‘এ ধরণী কর্মক্ষেত্র কর্মের বর্ম পরি / তোমায় এগুতে হবে বিধাতায় স্মরি, / আপনার লক্ষ্য পানে, ওরে অন্ধ নর / জীবন ব্যয়িত করে কর্মে নিরন্তর।

 

'/> SylheterDak.com.bd
পাঁচ মিশালী

‘কর্মের সাফল্যেই উজ্জ্বল জীবন’

সৈয়দ আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৩-২০২০ ইং ০০:০৭:৪১ | সংবাদটি ৪০৪ বার পঠিত
Image

তুমি যে কাজেই নিযুক্ত হবে সে কাজই মন দিয়ে ভালো করে করতে চেষ্টা করবে। কাজ যত সামান্যই হোক না কেন, সৎ, পরিশ্রমী ও বুদ্ধিমান মানুষ সেই কাজের দ্বারাই উন্নতি লাভ করতে পারে। সমস্ত জীবনটা তোমার সার্থকতাপূর্ণ হলো কি-না, তা পরিমাণ করা হয় নিজের কাজের মাপকাঠি দিয়ে, বয়স দিয়ে নয়। নিজের মৃত্যুর সাথে সাথে পৃথিবী থেকে তোমার নাম মুছে ফেলতে যদি না চাও, তবে এমন কিছু লিখ বা আবিষ্কার কর যা মানুষ মূল্যবান মনে করে গ্রহণ করবে অথবা এমন কাজ কর, যা নিয়ে পৃথিবীর মানুষেরা তোমার সম্পর্কে লিখতে পারে। তাইতো চাণক্য পন্ডিত লিখেছিলেন :
‘সুবিমল পূর্ণ কাজ করিয়া সাধন / ক্ষণকাল বাঁচিলেও স্বার্থক এ জীবন / কি ফল বাঁচিয়া বল শতবর্ষ ধরি / ইহকাল আর পরকাল সব নষ্ট করি।’
কর্ম ও সাধনা ছাড়া মানুষ বেঁচে থাকার পন্থা পায় না, উত্তম জীবন যাপন করতে পারে না। পৃথিবীর মানুষের জন্য রেখে যেতে পারে না, সৃষ্টিশীল, সৃজনশীল ও প্রশংসনীয় কোনো কর্মফল। মৃত্যুর পর অমর থাকা বা মানুষের হৃদয় মিনারে বেঁচে থাকা এবং স্মরণীয় বরণীয় হয়ে মানুষের অন্তরে অন্তরে ধ্বনিত হওয়ার জন্য প্রয়োজন উত্তমরূপে কর্মচেষ্টা ও সাধনা করা। কর্ম সাধনার অপর নাম সফলতা। কর্মহীন সফলতার কথা চিন্তা করা নিছক মূর্খতা। পৃথিবীর ইতিহাসে যারা আজ স্বনামে সমাদৃত, মানুষের মুখে মুখে যাদের নাম প্রশংসিত, আলোচনার টেবিলে স্বমহিমায় উদ্ভাসিত, যারা উপমা হয়ে তারকার ন্যায় আকাশে আলো হয়ে জ্বলছেন, তারা সবাই নিজ কর্ম ও চেষ্টা সাধনায় ছিলেন ব্রত। নিজ স্বপ্ন বিনির্মাণে কর্ম সাধনাকে করেছিলেন জীবনের ব্রত হিসাবে। ভালোবাসা দিয়ে কাজ করলে কাজে আনন্দ, উন্নতি ও প্রতিষ্ঠা পাওয়া যায়।
মানুষ নিজেই তার ভাগ্য নির্মাতা। ভাগ্যকে নির্মাণ করতে হলে নিরলস শ্রম ছাড়া দ্বিতীয়টি নেই। যে মানুষ কর্মকেই তার জীবনের ধ্রুবতারা করেছে জীবন সংগ্রামে তারই জয় নির্ণীত হয়েছে। সৌভাগ্যের স্বর্ণশিখরে আরোহণের একমাত্র উপায় হচ্ছে পরিশ্রম। পবিত্র কুরআনে ঘোষিত হয়েছে, ‘মানুষের জন্যে শ্রম ব্যতিরেকে কিছুই নেই’। মানবজীবন অনন্তকাল কর্মমুখর থেকে প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে যুদ্ধ করে তাকে জীবনের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে ও জীবনকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। এজন্য তাকে নিরন্তর কাজ করতে হয়। তাই পৃথিবী হলো কর্মশালা আর জীবন মাত্রই পরিশ্রমের কর্মক্ষেত্র।
পৃথিবীর বিখ্যাত ব্যক্তিগণ কঠোর পরিশ্রম করেই নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বৈজ্ঞানিক নিউটন বলেছিলেন, ‘আমার আবিষ্কারের কারণ প্রতিভা নয়, চিন্তাশীলতা ও পরিশ্রমের ফলে তত্ত্বগুলোর রহস্য উদঘাটন করতে পেরেছি।’ বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন এক হাজার বার চেষ্টার পর বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কার করেছিলেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন নির্বাচনে বারবার হেরে গিয়েও থেমে যাননি। তাঁর বারবার চেষ্টার ফল তাঁকে সফলতা দিয়েছিল। প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে তিনি ১২ বার নির্বাচনে পরাজয় বরণ করেছিলেন কিন্তু তাঁকে দমাতে পারেনি, তাঁর স্বপ্ন বিফল করতে পারেনি। ইচ্ছা, সাধনা, শ্রম ও বিশ্বাসের অদম্য শক্তি তাঁকে শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট বানিয়েছিল এবং হয়েছিলেন বিশ্বনন্দিত গণতন্ত্রের প্রবক্তা। ইসলাম ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) আজীবন কঠোর পরিশ্রম করে ধর্ম প্রচার করেছেন। মুমিনের জীবনে সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হলো পবিত্র রব আল্লাহকে রাজি খুশি করা। আর আল্লাহকে পেতে হলে, তাকে খুশি করতে চাইলে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়। ইরশাদ হচ্ছে, ‘যারা আমার উদ্দেশ্যে চেষ্টা-সাধনা করবে, তাদের আমি আমার পথ দেখাব। আর আল্লাহ অবশ্যই সৎকর্মশীল লোকদের সঙ্গে আছেন।’ ভারতের পরমাণু বিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রপতি এ.পি.জে আবুল কালাম বলেছেন-‘সূর্যের মতো দীপ্তিমান হতে চাইলে প্রথমে তোমাকে সূর্যের মতোই পুড়তে হবে।’ ‘কষ্ট ছাড়া কেষ্ট মেলে না’ প্রাচীন উক্তিটির সত্যতা আজও মানুষের জীবনে বাস্তবতার স্বপ্ন নিশান উড়াচ্ছে এবং বিশ্বাস করতে বাধ্য হচ্ছে।
বর্তমান যুগে মানুষ শ্রমের মূল্য ও মর্যাদা বুঝতে শিখেও এমন কিছু অপরিণামদর্শী কাজ করে যা দেখে মনে হয় তারা শ্রম বিমুখ ও অদৃষ্টবাদী। এমন অলসতার জন্যই তারা জীবনের প্রত্যেক পদক্ষেপে হয় ব্যর্থ। শিকার যেমন শিকারির কাছে নিজে থেকে আসে না তদ্রুপ পরিশ্রম ছাড়া কখনও সাফল্য নিজ থেকে কারো কাছে উপস্থিত হয় না। এই ডিজিটাল বিশ্বে কর্ম শক্তিকে হাতিয়ার করে যতক্ষণ পা চলবে, ততক্ষণ প্রতি পদক্ষেপে ফুটবে সুবাসিত ফুল। অন্যথায় ভাগ্যকে দোষারোপ ও দুঃখ কষ্টই হবে জীবন সাথী।
আল্লাহ প্রদত্ত কর্ম প্রেরণা ও অধিকার পৃথিবীতে যথাযথভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে পৃথিবীর সুন্দর পরিবেশ গড়ে তোলা মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মানুষ পৃথিবীকে গড়ে তুলতে দায়িত্বশীল। মহান সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টিকূলের সকল কিছু মানুষের জন্য সৃষ্টি করেছেন এবং সবকিছুকে করেছেন মানুষের অনুগত। তাই শ্রমই বর্তমান ও ভবিষ্যত উন্নয়নশীল দুনিয়ার সংগ্রামের প্রধান হাতিয়ার। বর্তমান সভ্যতার এ চরম বিকাশের মূলে রয়েছে যুগ যুগান্তর যাবত লক্ষ কোটি মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রম। মানুষ তার শ্রমে ঘামে গড়ে তুলেছে ডিজিটাল সভ্যতার এ তিলোত্তমা বিশ্বভুবন। সভ্যতার আদি যুগ থেকে চলমান এ যুদ্ধে মানুষ প্রতিনিয়ত আপন শ্রম ও সাধনায় জয়ী হয়ে অস্তিত্বকে রক্ষা করেছে কেননা মানুষ জানে নিরলস পরিশ্রম সাফল্যের চাবিকাঠি। তাই ইসলাম ধর্ম প্রবর্তক মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) বলেছেন, ‘নিজ হাতে কাজ করার মতো পবিত্র জিনিস আর কিছুই নেই।’
আমাদের জীবনকে সুন্দর ও সাফল্যমন্ডিত করতে চাইলে আমাদের সময়কে সঠিক কাজে লাগাতে হবে। জীবনকে উপলব্ধি করে সফলতার জন্য বুদ্ধিমত্তার সাথে কাজ করতে হবে। কথায় আছে ‘অলস মস্তিষ্ক শয়তানের আড্ডাখানা।’ যখন কোনো মানুষ অবসর থাকে, তখন নানা ধরনের বাজে চিন্তা তার মাথায় আসে ফলে খারাপ কাজে লিপ্ত হয়। কিন্তু সে যখন কর্মে ব্যস্ত থাকে তখন তার মন মানসিকতার উন্নতি হয়। এতে তার উন্নতির পথ উন্মুক্ত হয় এবং প্রতিভা ব্যবহার করে উন্নতির পথ উন্মুক্ত করতে সক্ষম হয়। পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করা হয়েছে-‘আল্লাহ কোনো জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না সে জাতি নিজেদের ভাগ্য নিজেদের কর্মের দ্বারা পরিবর্তন করে।’ পৃথিবীতে কেউ সাফল্যের সোনার চামচ নিয়ে জন্মায় না। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবনকে উদার, সুন্দর ও মহিমান্বিত করে তুলে। যে জাতি শ্রমশীল, যারা কর্ম ও জ্ঞান সাধনায় আনন্দ অনুভব করে, তারাই জগতে শ্রেষ্ঠ স্থান অধিকার করে থাকে। কর্তব্য জ্ঞানহীন, নীতিজ্ঞানশূন্য ও কর্মবিমুখ আলসে মানুষের স্থান জগৎ সংসারে থাকে সবার নিচে। জগতে ধন সম্পদ জয় করতে চাইলে, জীবনের কল্যাণ চাইলে পরিশ্রম ও সাধনা করতেই হবে। কেননা ধন সম্পদ আর ঐশ্বর্যের মূল উৎপত্তি হয়েছে পরিশ্রম থেকে।
সৌভাগ্যের স্বর্ণশিখরে আরোহণের একমাত্র উপায় হচ্ছে শ্রম। পৃথিবীর সৃষ্টি থেকে শুরু করে বর্তমান ডিজিটাল সভ্যতা পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই পরিশ্রম সর্বদা নিয়ামক হিসাবে কাজ করে চলেছে। মানব জীবন নিত্য কর্মমুখর। বহু প্রতিকূল পরিবেশে তাদেরকে এগিয়ে যেতে হয়। নিরন্তর শ্রমের মধ্যে দিয়েই বিকশিত হয় মানুষের সৃষ্টিশীল কর্ম প্রতিভা। তাই মানব সভ্যতা আজ এতো উন্নত। 'Industry is the key to success' অর্থাৎ পরিশ্রম সাফল্যের চাবিকাঠি। শারীরিক শ্রম আত্মসম্মানের পরিপন্থী নয়, বরং সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভের প্রধান উপায়। তাই শ্রমশক্তিতে দেশ ও জাতিকে জাগরিত করার মাঝেই আমাদের মঙ্গল নিহিত। তাইতো কবি ফজলুল করিম লিখেছিলেন-
‘এ ধরণী কর্মক্ষেত্র কর্মের বর্ম পরি / তোমায় এগুতে হবে বিধাতায় স্মরি, / আপনার লক্ষ্য পানে, ওরে অন্ধ নর / জীবন ব্যয়িত করে কর্মে নিরন্তর।

 

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT