এসব খিচুড়ি পাকছে আর সাথে সাথে আমি বেশ সচেতন, ‘দেখতে আসা’ যেন সার্থক হয়। এদিকে, কম পয়সায় ভালো এবং বেশি পরিমাণের মরতবা বোঝাতে তৎপর আব্বার হাত থেকে আম্মাকে উদ্ধার করে পাঠিয়ে দিলাম গুলশানে, তার পয়সাঅলা বোনেরা যেখানে থাকে। এরাই আমাদের শপিং টেস্টের জিম্মা নিয়ে রেখেছিল ততদিন পর্যন্ত। খালাতো বোনগুলার কী সুন্দর সব শাড়ি, হয়তো এর মধ্য থেকেই একটা পরবার সুযোগ হবে, আর বাদবাকি সমারোহে আব্বার খুব একটা খরচাপাতি নাই, এমন বুঝ নিয়ে আম্মাও নিশ্চিন্তে বোনের বাসার দামি ফার্নিচারের প্রশংসা করতেই থাকলেন।
খালাতো বোন শুরুতেই খ্যাপা, এইসব সস্তার ক্লিপ কাঁটা লাগিয়ে ‘দেখতে আসা’ বানচাল না করলেই কি না! গরিব খালার প্রতি করুণায় ছলছল সে রাজি হলো আমাকে উপযুক্ত করে সাজিয়ে দেবার। ইগো যথেষ্ট পরিমাণেই হার্ট হয়েছিল খালাতো বোনের আন্তরিক দয়া দেখানোতে। কিন্তু নিজের বা আম্মার টেস্টের ওপর এতটুকুও ভরসা ছিল না আমার। এমনকি পুরো আয়োজনের কোথাও যেন বের না হয়ে পড়ে যে আমার আম্মা অতটা স্মার্ট না, বরং ওরা খালাকেই ভাবুক আমার আম্মা, এমন গোপন ভাবনাতেও আমার লজ্জা হচ্ছিল না।
ও হ্যাঁ, এই বিশেষ ‘দেখতে আসা’ কনফার্ম হয়েছিল সাধারণ হঠাৎ ‘দেখতে আসা’ পর্বের পর। সেই পর্বে ছেলের মা আর বোন ঘুরে ঘুরে মাপল বাসা, আমি, আম্মা-আব্বা। বুঝছিলাম ওদের পছন্দ হয়েছে আমাকে। ‘তাও তো তেমন সাজিইনি’, খালাতো বোনদের কাছে খুব পার্ট নিলাম। ‘এতদিনে পার্ট নেবার মতো কিছু তো জুটল!’ ছেলের বোন ভীষণ স্মার্ট, বড়লোক বড়লোক ভাব। আমি ওর নাক সিটকান অগ্রাহ্য করেছিলাম খুশি খুশি মনে। আফটারঅল বড়লোকদের এটা থাকবেই।
স্বপ্ন যেন দৌড়াচ্ছিল দড়ি ছিঁড়ে। তার কারণও অবশ্য আছে। আম্মা-আব্বা আর তাদের হ্যাংলা চৌদ্দগুষ্টি ছেলের ডুপ্লেক্স বাসার ওপর থেকে তলা পর্যন্ত সব পড়ে এসেছে। এ-মাথা ও-মাথা দিক ভুল হয় এমন বাসাবাড়ি আর তার টেবিল চেয়ার, যাতে বসে তারা স্বাদ নিয়েছে ফ্রায়েড রাইস, স্যুপ, স্যালাড। এমনই যে আম্মার বড়লোক বোনদের বাসার টেবিলও নাকি হার স্বীকার করবে সুখে। আর আমি তো সুখের শিকার করতে দৌড়াচ্ছি রীতিমতো। লেখাপড়া সব ছুঁড়েছেড়ে মনে হতে থাকল এসবের জন্মই বা কেন হয়েছিল! রাত জেগে কেবল রোমান্টিক সব বিদেশি সিরিয়াল দেখা আর শেষ দৃশ্যের ভেজা চুমুর অপেক্ষায় থাকা আমার তখন ধ্যানের কাছাকাছি চলে গিয়েছিল।
মনে আছে, ছুটির দিন ছিল সেই দিনটায়। ওরা আসবে, আমাদের সবচেয়ে বড়লোক আত্মীয়র বাসায় দেখানো হবে আমাকে। আমার কোনো কিছুতেই আপত্তি হচ্ছিল না অথচ ক'দিন আগেই ক্লাসে যখন তুমুল তোলপাড় হচ্ছিল ‘দেখতে আসা’ গল্পগুলো নিয়ে, আমিই সবচে' বিদ্রোহী নারীর ক্যারেকটারে ছিলাম। তবুও নিজেকে আমার খুব ঠিক ঠিক মনে হতো, যেন আব্বা-আম্মার চাপেই তো রাজি হচ্ছি, না হলে আমি কি শুধু বড়লোক দেখি!
আম্মার আকুল চাওয়ায় হোক বা অন্য কোনো চাওয়ায় হোক, খালাতো বোনের সবচে’ সুন্দর শাড়িটাই পরার সুযোগ হলো, নিজেকে একসিঁড়ি উচ্চতায় ঠিক বোনের পাশেই পেলাম যেন। কত কতদিন এই দামি শাড়িটায় নিজেকে ভেবেছি, ‘ইশশ, ও যদি আমাকে এটা একদম দিয়ে দিত!’ শাড়িটা জড়ালাম, একটু কাজল, ব্যস আমি যেন সব উজ্জ্বলতা নিয়ে একাই দাঁড়িয়ে। আঁচল ছড়িয়ে সবার মুগ্ধ চোখে নিজেকে আরও মেলে দিলাম। খালাতো বোন চোখ টিপে বলল, ‘ওরা তোকে আজকেই দেখিস নিয়ে যাবে, তবে চশমা খুলে যাবি, তোর চোখ দুটো না দেখল তো কী দেখল!’ মনে আছে, আমি ঝাপসা চোখেও তৃপ্তিতে হাসছিলাম।
অবশেষে সেই বিশেষ মুহূর্ত। ছোট খালা হুট করে পেছন থেকে ঘোমটা টেনে আমার মাথাটা তার ভেতর ঢুকাবার জন্য রীতিমতো ঝগড়া শুরু করে দেয়। অসম্ভব! এইরকম টিপিক্যাল মেয়ে দেখানোর রীতি আমার মতো মডার্ন মেয়ে হজমই করবে না। সামান্য কাত করে ঘোমটা পর্ব ঝুলিয়ে রেখে আমি খালার আগেই ‘দেখতে আসা’ মানুষগুলোর সামনে হাজির। কথা ছিল, বিনয়ী ভঙ্গিতে ছোট খালার কোল ঘেঁষে আস্তেধীরে মুখ সামান্য নিচু (বেশি নিচু করলে চেহারা ঢেকে থাকে) করে রুমে ঢুকব, সবাইকে সালাম দেব, কারো চোখে সরাসরি তাকাব না। মোটের ওপর যতটা পারা যায় লাজুক, নরম, ভদ্র, নিষ্পাপ ইত্যকার যাবতীয় গুণ প্রকাশ্য হতে হবে, আর এটা নাকি একটা ঘোমটাতেই কাভার করা সম্ভব। কোথায় ঘোমটা গেল আর কোথায় লজ্জা- আমার মনে নাই। চিরকাল নিজেকে নিয়ে বিব্রত আমি কীভাবে যেন মুহূর্তের মধ্যে পুরো ঘরটাতে আমার ছটফটানি ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলাম তাও ভুলে গেছি।
একযোগে সবাই ‘বসো বসো’, মুরব্বি একজন তো সাহস দেবার ভঙ্গিতে এগিয়েই আসলেন, জড়সড় ভাব আশা করছিলেন নির্ঘাত। কিসের কী, ভীষণ ফুরফুরা মেজাজে এ-মাথা ও-মাথা ধরে সবার চোখে একবার নিজেকে দেখে নিলাম। ভাসাভাসা চারদিক। অনেক জোড়া চোখ যাচাইবাছাইতে ব্যস্ত। আন্দাজ করতে পারছিলাম, আমি একদম নির্বিকার, ছেলেটাকে আমার দেখতেই হবে।
আরে! সবচেয়ে কাছেই বসেছে সেই চশমা পরা (সবার কাছ থেকে পাওয়া এই এক তথ্যই মাত্র ছিল আমার কাছে), সামান্য এলোমেলো চুল ফ্রেম ঘিরে, মুখটাকে একটু ঢেকেও দিচ্ছে থেকেথেকে। আহা! আমার প্রিয় সিরিয়ালের নায়কের মতো কি! প্রতি সোমবার যে হয়ে যেত আমাকে ‘দেখতে আসা’ কোনো এক ছেলে। রাত জেগে সেই চুল আর তার নিচে বড় ফ্রেমে ঢাকা নায়কের প্রেমে আমি ততদিনে ডুবুডুবু অবস্থা।
দেখতে এসেছিল অন্তত দশজন বিভিন্ন বয়সের পুরুষ। বড় মুরব্বি দিয়ে সিরিয়ালি শুরু হলো প্রশ্নমালা; নামধাম, কুষ্ঠি ইত্যাদি ইত্যাদি। জানা কথাগুলোই তারা আবার এক এক করে আমার কাছে জানতে চাইল, বুঝলাম না ওরা কি মিলিয়ে নিচ্ছিল আগের জানা? বিরক্তি ধরে রাখতে পারছিলাম না ছেলেটাকে আবার খুব করে দেখবার লোভে। আমার জাপানিজ সিরিয়ালের নায়ক থেকেথেকে উশখুশ করছে, মনে হলো সেও কি অংশ নেবে প্রশ্নোত্তর পর্বে!
ছোটখালা ঘোমটা মাথায় একরকমের টেনেই আমাকে ওদের সামনে থেকে নিয়ে আসল, বিরক্ত সে, আমি নাকি বেহায়ার মতো সবার চোখে চোখ রাখছিলাম। আমিও বিরক্ত তার প্রকা সাইজের কা দেখে, নরম্যালি সে জিন্স পরে, আর আজ মাথায় কাপড়! ঘটনা নাকি এইপ্রকার যে ‘দেখতে আসা’ গল্পগুলোয় হরদম পছন্দ বদলায়, তাই আর সব উপযুক্ত (দাদি পিরিয়ড হবার পর থেকেই আমার নাম নেবার আগে বা পরে ‘উপযুক্ত’ শব্দ জুড়ে এর গুরুত্ব বোঝাবার সফল চেষ্টার পরও আমি কনফিউজড থাকতাম সম্মানিত হবো না অপমানিত) মেয়েদের লুকিয়ে থাকার নিয়ম। হাতেনাতে প্রমাণও আসল কিছুদিন বাদে। সাধারণ ‘দেখতে আসা’ পর্বে ছেলের মা আর বোন বিদায় নেবার সময় স্কুলফেরত আমার পিচ্চি বোনটাকে দেখে ফেলে, ওদের বেশি মন কাড়ে ওকেই; কিন্তু দুর্ভাগ্য, ওর পিরিয়ডই শুরু হয়নি। এই কথা জানবার পর অনেক অনেকদিন পর্যন্ত বোনের প্রতি আমার অসহ্যভাব রয়ে গেছিল।
এদিকে সাধ্যের বাইরে চলছে সাধাসাধি, বিদেশি সব কঠিন কঠিন নামের রেসিপির প্রিপারেশনে টেবিল টলোমলো করতে পেরে আমার পরিবারের সবাই খুশি। ওরা খাইয়েছে চাইনিজ, তুলনায় আমাদের মেক্সিকান, ইটালিয়ান আর ইংলিশের মাখোমাখো পরিবেশনে এই পর্বের জয়ভেরি বাজাচ্ছেন স্বয়ং আব্বা। মেয়েকে শিক্ষিত বড়লোকের আশ্রয়ে শিফটিংয়ে ওনার একমাত্র অস্ত্র হলো এইসব বোলচাল, যা আমিও ততদিনে মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে হিসেবে অবশ্য কর্তব্য বলে মেনে নিয়েছিলাম।
ছেলেপক্ষ খুশি, সুস্বাদু খাবারের দয়া না মেয়েপক্ষ হিসেবে কাঁচুমাচু আমাদের দেখে দয়া, তা ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। কারণ বড়খালা আব্বাকে শিখিয়ে যাচ্ছেন অসহায় ভাব মুখে মেখে রাখতে হবে মেয়ের স্বার্থেই। আব্বার তালে তালে আমিও মাথা নাড়ছি, জোড়া সম্মতিতে খালা খুশি, উদার মন নিয়ে জানতে চাইলেন, ‘ছেলেকে দেখছো? পছন্দ হইছে?’ আমি স্মার্টলি বলতে গিয়ে উল্টা গুলিয়ে ফেললাম, ‘ছেলেটা এত কাছে বসছে যে সরাসরি তাকাইতে লজ্জা লাগছে, ঠিকঠাক দেখি নাই, কিন্তু পছন্দ হইছে।’ খালা মুখ বাঁকালেন, ‘তোদের দুইটারে বসাইছে দুই মেরুতে, তার ওপর তুই চশমা ছাড়া, দেখিস নাই ঠিকই, তাইলে পছন্দ কেমনে বুঝলি?’ আমি নিশ্চিন্ত, খালা জানেই না ছেলে কোথায় বসেছে। তবুও বললাম, ‘চশমা দাও, জানালা দিয়ে দেখব আরেকবার।’ ছেলেটা বসেছিল জানালার কাছেই, আমি পর্দা না সরিয়েই খুব কনফিডেন্ট, খালাকে বর্ণনা দিচ্ছি ছেলের জিন্স আর টি-শার্টের, সিল্কি চুল আর চশমার নিচের চোখগুলোরও। খালা রীতিমতো ভেংচি কাটলেন, পর্দা সরিয়ে প্রথমে হাত, পরে চোখের ইশারায় দেখালেন ছেলেকে। অনেক দূরে বসেছে, চশমাও একটা ঠিকঠাক পরা আছে, গোঁফের আড়ালে এক্সপ্রেশন হারিয়ে যাচ্ছিল, কিছুটা গম্ভীর কি! হতাশ লাগছিল, চশমা দিয়েও আমি স্পষ্ট দেখছিলাম না, চুলগুলো কি সিল্কি না!
প্রায়ই ঘটে থাকে এমন ভঙ্গিতে খালা বললেন, ‘এইটা ছেলের ভাই, এক মায়ের পেটের, মিল আছে বলেই তুই ভুল করছিস, তার ওপর নিজের খুঁত ঢাকার জন্য চশমাও পরে যাস নাই।’ আমার খুব মন খারাপ হলো, সামান্য সময়ের মধ্যেই সিল্কি চুলে প্রেম এসে গেছিল আমার।
চশমা পরা গোঁফঅলা একজন হবে আমার বর, ব্যস এইটুকু জেনেই ঠিক একমাস পর আমার বিয়ে হয়ে যায়। তাকে কাছ থেকে ঠিকঠাক দেখি বিয়ের পরদিন সকালের রোদে। আগের রাতের ঘোলাটে আলোয় কাতান আর গয়নার চাপে বিপর্যস্ত আমার চশমা ছাড়া চোখ তাকে সত্যিই দেখে নাই।

 

'/> SylheterDak.com.bd
সাহিত্য

চশমাওয়ালা

রহিমা আফরোজ মুন্নী প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০৩-২০২০ ইং ০০:০১:২৪ | সংবাদটি ১৫২ বার পঠিত
Image

এই দিনটাতে ওরা দেখতে এসেছিল আমাকে। উপলক্ষ হিসেবে কা খানা এতই সাড়া ফেলে দিল যে, তার তালে আমি ধরাকে সরা না হলেও এর কাছাকাছি কিছু জ্ঞান করা শুরু করেছি। আমার হম্বিতম্বিতে আম্মা চিরকাল একটা আপাত তটস্থ ভাব নিয়ে ঘোরাঘুরি করলেও, টের পেতাম এটা তার ভান, তলে তলে উনি ঠিকই আব্বাকে উসকিয়ে নিজের অসহায়ত্বের প্রতিশোধ নেন। শুধু সেইবার, হয়তো প্রথমবারের মতো সেইবার, ওনার তটস্থভাবে চমৎকার সুগার কোটিং ছিল সমীহ ভাবের। আমার জন্য সেই সময় এটা বেশ বড় একটা জয়। সেই জয় দিয়েই পরের সব যুদ্ধের জন্য আমার দারুণ প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছিল।
'দেখতে আসবে' কথাটা ততদিনে একটা জগাখিচুড়ি অনুভূতি নিয়ে আমার ভেতর পাকতে থাকল। একদিকে, যে কেউ আসত তাকে কোনো না কোনোভাবে আমার জন্য ‘দেখতে আসা’ পর্ব হচ্ছে তা না জানালে আমার হজমের গণ্ডগোল হয়ে যেত। কিন্তু আম্মা-আব্বা চাইত কথা না পাকা হওয়া পর্যন্ত কারও কান তো দূরে থাক, চোখও যেন না পড়ে। যেন চোখ দিয়ে ভুল করে ফেলবে 'দেখতে আসা'। অন্যদিকে, এখনই বিয়ে করলে পড়ালেখার কী হবে, আমি তো আর সব টিপিক্যাল মেয়ের মতো না, ডেইলিসোপ, পার্লার আর শপিং যাদের জীবন। আব্বা-আম্মার প্রেশারে কেবল ‘দেখতে আসা’ মেনে নিয়েছি- এমন স্যাক্রিফাইসিং ভাব নিয়েও চলছি।
এসব খিচুড়ি পাকছে আর সাথে সাথে আমি বেশ সচেতন, ‘দেখতে আসা’ যেন সার্থক হয়। এদিকে, কম পয়সায় ভালো এবং বেশি পরিমাণের মরতবা বোঝাতে তৎপর আব্বার হাত থেকে আম্মাকে উদ্ধার করে পাঠিয়ে দিলাম গুলশানে, তার পয়সাঅলা বোনেরা যেখানে থাকে। এরাই আমাদের শপিং টেস্টের জিম্মা নিয়ে রেখেছিল ততদিন পর্যন্ত। খালাতো বোনগুলার কী সুন্দর সব শাড়ি, হয়তো এর মধ্য থেকেই একটা পরবার সুযোগ হবে, আর বাদবাকি সমারোহে আব্বার খুব একটা খরচাপাতি নাই, এমন বুঝ নিয়ে আম্মাও নিশ্চিন্তে বোনের বাসার দামি ফার্নিচারের প্রশংসা করতেই থাকলেন।
খালাতো বোন শুরুতেই খ্যাপা, এইসব সস্তার ক্লিপ কাঁটা লাগিয়ে ‘দেখতে আসা’ বানচাল না করলেই কি না! গরিব খালার প্রতি করুণায় ছলছল সে রাজি হলো আমাকে উপযুক্ত করে সাজিয়ে দেবার। ইগো যথেষ্ট পরিমাণেই হার্ট হয়েছিল খালাতো বোনের আন্তরিক দয়া দেখানোতে। কিন্তু নিজের বা আম্মার টেস্টের ওপর এতটুকুও ভরসা ছিল না আমার। এমনকি পুরো আয়োজনের কোথাও যেন বের না হয়ে পড়ে যে আমার আম্মা অতটা স্মার্ট না, বরং ওরা খালাকেই ভাবুক আমার আম্মা, এমন গোপন ভাবনাতেও আমার লজ্জা হচ্ছিল না।
ও হ্যাঁ, এই বিশেষ ‘দেখতে আসা’ কনফার্ম হয়েছিল সাধারণ হঠাৎ ‘দেখতে আসা’ পর্বের পর। সেই পর্বে ছেলের মা আর বোন ঘুরে ঘুরে মাপল বাসা, আমি, আম্মা-আব্বা। বুঝছিলাম ওদের পছন্দ হয়েছে আমাকে। ‘তাও তো তেমন সাজিইনি’, খালাতো বোনদের কাছে খুব পার্ট নিলাম। ‘এতদিনে পার্ট নেবার মতো কিছু তো জুটল!’ ছেলের বোন ভীষণ স্মার্ট, বড়লোক বড়লোক ভাব। আমি ওর নাক সিটকান অগ্রাহ্য করেছিলাম খুশি খুশি মনে। আফটারঅল বড়লোকদের এটা থাকবেই।
স্বপ্ন যেন দৌড়াচ্ছিল দড়ি ছিঁড়ে। তার কারণও অবশ্য আছে। আম্মা-আব্বা আর তাদের হ্যাংলা চৌদ্দগুষ্টি ছেলের ডুপ্লেক্স বাসার ওপর থেকে তলা পর্যন্ত সব পড়ে এসেছে। এ-মাথা ও-মাথা দিক ভুল হয় এমন বাসাবাড়ি আর তার টেবিল চেয়ার, যাতে বসে তারা স্বাদ নিয়েছে ফ্রায়েড রাইস, স্যুপ, স্যালাড। এমনই যে আম্মার বড়লোক বোনদের বাসার টেবিলও নাকি হার স্বীকার করবে সুখে। আর আমি তো সুখের শিকার করতে দৌড়াচ্ছি রীতিমতো। লেখাপড়া সব ছুঁড়েছেড়ে মনে হতে থাকল এসবের জন্মই বা কেন হয়েছিল! রাত জেগে কেবল রোমান্টিক সব বিদেশি সিরিয়াল দেখা আর শেষ দৃশ্যের ভেজা চুমুর অপেক্ষায় থাকা আমার তখন ধ্যানের কাছাকাছি চলে গিয়েছিল।
মনে আছে, ছুটির দিন ছিল সেই দিনটায়। ওরা আসবে, আমাদের সবচেয়ে বড়লোক আত্মীয়র বাসায় দেখানো হবে আমাকে। আমার কোনো কিছুতেই আপত্তি হচ্ছিল না অথচ ক'দিন আগেই ক্লাসে যখন তুমুল তোলপাড় হচ্ছিল ‘দেখতে আসা’ গল্পগুলো নিয়ে, আমিই সবচে' বিদ্রোহী নারীর ক্যারেকটারে ছিলাম। তবুও নিজেকে আমার খুব ঠিক ঠিক মনে হতো, যেন আব্বা-আম্মার চাপেই তো রাজি হচ্ছি, না হলে আমি কি শুধু বড়লোক দেখি!
আম্মার আকুল চাওয়ায় হোক বা অন্য কোনো চাওয়ায় হোক, খালাতো বোনের সবচে’ সুন্দর শাড়িটাই পরার সুযোগ হলো, নিজেকে একসিঁড়ি উচ্চতায় ঠিক বোনের পাশেই পেলাম যেন। কত কতদিন এই দামি শাড়িটায় নিজেকে ভেবেছি, ‘ইশশ, ও যদি আমাকে এটা একদম দিয়ে দিত!’ শাড়িটা জড়ালাম, একটু কাজল, ব্যস আমি যেন সব উজ্জ্বলতা নিয়ে একাই দাঁড়িয়ে। আঁচল ছড়িয়ে সবার মুগ্ধ চোখে নিজেকে আরও মেলে দিলাম। খালাতো বোন চোখ টিপে বলল, ‘ওরা তোকে আজকেই দেখিস নিয়ে যাবে, তবে চশমা খুলে যাবি, তোর চোখ দুটো না দেখল তো কী দেখল!’ মনে আছে, আমি ঝাপসা চোখেও তৃপ্তিতে হাসছিলাম।
অবশেষে সেই বিশেষ মুহূর্ত। ছোট খালা হুট করে পেছন থেকে ঘোমটা টেনে আমার মাথাটা তার ভেতর ঢুকাবার জন্য রীতিমতো ঝগড়া শুরু করে দেয়। অসম্ভব! এইরকম টিপিক্যাল মেয়ে দেখানোর রীতি আমার মতো মডার্ন মেয়ে হজমই করবে না। সামান্য কাত করে ঘোমটা পর্ব ঝুলিয়ে রেখে আমি খালার আগেই ‘দেখতে আসা’ মানুষগুলোর সামনে হাজির। কথা ছিল, বিনয়ী ভঙ্গিতে ছোট খালার কোল ঘেঁষে আস্তেধীরে মুখ সামান্য নিচু (বেশি নিচু করলে চেহারা ঢেকে থাকে) করে রুমে ঢুকব, সবাইকে সালাম দেব, কারো চোখে সরাসরি তাকাব না। মোটের ওপর যতটা পারা যায় লাজুক, নরম, ভদ্র, নিষ্পাপ ইত্যকার যাবতীয় গুণ প্রকাশ্য হতে হবে, আর এটা নাকি একটা ঘোমটাতেই কাভার করা সম্ভব। কোথায় ঘোমটা গেল আর কোথায় লজ্জা- আমার মনে নাই। চিরকাল নিজেকে নিয়ে বিব্রত আমি কীভাবে যেন মুহূর্তের মধ্যে পুরো ঘরটাতে আমার ছটফটানি ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলাম তাও ভুলে গেছি।
একযোগে সবাই ‘বসো বসো’, মুরব্বি একজন তো সাহস দেবার ভঙ্গিতে এগিয়েই আসলেন, জড়সড় ভাব আশা করছিলেন নির্ঘাত। কিসের কী, ভীষণ ফুরফুরা মেজাজে এ-মাথা ও-মাথা ধরে সবার চোখে একবার নিজেকে দেখে নিলাম। ভাসাভাসা চারদিক। অনেক জোড়া চোখ যাচাইবাছাইতে ব্যস্ত। আন্দাজ করতে পারছিলাম, আমি একদম নির্বিকার, ছেলেটাকে আমার দেখতেই হবে।
আরে! সবচেয়ে কাছেই বসেছে সেই চশমা পরা (সবার কাছ থেকে পাওয়া এই এক তথ্যই মাত্র ছিল আমার কাছে), সামান্য এলোমেলো চুল ফ্রেম ঘিরে, মুখটাকে একটু ঢেকেও দিচ্ছে থেকেথেকে। আহা! আমার প্রিয় সিরিয়ালের নায়কের মতো কি! প্রতি সোমবার যে হয়ে যেত আমাকে ‘দেখতে আসা’ কোনো এক ছেলে। রাত জেগে সেই চুল আর তার নিচে বড় ফ্রেমে ঢাকা নায়কের প্রেমে আমি ততদিনে ডুবুডুবু অবস্থা।
দেখতে এসেছিল অন্তত দশজন বিভিন্ন বয়সের পুরুষ। বড় মুরব্বি দিয়ে সিরিয়ালি শুরু হলো প্রশ্নমালা; নামধাম, কুষ্ঠি ইত্যাদি ইত্যাদি। জানা কথাগুলোই তারা আবার এক এক করে আমার কাছে জানতে চাইল, বুঝলাম না ওরা কি মিলিয়ে নিচ্ছিল আগের জানা? বিরক্তি ধরে রাখতে পারছিলাম না ছেলেটাকে আবার খুব করে দেখবার লোভে। আমার জাপানিজ সিরিয়ালের নায়ক থেকেথেকে উশখুশ করছে, মনে হলো সেও কি অংশ নেবে প্রশ্নোত্তর পর্বে!
ছোটখালা ঘোমটা মাথায় একরকমের টেনেই আমাকে ওদের সামনে থেকে নিয়ে আসল, বিরক্ত সে, আমি নাকি বেহায়ার মতো সবার চোখে চোখ রাখছিলাম। আমিও বিরক্ত তার প্রকা সাইজের কা দেখে, নরম্যালি সে জিন্স পরে, আর আজ মাথায় কাপড়! ঘটনা নাকি এইপ্রকার যে ‘দেখতে আসা’ গল্পগুলোয় হরদম পছন্দ বদলায়, তাই আর সব উপযুক্ত (দাদি পিরিয়ড হবার পর থেকেই আমার নাম নেবার আগে বা পরে ‘উপযুক্ত’ শব্দ জুড়ে এর গুরুত্ব বোঝাবার সফল চেষ্টার পরও আমি কনফিউজড থাকতাম সম্মানিত হবো না অপমানিত) মেয়েদের লুকিয়ে থাকার নিয়ম। হাতেনাতে প্রমাণও আসল কিছুদিন বাদে। সাধারণ ‘দেখতে আসা’ পর্বে ছেলের মা আর বোন বিদায় নেবার সময় স্কুলফেরত আমার পিচ্চি বোনটাকে দেখে ফেলে, ওদের বেশি মন কাড়ে ওকেই; কিন্তু দুর্ভাগ্য, ওর পিরিয়ডই শুরু হয়নি। এই কথা জানবার পর অনেক অনেকদিন পর্যন্ত বোনের প্রতি আমার অসহ্যভাব রয়ে গেছিল।
এদিকে সাধ্যের বাইরে চলছে সাধাসাধি, বিদেশি সব কঠিন কঠিন নামের রেসিপির প্রিপারেশনে টেবিল টলোমলো করতে পেরে আমার পরিবারের সবাই খুশি। ওরা খাইয়েছে চাইনিজ, তুলনায় আমাদের মেক্সিকান, ইটালিয়ান আর ইংলিশের মাখোমাখো পরিবেশনে এই পর্বের জয়ভেরি বাজাচ্ছেন স্বয়ং আব্বা। মেয়েকে শিক্ষিত বড়লোকের আশ্রয়ে শিফটিংয়ে ওনার একমাত্র অস্ত্র হলো এইসব বোলচাল, যা আমিও ততদিনে মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে হিসেবে অবশ্য কর্তব্য বলে মেনে নিয়েছিলাম।
ছেলেপক্ষ খুশি, সুস্বাদু খাবারের দয়া না মেয়েপক্ষ হিসেবে কাঁচুমাচু আমাদের দেখে দয়া, তা ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। কারণ বড়খালা আব্বাকে শিখিয়ে যাচ্ছেন অসহায় ভাব মুখে মেখে রাখতে হবে মেয়ের স্বার্থেই। আব্বার তালে তালে আমিও মাথা নাড়ছি, জোড়া সম্মতিতে খালা খুশি, উদার মন নিয়ে জানতে চাইলেন, ‘ছেলেকে দেখছো? পছন্দ হইছে?’ আমি স্মার্টলি বলতে গিয়ে উল্টা গুলিয়ে ফেললাম, ‘ছেলেটা এত কাছে বসছে যে সরাসরি তাকাইতে লজ্জা লাগছে, ঠিকঠাক দেখি নাই, কিন্তু পছন্দ হইছে।’ খালা মুখ বাঁকালেন, ‘তোদের দুইটারে বসাইছে দুই মেরুতে, তার ওপর তুই চশমা ছাড়া, দেখিস নাই ঠিকই, তাইলে পছন্দ কেমনে বুঝলি?’ আমি নিশ্চিন্ত, খালা জানেই না ছেলে কোথায় বসেছে। তবুও বললাম, ‘চশমা দাও, জানালা দিয়ে দেখব আরেকবার।’ ছেলেটা বসেছিল জানালার কাছেই, আমি পর্দা না সরিয়েই খুব কনফিডেন্ট, খালাকে বর্ণনা দিচ্ছি ছেলের জিন্স আর টি-শার্টের, সিল্কি চুল আর চশমার নিচের চোখগুলোরও। খালা রীতিমতো ভেংচি কাটলেন, পর্দা সরিয়ে প্রথমে হাত, পরে চোখের ইশারায় দেখালেন ছেলেকে। অনেক দূরে বসেছে, চশমাও একটা ঠিকঠাক পরা আছে, গোঁফের আড়ালে এক্সপ্রেশন হারিয়ে যাচ্ছিল, কিছুটা গম্ভীর কি! হতাশ লাগছিল, চশমা দিয়েও আমি স্পষ্ট দেখছিলাম না, চুলগুলো কি সিল্কি না!
প্রায়ই ঘটে থাকে এমন ভঙ্গিতে খালা বললেন, ‘এইটা ছেলের ভাই, এক মায়ের পেটের, মিল আছে বলেই তুই ভুল করছিস, তার ওপর নিজের খুঁত ঢাকার জন্য চশমাও পরে যাস নাই।’ আমার খুব মন খারাপ হলো, সামান্য সময়ের মধ্যেই সিল্কি চুলে প্রেম এসে গেছিল আমার।
চশমা পরা গোঁফঅলা একজন হবে আমার বর, ব্যস এইটুকু জেনেই ঠিক একমাস পর আমার বিয়ে হয়ে যায়। তাকে কাছ থেকে ঠিকঠাক দেখি বিয়ের পরদিন সকালের রোদে। আগের রাতের ঘোলাটে আলোয় কাতান আর গয়নার চাপে বিপর্যস্ত আমার চশমা ছাড়া চোখ তাকে সত্যিই দেখে নাই।

 

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT