পাঁচ মিশালী

কিছু দেখা, কিছু শোনা

এম এ মালেক চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৩-২০২০ ইং ০০:০৮:৪৭ | সংবাদটি ৪৫৫ বার পঠিত
Image

১৯৬৮ সালে এসএসসি পাশ করে তদানীন্তন সরকারি কলেজ বর্তমান এমসি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক ১ম বর্ষে ভর্তি হলাম। ১ম আগস্ট ইংরেজির ক্লাশ দিয়ে শুরু হলো। সাদা বিল্ডিং এর উপর তলায় হল নং দুইতে। স্যার ছিলেন জনাব আতাউর রহমান। বয়স অনুমানিক পঁচিশ ছাব্বিশ। সুদর্শন চেহারা, সুটেড এবং বুটেড। হাসিমাখা মুখ। অবিবাহিত বটে। পুরো পয়ঁতাল্লিশ মিনিট ইংরেজিতে লেকচার দিলেন। তবে স্যার যে খুবই রসিক তা বুঝতে দেরি হলো না। লেকচারের ফাঁকে বাংলাতে দুটি চুটকি বলে দুশো ছাত্রকে হাসালেন। তাঁর ক্লাশে একটা বা দুটো হাসির গল্প শোনাতেন। স্যারের ক্লাশ সপ্তাহে দু’ বা তিন পিরিয়ড ছিল। আমরা উদগ্রীব হয়ে আতাউর রহমান স্যারের ক্লাশের জন্য অপেক্ষায় থাকতাম। তখন ইংরেজী বিভাগের প্রধান আলীম আলী স্যার, গোলাম ইয়াহয়িয়া চৌধুরী স্যার, দিদারুল ইসলাম স্যার ও আতাউর রহমান স্যার মিলে ইংরেজি বিভাগে চারজন শিক্ষক ছিলেন। সব স্যারই সপ্তাহে একটি দুটি ক্লাশ নিতেন। প্রথম দু’জন স্যার ছিলেন ৫০ এর উর্ধ্ব বয়সী এবং শেষোক্ত দু’জন ছিলেন সমবয়সী। আলীম আলী স্যার বছর শেষে প্রমোশন পেয়ে অন্যত্র বদলী হয়ে গেলে জি. ওয়াই চৌধুরী স্যার ইংরেজি বিভাগের প্রধান হোন। জি ওয়াই চৌধুরী স্যারের মেয়ে রাশেদা কে চৌধুরী কয়েকবছর আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে মনোনীত হন। আর এক ছেলে অধ্যাপক ডা. ওসুল আহমদ চৌধুরী সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ পদ থেকে ৫/৬ বছর আগে অবসরে গিয়েছেন। মোস্ট পপুলার আতাউর রহমান স্যার পরের বছর সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সিএসপি (পোস্টাল) হয়ে ঢাকায় চলে যান। বাংলাদেশ ডাক বিভাগের মহাপরিচালক হয়ে চাকুরী থেকে অবসর নেন। বেশ কয়েক মহাপরিচালক হয়ে চাকুরি থেকে অবসর নেন। বেশ কয়েক থেকে প্রথমে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় দুই দ্বিগুণে পাঁচ শিরোনামে রম্য-রচনা লিখে রম্য সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত লেখক। এখন বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় তাঁর রম্য রচনা নিয়মিত প্রকাশ হচ্ছে। দিদারুল ইসলাম স্যার ও তৎকালীন স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানে (বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক) অধিক বেতনের চাকুরি নিয়ে শিক্ষকতা পেশাকে বিদায় জানান। ৬৯ এ অধ্যাপক মোবারক আলী স্যার এমসি কলেজে বদলি হয়ে আসেন। তিনিও ছিলেন আমোদ ফূর্তিমনস্বলম একজন জ্ঞানী। আদর্শ ব্যক্তিত্ব। রনজিত চক্রবর্তীও ছিলেন কেতা-দুরুস্ত স্যার, শীতে-গরমে শুধু টাই থাকতো গলায়। সুদর্শন এবং অভিজাত চাল-চলন ছিল তাঁর।
বাংলা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে পাই বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক সুধীর চন্দ্র পাল, অধ্যাপক আবদুল মজিদ হাওলাদার, অধ্যাপক আবুল বাসার, শামসুল আলম, প্রবীর চন্দ্র চক্রবর্তী ও কামরুল আহসান। সম্ভবত: শেষোক্ত দু’জন স্যার প্রভাষক ছিলেন। আমার সুধীর বাংলা জানে- এ মন্তব্য কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের- এ জন্য তদানিন্তন উভয় বাংলায় সুধীর পাল স্যারের খ্যাতির প্রসার ছিল। সুধীর পাল স্যারের ছাত্র হিসেবে শুধু এ নিষ্কর্মা কেন যারাই তার কাছে পড়েছে লেকচার শুনেছে সবাই সুধীর পাল স্যারের ছাত্র হতে পেরে গর্ববোধ করে থাকেন। ৮ম পিরিয়ডে অর্থাৎ বিকেল সাড়ে চারটায় সুধীর পাল স্যারের ক্লাশ থাকতো। সাধারণত: ৮ম পিরিয়ডে ছাত্র উপস্থিতি হাতে গুনা ছিল। আমরা বিজ্ঞানের ছাত্ররা ব্যবহারিক ক্লাশ শেষ করে সুধীর পাল স্যারের ক্লাশে আসতাম। সুধীর পাল স্যারের ক্লাশে কে কোন ইয়ারে বা কোন কলেজে কোন বিভাগে পড়ে তার কোন বাছ বিচার ছিল না। কলা বিভাগের ছাত্রগণ হোস্টেল বা বাসায় গিয়ে মধ্যাহ্ন ভোজ শেষ করে বৈকালিক ভ্রমণ হিসেবে সুধীর পালের লেকচার শুনতে আসতো। সাদা বিল্ডিং এর নীচে বাম দিকে হল থ্রির গ্যালারীতে বসতো স্যারের ক্লাস। গ্যালারী কানায় কানায় ভরে গিয়ে অনেক ছাত্র দাঁড়িয়ে তাঁর লেকচার শুনতো। পিনপতন নিরবতা বিরাজ করতো তাঁর বক্তৃতার সময়ে। স্যার মাথা কিছুটা নীচু করে ছাত্র-ছাত্রীদের স্বাগত জানিয়ে ক্লাশে ঢুকে ছাত্র হাজিরা খাতা টেবিলে রেখে প্রথমেই বলতেন, মাই ডিয়ার স্টুডেন্ট, পারসেন্টটেজে কাটবো না, সিম্পলি গো-আউট।’ অর্থাৎ সবাই প্রেজেন্ট। তাঁর ক্লাশে ছাত্ররা বাহির হওয়াতো দূরের কথা, লেকচারকালীন সময়ে আরোও ছাত্র ঢুকতো। পুরো এক বছরে রবীন্দ্রনাথের কংকাল (ছোট গল্প) গল্পটি শেষ করলেন। তখন সরকারি কলেজে (বর্তমান এমসি কলেজ) অর্ধশত শিক্ষকদের মধ্যে হিন্দু শিক্ষক ছিলেন সম্ভবত: ৫ অথবা ৬ জন। তন্মধ্যে সুধীর পাল স্যার ছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ। সাদা-আয়রণ করা ধূতি, ধবধবে সাদা পলিশ পানজাবী বা চার পকেটযুক্ত লম্বা হাতা শার্ট এবং পায়ে সব মওসুমে কালো রং-এর স্যু থাকতো। তাঁকে দেখে অমনিতেই ছাত্রদের শ্রদ্ধা আসতো। কলেজ কম্পাউন্ডে স্যার ডান হাত নামাতেই পারতেন না- ছাত্র-ছাত্রীদের আদাবের জবাব দিতে দিতে। সুধীর পাল স্যার অজান্তেও ক্লাশের লেকচারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম মুখে আনতেন না। সব সময় কবি গুরু বলে তাঁকে সম্বোধন করতেন। আব্দুল মজিদ হাওলাদার স্যার কবিতা পড়াতেন। তাঁর ক্লাশেও নীরবতা বিরাজ করতো। ছাত্র-ছাত্রীদের মনোযোগ আকর্ষণের তথা ধরে রাখার ক্ষমতা ছিল।

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT