ধর্ম ও জীবন

পারস্পরিক হক্ব আদায় শান্তিপূর্ণ সমাজের ভিত্তি

আখতার হোসাইন প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০৩-২০২০ ইং ০০:২০:৪০ | সংবাদটি ১১৮ বার পঠিত

জীবনের চেয়ে ধর্ম বড়। ধর্ম জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে, মন্দ পথ থেকে বাঁচিয়ে রাখে, গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে সুগঠিত করে গড়ে তোলে শান্তির পথে পরিচালিত করে। জীবনের কোন ফাঁক দিয়ে যেন ত্রাস সৃষ্টিকারী শয়তান কিংবা ধ্বংসকারী নাফসে আম্মারার অনুপ্রবেশ না ঘটে, দুনিয়া এবং আখিরাতের সকল অশান্তি থেকে মানুষ যাতে নিরাপদ আশ্রয়ে দিনাতিপাত করতে পারে, সে জন্যে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ধর্ম ইসলাম ‘আদেশ এবং নিষেধের’ বিধি-বিধান পালন দ্বারা জীবনের নিরাপত্তার সুব্যবস্থা করে দিয়েছে। ইসলাম হল পূর্ণাঙ্গ ও অনুপম একটি জীবন দর্শন। সুখী-সুন্দর ও নিরাপদ জীবনের একটি ম্যানুয়াল। এক জীবনে যা চাই, তার সবকিছুই সাজানো রয়েছে এর পরতে পরতে। শুধু প্রয়োজন এর জ্ঞানার্জন এবং পূর্ণ অনুসরণ। ইসলাম বলে, হে মানুষ! শুধু আল্লাহর বিধান পালন কর; তাহলে তুমি আল্লাহর গুণাবলীতে ভুষিত হবে, তখন তুমি যা চাইবে তা অর্জন করতে পারবে (সহীহ বুখারী)।
উক্ত ম্যানুয়ালের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান হল-পারস্পরিক হক্ব বা অধিকার আদায় করা। মানুষ সামাজিক জীব। সমাজের সকল শ্রেণীর লোক নিয়েই তার বসবাস। বিভিন্ন শ্রেণীর লোকজন এই একটি সমাজের বিভিন্ন অংশবিধায় প্রত্যেকের জন্য প্রত্যেকের প্রয়োজন।
মাছ বিক্রেতা মাছ বিক্রি করে আলু, ডাল ও চাল ক্রয় করে। আবার মুদির দোকানদার ডাল, আলু ও চাল বিক্রি করে মাছ ক্রয় করে। রাষ্টপতি তাঁর সন্তানদের শিক্ষা দানের জন্য সাধারণ শিক্ষকের দ্বারস্থ হন। শিক্ষক তার মহান দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাধারণ অভিভাকদের কাছে জবাবদিহী করতে হয়। একজন রোগী যতবড় লোকই হননা কেন তার চিকিৎসার জন্য সাধারণ একজন ডাক্তার ও হুজুরদের দ্বারস্থ হতে হয়। সর্বোপরী মুসাফিরী এ জীবনের শেষ প্রান্তে দাড়িয়ে আমরা মুখাপেক্ষী থাকি একজন আমলদার খালিস আলিম এর প্রতি। এ জন্য যে, তিনি যেন আমাদের জানাযার সালাতটা পড়িয়ে আখেরী বিদায় দেন। আসলে প্রত্যেকের তরে প্রত্যেকে আমরা। এই পারস্পরিক হক্ব আদায়ের মধ্যেই সমাজের শান্তি-নিরাপত্তা নিহিত রয়েছে। সমাজে তখনই শান্তি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন সবাই প্রত্যেকের হক্ব যথার্থরূপে আদায় করবে। এ হক্ব, অধিকার বা কর্তব্য শব্দটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। এতে ফরজে আইন, কিফায়া এবং মুস্তাহাব সকল আইনই শামিল রয়েছে (আত্-তারগীব)। আল্লামা শাওকানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন: এর অর্থ হচ্ছে, যা পরিত্যাগ করা উচিত নয় বরং যথাসময়ে অন্যের হক্ব আদায় করা ওয়াজীব (নাইলুল আওতার)। মহান সৃষ্ঠিকর্তা বলেন : হে নবী! আপনার অনুসারী মু’মিসদের প্রতি তাদের হক্ব আদায়ে আপনি সদয় হোন (শুয়ারা-২১৫)। আর জেনে রাখুন, যারা পারস্পরিক হক্ব আদায় করেনা তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের কঠোর শাস্তি আর দহন যন্ত্রনা (সূরা বুরুজ-১০)।
পারস্পরিক হক্ব, অধিকার বা কর্তব্য কয়টি এ ব্যপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন পরিবেশে ভিন্ন ভিন্ন্ মজলিসে একেকটি হাদিসে একেক ধরণের সংখ্যা উল্লেখ করেছেন। হযরত আবু হোরায়রা বর্ণিত দু’টি হাদিসে পাঁচটি অন্যটিতে ছয়টি (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)। হযরত আলী ও আবু হোরায়রার যৌথ বর্ণিত আরেকটি হাদিসে ছয়টি (মিশকাতুল মাসাবিহ)। উক্ত চারটি হাদিস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় নবীজী মোট নয়টি কর্তব্যের কথা উল্লেখ করেছেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণিত একটি হাদিসে উক্ত নয়টি সহ মোট চল্লিশটি পারস্পরিক হক্ব অধিকার বা কর্তব্যের কথা নবীজী বলেছেন। উক্ত হাদিসে অবশ্য চল্লিশটির উল্লেখ নেই। তবে হযরত আশরাফ আলী থানভী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এ জাতীয় ত্রিশটি অধিকার ও কর্তব্যের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথম নয়টি নিম্নরূপ: (১) পরিচিত ও অপরিচিত সকলকে সালাম প্রদান করা। (২) সালামের উত্তর প্রদান করা। (৩) হাঁচির জবাবে ইয়ারহামুকাল্লাহ বলা। (৪) দাওয়াত গ্রহণ করা। (৫) রোগীর সেবা-যত্ন করা। (৬) মু’মিন-মুসলমানের জানাযার সালাতে উপস্থিত হওয়া। (৭) সদুপদেশ দেয়া। (৮) নিজের জন্য যা পছন্দ অন্যের জন্যও তা পছন্দ করা। (৯) সর্বাবস্থায় অপরের কল্যাণ কামনা করা । বাকী ২১টি নিম্নরূপ: (১০) কোন ভাই ভুলত্রুটি করলে তা ক্ষমা করে দেয়া। (১১) বিপদগ্রস্তকে দয়া করা। (১২) অন্য ভাইয়ের দোষত্রুটি গোপন রাখা। (১৩) অন্য ভাই কোন ওযর পেশ করলে তা গ্রহণ করা । (১৪) কারো দুঃখ-কষ্ঠ দেখলে তা মোচন করা। (১৫) অন্যের প্রতি ভালবাসা প্রদর্শন করা। (১৬) যত্নের সাথে তার সকল দায়িত্ব পালন করা। কেউ কোন উপহার দিলে তা গ্রহণ করা। (১৮) কেউ কোন উপকার করলে তার উপকারের প্রতিদান দেয়া। উল্লেখ্য অন্যের উপকার করার জন্যেই তোমাদের সৃষ্ঠি করা হয়েছে। (১৯) প্রদত্ত নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা। (২০) সুযোগ পেলেই অন্যকে সাহায্য করা। (২১) তার পরিবার-পরিজনের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা। (২২) তার অভাব-অনটন দূর করা। (২৩) কোন আবেদন পেশ করলে তা গ্রহণ করা। (২৪) কোন সুপারিশ করলে তা গ্রহণ করা। (২৫) কোন ব্যাপারে তাকে নিরাশ না করা। (২৬) হারানো কোন জিনিষ পেলে তার কাছে পৌঁছে দেয়া। (২৭) অন্য ভাইয়ের সাথে নম্রভাবে কথা বলা। (২৮) সর্বদা তার সাথে সদ্ব্যবহার করা। (২৯) কোন শপথ করলে তা পূরণ করা। (৩০) কাউকে অপমান না করা। এছাড়া আরও কিছু কর্তব্য অন্যান্য হাদীসে রয়েছে। (আত্-তারগীব ওয়াত্্ তারহীব)।
হযরত আনাস রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসে শেষ নবী বলেন : একজন মানুষ পরিপূর্ণ মু’মিন হতে হলে শর্ত হল- সে তার জন্য যা ভালবাসবে,তা অন্যের জন্যও পছন্দ করবে (মিশকাত)। একব্যক্তি প্রচন্ড পিপাসায় একটি কুপে নেমে পানি পান করে আসল। এমন সময় একটি কুকুরকে পানির পিপাসায় ভিজা মাঠি চাঠতে দেখে সে ভাবল, আমার যেরূপ তৃষ্ণা লেগেছিল এ কুকুরটিরও তেমনি পিপাসা লেগেছে। সে কুপে নেমে তার চামড়ার মোজা পানি ভর্তি করে মুখে কামড়ে ধরে উপরে নিয়ে আসল। এবং কুকুরকে পানি পান করিয়ে খুব তৃপ্তি পেল এবং অল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল। আল্লাহ তা’য়ালা তার সমস্ত গোনাহ ক্ষমা করে দিলেন (বুখারী ও মুসলিম)। মানব ম্যানুয়াল মহাগ্রন্থ আলকুরআনে বলা হয়েছে, তুমি এমনভাবে মানুষের হক্ব আদায় কর যেমন তোমার মালিক জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তোমার হক্ব আদায় করে যাচ্ছেন (সূরা কাছাছ-৭৭)। আর জেনে রাখ! এ বিশ^ভূবনের সকল সৃষ্ঠি আল্লাহর পরিবার সদৃশ। এর মধ্যে সেই আল্লাহর কাছে প্রিয় যে তাঁর পরিবারের হক্ব পূর্ণরূপে আদায় করে এবং তাদের সাথে ভাল ব্যবহার করে (বায়হাক্বী)। হযরত আবু হোরায়রা বর্ণিত একটি হাদিসে নবীজী বলেন : এ বিশ^ভুবনে সর্বাধিক মর্যাদাশীল মানুষ হল তারা, যারা ধর্ম সম্পর্কে বুৎপত্তি অর্জন করে (আদাবুল মুফরাদ)। কারণ নীতি নৈতিকতা সম্পন্ন ব্যক্তিরাই অন্যের হক্ব আদায়ে সদা তৎপর থাকে। আর এরাই আল্লাহর আশ্রয়ে নিরাপদে বসবাস করে। এদের কোন ভয় নেই, ক্ষয় নেই, লয় নেই (সূরা আল্-ইমরান-১৩৯)। আল্লাহর বিধান অনুযায়ী জীবন-যাপন করলে বিক্ষিপ্ত শক্তি একত্রিত হয়,মরণোন্মুখ জাতি নবজীবন লাভ করে (সূরা আল্-ইমরান-১০৩)। মুসাফিরী এ জীবনে চলার পথে তাদের কোন বাধা-বিপত্তি থাকেনা, সকলে তাদেরকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করে। আল্লাহ তা’য়ালা সকল দস্যু-শত্রু এবং দারিদ্রতার কড়াল গ্রাস থেকে নিরাপদ রাখেন আর পরকালীন আযাব থেকে পূর্ণ নিস্কৃতি দিয়ে দেন (সূরা কুরাইশ-৩-৪)। সবচেয়ে জরুরী যে কথা তাহল-ব্যক্তি নিজের জন্য ধর্ম বা নিয়ম মানা যতটুক গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরী, সাধ্যমত পরিবার-পরিজন, প্রতিবেশী, সমাজ, দেশ-জাতি এবং নিখিল বিশে^র মানুষদেরকে ঐ ধর্মের ঈমান ও সৎকর্মের দাওয়াত দেয়া ঠিক ততটুকু গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরী। নতুবা শুধু নিজেদের আমল ইহ ও পরকালীন শান্তি-নিরাপত্তা এবং মুক্তির জন্য যথেষ্ঠ হবেনা (সূরা আছর)। সূরা আছরের তাফসিরে ইমাম শাফিয়ী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন : দ্বীন ও দুনিয়ার সমুহ ক্ষতি থেকে রক্ষা এবং নিরাপত্তা লাভের উপায় হল-চারটি। যথা: (১) নিজে সঠিক ঈমান। (২) এবং সৎকর্মের উপর বহাল থাকা। (৩) অপরকে তার দাওয়াত পৌঁছে দেয়া। (৪) অতঃপর যাবতীয় অন্যায় কাজ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা (তাফসিরে মা’রিফুল কুরআন)। উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে বুঝা গেল যে, সৃষ্ঠিকর্তার আইন পূর্ণরূপে পালন করে শ্রেষ্ঠ ও মর্যাদাবান একজন খলিফার আসন লাভ করাই বুদ্বিমানের কাজ এবং এটাই আসল দায়িত্ব ও কর্তব্য বলে আমাদের শেষ নবী জানিয়ে দিয়েছেন (আদাবুল মুফরাদ)।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT