সাহিত্য

বঙ্গবন্ধুর সাহিত্যচিন্তা

বিশ্বজিৎ ঘোষ প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৩-২০২০ ইং ২৩:৫৫:৪১ | সংবাদটি ৩৭৮ বার পঠিত
Image

বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্বব্যাপী একজন রাজনীতিবিদ হিসেবেই সমধিক পরিচিত। প্রকৃত প্রস্তাবেই তিনি রাজনীতির মানুষ, রাজনীতিই তাঁর জীবনের ধ্যান-জ্ঞান। তবে রাজনীতির বাইরেও তিনি নানা বিষয়ে ভেবেছেনÑ খেলাধুলা, চলচ্চিত্র, সাহিত্য, ভাষা কিছুই তাঁর চিন্তার বাইরে ছিল না। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ (২০১২) এবং ‘কারাগারের রোজনামচা’ (২০১৭) প্রকাশের পর তাঁকে একজন
লেখক হিসেবে চিনে নেবারও ঐতিহাসিক সুযোগ ঘটেছে বিশ্ববাসীর। তবে এতসব বিষয় নয়, আজকের এ লেখায় বঙ্গবন্ধুর ভাষা ও সাহিত্য চিন্তা সম্পর্কেই আমাদের আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখবো। বাংলাদেশ, বাঙালি জাতি, বাংলা ভাষা এবং বাংলা সাহিত্য- সবকিছুর প্রতিই ছিল বঙ্গবন্ধুর গভীর ভালোবাসা।
বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য তথা বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাবনার একটা নির্যাস পাওয়া যায় ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক অধীবেশনে দেয়া তাঁর ভাষণ থেকে। ওই ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন : ‘আমরা বাঙালি। আমরা জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করি। আমি যদি ভুলে যাই আমি বাঙালি, সেদিন আমি শেষ হয়ে যাবো। আমি বাঙালি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলা আমার দেশ, বাংলার মাটি, আমার প্রাণের মাটি, বাংলার মাটিতে আমি মরবো, বাংলার কৃষ্টি, বাংলার সভ্যতা আমার কৃষ্টি ও সভ্যতা।’ এ বক্তব্য থেকে বাংলা ভাষায় সাহিত্য ও বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি বঙ্গবন্ধুর অনুরাগ ও ভালোবাসা স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা যায়।
ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি এই অনুরাগ ও ভালোবাসা থেকেই বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে পালন করেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর সম্পৃক্ততা তাঁর ভাষ্যেই শোনা যাক: ‘আমি তখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বন্দী অবস্থায় চিকিৎসাধীন। সেখানেই আমরা স্থির করি যে, রাষ্ট্রভাষার উপর ও আমার দেশের উপর যে আঘাত হয়েছে ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখে তার মোকাবিলা করতে হবে। সেখানেই গোপন বৈঠকে সব স্থির হয়। ... কথা হয়, ১৬ ফেব্রুয়ারি আমি জেলের মধ্যে অনশন ধর্মঘট করব, আর ২১ তারিখে আন্দোলন শুরু হবে। জেলে দেখা হয় বরিশালের মহিউদ্দিন সাহেবের সঙ্গে। তাঁকে বললাম আমরা এই প্রোগ্রাম নিয়েছি। তিনি বললেন, আমিও অনশন ধর্মঘট করবো। ১৬ ফেব্রুয়ারি তারিখে আমরা অনশন ধর্মঘট করলাম। এর দরুন আমাদের ট্রান্সফার করা হলো ফরিদপুর জেলে। সূচনা হয় ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের।’ বাংলা ভাষার প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকেই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে তিনি পালন করেছেন অন্যতম চিন্তকের ভূমিকা।
বঙ্গবন্ধু বাংলা ভাষায় বক্তৃতা করতে ভালোবাসতেনÑ বাংলা ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও ভালোবাসা থেকেই তিনি বাংলায় বক্তৃতা করতেন। জাতিসংঘের অধিবেশনে বাংলায় বক্তৃতা দিয়ে বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। প্রসঙ্গত উদ্ধৃত করা যায় তাঁর এই অভিমত : ‘কেন বাংলায় বক্তৃতা করব না? ... পূর্ব বাংলার ছাত্ররা জীবন দিয়েছে মাতৃভাষার জন্য। বাংলা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু লোকের ভাষা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে না জানে এমন শিক্ষিত লোক চীন কেন দুনিয়ার অন্যান্য দেশেও আমি খুব কম দেখেছি। আমি ইংরেজিতে বক্তৃতা করতে পারি। তবু আমার মাতৃভাষায় বলা কর্তব্য।’
স্বাধীনতার পর অতি অল্প সময়ে বাংলাভাষায় সংবিধান রচনা করার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু পালন করেছেন ঐতিহাসিক ভূমিকা। আদালতে বাংলায় রায় লেখার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। যথাযথ পরিভাষা না থাকার কারণে রাষ্ট্রের সর্বত্র বাংলা ভাষা ব্যবহারে সমস্যা দেখা দিতে পারে- এ কথা অনুধাবন করে ১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বঙ্গবন্ধু বলেন এই কথা : ‘আমি ঘোষণা করছি, আমাদের হাতে যেদিন ক্ষমতা আসবে সেদিন থেকেই দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু হবে।
বাংলা ভাষার পণ্ডিতেরা পরিভাষা তৈরি করবেন, তারপরে বাংলা ভাষা চালু হবে, সে হবে না। পরিভাষাবিদেরা যত খুশি গবেষণা করুন, আমরা ক্ষমতা হাতে নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষা চালু করে দেবো, সে বাংলা যদি ভুল হয়, তবে ভুলই চালু হবে, পরে তা সংশোধন করা হবে।’ সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনে বঙ্গবন্ধু যে কত আন্তরিক ছিলেন, উপরের ভাষ্য থেকে তা সম্যক উপলব্ধি করা যায়।
কেবল মাতৃভাষা বাংলা নয়, বাংলা সাহিত্যের প্রতিও ছিল বঙ্গবন্ধুর গভীর অনুরাগ। বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের কবিতা অবলীলায় উচ্চারণ করতেন। সাহিত্যের মাধ্যমে তিনি গণমানুষের উন্নতির কথা ভেবেছেন- সাহিত্যিককে সাধারণ মানুষের কাতারে নেমে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু মনে করেন- জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনদিনই মহৎ সাহিত্য রচিত হতে পারে না। কেবল শহর নয়, গ্রামীণ জীবন ও জনপদকেও সাহিত্যের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার কথা বলেছেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমি আয়োজিত জাতীয় সাহিত্য সম্মেলনে প্রধান অতিথির ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাহিত্য প্রসঙ্গে যে কথা বলেছিলেন, তা তাঁর প্রাতিস্বিক সাহিত্য ভাবনারই শিল্পিত ভাষ্য। ওই ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন: ‘আজকে যখন দেশ স্বাধীন হয়েছে, তখন সাহিত্যিক, শিল্পী ও সংস্কৃতিসেবীদের কাছে আমার প্রত্যাশা আরও অধিক। যাঁরা সাহিত্য সাধনা করছেন, শিল্পের চর্চা করছেন, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সেবা করছেন, তাদের দেশের জনগণের সঙ্গে গভীর যোগসূত্র রক্ষা করে অগ্রসর হতে হবে। দেশের জনগণের চিন্তা-ভাবনা, আনন্দ-বেদনা এবং সামগ্রিক তথ্যে তাঁদের জীবন-প্রবাহ আমাদের সাহিত্যে ও শিল্পে অবশ্যই ফুটিয়ে তুলতে হবে।’
বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন- সাহিত্য-শিল্পের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের প্রতিরূপ নির্মাণই লেখকের মুখ্য কাজ। সাহিত্যের রস সৃষ্টি প্রসঙ্গ মনে রেখেই তিনি সামাজিক উপযোগিতার কথাটাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন।
প্রসঙ্গত স্মরণ করা যায় তাঁর এই বক্তব্য : ‘সাহিত্য-শিল্পে ফুটিয়ে তুলতে হবে এদেশের দুঃখী মানুষের আনন্দ-বেদনার কথা। সাহিত্য-শিল্পকে কাজে লাগাতে হবে তাঁদের কল্যাণে। আজ আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে দুর্নীতির শাখা-প্রশাখা বিস্তার করেছে, আপনাদের লেখনীর মাধ্যমে তার মুখোশ খুলে ধরুন; দুর্নীতির মূলোচ্ছেদে সরকারকে সাহায্য করুন। আমি সাহিত্যিক নই, শিল্পী নই, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি যে, জনগণই সব সাহিত্য ও শিল্পের উৎস। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনদিন কোন মহৎ সাহিত্য বা উন্নত শিল্পকর্ম সৃষ্টি হতে পারে না। ... আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি যেন শুধু শহরের পাকা দালানেই আবদ্ধ না হয়ে থাকে, বাংলাদেশের গ্রাম-গ্রামান্তরে কোটি কোটি মানুষের প্রাণের স্পন্দনও যেন তাতে প্রতিফলিত হয়।’ পাকিস্তানী উপনিবেশিক সরকার বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে পদে পদে বাধার সৃষ্টি করেছে। প্রচার মাধ্যমে রবীন্দ্রসঙ্গীত বর্জনের সিদ্ধান্ত এমনই একটি বাধার উদাহরণ। কিন্তু বাঙালি জনগোষ্ঠী ঔপনিবেশিক শাসকদের এই হীন ষড়যন্ত্র মেনে নেয়নি, মানেননি বঙ্গবন্ধুও। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্ত হয়ে পরের দিন সোহরাওয়ার্দী ময়দানে দেয়া সংবর্ধনা সভায় বাঙালি সংস্কৃতি সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু যে কথা বলেন, বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি তা তাঁর ভালোবাসার উজ্জ্বল স্মারক। ওই সংবর্ধনা সভায় বঙ্গবন্ধু বলেন : ‘আমরা মীর্জা গালিব, সক্রেটিস, শেক্সপিয়র, এরিস্টটল, দান্তে, লেলিন, মাও সে তুং পড়ি জ্ঞন আহ্রণের জন্য। আর দেউলিয়া সরকার আমাদের পাঠ নিষিদ্ধ করে দিয়েছ রবীন্দ্রনাথের লেখা, যিনি একজন বাঙালি কবি এবং বাংলায় কবিতা লিখে যিনি বিশ্বকবি হয়েছেন। আমরা রবীন্দ্রনাথের বই পড়বই, আমরা রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইবই এবং রবীন্দ্র সঙ্গীত এই দেশে গীত হবেই।’
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মর্মে-মর্মে রাজনীতিবিদ হয়েও ভাষা সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে যে সব কথা বলেছেন, তা ভাবলে বিস্মিত হতে হয়। তিনি ছিলেন রাজনীতির কবি- ‘Poet of Politics।’ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য মধ্যবিত্তের শাহরিক ভাষার পরিবর্তে তিনি ব্যবহার করেছেন লোকভাষা। তাঁর লেখা এবং বক্তৃতায় লোকভাষা-আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের বিস্ময়কর সার্থকতা লক্ষ্য করা যায়। ৭ মাচের ঐতিহাসিক ভাষণ তার একটা উজ্জ্বল উদাহরণ। বঙ্গবন্ধু শোষণমুক্ত গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছেনÑ তাঁর ভাষা এবং সাহিত্যচিন্তা সে স্বপ্নেরই সমার্থক এক অনুষঙ্গ।

 

 

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT