পাঁচ মিশালী

পাইলট স্কুলের স্মৃতি

জামান মাহবুব প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৩-২০২০ ইং ০০:০৬:২৭ | সংবাদটি ৪৯৮ বার পঠিত
Image

১৯৬৪ সালে শেখঘাট প্রাইমারি স্কুলে (পরে সরকারি) চতুর্থ শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর বাবার বন্ধু শিক্ষক ওয়াছির আলী বড়লস্করের পরামর্শে সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিই। কোনোমতে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলাম। কিন্তু ওয়াছির আলী বড়লস্কর স্যার আমার মনে ভয় ধরিয়ে দিলেন এই বলে যে, যদি পঞ্চম শ্রেণির ষান্মাসিক পরীক্ষায় ভালো ফলাফল না করতে পারি, তাহলে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হবে। সেসময়ে সিলেট সরকারি পাইলট স্কুল ছিল পূর্ববাংলার অন্যতম সেরা স্কুল। এসএসসি পরীক্ষায় এ স্কুলের ফলাফল ছিল ঈর্ষণীয়।
দলবেঁধে হেঁটে হেঁটে স্কুলে যাই। হেঁটে হেঁটে ফিরি। সেসময় রাস্তাঘাটে তেমন গাড়ি চলাচল ছিল না। শেখঘাট থেকে চার আনায় রিকশা ভাড়া দিয়ে কালীঘাটে স্কুলে যাওয়া ছিল ছাত্রদের জন্য রীতিমতো বিলাসিতা। তবে শান্ত-স্নিগ্ধ মিষ্টি সকালে দলবেঁধে স্কুলে যাওয়ার সময় কিনব্রিজসংলগ্ন দেয়ালবিহীন সার্কিট হাউসের কুলগাছ তলায় কুল কুড়ানো কিংবা ঢিল ছুঁড়ে দু-চারটা কুল পেড়ে খাওয়ার আনন্দ ছিল দারুণ। মাঝে মাঝে তালতলা দীঘিতে (বর্তমান বাংলাদেশ ব্যাংক) দুরন্ত ছেলেদের সাঁতার কাটা দেখতে আনন্দ হতো। কখনো-বা কিনব্রিজের পশ্চিম পার্শ্বের গির্জাসংলগ্ন বিরাট গাছগুলোর নিচে রাস্তার ধারে বাঁদর-নাচ দেখতাম। কখনো বা ভাগ্য পরীক্ষার ছলে টোটকা ওষুধ বিক্রেতাদের ক্যানভাস শুনতাম। মাঝে মাঝে বাসায় ফেরার পথে সাপুড়েদের সাপের খেলা দেখা ছিল আমাদের বিনোদন। এরপরও মাথায় দুর্বিষহ ভাবনা ছিল, ষান্মাসিক পরীক্ষার ফলাফল কী করে ভালো করব! যা হোক, সেযাত্রায় ত্রয়োদশ স্থান লাভ করে সেই ভীতি থেকে মুক্ত হলাম। পরে বুঝেছি, আমাকে পড়াশুনায় মনোযোগী করাই ছিল বাবা ও স্যারের গোপন অভিলাষ।
আমাদের ক্লাস ক্যাপ্টেন ছিল শাহ সৈয়দ ইশতিয়াক হক জালালী। সে স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক আসামি স্যারের সন্তান। স্যারের পুরো নাম শাহ সৈয়দ মনিরুল হক। আদিবাস ভারতের আসাম রাজ্যে। সেই সুবাদেই ‘আসামি স্যার’। তাঁর পুত্র জালালী পড়াশুনায় খুবই ভালো। শান্তশিষ্ট ও ভদ্র। তার সাথে সহজেই আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেল। টিফিন পিরিয়ডে পিয়ন দাদু টিফিন নিয়ে আসতেন। ক্লাস ক্যাপ্টেনের তত্ত্বাবধানে তা বন্টন হতো। মনে বাসনা ছিল, বন্ধুত্বের খাতিরে জালালী আমাকে দু-একটা বাড়তি সিঙ্গাড়া আমার হাতে তুলে দেবে, কিন্তু কখনো সেটি হয়নি। এ ব্যাপারে সে ছিল অতিমাত্রায় কড়া।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী ছিলেন ব্যাঘ্র পুরুষ। তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা ছাত্র তো দূরের কথা, শিক্ষকদেরও সাহস হতো না। তিনি যখন প্রধান শিক্ষকের কক্ষ থেকে বেরিয়ে পরিদর্শনে বের হতেন, তখন সারা স্কুলের চেচামেচি থেমে যেত। শিক্ষকেরা অত্যন্ত মনোযোগী হয়ে পাঠ বোঝাতে লেগে যেতেন। স্তব্ধ করিডোরে শোনা যেতো প্রধান শিক্ষকের জুতোর খটখট আওয়াজ। মাঝে মাঝে ঢুকে যেতেন শ্রেণিকক্ষে। ছাত্রদের এটা-ওটা জিজ্ঞেস করতেন। ভয়ে আমাদের আত্মারাম তখন খাঁচা-ছাড়া হওয়ার উপক্রম। প্রধান শিক্ষকের অফিসকক্ষের শো-কেসে একটা লম্বা বেত সাজিয়ে রাখা ছিল। শোনা যেত, পিয়ন ওতে প্রায়শই তেল দিয়ে চকচকে করে রাখে। প্রধান শিক্ষক এটি মাঝে মাঝে অবাধ্য ও দুর্বিনীত ছাত্রদের পিঠে পরখ করতেন। যার ভাগ্যে বেতের মার জুটেছে, সে ইহজন্মে সে ‘সুখ’ কখনো ভুলতে পারবে, তেমন সম্ভাবনা ছিল না।
আমার চাচাতো বড়ভাই শামসুল করিম কয়েস দশম শ্রেণির ছাত্র। কবিতা-ছড়া লিখে তিনি তখন খ্যাতিমান কিশোরকবি। একদিন আমাকে নিয়ে হঠাৎ প্রধান শিক্ষকের বাসায় হাজির হলেন। স্যার একটা চৌকিতে বসে দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন। ভয়ে আমার শরীর তখন কাঁপছে। আমাকে দেখে ভাইকে স্যার জিজ্ঞেস করলেন, ‘কয়েস, ও সাজ্জাদ মামার ছেলে না?’ কয়েস ভাই মাথা নাড়তেই বললেন, ‘তোমরা ভাত খেয়ে যাও।’ কয়েস ভাই মিনমিনে গলায় আপত্তি তুললে স্যার পাশে দাঁড়ানো কর্ত্রীকে বললেন, ‘ওদেরকে গরুর দুধ খাইয়ে দিও।’ স্যারের সহধর্মিণী কয়েস ভাইয়ের বৈমাত্রেয় বোন তা জানতাম। কিন্তু শ্মশ্রুমন্ডিত রাশভারী প্রধান শিক্ষক আমাদের দুলাভাই, এটা ভাবতেই শরীরের রক্ত হিম হয়ে এল।
শাসনে-স্নেহে, কঠোরে-কোমলে প্রধান শিক্ষকের এই চরিত্র আমাকে দিনে দিনে মুগ্ধ করে তুলল। এরকম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অন্যান্য শিক্ষকদের মধ্যেও কমবেশি ছিল। পঞ্চাশ বছর আগে এসএসসি পাশ করে সিলেট সরকারি পাইলট স্কুলের গন্ডি ছাড়িয়ে জীবনের নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে বার্ধক্যে উপনীত হয়েছি। কিন্তু আজো মনশ্চক্ষে দেখতে পাই, শ্রেণিকক্ষের চেয়ারে বসে, ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়ে কিংবা ব্ল্যাকবোর্ডে চক-ডাস্টার হাতে পাঠদান করছেন শৈলেশরঞ্জন দেব, আব্দুর রাজ্জাক, মতিলাল গোপ, চেরাগ আলী, হামিদ আলী, মোহাম্মদ সাইদ, সদাকত আলী, আব্দুল হামিদ, মাসুদ সিদ্দিকী, আব্দুল মান্নান, পন্ডিত আ.ন.ম বদরুল হক শান্ত্রী, মুস্তাকিম আলী লশকর, মুহাম্মদ সিরাজুল হক, আফতাব আলী, নজরুল ইসলাম চৌধুরী, কাজী সিরাজুল ইসলাম, রিয়াছত আলী, আব্দুল হক, ফজলুল হক, আর্জুমান্দ আলী, মাহবুবুর রহমান প্রমুখ স্যার।
অষ্টম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর আমরা কতিপয় সহপাঠী বইপড়ার নেশায় মত্ত হয়ে উঠি। বিভিন্ন পাঠাগার থেকে পাঠ্যবহির্ভূত বই এনে কিংবা সহপাঠীদের বই ধার করে আমরা দিনরাত বই নিয়েই পড়ে থাকতাম। বন্ধুদের মধ্যে অসুল আহমদ চৌধুরী, বনদীপলাল দাশ, ফয়েজ আহমদ, সহিদ আহমদ চৌধুরী, মোরশেদ আহমদ চৌধুরী, আলী আশরাফ চৌধুরী, আব্দুর রকিব, শামীম আহমদ প্রমুখ গল্পের বই পড়ার নেশায় মেতে থাকলেও শ্রেণিকক্ষে ছিল মনযোগী ছাত্র। আমি ছিলাম এর ব্যতিক্রম। শ্রেণিকক্ষে একদিকে স্যার পাঠদান করছেন অন্যদিকে আমি পাঠ্যবইয়ের নিচে লুকিয়ে রেখে গল্পের বই পড়ছি। ফলে ষান্মাসিক পরীক্ষায় ফেল মারলাম অংকে। শৈলেশরঞ্জন দেব স্যার কান মলে বললেন, ‘গাধা, তোর দ্বারা বার্ষিক পরীক্ষায় পাশ করা হবে না।’ খুব অপমানিত বোধ করলাম। মাথা বেঁধে অংক বইয়ের সব অংক কষে ফেললাম। বার্ষিক পরীক্ষায় ঊনসত্তর নম্বর পেলাম অংকে। তখন লেটার মার্কস পাওয়া ছিল খুব কঠিন। যা হোক, ভালোভাবে নবম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হলাম। পরে শৈলেশরঞ্জন দেব স্যার বললেন, ‘ওই দিন ওভাবে না বললে তুই ভাল রেজাল্ট করতে পারতিস না।’ স্যারের প্রতি শ্রদ্ধায় আমার মন বিগলিত হয়ে উঠল।
সত্তর সালের এপ্রিল মাসে এসএসসি পরীক্ষা। ফেব্রুয়ারি মাসে আমাদের বিদায়-সংবর্ধনার আয়োজন করা হলো। স্কুলের যেদিকে তাকাই সাত বছরের নানা স্মৃতি, চোখ ঝাপসা হয়ে ওঠে। বিদায়-সংবর্ধনায় আমরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম। এই স্কুল, খেলার মাঠ, প্রাজ্ঞ শিক্ষক মন্ডলি, পিয়ন দাদুরা, পলাশ-শিমুলের রাঙা হয়ে ওঠা বিশাল গাছের সারি, সহপাঠী বন্ধু, নিচের শ্রেণির অনুজপ্রতিম ছাত্র সবাইকে ছেড়ে যেতে হবে। এই শিক্ষাঙ্গন আর আমাদের নয়। কদিন পরই আমরা স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রদের দীর্ঘ সারিতে সংযুক্ত হব। বুক ফেটে বেরিয়ে এল দীর্ঘশ্বাস!
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তৃতায় প্রধান শিক্ষক সৈয়দ আমিরুল ইসলাম বললেন, ‘আজকের এই বিদায়ের মুহূর্তটি নিঃসন্দেহে বেদনার। তবে তোমরা স্কুলকে চিরতরে ছেড়ে যাচ্ছ না। পাইলট স্কুলের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যকে ধারণ করে তোমরা নিজেদেরকে গড়ে তুলবে আরো বৃহৎ পরিসরে। একদিন ছড়িয়ে পড়বে পৃথিবীর পাঠশালায়। তোমাদের সফলতায়, তোমাদের অবদানে দেশ, জাতি ও বিশ্ব সমৃদ্ধ হবে। পাইলট স্কুলের অগ্রযাত্রায় যুক্ত হবে সাফল্যের নতুন নতুন পালক।’
প্রধান শিক্ষক সৈয়দ আমিরুল ইসলাম স্যারের উদ্দীপনামূলক ভাষণে আমরা হলাম অনুপ্রাণিত, হলাম উজ্জীবিত। মনে হলো, আমাদের বুকের গভীরে চিরদিনের জন্য ঠাঁই করে নিয়েছে সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়। এ বন্ধন কখনো ছিন্ন হবার নয়, হবেও না।

 

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT