম। প্রতিদিন মুসল্লিরা মসজিদে যাতায়াত করার সুযোগ পান এবং জামাতের সাথে সালাত আদায় করেন। আমাদের ইসলাম ধর্মে কিছু কিছু নিয়ম মানার উপর জোর তাগিদ দেয়া হয়েছে। আজকে মুসল্লি ও ইমামদের অনিচ্ছাকৃত কিছু ভুল প্রায়ই হয়, যা সংশোধন করে নিলে সঠিকভাবে সালাত কায়েম ও মসজিদের পবিত্রতা, আদব-কায়দা ও সালাতের সৌন্দর্য আরো অনেকগুণ বেড়ে যাবে।
ইয়াংজেনারেশন ছাড়াও বয়োবৃদ্ধ অনেক লোক আছেন যারা মসজিদে সামনের কাতার খালি থাকার পরও সামনের সারিতে যেতে চান না। তারা নামাজের একামত শেষ হওয়ার পরও সামনের কাতার পুরা না করে পিছনের সারির কাউকে সামনে যেতে বলেন! কেন তারা সামনে যেতে অপারগ সেটা বুঝা মুসকিল। আবার অনেক মুসল্লি আছেন যারা সব সময় সামনের কাতারে নামাজ পড়েন বিধায় কোন দিন দেরীতে মসজিদে এলে দেখবেন বসে থাকা সব মুসল্লিদের ডিঙ্গিয়ে সামনের দিকে যেতে থাকেন। সামনে যায়গা থাকুক বা না থাকুক, তিনি সামনে যেতেই থাকেন ভেজা জুতা, সেন্ডেল মানুষের ঘাড়ে পিঠে লাগিয়ে!
তাদের ভাবখানা তখন এমনি হয় যেন পিছনের সারিতে নামাজ আদায় করলে নামাজ সহীশুদ্ধ হবে না। তারা কোন মতেই মানতে চান না যে ছোট বড় কারোর ঘাড়ে, পিঠে হাত দিয়ে এভাবে সামনে আসন নেয়া অনুচিত। মসজিদের আদব হল যেখানে খালি জায়গা সেখানেই আসন গ্রহণ করা। অনেকেই এই নিয়মটি মানেন না। শুক্রবার জু’মার সালাতের কারণে সব মসজিদগুলোতে মুসল্লির সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। আপনি দেখবেন মসজিদ কয়েক তলা বিল্ডিং হলে উপরে সিঁড়ি বেয়ে উটার সময় সিঁড়ির সামনেই কেউ কেউ সুন্নত বা নফল নামাজ পড়তে লেগে যান। তিনি বে-মালুম ভুলে যান যে তার এখানে নামাজে দাঁড়ালে অন্য মুসল্লির উপর তলায় যাওয়ার আর কোন পথ খোলা নেই। বাধ্য হয়ে মুসল্লিগণ ঐ নামাজরত ব্যাক্তির সামনে দিয়েই উপরে উঠতে থাকেন। সালাতরত নামাজীর সামনে দিয়ে হাঁটা-চলা ইসলামে কড়া নিষেধ আরোপ করা আছে। তা সত্ত্বেও মানুষ নামাজির সামনে অহরহ চলাফেরা করেন।
হাদিস শরীফে উল্লেখ আছে ৪০ বৎসরও যদি দাঁড়িয়ে থাকতে হয় থাকবেন তবুও নামাজরত মুসল্লির নামাজের সামনে দিয়ে যেতে পারবেন না! এমন পারমিশন ইসলাম দেই নাই। ইসলামে কঠোর নিষেধ আরোপ করা হয়েছে এ ব্যাপারে। আমরা দেখি অনেক বয়স্ক লোক, পাকনা দাড়িওয়ালা লোক, এমনকি জ্ঞানী লোকও ২/১ মিনিট ধৈর্য্য না ধরে নামাজরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে হেঁটে চলেন। সঠিক জ্ঞানের অভাবই হল এর কারণ। এগুলা বড় গুনাহের কাজ এবং এগুলি নামাজের সৌন্দর্যের হানী ঘটায়।
লক্ষ করে দেখবেন কেউ কেউ ইমাম সাহেব নামাজ শুরু করার পূর্বেই (তাকবির বলার আগে) নামাজের রাকাত বেঁধে নেন। কেউ কেউ ইমাম সাহেবের আগে রুকু, সেজদায় চলে যান। এ গুলি অত্যান্ত দৃষ্টিকটু ব্যাপার এবং বড় গুনাহের কাজ। এরা যে খুবই ধর্মান্ধ বা উগ্র তা কিন্তু নয়। এ ভুলগুলি সচেতনতা বা খেয়ালের অভাবেই করেন তারা। সবাই জানেন মসজিদে দুনিয়াদারীর কথা বলা নিষেধ। অথচ একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যায় যে, দু‘জন পরিচিত লোক এক হলেই গল্প শুরু করে দেন। অনেকে মোবাইলে জোরে জোরে কথা বলেন। এগুলি পরিহার করা দরকার। মসজিদে প্রয়োজন ছাড়া দুনিয়াদারীর কথা বললে ৪০ বৎসরের ইবাদত হয়ে যায়। এমন হাদিসের কথাও আমরা জানি। তারপরও আমরা মুখ বন্ধ করে থাকতে পারি না। একটু চেষ্টা বা খেয়াল করলেই মসজিদের আদব, পবিত্রতা এবং সৌন্দর্য রক্ষা করা যায়। মসজিদে প্রবেশে ডান পা বেরুতে বাম পা আগে দিতে হয় এগুলাও অনেক মুসল্লিকে মানতে দেখি না। মসজিদে প্রবেশ করে প্রথমেই ২ রাকাত দুখুলিল মসজিদ নামাজ আদায়ের জরুরতের কথা আমরা জানি। এই দুই রাকাত নামাজ খুবই ফজিলতপূর্ণ। এই নামাজকে মসজিদের হক বলা হয়। এই নামাজ আদায় না করে মসজিদে বসার পারমিশন নাই।
অথচ আমরা খেয়াল করলে দেখতে পাই অধিকাংশ মুসল্লিগণ এই নামাজ আদায় করেন না। এতই মর্তবাপূর্ণ এই সালাতের কথা কখনো মসজিদে ইমাম সাহেব জোর দিয়ে বলতে শুনিনি! প্রতি শুক্রবারে ইমামগণের উচিৎ বয়ানের সময় মুসল্লিদের এ ব্যাপারে জানিয়ে দেয়া। অনেক শুক্রবারে বয়ানের সময় খেয়াল করেছি কিন্তু দুঃখের বিষয় ইমামগণ এরকম কোন কথা বলতে শুনা যায় নি।
মসজিদে সিঁড়ি দিয়ে উপরের তলায় উঠার সময় ‘আল্লাহুয়াকবার’ নামার সময় ‘সুবহানাল্লাহ’ পড়ার বিধানের কথা সিঁড়িতে লেমিনেটিং কাগজে লিখা থাকলেও সম্ভবত কেউ এটা ফলো করেন বলে মনে হয় না। সবাই দল বেঁধে উপরে উঠেন, নামেন নানান গল্প করতে করতে। মসজিদের ভিতরে জুতা,সেন্ডেলের স্তুপ খুবই দৃষ্টিকটু লাগে। অনেক সময় দেখা যায় জুতা সেন্ডেল অপরিস্কার বা ভেজা এই কারণে মসজিদের ফ্লোর নোংরা হয়, অপবিত্র হয়। অনেকে মসজিদের প্রবেশ পথে দেখা যায় জুতা, সেন্ডেল রেখে চলে যান। এগুলি অন্য মানুষের চলাচলে ব্যাঘাত ঘটায়। মসজিদে প্রয়োজনে পাতলা পলিথিন ব্যাগে ভরে জুতা সেন্ডেল নেয়া যেতে পারে। বর্তমান জামানায় মোবাইলফোন নিত্যসঙ্গি মানুষের।
নামাজ শুরুর পূর্বে ইমাম সাহেব মোবাইল সুইচ বন্ধ করার ঘোষণা দিলেও মানুষের বে-খেয়ালের দরুন মোবাইল সুইচ অফ করা হয় না, এতে নামাজের সময় কল চলে আসে, ফলে অন্য মুসল্লিরা চরম বিরক্তিভাব প্রকাশ করেন। তাছাড়া এতে নামাজরত মানুষের নামাজের একাগ্রতা ও মনযোগ বিনষ্ট হয়। এগুলা খেয়ালের বিষয়। অনেকে তাড়াহুড়ার কারণে মসজিদে ওযুর শেষে টেপ বন্ধ করতে বে-মালুম ভুলে যান। এবং দীর্ঘক্ষণ নিয়ে অযু করার কারণে অনেক পানির অপচয় করেন। এগুলি সামান্য খেয়াল করলেই হয়। মসজিদের প্রবেশ মুখে প্রায়ই দেখা যায় মানুষে গল্প-গুজব শুরু করে দেন। এতে জটলার সৃষ্টি হয়। এই জটলার কারণে মসজিদে প্রবেশে বা বেরুতে মুসল্লির অনেক কষ্ট হয়। এগুলি মসজিদের পবিত্রতা ও সৌন্দর্য বিনাশ করে। এ অভ্যাস পরিহার করা জরুরি। একটু খেয়াল করে চললে এই দিক গুলি সহজেই বদলানো যায়। একটু সুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি পরিবেশকে অনেক সুন্দর করতে পারে। এই গুলি কাউকে বলে দিতে হবে কেন? এ গুলি কমনসেন্সের ব্যাপার। এইসব পরিহার করা জরুরি।
জু’মার খুৎবার সময় সব ধরনের কথা বলা নিষেধ জানার পরও খুৎবার সময় গল্প-গুজবে মেতে উঠেন অনেকেই। ইসলামে কড়া নিষেধ খুৎবার সময় কথা বলা এমন কি আপনি কাউকে ইশারাও করতে বারন। খুৎবার সময় কথা বলা নিষেধ এই কথা বলাও নিষেধ! মসজিদের ভিতরে দুনিয়াদারী আলাপ আলোচনা করা থেকে বিরত থাকার জন্য মসজিদের ওয়ালে লিখা আছে তার পরও কিছু মুসল্লি কথা বলা থেকে বিরত থাকেন না। প্রায়ই দেখা যায় বাচ্ছারা সামনের সারিতে থাকলে তাদের পিছনে ঠেলে দেয়া হয়। এটা কেন করেন কিছু মুসল্লি আমার বোধে আসেনা।
এগুলো পরিহার করা প্রয়োজন। বড়রা এরকম আচরণ করলে বাচ্চারা মসজিদে আসার উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে। আরেকটি জিনিষ অত্যান্ত খারাপ লাগে-গরমের সময় হলে অনেকেই মসজিদে ফ্যানের সুইস দিতে গিয়ে বারবার সবগুলো সুইসে টিপাটিপি করেন এতে মুসল্লিগণের একাগ্রতা ও মনযোগ বিঘিœত হয়। এসব পরিহার করতে হবে। এইসব নামাজের সৌন্দর্যের পরিপন্থি।
ইমাম সাহেব বয়ান শুরু করলে আর রক্ষা নাই। অনেক সময় দেখা যায় চিৎকার তারা বয়ান করেন। এক কথা বারবার বলেন। মনে করেন যত বড় গলায় বারবার বলা যাবে ততই তিনি বড়ই বক্তা! বয়ানের সময় তারা অনেকেই মনগড়া কথা বলেন, অযৌক্তিক কথা বলে বেসামাল হয়ে যান। দম বন্ধ করে জোরে কথা বলায় অনেক সময় শরীর খারাপ হতে পারে। নামাজের পরে লম্বা দোয়া মোটেই ঠিক কাজ নয়। ফরজ নামাজের পরে ইমামের নয় নিজের ইচ্ছামত মনের মাধুরী মিশায়ে দোয়া করার নিয়ম। আমাদের দেশে নামাজের শেষে ইমামের দোয়া করা রেওয়াজ হয়ে গেছে। দোয়া করা না হলে মনে করা হয় নামাজ হয়নি যেন সবই বৃথা।
বেশির ভাগ মসজিদের মাইক সিষ্টেম ঠিক নয়। মসজিদের প্রত্যেকটি তলায় গেলে অবাক না হয়ে পারা যায় না। অত্যন্ত নয়েজ হয় প্রতিটি ফ্লোরে। শুক্রবারে বয়ান হলে এটা যে বয়ান বুঝার উপায় নেই। অনেক সময় খুৎবার কোন কিছু বুঝা যায় না উচ্চ শব্দের কারণে। শুধু বয়ান নয় খুৎবা বা ক্বেরাত পাঠের সময়ও ঝন্ঝন্ শব্দ হয়, কানে টাসকি লাগে। এ কারণে নামাজির মনযোগ বিনষ্ট হয়, বিরক্তির ভাব উদয় হয়। প্রতিটি ফ্লোরে এমন অবস্থা দেখার কেউ নেই। একটু খেয়াল করে সুইচ কন্ট্রোল করলে এমন বিশ্রী অবস্থার সৃষ্টি হত না।
আমার এলাকার মসজিদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি এবং কর্তৃপক্ষকে বারবার বলার পরও মাইকের উচ্চ আওয়াজ নিয়ন্ত্রণে আনা হয়নি। এগুলি শুধু নামাজের সৌন্দর্য নষ্ট করে তা শুধু নয় এগুলি মসজিদের আদব ও পবিত্রতা বিনষ্ট করে। উচ্চ শব্দের কারণে মুসল্লির শ্রবণেন্দ্রিয়ের মারাত্মক ক্ষতি হয়। অনেক সময় মাথা ঝিমঝিম করে। কর্তৃপক্ষের উচিত প্রতিটি ফ্লোরে সব কাজের সাথে মাইকের শব্দ নিয়ন্ত্রণে আছে কি না এইগুলোর খোঁজ নেয়া। এইগুলো মসজিদের পবিত্রতা ও সৌন্দর্যের সাথে মানায় না।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT