ধর্ম ও জীবন

হযরত শাহজালালকে নিবেদিত কথামালা

মুন্সি আব্দুল কাদির প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০৩-২০২০ ইং ০০:২২:০৯ | সংবাদটি ২৭৩ বার পঠিত


হে প্রিয়, আপনি রাসুলের সা. দেশের খুব কাছেই ছিলেন। আপনার দেশের সীমানা পেরুলেই প্রিয় নাবীর পুষ্পদ্যান। উত্তরের মরু সাইমুম রওজায়ে আতহারের সুঘ্রাণ আপনার নাসারন্দে পৌছে দিত। শরীর এক আনন্দ শিহরনে নেচে উঠে। হৃদয়ে এক অনাবিল শান্তি বিরাজ করে। মন রাসুলের ভালবাসায় আল্পুত হয়। হৃদয়ের গভীর থেকে সালাম সালাম হে রাসুল বলে ঠোট দিয়ে এমনিতেই বেরিয়ে যায়। আরব সাগরেরর জলরাশি নিয়ে হিমেল বাতাস উত্তরে বয়ে চলে, আপনার সালামকে সাথে করে নিয়ে যায়। খুব আদবের সাথে মোলায়েম ভাবে আপনার সালাম পৌছে দেয় জান্নাতের বাগান সবুজ গম্বুজের নিচে। খুব সহজে আপনিও পৌছে যেতে পারেন প্রেমাষ্পদের জিয়ারায়।
আপনার দেশ ছিল, খেশ ছিল, বাড়ি ছিল, পাড়া প্রতিবেশী ছিল, উত্তরে জান্নাতের বাগান রাসুলের রওজা আর দক্ষিনে আরব সাগরের বিশাল জলরাশি। রাসুলের প্রেম ভালবাসার সাগরে ডুব দিয়ে আপনি কত হিরা জহরত মনি মুক্তা আহরন করেছেন। আপনার পূর্বসুরী রাসুল সা. এর আশেক ওয়ায়েস আল কারনী প্রিয় রাসুলের ওহুদের দন্ত শহীদ হওয়ার কথা শোনে নিজের সবগুলো দাঁত নিজে পাথর দিয়ে আঘাত করে করে ভেঙ্গে ফেলেন, এটা কতটুকুন এশকের টান আমি তা অনুভব করতে পারি না।
হে প্রিয়, আপনি উসর মরুর ধুসর মনের মালিক, খোদার প্রেমের জোয়ারে ভাসমান। রাসুল প্রেমের এশকে কত রোনাজারি আর চোখের লোনাপানি আপন্রা খাজানায় ভরপুর। আপনাদের এই চোখের পানি আরব সাগরের বিশাল পানির ভান্ডারকেও হার মানিয়েছে। রাসুলের ভালবাসা ছাড়া পথ চলা নেই। আল্লাহর প্রেম ছাড়া কারো সাথে সখ্যতা নেই। দিদারে মাওলাই একমাত্র আরাধ্য। খোদার নামের সৌন্দর্য আপনার হৃদয়, মন প্রাণ ছিনিয়ে নিয়েছে। তাঁর ভালবাসা তৃষ্ণার্ত হৃদয়কে সিক্ত করেছে। তার ভালবাসা হৃদয় সাগরকে দিন দিন আরো উত্তাল করেছে। তাঁর সান্নিধ্য পাওয়ার আশা মনকে ব্যাকুল করে দিয়েছে। পায়ের চলন, হাতের কর্ম, মনের চিন্তা, হৃদয়ের কামনা, চোখের অবলোকন, কর্ণের শ্রবন শুধু আল্লাহর ধ্যান জ্ঞানে মশগুল।
এত ভাবাবেগ, এত উষ্ণতা, এশকের সাগরের অতল তলে হারিয়ে যাওয়া, তারপরও কেন মনি মুক্তা বিছানো, নবীর পরশ, বাইতুল্লাহর আরাধনা, রওজায় হাজিরা দেওয়া ছেড়ে এই বিপদ সংকুল পথ বেছে নিলেন। হাজার হাজার মাইল পায়ে হাটা পথ, বিক্ষুব্ধ ঝড় ঝঞ্জা, অজানা অচেনা দেশ, নতুন দেশ নতুন ভাষা, নতুন মানুষ সামনে পিছনে শুধু শত্রু, এমন এক দেশে পাড়ি জমালেন। আমাদেরকে আলোর পথ দেখাতে, জুলুম শোষন থেকে উদ্ধার করতে, জাহান্নামের লেলিহান শিখার দগ্ধতা থেকে বাঁচাতে, সত্যিকারের প্রভুকে চিনাতে, কত দরদ, কত ভালবাসা, কত আবেগ অনুভব নিয়ে আপনি রাজ রোষের বিরুদ্ধে খালিহাতে দাড়িয়ে গেলেন প্রিয়। আল্লাহ তায়ালা যা ভালবাসেন, রাসুল সা. কে যে জন্য হেরার আলো দিয়ে দুনিয়ায় পাঠালেন, যে আলোর রশ্মিতে তখনকার পরাশক্তি কায়সার কিসরা, রোম পারস্য ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। যার জন্য রাসুল সা. এর প্রিয় সাহাবাগন রা., তাবেয়ী রাহ, তাবে তাবেয়ীগন রাহ. তার পরবর্তীতে আল্লাহ তায়ালার প্রিয়গন সংসার, দেশ, খেস, সহায় সম্পদ সব কিছু ছেড়ে আটলান্টিকের কিনারা থেকে শুরু করে সুদুর ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত কেবল মাত্র মাওলার পরিচয়, পথভুলা মানুষদের জন্য চষে বেরিয়েছেন। আপনিও তাঁদের একজন হে প্রিয়।
আপনি পায়ে হেটে আপনার সাথীদের নিয়ে হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়েছেন। অনাহারে অর্ধাহারে দিন গুজরান করেছেন। কখনো সামান্য আহার, কখনো সামান্য ফলমূল ছিল আপনারদের রসনার বস্তু। রৌদ্রের খরতাপে জ¦লেছেন, ঝড় বৃষ্টির ঝাপটা সয়েছেন, উপোষ থেকেছেন, খালি মাঠে রাত্রি জাপন করেছেন। সবকিছুই হাসি মুখে, নিজের চাওয়া হিসেবে মহিয়ানের এশকের কাছে হার মেনেছে। পরোয়ারদেগারের এশক যেখানে জ¦লন্ত, সেখানে অন্য দুঃখ কষ্ট, বাধা বিপত্তির কিইবা মূল্য আছে। মাহবুবের এশক সবকিছুকে জ¦ালিয়ে ভষ্ম করে দেয়। সেখানে অন্য কষ্টের কোন আলামতই থাকে না।
তাইতো বাতিল শক্তিকে কোন শক্তিই মনে করেননি। জালিমের রক্ত চক্ষুর কোন পরোয়াই করেননি। এভাবেই শিশাঢালা প্রাচীরের ন্যায় জালিম শাসকের বিরুদ্ধে দাড়াতে কুন্ঠা বোধ করেননি। আল্লাহর সাহায্যের উপর প্রগাড় আস্থা, দ্বীনের পথে অটল, অবিচল, মাওলার সাহায্যকে অবধারিত করে দিয়েছে। আল্লাহর সাহায্যে জালেমকে পরাভুত করে এই সবুজ শ্যামল ভূমির নীলাকাশে কালেমার পতাকা উড়িয়ে দিয়েছেন। ভালবাসা আর দরদ ভরা কন্ঠে আমাদের পূর্ব পুরুষদের মাওলার পছন্দ করা দ্বীন আল ইসলামের পথে আহবান করেছেন।
পলিযুক্ত দোআশ মাটির এই সোনার বাংলায় আমাদের জন্ম, বসবাস। আমাদের এই ভূমির মাটির মতই মানুষের মনও নরম। তাই আমাদের পূর্ব সুরীগন যখনই আপনার আহবানে সত্যের সন্ধান পেয়েছেন, মহান প্রভুর পরিচয় জেনেছেন, আপনার বাগানের ফুল গুলোতে মধুর সন্ধান পেয়েছেন। তখনই আপনার আহবানে তারা তাদের ধর্ম ত্যাগ করে দলে দলে আপনার অনুসারী হয়েছেন। মাওলাকে পাওয়ার বাসনায় ব্যাকুল হয়ে গেছেন।
হে প্রিয় একটু দেখুতো, আমার এই ভূমি তিন দিকেই অন্য ধর্মের মানুষ দ্বারা বেষ্টিত। মুসলিম দুনিয়া থেকে এক্বেবারে বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপে আমার বসবাস। আমি ছাড়া পৃথিবীতে যতগুলো মুসলিম দেশ রয়েছে সকলের সাথে সকলের জল অথবা স্থল সীমা রয়েছে। কিন্তু আামার সাথে কোন মুসলিম দেশের সীমানা নেই। হে প্রিয় আমার মন সত্যের জন্য উদগ্রীব না হলে আমি কি মুসলমান হতে পারতাম। আল্লাহ তায়ালার অফুরন্ত দয়া আমার দিকে বষিত না হলে আপনিও কি আমাকে সত্যের পথে আহবানের জন্য আসতেন? হে প্রিয় আপনাকে অনেক অনেক মুবারকবাদ। মহান মাওলার হাজারো লক্ষ্য শুকরিয়া। আপনি আমাদের পুরো এলাকা দ্বীনের ফসলে আবাদ করেছেন। এই কর্দমাক্ত উর্বব ভূমি চাষ করার জন্য আপনার সাথীগন পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছেন। আপনি এবং আপনার সাথীগন কোন আরাম আয়েশ চাননি। আমার এই এলাকার পুরো রাজত্ব আপনার পায়ের তলায় চুম্বন করেছে। কিন্তু আপনি কোন বাদশাহী চাননি। বাদশাহী আর রাজত্ব চাইলে আপনি এবং আপনার সাথীগন নিজ দেশেই আরামে আয়েশে দিন যাপন করতে পারতেন। মাওলার দ্বীন প্রচারের কাছে এই আরাম আয়েশ নেহায়েতই তুচ্ছ।
হে প্রিয়, আপনি বিদায় নিয়েছেন, বেশ কয়েক শতক পেরিয়ে গেছে। কিন্তু আপনার নাম আমরা খুব তাজিমের সাথেই স্মরণ করি। আপনাদের নাম বলার সাথে সাথে মহান মাওলার দরবাবে আপনাদের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য দোয়া করতে থাকি। আপনাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় অন্তরের মনিকুটা থেবে বেরিয়ে আসে আস সালাম। আমাদের পূর্ব পুরুষগন ঠিকই আপনাদের প্রিয় হতে পেরেছেন। আপনাদেরকে আপন করে নিয়েছিলেন। কিন্তু আমরা!
হে প্রিয়, আপনি আমাদেরকে যেমন চাইতেন, আমরা তেমটি নেই। আল্লাহর প্রেম আর রাসুলের ভালবাসা থেকে আমরা যোজন যোজন দুরে। মুখে আল্লাহর প্রেম আর রাসুলের ভালবাসা কথা বললেও অন্তরে তার স্থান খুব একটা নেই। আমাদের বেখেয়াল আর অবহেলায় আপনাদের শুয়ে থাকার জায়গায় আমরা সুন্নাতের পরিবর্তে বেদয়াত আর শিরকের আস্তানা বানিয়েছি। আমাদের অবস্থা এমন দাড়িয়েছে যে আমরা কোনটি সুন্নত আর কোনটি বেদয়াত সে চিন্তা করতেও ভুলে গেছি। আমাদের সামনে যখন সুন্নত ও দুনিয়ার স্বার্থ এসে হাজির হয় আগে দুনিয়ার স্বার্থই প্রাধান্য দেই। আামদের মধ্যে যারা দ্বীন নিয়ে চিন্তা করে তারা খুব একটা আপনাদের ধারে কাছে যান না। তারাও আপনাদের শয়নের স্থানে বেদয়াত আর শিরকের আস্তানা গাড়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। তারা শুধু শিরক আর বিদয়াতের বিরুদ্ধে মাঠ গরম গরম বক্তৃতা দিতেই অভ্যস্ত। কিভাবে আপনাদের শয়নের স্থানগুলোতে শিরক আর বিদয়াত আস্তানা গেড়েছে আর কিভাবে তা দুর করা যায় তার পথ ও পন্থা নিয়ে খুব একটা চিন্তা করতে দেখা যায় না।
আমাদের মধ্যে অনেক শ্রদ্ধাভাজন আলেম আছেন, তারা আপনার পাশ দিয়ে য়াওয়ার সময় আপনার শয়নের পাশে গিয়ে খুব একটা সালাম দিতে শোনা যায় না। এমনটি হলে আমরা যারা সাধারণ মানুষ আপনার জেয়ারায় বুঝে, না বুঝে এসে থাকি আমরা কিভাবে জেয়ারত করতে হয় বুঝতে পারতাম, শিরক আর বিদয়াত বুঝে আমল করতে পারতাম। আপনাাদের প্রতি আমাদের আবেগকে শয়তান অস্র বানিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে। ফলে আমাদের ভাল চাওয়াটাও মন্দ ফল বয়ে আনে। প্রথা আর পদ্ধতি সঠিক না জানার কারণে আমরা ভুল করে থাকি। কোনটিতে সাওয়াব আর কোনটি বেদয়াত আমরা জানি না। জানার চেষ্টাও করি না। আমরা আল্লাহর প্রিয় হতে চাই ভুল পথে। আলেমগনও আল্লাহর প্রিয় হতে চান, মাঠে ওয়াজ করে। আামাদের আর আলেমগনের মধ্যে যেন এক বিভেদের দেয়াল দাড়িয়ে আছে। আমরা চাই এটা থেকে বেরিয়ে আসি। কিন্তু কোন এক শক্তির বেড়াজালে পড়ে আমরা পারছিনা সেই বিভেদের দেয়াল ভেঙ্গে দিতে।
হে প্রিয়, আপনারা আমাদেরকে অনেক ভালবাসতেন। কিন্তু আমরা আপনাদের ভালবাসার মূল্য রাখিনি। আপনাদের পথ সঠিক ভাবে অনুসরন করছিনা। শুধু আবেগের চাদরে ইমানকে ঢেকে দিতে চাই। ইলম আর আমল আমাদের মধ্যে অনুপস্থিত। হে প্রিয়, আদালতে আখেরাতে আমাদের বিরুদ্ধে আরজি পেশ করার যথেষ্ট কারন উপস্থিত। আপনারা মাওলাকে পাওয়ার জন্য যেভাবে রোনাজারি করেছেন, রাত জেগেছেন, আরাম আয়েশ বিসর্জন দিয়েছেন, আমাদের মাঝে এর কোনটিই নেই। আপনারা আল্লাহর মাহবুব ছিলেন, আর আমাদের মাহবুব হল আমার পেট। সারাদিন শুধু আমার পেটের কর্ম নিয়েই আমি ব্যস্ত।
হে প্রিয়, আজ মাওলার কাছে নিবেদন করছি, আমরা যেন মাওলাকে চিনতে পারি। আপনাদের উপর জুলুম না করি। সুন্নাতে রাসুল সা. এর অনুস্মরনের মাধ্যমে মাওলার প্রিয় হতে পারি। আদালতে আখেরাতে যেন আপনাদের সাথে আমাদের শান্তির মোলাকাত হয়। সবাই সবাইকে যেন ভালবাসতে পারি। আমিন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT