সাহিত্য

কবি আবুল হাসান

মুস্তাফিজ সৈয়দ প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০৩-২০২০ ইং ০০:৫৪:০৮ | সংবাদটি ৩০০ বার পঠিত

১৯৪৭ এবং এর পরবর্তী প্রেক্ষাপটে আমাদের জাতীয় জীবনে চলছিল দু:সহ যন্ত্রণার কঠিন পাথরসম লগ্ন। ৪৭ সালেই উপনিবেশ শাসনের অবসান হয়। দেশভাগ হয়ে জন্ম হলো এশিয়া উপমহাদেশের অন্যতম দুটি পরাশক্তি ভারত ও পাকিস্তানের। আজকের বাংলাদেশ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অংশ। এসময় আমরা (পশ্চিম) পাকিস্তানী শাসনের জাঁতাকলের বিদগ্ধ অত্যাচারে অতিষ্ট। বিপ্লব শুরু হলো ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। তখন থেকে শুরু বাঙালি রেনেসাঁর নব সঞ্জীবন। বায়ান্নর ভাষার আন্দোলন বাঙালিকে দিয়েছিল নতুন একটি ভাষার স্বীকৃতি, পরিচয়, একক জাতিসত্তাবোধ ও বিশুদ্ধ চিন্তাবুদ্ধির শুদ্ধতম চর্চা। বাঙালি রেনেসাঁর নব সঞ্জীবনে সাহিত্যসৃষ্টিতে তথা কাব্যজগতে ক্ষণজন্ম প্রতিনিধি আবুল হাসান। ষাটের মধ্যসময়ে আধুনিক বাংলা কবিতার এই রাজার আর্বিভাব ঘটেছিল। মাত্র ২৯ বছর বয়সে পাখি হয়ে যাওয়া একটি নিরব প্রাণ হলেন কবি আবুল হাসান ।
১৯৪৭ সালের ৪ঠা আগষ্ট তৎকালীন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমা অর্ন্তগত টুঙ্গীপাড়া থানার বর্নি গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন বাংলা সাহিত্যের ক্ষণজন্ম কবিতার শহরের একচ্ছত্র রাজা আবুল হাসান। আবুল হাসানের পৈতৃক নিবাস পিরোজপুর জেলার নাজিরপুরের ঝনঝনিয়া গ্রামে। তাঁর পিতার নাম আলতাফ হোসেন মিয়া। তিনি ছিলেন একজন পুলিশ অফিসার। সন্তানের কবি খ্যাতি নিয়ে গর্ববোধ করতেন এবং হাসানের উড়নচন্ডী স্বভাবকে তিনি সর্বদা প্রশয়ই দিয়েছিলেন। মায়ের নাম মোসাম্মাৎ সালেহা বেগম, তিনি ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করলেও সাহিত্য অনুরাগ ছিল। সেই গুণটি মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেন কবি আবুল হাসান। ‘দাড়িয়া’ বংশোদ্ভূত আবুল হাসানের প্রকৃত নাম আবুল হোসেন মিয়া। পরিবার ও সাহিত্যবলয়ে ‘টুকু’ নামে পরিচিত ছিলেন এই উজ্জল সাহিত্যনক্ষত্র। সাহিত্য জগতে তিনি আবুল হাসান নাম ধারণ করেন আরেক প্রতিভাময় কবি রফিক আজাদের পরামর্শে। আবুল হাসানের শিক্ষাজীবন শুরু হয় ১৯৫৩ সালে বর্নি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির মাধ্যমে এবং সেখানে তিনি ৪র্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন। শৈশবের দিনগুলোতেই আবুল হাসান ছিলেন মেধাবী। তাঁর স্বভাব ছিল নির্লিপ্ততা ও তিনি নিঃসঙ্গ কেননা কবিরা মানুষের জগতে থেকেও নি:সঙ্গ, কবিতাই তাঁদের আজন্ম সঙ্গী।। নিঃসঙ্গতার মাঝেও তিনি তৈরি করেছেন নিজের আলাদা এক কাব্যরাজ্য। যে কাব্যরাজ্যে তিনিই ছিলেন তাঁর রাজা। ৪র্থ শ্রেণিতে থাকাবস্থায়ই তিনি প্রথম কবিতা লেখা শুরু করেন। ৫ম শ্রেণি-৮ম শ্রেণি পর্যন্ত ছিলনা-গুয়াদানা উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ৯ম শ্রেণিতে তিনি ভর্তি হন ঢাকার আরমানিটোলা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে। এ স্কুল হতে তিনি ১৯৬৩ সালে ২য় বিভাগে এস.এস.সি পাস করে। এস.এস.সি পাসের পর তিনি বরিশালের ব্রজমোহন সরকারি কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৬৫ সালে যশোর শিক্ষাবোর্ড হতে ২য় বিভাগে পাশ করেন। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন আবুল হাসান। ১৯৬৭ সালে সাবসিডিয়ারি পরীক্ষা। পরীক্ষার ফর্ম পূরণ করার সময় পারিবারিক কাজে তাঁকে বাড়ি যেতে হয়, বাড়ি যাওয়ার পূর্বে তিনি তাঁর বন্ধু মোস্তাফিজুর রহমানের কাছে ফিসের টাকা দিয়ে যান। কিন্তু কোন এক কারণে বন্ধু ফিস জমা দেননি। বাড়ি থেকে হাসান ফিরে এলে বিভাগীয় চেয়ারম্যানের সাথে যোগাযোগ করেন। কিন্তু বিলম্ব ফিস জমা দেয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে অপারগতার কারণে চেয়ারম্যান স্যারের বিরূপ মন্তব্য শুনে কবি আবুল হাসান অভিমানবশত পরীক্ষা দেননি এবং এখানেই তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি ঘটে।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বন্ধ হয়ে যায় তবে তিনি তাঁর জাগতিক শিক্ষার দ্বার বন্ধ করেন নি বরং এগিয়ে চলেছেন সময় স্রোতের সাথে পাল্লা দিয়ে। আমরা জীবনে যাই বলি না কেন, আমাদের জীবনে অর্থের প্রয়োজন অপরিসীম। আবুল হাসানও এর ব্যাতিক্রম নন, তিনি অর্থের প্রয়োজনে ১৯৬৯ সালে প্রথম দিকে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় বার্তাবিভাগে চাকরি নেন কিন্তু মাত্র তিনমাস পরেই চাকরি ছেড়ে দেন। বোহেমীয় স্বভাবের উড়নচন্ডী কবি আবুল হাসান কোন পত্রিকায় একটানা বেশি দিন চাকরি করেননি। কবি তার নিজ জীবনে নিজেকে রাজাই ভাবতেন নইলে দায়সারাভাবে চাকরি ছেড়ে দিতেন না। ১৯৭২ সালে গণবাংলা পত্রিকায় চাকরি নেন। গণবাংলার সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন কবি শহীদ কাদরী,তাঁর সহযোগী ছিলেন হাসান। ১৯৭৩ সালের ২৪ শে জানুয়ারী হতে দৈনিক জনপদ পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে চাকরি গ্রহণ করেন। ১৯৭৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত তিনি চাকরি করেন। এই দেড় বছরে জনপদ পত্রিকায় আবুল হাসানের লেখা কবিতা, প্রবন্ধ এবং উপসম্পাদকীয় প্রকাশ পায়। এরপরে তিনি দৈনিক গণকন্ঠ পত্রিকায় সহাকরী সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন। বাংলা সাহিত্যের আরেক প্রতিভাবান কবি আল মাহমুদ ছিলেন গণকন্ঠ পত্রিকার সম্পাদক। এই পত্রিকায় আবুল হাসান ‘আড়ালে অন্তরালে’ এবং ‘বৈরী বর্তমান’ শীর্ষক দুটি উপসম্পাদকীয় লিখতেন। ‘ফসলবিলাসী হাওয়ার জন্য কিছু ধান চাই’ শীর্ষক একটি উপসম্পাদকীয় নিবন্ধ লিখে সংবাদ- সাহিত্য জগতে বিস্ময়কর আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন।
১৯৭০ সালটি কবির জীবনে বিশেষ তাৎপর্যময় ও সাফল্যময়। ‘শিকারী লোকটা’ শিরোনামে কবিতার জন্য তিনি সমগ্র এশিয়া ভিত্তিক এক প্রতিযোগীতায় প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে ঐ কবিতাটি কলকাতা থেকে প্রকাশিত পৃথিবীর প্রতিনিধিত্বশীল কবিদের কবিতা সংকলনে অর্ন্তভুক্ত হয়েছিল। ‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিতা’ (১৯৭০) শীর্ষক গ্রন্থে তৎকালীন পাকিস্তান (পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান) রাষ্ট্রের একমাত্র প্রতিনিধিত্ব করে আবুল হাসানের কবিতা। সাহিত্যজগতের অনেকেই হিংসা করতো কেননা তারা এই কবির সমপর্যায়ে যেতে পারেনি। আবুল হাসান মাত্র দশ বছর সাহিত্য চর্চা করেন কিন্তু তিনি অল্প বয়সেই সৃজনশীল সাহিত্যিক হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। আত্মত্যাগ, বোহেমীয় স্বভাব, নি:সঙ্গতা, বৈরাগ্য, দু:খচেতনা, স্মৃতিমুগ্ধতার বিশুদ্ধতা ও মুক্তিযুদ্ধ, দেশপ্রেম আবুল হাসানের কবিতার দারুণভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। আবুল হাসানের অন্যতম গ্রন্থ হচ্ছে ‘রাজা যায় রাজা আসে’, ‘যে তুমি হরণ করো’, ‘পৃথক পালঙ্ক’। কবিতার জন্য মরণোত্তর ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’ (১৯৭৫) পেয়েছেন এবং একুশে পদক (১৯৮২) লাভ করেন। কবিতার গঠনশৈলী নিয়ে ষাটের দশকের সাহিত্যজগতে এক বিস্তর পরীক্ষা চলছিল। এ সময় কবিতার রচনায় কবিরা গদ্যছন্দের ব্যবহার করেন।
কবি আবুল হাসান যখন সাহিত্যসৃষ্টিতে একজন কবি হিসেবে আসেন তখন তিনিও এর চর্চা শুরু করেন। গদ্য ছন্দের সাথে সাথে কবি আবুল হাসান নান্দনিক প্রকাশশেলীতার পরিচয় দিয়েছেন দক্ষতার সাথে। গোধূলী বেলায় যেমন আলো আধারের লুকোচুরি খেলা চলে যুগলবন্দিতে ঠিক তেমনি তাঁর কবিতার ছন্দ,শব্দ আর আবেগ অনুভূতির এক পরিপূর্ণ মিশ্রণে রহস্য নির্জনতায় ব্যক্তিসত্তার স্বাতন্ত্র্য পরিচয়। কবিরা বরাবরই প্রকৃতির প্রেমে পড়েন এবং নারীর। কবি আবুল হাসানও প্রকৃতির প্রেমে আত্মমগ্ন হয়েছিলেন আর সৃষ্টি করেছেন প্রেম প্রকৃতির মাধুর্য, সৌন্দর্যময়, মানস ভাবনার লোকজ কৃষ্টি কালচার, পাখির কিচির মিচির ডাক কিংবা নি:শব্দের মাঝেও রাত্রির এক অনির্ণীত এক কোলাহলে কবিতার অফুরন্ত ভান্ডার। সাহিত্য মানবমনের মাঝে অর্তীত ও বর্তমানের একটু সেতুবন্ধন। যে সেতু দিয়ে যেকেউ চলে যাবে ভবিষ্যতের দরজায়। কবি আবুল হাসানের কবিতা অর্থাৎ তাঁর সমগ্র সাহিত্য সৃষ্টির মাঝে রয়েছে এক ধরণের যোগসূত্র। যা আমাদের চিরচেনা প্রকৃতির অনিন্দ্য সৌন্দর্য এবং মানবসৃষ্ট নগরসভ্যতাকে একসূত্রে গেঁথে দিয়েছে। আবুল হাসানের কবিতা শুধু নয় কোন সাধারণ দৃশ্যকল্প কিংবা রঙ ছড়ানো উপমা বরং কবিতার মাঝে রয়েছে ভবিষ্যতের মানবমনের অপ্রকাশিত ভাবনার সুরলহরী। কবিরা কাব্যসৃষ্টি করে পাঠকজগতের মনোরঞ্জনের রসদ যোগান দেন। কবি আবুল হাসানও তাঁর অল্প জীবনে অসাধারণ সাহিত্য প্রতিভার সবটুকু দিয়েই পাঠক শ্রেণিদের ঋণী করেছেন। কবিরা জীবনে অসহায় হয়ে থাকেন, বোহেমীয় ভাব তাঁদের জীবনকে আরো অসহায়ত্বের দিকে নিয়ে চলে। ইদানিং একটা কথা আমাকে সবথেকে বেশি ভাবাচ্ছে যে মানুষ জন্মগত একা। আমার কাছে এর মানে এই যে আমি পৃথিবীতে আমি এসেছি একা এবং যাবও একা।
কবি আবুল হাসানের কাব্যভাষায় বলা চলে-
‘অবশেষে জেনেছি মানুষ একা/ জেনেছি মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা।’
আমরা তো নিজের কাছেই নিজে এখনো অচেনা। আমরা বসবাস করি অন্যদের সময়ে যদিও বলি আমরা বাঁচি নিজের সময়ে। আবুল হাসান বেঁচেছিলেন নিজের সময়ে এবং ভবিষ্যতের প্রবাহমান সাহিত্য নদীতে। স্বাধীনতা উত্তরকালে যেকোন দেশেই অস্থিরতা বিরাজ করে। তেমনি একটা অস্থির পরিবেশের মাঝেও ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রকাশিত হয় আবুল হাসানের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাজা যায় রাজা আসে’। অন্যতম কয়েকটি কবিতার নাম হলো - বনভূমির ছায়া, স্বীকৃতি চাই, পাখি হয়ে যায় প্রাণ, শিল্পসহবাস, জন্ম মৃত্যু জীবনযাপন, শান্তিকল্যাণ, মেঘেরও রয়েছে কাজ, মাতৃভাষা, একলা বাতাস,বদলে যাও, কিছুটা বদলাও, অসভ্য দর্শন, সেই সুখ, মৌলিক পার্থক্য, প্রতিক্ষার শোকগাঁথা, ফেরার আগে, কথা দিয়েছিলি কেন, বলছিলি কেন, মানুষ ইত্যাদি। ১৯৭৪ সালে দেশজুড়ে দুর্ভিক্ষ এবং খরা। এসময় প্রকাশিত হলো তাঁর ২য় কাব্যগ্রন্থ ‘যে তুমি হরণ করো’। স্মৃতি কাতরতা, ব্যক্তিগত নীল বেদনা হাহাকার, নিঃসঙ্গতা তুলে ধরেছেন এই গ্রন্থে। ৪০ টি কবিতার উপস্থিতি আছে এতে। অন্যতম কবিতাগুলো হচ্ছে- কালো কৃষকের গান, অপেক্ষায় থেকো, চিবুক ছোঁব, তুমি ভালো আছো, আমি অনেক কষ্টে আছি, গোলাপের নিচে নিহত হে কবি কিশোর ইত্যাদি। এসব কাব্য সৃষ্টি মাঝে আবুল হাসান নিজ মেধা ও সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন, রেখেছেন স্বপ্রতিভ স্বাক্ষর। আবুল হাসানের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ হলো ‘পৃথক পালঙ্ক’, যা প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে এবং এটি তিনি উৎস্বর্গ করেন তৎকালীন সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সুরাইয়া খানমকে। কবির জীবনে সুরাইয়া একটি ধূসর রহস্যতার নাম। সময়ের পরিক্রমায় কবি আবুল হাসান সাহিত্যশিল্প খেলার উত্তরণ পথের খেলোয়াড় হয়ে যান। যার বাস্তব রূপচিত্র বিদ্যমান ‘পৃথক পালঙ্ক কাব্যগ্রন্থতে। আবুল হাসান নিজের কাব্যপ্রতিভাকে নিজেই বিভিন্নভাবে পরখ করেছেন। ‘রাজা যায় রাজা আসে’ গ্রন্থে তিনি শোভাময় লালিত্য মিশ্রিত গদ্যের অনুসরণ করেছেন। ‘যে তুমি হরণ করো’ কাব্যগ্রন্থে তিনি প্রেম বিরহ যন্ত্রণা দেশ ও সমাজের কথা তুলে ধরেছেন সযত্বে পরম মমতার বন্ধনে। পৃথক পালঙ্কে আবুল হাসান নিজেকে নিয়ে গিয়েছেন এক অনন্য স্তরে। পৃথিরীর রূপ লাবন্য রস বর্ণ স্বাদ আস্বাদন করে যাবতীয়দায়বদ্ধতার কাছে নিজেকে নিজেই বন্দি করেছেন যাতে মানবীয় বন্দিত্ব তাকে বন্দি না করতে যারে। আবুল হাসান বরাবরই প্রেমের কবি, যে প্রেমের ভাষার বহি:প্রকাশ তার স্বরচিত কবিতা, তার সৃষ্টিকৃত কাব্যধারা। কবির কবিতার শিল্প ও সৌন্দর্যস্বরূপ প্রয়োগের মাধ্যমেই কবির স্বার্থকতা, শৈল্পিকতা, চিত্রময়তা ফুটে ওঠে। আবুল হাসানের কবিতাই ছিল প্রকৃতি কিংবা গ্রাম বাংলার রূপ লাবন্যের বহিঃপ্রকাশ।
‘ঝিনুক নীরবে সহো/ ঝিনুক নীরবে সহো ঝিনুক নীরবে সহে যাও/ ভেতরে বিষের বালি, মুখ বুজে মুক্তা ফলাও!’
অল্প কয়েকটি পংক্তি অথচ কি আবেদন, আবুল হাসানের সাহিত্যজীবন মাত্র দশ কিংবা বড়জোর এগারো বছর। কিন্তু কি অপরূপ অনবদ্য সৃষ্টি শৈল্পিক নান্দনিকতা। একজন কবির পরিচয় কখনো নির্দিষ্ট গন্ডিতে সীমাবদ্ধ নয় বরং তা পাঠকের আগ্রহের উপর নির্ভর। যার ফলে একই কবির কবিতা এক পাঠকের কাছে একেক রকম। কবিকে তাই তাঁর কবিতার ভাষা ও আবেগের মানদন্ডে যথার্থ নিমোর্হ উপলদ্ধি করা যায় না।
ষাটের দশকের জনপ্রিয় ক্ষণজন্মা কবি আশ্চর্য প্রতিভা আবুল হাসান। ২৮ বছরের জীবনবেলা তবুও তিনি পাঠককূলকে দিয়ে গেছেন তিনটি কাব্যগ্রন্থ ও অগ্রন্থিত মর্মস্পর্শী কবিতা। এছাড়াও তিনি বেশ কয়েকটি গল্প ও কাব্যনাটক লিখেছিলেন। কবিতাই আবুল হাসানকে পাঠকের মর্মমূলে স্থান দিয়েছে। সাহিত্য প্রতিভার স্বীকৃতি স্বরূপ কবি আবুল হাসান ১৯৭৫ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এবং ১৯৮২ সালে একুশে পদক লাভ করেন। শৈশবেই আবুল হাসান বাত জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন। এ সময় কোন সুচিকিৎসা হয়নি বলেই অল্প বয়সেই তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন। ১৯৭০ সালে তাঁর হৃদপিন্ড সম্প্রসারণজনিত রোগ ধরা পডে, তখনই তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসতাপালের সফেদ বিছানায় শুয়ে লিখেছিলেন কবিতা। কবিতাই তো কবির প্রাণ, জাগতিক মৃত্যু তো কবির কাছে অতি তুচ্ছ ব্যাপার। ১৯৭৫ সালের ২৬ নভেম্বর মাত্র আটাশ বছওে পাখি হয়ে যাওয়া প্রাণ হয়ে গেলেন কবি আবুল হাসান।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT