সাহিত্য

কৃষ্ণপক্ষ

সাঈদ আজাদ প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০৩-২০২০ ইং ০১:১৮:১২ | সংবাদটি ২২৭ বার পঠিত
Image

বাসনা বারান্দায় বসা। উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বাড়ির ছাইগাদায়। হাসানকে দেখে দৃষ্টি ফেরায়। একটু রক্তিম হয় বাসনার ফ্যাকাসে চেহারা।
খবর কী তোমার? জানতে আইলাম।
হাসানের বয়স চল্লিশের আশপাশে। দেখায় আরো কম। বেশ লম্বা। সুপুরুষ। বিয়ের দুই বছর পর বউ মারা যায়। আর বিয়ে করেনি। স্বভাবে একটু বাদাইম্যা ধরনের। নির্দিষ্ট কোনো কাজ করে না।
বাসনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, খবর আর কি! ছেলের চিন্তায় কিছু ভাল্লাগে না।
এত চিন্তা কইরো না তো। ডাক্তাররা অমন কত কতাই কয়। দেখো নাই, কইল আব্বাসের মাথায় টিউমার অইছে, মাস তিনেকের বেশি বাঁচব না। কই, বছর পার অইয়্যা গেল, আব্বাসেরে দেইখ্যা মনে হয় তার কোনো অসুখ আছে?
অনেক দিন পরে আইলেন। গতকাইলও রাজুর বাপ আপনের খোঁজ করছিল।
হাসান হাসে। কিয়ারে! আমারে কী দরকার তোমার জামাইয়ের? মারব নাকি?
কী যে কন না। এমনি জিগাইতেছিল, আসেন না কয়দিন, তাই মনে অয়।
আপনজন! হুম। হাসান বাসনার দিকে তাকায়।...রাজু কি বাড়িতে, না তুমি একলা?
বাসনাও তাকিয়ে ছিল হাসানের দিকে। চোখে চোখ পড়াতে ঘরের দিকে তাকিয়ে বলে, রাজু বাড়িতেই। ঘুমায়। ঘরের ভিত্রে গিয়া বন। রাজুর বাপের আসার সময় অইছে।
না, বইতাম না। মমিনরে কইয়ো আমি আইছিলাম। হাসান বলে।
খালি মুখে যাইবেন গা?
দুপুরবেলা আর কী খাওয়াইবা? খাওয়াইলেও ভাত। হিসাব করা রান্না। আমি খাইলে টান পড়ব।... চিন্তাভাবনা কিছু করছ কি না, কইলা না? আমি আবার মঙ্গলবার দুপুরে আসমু। যাই।
হাসান চলে যায়।
হাসান যেতে না যেতেই বাড়ি ঢোকে মমিন। শার্ট খুলে উঠানের রশিতে মেলতে মেলতে মমিন করুণ চোখে তাকায়। বাসনার বয়স পঁয়ত্রিশ। একসময় ডাকের সুন্দরী ছিল সে। মমিনের সংসারে এসে মলিন হয়েছে গায়ের রং। তারপরও দেখলে তাকে কেউ অসুন্দরী বলবে না।
ছেলের চিন্তায় সারাক্ষণ বাসনা মনমরা হয়ে থাকে। বোঝে মমিন। কিন্তু বাসনাকে আশার কথা শোনাতে পারে না সে।
গেছিলাম ইকবালের কাছে। কইল, এখন তার হাত খালি। ১৫ দিন পর কিছু ব্যবস্থা করতে পারব। গেছিলাম মোহসিন চাচার কাছেও। ধার পাইলাম না!
অন্যের কথা বাদ দিলাম, ইকবাল ভাই না তোমার ছোটবেলার বন্ধু? তুমি তার মায়ের অসুখের সময় নিজের জমি বেইচ্চা টাকা দিলা। সেই টাকা ফেরত দিব না? এখন আমগো দুঃসময়। এখন টাকা না পাইলে পরে টাকা দিয়া কী করবা!
মমিন বারান্দায় বসে বলে, পাওনা টাকা আদায় করতে এত ধকল সইতে হবে কে জানত!...রাজু কই?
স্কুল থাইক্যা ফিরাই শুইয়্যা রইছে। ছেলের চিন্তায় কোনো কিছু ভাল্লাগে না। মমিনের পাশে বসে বাসনা। আল্লাহ যে কিয়ারে ছেলেটারে এমন রোগ দিল! একটা মাত্র ছেলে আমগো। আঁচলে চোখ মোছে বাসনা।
রাজু খাইছে?
খাইছে। তোমারে ভাত দেমু?
তুমিও বও। দুইজনে একলগে খাই। আজ আর আড়তে যামু না। পুকুরটা বেইচ্চা দিলাম। সত্তর হাজার টাকা পাইছি।
পুকুরটাও!
একটাই ছেলে আমগো। তার জীবনের চেয়ে মূল্যবান বেশি কী আর আছে? আজ হাসান আসছিল?
না। হাসান ভাই আসে নাই। অন্যদিকে তাকিয়ে বাসনা বলে।
মমিন আর বাসনার ছেলে রাজু। পড়ে ক্লাস নাইনে। চার মাস আগে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে উপজেলা সদরের হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে। ডাক্তার যা বলে তাতে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে ওদের। রাজুর হার্টে নাকি বড় বড় দুই ছিদ্র। অপারেশন ছাড়া এর আর কোনো চিকিৎসা নেই। আর অপারেশন করতে হবে ঢাকায়। প্রায় লাখ তিনেক টাকা খরচ হবে। অপারেশন না করালে যেকোনো সময় মারা যাবে রাজু।
বলতে গেলে মমিন দিনমজুরই। মাছের আড়তে কাজ করে। সারা দিন খেটে যা পায়, তাতে মাসের খরচ শেষে ৩০০ টাকাও জমে না। তিন লাখ টাকা স্বপ্নেও দেখেনি সে।
সম্ভাব্য-অসম্ভাব্য সবার কাছেই গিয়েছে মমিন। টাকা ধার চাইতে। সবাই নিরাশ করেছে। পুকুরটা বিক্রি করে ৭০ হাজার টাকা পাওয়া গেছে। আর বিয়ের সময় কিছু স্বর্ণের গহনা বাসনাকে দিয়েছিল তার বাপ। সেগুলোর দাম বেড়ে না হয় আরো পঞ্চাশই হলো। বাকি টাকা কোত্থেকে গোগাড় করবে, তা ভেবে রাতের ঘুম হারাম বাসনা আর মমিনের।
এমনিতে রাজুকে দেখে কেউ বুঝবে না যে সে এত অসুস্থ। দেখতে ভালো স্বাস্থ্যের অধিকারী। হঠাৎ হঠাৎ শ্বাস নেওয়ার বাতাস পায় না। পুরো মুখ নীল হয়ে যায় অক্সিজেনের অভাবে। খুব নিস্তেজ হয়ে পড়ে। তখন দুনিয়া অন্ধকার হয়ে যায় মমিন আর বাসনার।
তোমার গয়না বেচলে কিছু টাকা হয়।
গয়না! গয়না বেচলে কত টাকা অইব।
যা আছে, তা বেচলেও হাজার পঞ্চাশ তো অইবই। ভাত বাড়ো, খাইয়্যা রাজুর পাশে একটু শুই।
২.
আব্বা, ঘুমাইছ? রাজু ডাকে মমিনকে।
না রে বাপ। ঘুমাই নাই। আয়, আমার কাছে শো।
রাজু চৌকি থেকে নেমে বিছানায় বাপের গা ঘেঁষে বসে। লাইট নেভানো হয়েছে অনেক আগেই। রাজু বলে, বিকালে আড়তে যাও নাই যে আব্বা? কলম আনতে কইছিলাম, আনো নাই।
কাইল ফিরার সময় আনমু।
হ, কয়দিন ধইরা তোমারে কেমন জানি কাহিল কাহিল দেখায়। ...আব্বা, তুমি না কইছি লা আমার অসুখটা ভালা অইয়্যা যাইব। এত দিন অইয়্যা গেল ভালা তো অয় না। জানো, কাল রাতে আমার শ্বাস নিতে কষ্ট অইতাছিল খুব। আমার মনে অইতাছিল, মইরা যাইতাছি। তোমারে হাত দিয়া কত ঠেললাম। তোমার ঘুম ভাঙে নাই। আম্মায় বিছানায় আছিল না।
মমিনের বুকের ভেতর ধক করে ওঠে। কী কস বাপ! এমন মড়ার মতো ঘুমাইতেছিলাম। তর মারে ডাকস নাই কিয়ারে?
কইলাম না, আম্মায় বিছানায় আছিল না।
মমিন ছেলের মাথা বুকে নিয়ে বলে, না রে বাপ, তুই অনেক দিন বাঁচবি। ডাক্তার কইছে, অপারেশন করলেই সব ঠিক অইয়া যাইব। এইসব ভাবিস না তুই। আমি টাকার জোগাড় করতাছি।
আজকা হাসান কাকায় আইছিল মনে অয়।
কোন সময়?
দুপুরের আগে। তখন আমি শুইয়্যা আছিলাম। আম্মার লগে কতা কইয়্যা গেল গা। যাওয়ার সময় কইছে, মঙ্গলবার দুপুরে আবার আইব।
কিন্তু তর মায় যে কইল... তুই ঠিক শোনছস রাজু?
আমি ঘরে শুইয়্যা আছিলাম। গলা শুইন্যা তো হাসান কাকারই মনে অইল।
রান্নাঘর গুছিয়ে এসে বাসনা দেখে, মমিন ছেলেকে কোলে নিয়ে বসে আছে বিছানায়।
কী অইছে? শইল ভালা না কইয়্যা শুইলেন। ঘুমান নাই যে? রাতও তো অইছে অনেক।
ঘুম আসে না রাজুর মা। পুকুর আর গয়না বিক্রির টাকা এক করলে বড়জোর এক লাখ বিশ হাজার টাকা হইব। এখনো দুই লাখ আশি হাজার টাকা দরকার। বাকি টাকা ক্যামনে জোগাড় হইব, ভাইব্যা কূল-কিনারা পাইতাছি না। আমার মতন রোজগারের মানুষরে এত টাকা ধার না দিলে দোষও দেওন যায় না কেউরে। ছেলেটারে মনে অয় বাঁচাইতে পারতাম না।
হাসান বলে আইছিল বাসনা? রাজু কইল?
হাসান ভাইয়ে না, রশিদ আইছিল। রাজুর খোঁজখবর লইতে। রাজু মনে অয় রশিদের গলা শুইন্যা ভাবছে হাসান ভাই। শুইয়্যা পড়েন, রাত অইছে। রাজু নিচেই শোক।
৩.
বিকেলের দিকে মমিন বাড়ি ঢোকে।
বাসনা। বাসনা! গেলা কই? আশি হাজার টাকা পাইছি। বদলে ভিটাটা বন্ধক রাখলাম। গেলা কই?
বাসনার সাড়া নেই।
দেখোছে, কই গেল! রাজুও তো মনে অয় বাড়ি নাই। নিজের মনে বিড়বিড় করে মমিন।
দুপুরবেলায় তর বউরে দেখলাম হাসানের লগে কই যানি যায়! পাশের বাড়ির শুকজান মমিনের চেঁচানিতে উঠানে এসে দাঁড়ায়।
হাসানের লগে আবার কই গেল? টাকা-পয়সার খোঁজে গেল কারো কাছে?
আমার অন্য কিছু মনে অয়। যাওয়ার সময় তর বউয়ের ভাবগতিক বেশি ভালা দেখলাম না। আগেও দেখছি, তুই বাড়িত না থাকলে হাসান আইয়্যে। তার লগে ক্যামনে ক্যামনে জানি কতা কয় বাসনা। আজকা দেখলাম, কেমন সাজগোজ করছে বাসনা। নতুন কাপড় পরা। দুলাল আর তার নতুন বউ সিনামা দেখতে যাওয়ার সময় যেমন রংঢং করে তর বউ আর হাসানরে দেখলাম তেমন রংঢং করতে করতে বাঁশঝাড়ের পাশ দিয়া যাইতাছে।...ভালা মতন বউয়ের খোঁজ কর মমিন। তর না আবার কপাল পুড়ল।
শুকজানের দিকে কিছুক্ষণ অবাক চোখে তাকিয়ে থেকে, দ্রুত পায়ে ঘরে ঢুকে মমিন। খালি ঘরে ট্রাংকটা পড়ে আছে। খোলা। ট্রাংকেই পুকুর বেচা টাকা আর গয়না ছিল।
যেমন দ্রুত ঢুকেছিল তেমনই দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে আসে মমিন।
শুকজান বলে, কী রে মমিন, কী অইছে? তরে এমন দেখাইতাছে কিয়ারে?
মমিন কোনো কথা বলে না। ধপ করে উঠানে বসে পড়ে। ফ্যালফ্যাল করে শুকজানের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না। কোনো মা এমনটা করতে পারে! ছেলের চিকিৎসার জন্য জোগাড় করা টাকা আর গয়না নিয়ে হাসানের সঙ্গে চলে গেছে বাসনা।
রাজু বোধ হয় বাইরে কোথাও খেলতে গিয়েছিল। সে বাড়ি ঢুকতেই মমিন অসহায় চোখে তাকায় ছেলের দিকে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে দৃষ্টি তার ঝাপসা হয়ে আসে।

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT