ধর্ম ও জীবন

জিকিরেই মানবাত্মার শান্তি

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-০৩-২০২০ ইং ২৩:৫৩:৩৭ | সংবাদটি ১৪৪ বার পঠিত

আল্লাহর জিকির করা, আল্লাহকে স্মরণ করা, আল্লাহকে ডাকা সবচেয়ে বেশি পুণ্যের কাজ। আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমেই মানুষ তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করে। মনুষ্যত্ব বিকাশের প্রধান মাধ্যম হচ্ছে আল্লাহর জিকির। আল্লাহর জিকির করেই মানুষ পরম শান্তি খুঁজে পায়। আল্লাহর জিকিরেই রয়েছে মানবাত্মার প্রকৃত শান্তি। আল্লাহর জিকিরের অশেষ ফজিলত বিষয়ক কয়েকখানা আয়াত হচ্ছে এইÑ
‘জেনে রাখ, আল্লাহর জিকিরেই অন্তর প্রশান্তি লাভ করে’ (সূরা রা’দ : আয়াত-২৮)।
‘বেশি বেশি করে তোমার প্রতিপালকের জিকির কর এবং সকাল-সন্ধ্যা তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর’ (সূরা আল-ইমরান : আয়াত-৪১)
‘মুমিন তো তারাই যাদের হৃদয় কম্পিত হয় যখন আল্লাহর জিকির করা হয় এবং যখন তাঁর আয়াত তাদের নিকট পাঠ করা হয়, তখন উহা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং তারা তাদের প্রতিপালকের উপর নির্ভর করে’ (সূরা আনফাল : আয়াত-২)
‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন কোন দলের সম্মুখীন হবে তখন অবিচলিত থাকবে এবং বেশি বেশি করে আল্লাহর জিকির করবে, যাতে তোমরা সফলকাম হও’ (সূরা আনফাল : আয়াত-৪৫)
‘বল, তোমরা ‘আল্লাহ’ নামে আহবান কর বা ‘রাহমান’ নামে আহবান কর তোমরা যে নামেই আহবান কর সকল সুন্দর নামই তো তাঁর’ (সূরা বনি ইসরাঈল : আয়াত-১১০)
‘আপনি নিজেকে তাদের সাথে পাবন্দ করে রাখুন যারা সকাল-সন্ধ্যা আপন প্রতিপালককে তাঁরই সন্তুষ্টির জন্য ডাকে’ (সূরা কাহাফ : আয়াত-২৮)
‘আমার জিকিরে তোমরা অলসতা করিও না’ (সূরা ত্বাহা : আয়াত-৪২)।
‘সুসংবাদ দাও সেই বিনয়ী লোকদেরকে, যাদের অন্তর আল্লাহর জিকিরে আল্লাহর ভয়ে কেঁপে উঠে’ (সূরা হজ্ব : আয়াত ৩৪-৩৫)।
‘সেই সব লোক, যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর জিকির হতে এবং সালাত কায়েম ও যাকাত প্রদান হতে বিরত রাখতে পারে না, তারা ভয় করে সেই দিনকে যেইদিন তাদের অন্তর ও দৃষ্টি বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে’ (সূরা নূর : আয়াত-৩৭)
‘আল্লাহর জিকিরই সর্বশ্রেষ্ঠ’ (সূরা আনকাবুত : আয়াত-৪৫)
‘সে যদি আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা না করতো তাহলে তাকে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত থাকতে হতো উহার উদরে’ (সূরা সাফফাত : আয়াত ১৪৩-১৪৪)
‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা অধিক পরিমাণে আল্লাহর জিকির করবে এবং সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করবে’ (সূরা আহযাব : আয়াত ৪১-৪২)
‘আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও অধিক স্মরণকারী নারীদের জন্য আল্লাহ রেখেছেন ক্ষমা ও মহা-প্রতিদান’ (সূরা আহযাব : আয়াত-৩৫)
‘তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখেরাতকে ভয় করে এবং অধিক পরিমাণে আল্লাহর জিকির করে তাদের জন্য রাসুলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ’ (সূরা আহযাব : আয়াত-২১)
‘যে ব্যক্তি আল্লাহর স্মরণে বিমুখ হয় আমি তার জন্য নিয়োজিত করি এক শয়তান, অতঃপর সেই হয় তার সহচর’ (সূরা যুখরুফ : আয়াত-৩৬)
‘ঈমানদারদের জন্য কি ইহার সময় আসে নাই যে, আল্লাহর জিকিরের জন্য তাদের অন্তরসমূহ ঝুঁকে পড়বে’ (সূরা হাদীদ : আয়াত-১৬)
‘তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমি তোমাদেরকে স্মরণ করব’ (সূরা বাকারা : আয়াত-১৫২)
‘আহবানকারী যখন আমাকে আহবান করে আমি তার আহবানে সাড়া দেই’ (সূরা বাকারা : আয়াত-১৮৬)
‘যখন তোমরা সালাত সমাপ্ত করবে তখন দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে আল্লাহর জিকির করবে’ (সূরা নিসা : আয়াত-১০৩)
‘আমি আমার প্রতিপালককে আহবান করি : আশা করি, আমার প্রতিপালককে আহবান করে আমি ব্যর্থকাম হবো না’ (সূরা মরিয়ম : আয়াত-৪৮)
‘যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের জিকির হতে বিমুখ হয় তিনি তাকে দুঃসহ শাস্তিতে প্রবেশ করাবেন’ (সূরা জিন্ন : আয়াত-১৭)
‘যখন সালাত সমাপ্ত করবে তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করবে ও অধিক পরিমাণে আল্লাহর জিকির করবে যাতে তোমরা সফলকাম হও’ (সূরা জুমআ : আয়াত-১০)
‘তুমি তোমার প্রতিপালকের নাম স্মরণ কর এবং একনিষ্ঠভাবে তাতে মগ্ন হও’ (সূরা মুজাম্মিল : আয়াত-৮)
‘নিশ্চয়ই সাফল্য লাভ করবে যে পবিত্রতা অর্জন করবে এবং তার প্রতিপালকের নাম স্মরণ করে ও সালাত আদায় করে’ (সূরা আ’লা : আয়াত ১৪-১৫)
তোমরা বিনীতভাবে ও গোপনে তোমাদের প্রতিপালককে ডাক: তিনি সীমা লংঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না’ (সূরা আরাফ : আয়াত-৫৫)
‘উত্তম নামসমূহ আল্লাহরই : তোমরা তাঁকে সেই সব নামেই ডাকবে’ (সূরা আ’রাফ : আয়াত-১৮০)
‘তোমার প্রতিপালককে মনে মনে সবিনয় ও সশংকচিত্তে অনুচ্চস্বরে প্রত্যুষে ও সন্ধ্যায় স্মরণ করবে এবং তুমি উদাসীন হবে না’ (সূরা আ’রাফ : আয়াত-২০৫)। ‘আমার স্মরণার্থে সালাত কায়েম কর’ (সূরা ত্বাহা : আয়াত-১৪)।
আল্লাহর জিকিরেই মানবাত্মা প্রকৃত শান্তি লাভ করে। জিকিরের মহিমা ও ফজিলত সম্পর্কে অগণিত হাদীস রয়েছে। জিকিরের ফজিলত বিষয়ক কয়েকখানা হাদীস হচ্ছে :
হযরত মা’আজ ইবনে জাবাল (রা.) বর্ণিত হাদীসে, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘কবরের আজাব থেকে মুক্তি লাভের জন্য আল্লাহর জিকিরের চেয়ে উত্তম আমল আর নেই’ (আহমদ)।
হযরত আয়শা (রা.) হতে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন ‘জিকরে খফী’ (গোপনে জিকির) যা ফেরেস্তারাও শুনতে পায় না ইহার সাওয়াব সত্তরগুণ বেশি’ (মুসনদে আবুল ইয়ালা)। উক্ত হাদীসে গোপনে জিকির করার ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, আল্লাহপাক বলেছেন-তুমি ফজর ও আসরের নামাজের পর সামান্য সময় আমার জিকির কর। আমি মধ্যবর্তী সময়ের মধ্যে তোমার যাবতীয় প্রয়োজন পূর্ণ করে দেব’ (আহমদ)।
হযরত আনাস (রা.) বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে সমস্ত লোক আল্লাহর জিকিরের জন্য একত্রিত হয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হয়, তখন আসমান হতে এক ফেরেস্তা ঘোষণা করে যে, তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে এবং তোমাদের গুনাহ সমূহকে নেকী দ্বারা বদলে দেয়া হয়েছে’ (আহমদ, তাবরাণী)।
জিকিরের উপকারিতা বর্ণনা করে শেষ করা যাবেনা। আল্লাহর জিকিরের কয়েকটি উপকারিতা নি¤েœ উপস্থাপন করা হলো :
(১) জিকির আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের একমাত্র উপায়। (২) আল্লাহর মারিফতের দরজা খুলে যায়। (৩) আল্লাহর জিকির জান্নাতের চারাগাছ। (৪) আল্লাহর জিকির ইলমে তাসাউফের মৌলিক বিষয়গুলোর মূল। (৫) জিকির শোকরের মূল। (৬) জিকির অন্তরের যাবতীয় রোগের চিকিৎসা। (৭) জিকির দ্বারা সকল কষ্টকর কাজ সহজ হয়। (৮) জিকির দ্বারা মুনাফিকী থেকে মুক্তি লাভ করা যায়। (৯) ফেরেস্তারা জিকিরকারীর জন্য দোয়া করে। (১০) জিকিরের মজলিস হল ফেরেস্তাদের মজলিস। (১১) জিকিরকারী হেসে হেসে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (১২) জিকির দ্বারা কবর আলোকিত হয়।
(১৩) জিকিরের বরকতে জবান সকল প্রকার অনর্থক কথা হতে হেফাজতে থাকে। (১৪) জিকির অন্তরকে জিন্দা রাখে। (১৫) জিকির দ্বারা মোরাকাবা নসীব হয়। যা জিকিরকারীকে ইহসানের স্তরে পৌঁছিয়ে দেয়। (১৬) জিকির মনের দুশ্চিন্তা দূর করে। (১৭) জিকির হলো অন্তর ও রূহের খোরাক। (১৮) জিকির দ্বারা মারিফতের ফল ধরে থাকে। (১৯) জিকির দ্বারা অন্তরের কঠোরতা দূর হয়। (২০) জিকিরকারীদের নিয়ে আল্লাহপাক ফেরেস্তাদের সাথে গর্ব করেন। (২১) আল্লাহর সাথে বন্ধুত্বের প্রধান মাধ্যম হলো জিকির। (২২) জিকির অন্তরের মরিচা দূর করে। (২৩) জিকিরের মাধ্যমে হজ্ব, ওমরা, জিহাদের সাওয়াব পাওয়া যায়। (২৪) জিকিরের দ্বারা জান্নাতে ঘর নির্মাণ করা হয়। (২৫) জিকির জাহান্নামের দেয়াল স্বরূপ।
জিকিরের পূর্ণ উপকারিতা পেতে হলে জিকিরের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে। প্রশিক্ষণ ছাড়া জিকিরের পূর্ণ স্বাদ পাওয়া যায় না।
আল্লাহর জিকিরের পূর্ণ স্বাদ ও উপকারিতা পেতে হলে জিকিরের প্রশিক্ষণের জন্য ইলমে শরীয়ত ও ইলমে মারিফতে অগাধ পান্ডিত্যের অধিকারী আলেমের দ্বারস্থ হওয়া অতি প্রয়োজন। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহপাক বলেন, ‘আমি আমার বান্দার সাথে থাকি যতক্ষণ সে আমার জিকির করতে থাকে।’
অন্য হাদীসে বলেছেন, ‘আমার জিকিরকারীগণ আমার আপনজন, তাদেরকে আমি কখনও আমার রহমত থেকে দূরে সরাই না।’ অভিজ্ঞ আলেমের দ্বারস্থ হয়ে জিকিরের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করত: সর্বাবস্থায় আল্লাহর জিকিরে মগ্ন থাকা আমাদের সকলের উচিত।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT