শিশু মেলা

শিশুর হাতে মিষ্টি ছড়া

কানিজ আমেনা প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০৩-২০২০ ইং ০১:১১:০৫ | সংবাদটি ২৩৩ বার পঠিত
Image

কবি এখলাসুর রহমানের সাম্প্রতিক সময়ে রচিত ‘শিশুর হাতে মিষ্টি ছড়া’ বইটি ইতিমধ্যে যথেষ্ট সাড়া জাগিয়েছে। সেই সাথে সিলেটের কয়েকটি স্কুলে শিশু শ্রেণিতে পাঠ্যবইয়ের তালিকায়ও স্থান করে নিয়েছে। কবির সাথে ব্যক্তিগত সুসম্পর্কের খাতিরে বইটি আমার হস্তগত হওয়ার সৌভাগ্য হলো আর সেই সুবাদে এই বিষয়ে দু’কলম লেখার সুযোগ তৈরি হলো।
বইটির শুরুতেই স্বরবর্ণের ১১টি বর্ণ দিয়ে শিক্ষামূলক ছড়াগানের মাধ্যমে শিশুদের প্রতি কবির আহ্বান, ‘অ অ অ পড়ো পড়ো পড়ো/ আ আ আ/ ইশকুলেতে যা/ ই ঈ ি ী/ পড়ো পড়ো/ ইশকুলে যাও/ একসাথে মিলি/ উ ঊ ঋ / চলো চলো/ হিংসা বিদ্বেষ জাতিভেদ ভুলি/ এ ঐ ও ঔ। মান্য করো/ প্রভুর আদেশ/ সত্যবাদী হও।’ প্রতিটি বর্ণ পরিচয়ের সাথে আছে চার লাইনের ছড়া। সেই সাথে নিচে পাদটীকায় রয়েছে ‘শব্দার্থ’ ও ‘জবাব দাও’ নামের সুন্দর সংযোজন যা শিশুর জ্ঞানের বিকাশে সহায়ক হবে।
অ-তে কবি বলছেন, ‘অলী উঠো অজু করো/ নামাজ পড়ে নাও/ প্রভাত হলো কুরআন নিয়ে পড়তে বসে যাও।’ এখানে শিশু কতিপয় ধর্মীয় পরিভাষার সাথে পরিচিত হচ্ছে, যেমন-অজু, নামাজ, কুরআন ইত্যাদি। আ-তে গ্রামবাংলার চিরায়ত ভোরের দৃশ্য ফুটে উঠেছে, ‘আঁধার ছিঁড়ে পুব গগনে/ উঠছে সুরুজ লাল/ রাখাল ছেলে যাচ্ছে মাঠে/ নিয়ে গরুর পাল।’ উ-তে একই সাথে গ্রামীণ জলাশয়ের দৃশ্যের এবং জাতীয় ফুল শাপলার সাথে শিশু পরিচিত হচ্ছে, ‘উষা হাসে উর্ধ্বাকাশে/ বাগে হাসে ফুল/ বিলে হাসে শাপলা-কমল/ নৌকা নদীর কুল।’ ঐ-তে শিশুরা ছেলেমেয়েদের বেশ কয়েকটি নাম শেখার সুযোগ পাচ্ছে। যেমন, ‘ঐরাবতে চড়ে এল/ রাইসা ওয়াসিক দিহা/ দেখতে এল নাশিন তাসিন/ মৌলি অমি মিহা।’ ও-তে ছোট্ট ওয়াসিক বলছে, ‘ওয়াসিক বলে দাও না মাগো/ব্যাগটা তুলে হাতে/ আপু যাবে পাঠশালাতে/ আমিও যাব সাথে।’ ছোট্ট শিশুর স্কুলে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ পেয়েছে এই উক্তির মাধ্যমে। মা চিরন্তন স্নেহ-মমতার প্রতীক। অসুস্থ সন্তানের পাশে রাতজাগা মায়ের চিত্র ফুটে উঠেছে ঔ-তে, ‘ঔষধ খাইয়ে ছোট্ট খুকির/ গালে দিয়ে চুম/ মা ডেকে কন পড়া শেষে রাত হলো দাও ঘুম।’ ক-তে শিশু আবারো কিছু ধর্মীয় পরিভাষার সাথে পরিচিত হচ্ছে, ‘কাবা আঁকা জায়নামাজে/ তসবি হাতে মা/ মধুর সুরে কুরআন শরিফ/ পড়ছে ফাতেমা।’ ঙ-তে ব্যাঙ ও সাপ নিয়ে কবি মজার ছলে বলছেন, ‘ব্যাঙের হলে সর্দি কাশি/ বদ্যি গেল সাপ/ দেখেই তারে বিছনা ছেড়ে/ ডোবায় দিল লাফ।’ ব্যাঙ যদিও অসুস্থ আর সাপ গেছে ডাক্তার সেজে তার চিকিৎসা করতে, তবুও সাপকে দেখে ব্যাঙ ভয়ে পালিয়ে গেল। এ থেকেই বোঝা যায় শুভাকাঙ্খীরূপে সাপ ব্যাঙের কাছে গেলেও আসলে সাপ ও ব্যাঙ পরস্পর চিরশত্রু। ছ-তে বলা হচ্ছে, ‘ছারপোকার ছয় পা ভেঙেছি/ করছি পুড়ে ছাই/ সাফ করেছি ডোবা-নালা/ ডেঙ্গুরও ভয় নাই।’ নিজে পরিষ্কার থাকা এবং আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার মাধ্যমে ডেঙ্গুজ্বর প্রতিহত করা সম্ভব এ ব্যাপারে শিশুকে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। জ-তে বলা হচ্ছে, ‘জগৎ জুড়ে একটি ভাষা/ যে ভাষার নাই বুলি/ বলতে পারো কোন সে ভাষা?/ সেই ভাষাটি তুলি।’ কবির এই কথাগুলো বড় অপূর্ব! নানান দেশের নানান ভাষা। কিন্তু পৃথিবীতে একটি ভাষা আছে যে ভাষার অর্থ সকলেই বুঝতে পারে। আর তা হলো ছবি বা চিত্রের ভাষা যা শিল্পীর তুলির আঁচড়ে জীবন্ত হয়ে উঠে।
ঞ-তে বলা হচ্ছে, ‘মিঞাঁও মিঞাঁও বিড়াল ডাকে/ কুকুর ডাকে ঘেউ/ শিয়াল ডাকে হুক্কা হুয়া/ বাঘের পিছে ফেউ।’ এখানে শিশু ছড়ার মাধ্যমে কয়েকটি পশুর নাম শিখছে। যেমন-বিড়াল, কুকুর, শিয়াল, বাঘ, ফেউ (শিয়াল জাতীয় প্রাণী)। ঠ-তে বর্ণ ও ছড়া শেখার পাশাপাশি যে চিত্র ব্যবহার করা হয়েছে তার মাধ্যমে শিশু সিলেটের ঐতিহ্যবাহী কিনব্রিজ ও আলী আমজদের ঘড়ির সাথেও পরিচিত হচ্ছে। দেশ ও ভাষার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে ব-তে, ‘বাংলাদেশে জন্ম আমার/ বাংলা মায়ের ভাষা/ মায়ের ভাষায় কথা বলে/ পুরাই মনের আশা।’ য-তে কবি বলছেন, ‘জুঁই মালতি টগর বকুল/ বেলি হাসনাহেনা/ ডালায় ভরে ফেরি করে / ছোট্ট খুকি হেনা।’ কোমলমতি শিশুদের মন ফুলের মত পবিত্র। আর এই ছড়ায় শিশু ছয়টি ফুলের নাম শিখছে। ১৯৭১ সাল। বাঙালি জাতির জীবনে একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। আর এই সালটির সাথে ছোট্ট শিশুর এক ঝলকের পরিচয় ঘটিয়ে দিচ্ছেন কবি ল-তে লিখিত তার চার লাইনের ছড়ার মাধ্যমে, ‘লাল-সবুজের ওই পতাকা/ আনতে আমার ভাই/ সেই যে গেল একাত্তরে/ আর তো ফিরে নাই।’ সাদা পায়রা শান্তির প্রতীক। সারা বিশ্বজুড়ে শান্তি কাম্য, ঐক্য কাম্য। শ-তে এই শ্লোগানই মুখরিত হচ্ছে, ‘শান্তির সাদা পায়রাগুলো/ যাচ্ছে ওড়ে ওড়ে/ ঐক্যের বাণী পৌঁছে দিচ্ছে। সবার ঘরে ঘরে।’
গ্রামবাংলার একটি ঐতিহ্যবাহী খেলা হলো ষাঁড়ের লড়াই যা আজকাল আর খুব বেশি দেখা যায় না। ষ-তে বলা হচ্ছে, ষাঁড়ে ষাঁড়ে করছে লড়াই/ মুক্ত খেলার মাঠে/বটের তলায় ভিড় জমেছে/ বিজয় মেলার হাটে।’ ষড়ঋতুর একটি প্রধান ঋতু হলো বর্ষা। শিশু পরিচিত হচ্ছে ঋতুর রাণি বর্ষার সাথে ঢ়-তে, ‘আষাঢ় মাসে জোয়ার আসে/ নেমে আসে ঢল/ বানে ডুবে মাঠ ও ঘাট/ করে টলোমল।’ য়-তে ছড়ায় ছড়ায় শিশু মোট নয়টি পাখির নাম শেখার সুযোগ পাচ্ছে, ‘ময়না টিয়া পিক পাপিয়া/ দোয়েল শ্যামা কাক/ বক শালিকের বসছে মেলা/ রতœা নদীর বাঁক।’ মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলো ঈদ। ঈদের আগমন বার্তা নিয়ে আসে আকাশে উদিত নতুন চাঁদ যা ঘুচিয়ে দেয় সমাজের ধনী-গরীব ভেদাভেদ। ঁ-তে তাই কবি বলছেন, ‘চাঁদটা রুপার চন্দ্রবিন্দু/ আকার ধারণ করে/ আজহা ঈদের বার্তা নিয়ে/ এল সবার ঘরে।’
বইটির কিছু ছড়ায় যেমন ফুলের নাম, পশুর নাম, পাখির নাম এসেছে তেমনি অন্য কয়েকটি ছড়ায় ফলের নাম, নদীর নাম, গাছের নাম ইত্যাদি সংযুক্ত করা যায়। তাহলে বইটি শিশুদের জন্য আরো শিক্ষণীয় হয়ে উঠবে।
বইটি প্রকাশ করেছে সিলেটের বন্ধু লাইব্রেরি এন্ড পাবলিকেশন। বইয়ের প্রচ্ছদ ও ভেতরের পাতায় পাতায় নজরকাড়া ছবিগুলো এঁকেছেন প্রচ্ছদশিল্পী টিটন কান্ত দাশ।

 

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT