ধর্ম ও জীবন

হদয়ে আমার মক্কা-মদিনা

চৌধুরী শাহেদ আকবর প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০৩-২০২০ ইং ০০:২১:০৮ | সংবাদটি ২৭৯ বার পঠিত
Image

ইসলামিক ভ্রমণ সাহিত্যের একটি বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে হজ্ব। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ প্রতি বছর পবিত্র হজ্ব পালন করার জন্য মক্কা এবং মদিনায় যান এবং ফিরে এসে অনেকেই তাদের হজ্ব ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেন। হজ্বকে কেন্দ্র করে লিখা এইসব ভ্রমণ কাহিনী আর অভিজ্ঞতা শত শত বছর ধরে ইসলামিক ভ্রমণ কাহিনীকে করে আসছে সমৃদ্ধ। বিখ্যাত পারস্য কবি নাসের-ই-খসরু (১০৫৫), স্পেনের মুসলিম পরিব্রাজক ইবনে যুবায়ের (১১৮৩-১১৮৪), মরক্কোর বিখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতা (১৩২৬) উনাদের হজ্ব ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন। ইউরোপীয় রেনেসার শুরুর দিকে অনেক ইউরোপিয়ানরা ও মক্কা-মদিনা ভ্রমণ করেছেন এবং তা নিয়ে লিখেছেন। তাদের অনেকেই ধর্মান্তরিত মুসলিম হিসেবে আবার অনেকেই মক্কা ও মদিনা গিয়েছেন ছদ্মবেশে। তাদের মধ্যে সুইজারল্যান্ডের জন লুইস বারখার্ড (১৮১৪), ব্রিটেনের স্যার রিচার্ড বার্টন (১৯৫৩), ধর্মান্তরিত মুসলিম লেডি এভেলিন কবোলদ (১৯৩০) সহ আছেন আরো অনেকে।
আমাদের দেশেও হজ্ব ভ্রমণের কাহিনী নিয়ে লিখেছেন অনেকেই। বাংলাদেশি হাজিদের মধ্যে হাজি আহসানউল্লাহ ১৯১২ সালে হজ্বে গিয়েছিলেন। সেই ভ্রমণ কাহিনী তিনি তার ‘আমার জীবন ধারা’ বইতে লিপিবদ্ধ করেছেন। মোস্তফা জামান আব্বাসীর ‘রাসুল স. এর পদপ্রান্তে’ কিংবা অধ্যাপক হাসান আব্দুল কাইয়ুমের ‘সমুদ্রপথে হজ্ব ভ্রমণের অভিজ্ঞতা’ হজ¦ ভ্রমণের স্মৃতি নিয়েই লিখা। একই গতিধারার পথে সাম্প্রতিক সময়ের সংযোজন হলো বেলাল আহমেদ চৌধুরীর (২০১৯) লেখা, ‘হদয়ে আমার মক্কা-মদিনা’। বেলাল আহমেদ চৌধুরী সস্ত্রীক ২০০৯ সালে পবিত্র হজ্ব পালন করেন। ২০১৫ সালেও তিনি আরেকবার হজ্ব পালন করেন। বইখানা মূলত তাঁর ২০০৯ সালের হজ্ব ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখা।
‘হদয়ে আমার মক্কা-মদিনা’ বইখানা দুই অধ্যায়ে বিভক্ত। প্রথম অধ্যায়ে ৮৬টি এবং দ্বিতীয় অধ্যায়ে ৩০টি শিরোনামে ৩১১ পৃষ্ঠার এই বইখানাকে বিন্যস্ত করেছেন লেখক। লেখক বেলাল আহমদ চৌধুরী মূলত এক একটি অধ্যায়ে এক একটি পৃথক বিষয় কখনো তথ্য দিয়ে, কখনো কাহিনী হিসেবে গল্পচ্ছলে, আবার কখনো ইতিহাসের আলোকে বর্ণনা করে সামনের দিকে এগিয়েছেন। কিন্তু সবচেয়ে মজার বিষয় হলো তাতে হজ্বের ধারাবাহিকতার ধাপগুলো বর্ণনার মাঝে হারিয়ে যায়নি। হজ্ব সম্পাদনের সময় ধারাবাহিক করণীয়গুলো কি কি সেটা পাঠকেরা ঠিকই বুঝতে পারবেন। সেই সাথে কাবা শরীফের ইতিহাস, হজ্বের গুরুত্ব, নামাজের গুরুত্ব, জমজমের ইতিহাস, হিজরতের কাহিনী, বদরের যুদ্ধ, মক্কা বিজয়ের কথা সহ ইসলামের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে বইটিতে। অত্যন্ত সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় লেখা বইখানা পড়ার সময় তীব্র ইচ্ছা জাগে হজ্ব ভ্রমণের। সেই সাথে এক ধরনের প্রশান্তি আসে মনের মধ্যে। আর এইটাই আসল কৃতিত্ব লেখক বেলাল আহমদ চৌধুরীর। বইখানা তাই শুধু ভোলায় না, ভাবায়ও বটে।
একজন মুসলিম হজ্ব পালনের তীব্র ইচ্ছা সবসময়ই তার মনের মধ্যে লালন করেন। আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব মুরব্বিদের অনেকের কাছেই হজ্বের গুরুত্ব এবং হজ¦ ভ্রমণের কাহিনী মুসলিমরা ছেলেবেলা থেকেই শুনে আসেন এবং ওই সময় থেকেই জীবনে একবার হলেও হজ্ব সম্পাদনের তীব্র ইচ্ছা মনের মধ্যে লালন করে প্রতিটি মুসলমানই বড় হন। বেলাল আহমদ চৌধুরীর মনেও সেই ইচ্ছা ছেলেবেলা থেকেই ছিলো। বইখানার শুরুতেই তিনি লিখেছেন, ‘আমার হৃদয়ে দিদারে বায়তুল্লাহ ও নবীজির রওজা মোবারকের স্বপ্ন সাবালক হওয়ার পর থেকেই অংকুরিত হয়েছিল। আমি খুব আগ্রহ সহকারে ‘ইহরামে’ সাদা লেবাসধারীকে অনিমেষ তাকিয়ে দেখতাম। আর, স্বপ্ন দেখতাম কবে ইহরামে সাদা শুভ্র দু’খণ্ড কাপড় গায়ে জড়িয়ে আমার কন্ঠ থেকে ধ্বনিত হবে, ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’। ’
প্রতি বছর বহুলোক আমরা হজ্বে যাই। এই হজ্ব শুধু ভ্রমণের জন্য বা সম্পাদনের জন্য নয়। এর আরো অন্তর্নিহিত তাৎপর্য রয়েছে। শিক্ষা রয়েছে। হজ্ব পালনের সময় একজন মুসলিমের অনেক ধরনের উপলব্ধি ঘটতে পারে। সেটি মানসিক ও আধ্যাত্মিক উভয় প্রকারেরই হতে পারে। বেলাল আহমদ চৌধুরী ও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। যেমন মিনাতে হাজীদের সমাগম দেখে লেখকের মনে হয়েছে ‘মানুষ আল্লাহর বান্দা। সুতরাং মানুষ দ্বিধাহীনচিত্তে প্রশ্নাতীতভাবে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসায় উদ্ভুদ্ধ হয়ে প্রতিটি মুহূর্ত কেবল তারই আনুগত্য করে যাবে।’ আবার আরাফাতের ময়দানে গিয়ে লেখকের মনে হয়েছে, ‘আমাদের দরকার আল্লাহর দ্বীনের পূর্ণাঙ্গ অবয়ব ও পবিত্র কুরআনের দাবি মেনে চলা।’ এই হজ্ব পরবর্তী জীবন কেমন হওয়া উচিত সেই ভাবনা থাকে বিচলিত করেছে। তিনি লিখেছেন, ‘হজ্ব হচ্ছে অহংকার, গর্ব এবং গৌরব ও পদমর্যাদা দূর করার প্রতিষেধক।’
বাংলাতে একটা কথা আছে ‘আগে দর্শনধারী, পরে গুণবিচারী’। এই কথাটার মানে হচ্ছে যে প্রথম দেখাতেই যদি কোনো কিছু বা কোনো বস্তুকে মনোমুগ্ধকর মনে না হয় তবে সেই বস্তুর প্রতি আগ্রহ অনেকখানি এমনিতেই কমে যায়। ‘হদয়ে আমার মক্কা-মদিনা’ বইখানার বাহ্যিক রূপ এবং অলংকরণ এক ভালোলাগায় মনকে আচ্ছাদিত করে ফেলে। প্রচ্ছদ, পেছনের কভার এবং ভেতরের কভারকে আকর্ষণীয় করে তুলতে ওয়াজিহা মাহমুদ মানহা বেশ মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। ঝকঝকে ছাপা এবং মানসম্পন্ন কাগজ ও টেকসই বাঁধাইয়ের জন্য যে কোনো পাঠক বইটিকে দীর্ঘদিন সংগ্রহে রাখতে পারবেন। পেছনের ভেতরের কভারে লেখকের ছবি ও সংক্ষিপ্ত জীবনী সংযোজন যথার্থ হয়েছে। বইখানার ভূমিকা লিখেছেন দৈনিক সিলেটের ডাক-এর নির্বাহী সম্পাদক আবদুল হামিদ মানিক। আর প্রকাশ করেছে পাণ্ডুলিপি প্রকাশন।
বাজারে হজ্ব সম্পর্কিত অনেক ধরনের বই পাওয়া যায়। এই বইগুলো সাধারণত দুই ধরনের হয়। হজ্বের মাসলা-মাসায়েল সম্পর্কিত অথবা হজ্ব ভ্রমণের স্মৃতি আর অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা। কিন্তু এই বইখানা একটু ব্যতিক্রম। এই বইখানা আসলে একের ভেতর অনেক। বইখানাতে লেখক তার সফরের কাহিনীর সাথে সাথে বলে গেছেন হজ্বের ইতিহাস, গুরুত্ব, হজে¦র নিয়মাবলি এবং সমকালীন মুসলিম বিশ্বের অনেক কিছুই। তাই বইখানা কখনো ধর্মীয় শিক্ষা, কখনো বা বাস্তব অভিজ্ঞতার বর্ণনা, আবার কখনো যেনো ইতিহাসের পথে পরিভ্রমণ। বইটির লেখক বেলাল আহমদ চৌধুরী যে একজন ভালো পাঠকও বটে তা স্পষ্ট হয়ে উঠে এটা থেকে। তিনি পবিত্র আল কুরআন-এর উদ্ধৃতি, হামদ ও নাত, গজল, ইসলামী কবিতা এবং ঐতিহাসিক এবং সাম্প্রতিক বিষয়াবলির সন্নিবেশে বইখানাকে করে তুলেছেন একটি তথ্যবহুল সুখপাঠ্য। হালকা কিছু মুদ্রণ প্রমাদ যদিও রয়েছে বইখানাতে, কিন্তু সেটা বইটির আনন্দপাঠে বিঘ্ন ঘটায় না মোটেও। বইখানা এক কথায় এটি একটি সংগ্রহে রাখার মত বই। এই রকম একখানা বই পাঠককূলকে উপহার দেওয়ার জন্য লেখক ও প্রকাশককে ধন্যবাদ।

 

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT