মহিলা সমাজ

মায়ের জাতিকে সম্মান

জুঁই ইসলাম প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৩-২০২০ ইং ০০:০১:৩২ | সংবাদটি ১৪৬ বার পঠিত

প্রতিবছরই নারী দিবস আসে আর যায়। আমাদের নারীদের তো কোন পরিবর্তন হয় না। নারী নির্যাতিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত ঘরে বাইরে প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে। খবরের কাগজে কিংবা টেলিভিশনে চোখ রাখলেই দেখা যায় নারী নির্যাতনের লোমহর্ষক কত কাহিনী যা মানা যায় না। নারীরা পদে পদে অবহেলিত হচ্ছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী নারী, বিরোধি দলীয় নেত্রী নারী, সংসদের স্পীকার নারী তারপরও নারীকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মারছে একশ্রেণীর ঘাতক পুুরুষ। তার প্রমাণ কয়েকদিন আগে ঘটে যাওয়া নুসরাত হত্যাকান্ড। ফুলের মত নিষ্পাপ একটি মেয়েকে আগুনে ঝলসিয়ে দেওয়া হল। যারা নারী অধিকার আদায়ে কিংবা নারীর নানা কল্যাণমূলক বিষয় নিয়ে আলোচনা সমালোচনার ঝড় তুলেন, জাঁকজমকভাবে নারী দিবস পালন করেন কিন্তু কি হয় এসব দিবস পালন করে? যারা সভা সেমিনার করেন, মিটিং করেন নারীর অধিকার নিয়ে এরাই তো দেখা যায় অনেক ক্ষেত্রে নিজ স্ত্রীকে নিজ ঘরে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করছেন। আবার ধরেন তার বোন বা ঘরের যে কাজের মেয়েটি যে সেও নির্যাতিত হয় এই পুরুষদের দ্বারা, সেও নিরাপদ না। মুখোশধারী কিছু পুরুষ মনে প্রাণে চায় না নারী তার অধিকার ভোগ করুক আর সেই জন্য প্রতিনিয়ত পুরুষ দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছে আমাদের নারী সমাজ।
অনেক ক্ষেত্রে নারীরা স্বনির্ভর হলেও সংসার জীবনে তারা স্বাধীন না। এমনও অনেক নারী আছেন-যিনি কর্মজীবি কিংবা চাকুরিজীবি সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর যখন ঘরে ফেরেন তখনও বিশ্রামের আশা করতে পারেন না সংসারের নানা ঝামেলায়। আমরা নারীরা পারি বলেই সংসারের নানা জালাতন সহ্য করে মুখে হাসি নিয়ে সংসার জীবনকে লালন-পালন করি, সংসারের সবার মুখে হাসি ফোটাতে। দেখা যায় অনেক সময় মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক নারীই আছেন যাদের সংসারের সকল সদস্যদের খাওয়া-পিনার পর নিজের ভাগ্যে জোটে না একপ্লেট ভাত কিংবা একটুকরো মাছ। তারপরও স্বামী-সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে কৃপণতা করেন না তারা।
অনেক সময় দেখা যায় স্বামী অসুস্থ হলে একজন স্ত্রী যতটুকু সেবা-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন ততটা অনেক সময় অনেক স্বামীর ক্ষেত্রে দেখা যায় না। কত অসহায় নারী, অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকলেও স্বামী ভুলেও স্ত্রীর কপালে হাত বুলিয়ে দেন না, জিজ্ঞেস করেন না ‘এখন কেমন আছো?’ একজন নারী কি শুধু সংসারে সন্তান উৎপাদনের জন্যই বা পুরুষের মনোরঞ্জনের জন্যই? তার কি নিজস্ব কোন চাওয়া পাওয়া নেই? তার কি সেবা শুশ্রƒষার দরকার নেই? হতভাগ্য কত নারীই আজ সংসার জীবনে অবহেলিত পাত্রের মত অবস্থান করছে তার খবর কে রাখে? আবার দেখা যায় আমাদের সমাজে স্ত্রী বিয়োগের সাথে সাথে একজন পুরুষ দ্বিতীয় বিয়ে করে নেন খুব সহজে। যেটি একজন নারী সহজে করতে পারেন না স্বামীশোকে। পুরুষের শারীরিক সমস্যার কারণে অনেকক্ষেত্রে স্ত্রী সন্তানের মুখ দেখতে পারেন না তবুও স্বামীর সংসার ছাড়েন না কিন্তু স্ত্রীর কারনে সন্তান না হলে খুব সহজে পুরুষজাতি দ্বিতীয় বা তৃতীয় বিয়ে করেন কিন্তু সন্তান না হওয়ার কারণে অনেক নারী মুখ বুজে সহ্য করেও জীবন পার করে দেন তবু স্বামীকে সমাজে ছোট করেন না। কথায় আছে নারী সহজে আকার ধারণ করতে পারে তা যেকোন পরিস্থিতিতে।
আমাদের দেশে সংবিধানে নারী পুরুষের সমান অধিকার লিখিতভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সংবিধানের ভাষা কাগজ পত্রেই থেকে যাচ্ছে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে। মেয়েরা কি তাদের প্রাপ্য স¤মান ও স^ীকৃতি পাচ্ছে? ইটের ভাটা থেকে শুরু করে রাজনীতি প্রতিটি ক্ষেত্রে মেয়েরা কাজ করলেও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে সর্বত্রই। আন্তর্জাতিক নারী দিবস কী মোহময় মহান বাণী। আমরা কেন ভাবতে পারি না আমরা শুধুই নারী বা পুরুষ নই। আমরা আগে মানুষ, তারপর লিঙ্গভেদ। আজও আমাদের সমাজে যৌতুক, পণপ্রথার মত ঘৃণ্য প্রথা প্রচলিত। যতই নারীর অধিকার স^াধিকারের কথা চিৎকার করে বলি, আসল সত্যটা হল-নারীর মৌলিক অধিকার সীমিত। নারীকে আজও পণ্য, ভোগ্য বস্তু হিসাবে আমাদের সমাজ দেখে থাকে। তাইতো প্রতিদিন খবরের কাগজে, দূরদর্শন খুললেই চোখে পড়ে বধূহত্যা, ধর্ষণ, নারীপাচার প্রভৃতি ঘটনা। নারী অনেক ক্ষেত্রে নিজেই প্রতিবাদের জন্য ভাষা খুঁজে না পেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। নারীও একজন মানুষ তাও আমাদের সকলে মানতে হবে, জানতে হবে।
আজকাল টিভি পর্দা খুললেই দেখা যায় নারীদের নানা উগ্র পোশাকে নানা ভঙ্গিমায় উপস্থাপনা। নারী স্বাধীনতার নামে যারা বেহায়পনা করেন, অশ্লীলভাবে নিজেকে উপস্থাপন করেন, সমাজকে উষ্কে দেন কিংবা সমাজকে নষ্ট করেন সে স্বাধীনতা তো আমাদের কাম্য না। আমরা নারী স্বাধীনতা ভোগ করতে বিশ্বাসী। তাই বলে পুরুষ সমক্ষ হয়ে সমঅধিকারে আমি বিশ্বাসী না।
আজকাল নিজ ঘরে নারীরা অনেক বেশি অনিশ্চিত জীবন যাপন করছেন শুধু এদেশে নয় উন্নত দেশেও, আমাদের সমাজে একটি মেয়েকে কত সহজে পতিতা আখ্যা দিয়ে দেওয়া হয়-কিন্তু একা একটি মেয়ে পতিতা হয় কিভাবে? সমানভাবে তার অপরাধের জন্য সাথে পুরুষও দায়ী কিন্তু সেদিকে সমাজে আঙ্গুল তুলে কেউ কিছু বলে না।
আজ আমরা মেয়েরা নিজেরা নিজেদেরকে পণ্য এবং ভোগ্যবস্তু করে তুলছে। সবক্ষেত্রে না হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা বটেই। বেশ ক‘বছর থেকে বিশ্বসুন্দরীদের দাপটে বিজ্ঞাপন কো¤পানীগুলোর রমরমা অবস্থা। বিশ্বের বড় বড় শহর ছাড়িয়ে সুন্দরী প্রতিযোগীতা আমাদের পরিশীলিত ছোট ছোট শহরেও থাবা বসিয়েছে। সুন্দরী প্রতিযোগীতার মত নগ্ন এবং কুৎসিত ব্যাপার মেয়েদেরকে অবমাননা করার মত আর কিছু হতে পারে না। নামমাত্র কাপড় গায়ে দিয়ে সমস্ত অঙ্গের বিভিন্ন ভঙ্গি দেখে দেখে বিচারকরা এর উপর নম্বর দিয়ে থাকেন। এটার নাম তো নারী স্বাধীনতা নয়। এমন স্বাধীনতা চাই না। নারী পুরুষ বৈষম্য দূর হোক। নারীকে মানুষ ভাবুন। নারী তো মা। সেই মায়ের জাতিকে সম্মান করুন, ভালোবাসুন, যত্ন নিন।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT