সাহিত্য

ভূত কবি

ইফতেখার শামীম প্রকাশিত হয়েছে: ১৫-০৩-২০২০ ইং ০০:০১:৫১ | সংবাদটি ৪২৭ বার পঠিত
Image

ঢাকা শহরের পুরনো জীর্ণ শীর্ণ বাসায় বসে শহুরে মানুষের ব্যস্ততা দেখেন মিনহাজ সাহেব। পড়ন্ত বিকেলের রোদে শহুরে গাড়ির অযথা হর্ণের শব্দে বিরক্তবোধ করেন। ভাবেন, গ্রাম কত শান্তির জায়গা। সবুজের সমারোহ আর পাখির কলকাকলিতে মুখর গ্রামের পরিবেশে শিশুদের খেলার মাঠের হৈ-হুল্লোড়েও একপ্রকার আনন্দ পাওয়া যায়। অথচ শহরে আনন্দের অভাব, প্রয়োজনের তাগিদে ছুটে চলা মানুষের ব্যস্ততা আকাশচুম্বী।
আজ সপ্তাহখানেক হলো মিনহাজ সাহেব ঢাকা শহরে এসেছেন। তার বড় ছেলে অনিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ নিয়ে মাস্টার্স শেষ করেছে। গতকাল ছিলো তাদের সমাবর্তন অনুষ্ঠান। অনিক তার আনন্দের এই মুহূর্তের স্বাক্ষী করতে চায় তার বাবাকে। মিনহাজ সাহেবের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে আসার কোনো ইচ্ছে ছিলো না, কিন্তু ছেলে যাতে কষ্ট না পায় তাই বাধ্য হয়ে আসা।
ঢাকা শহরে মন ঠেকে না তার, কর্পোরেট শহরের ইট দালানকেও ভীষণ কর্পোরেট মনে হয়, আর মানুষকে মনে হয় রোবটের মতো অনুভূতিহীন।
হঠাৎ অ্যাম্বুলেন্সের শব্দে চিন্তিত হয়ে পড়েন তিনি। তার ভাবনায় উঁকি দিতে থাকে স্বজন হারানো যন্ত্রণা। আজ থেকে ঠিক চল্লিশ বছর আগে বাবাকে হারিয়েছেন তিনি। বাবা নামক বটবৃক্ষকে হারানোর বেদনা আজও তাকে ভীষণ পীড়া দেয়। একে একে স্মৃতির দরজা খুলতে থাকে আর সেই দরজা দিয়ে বাবার ভালোবাসা ভরা স্মৃতিময় শৈশবে প্রবেশ করেন তিনি। তখন তার বয়স সাত কিংবা আট, একদিন তিনি তার বাবার সাথে জুমার নামাযে যাচ্ছিলেন। বাবার হাত ধরে হাঁটার পথে হঠাৎ হোঁচট খেলেন, সাথে সাথে ডান পায়ের মধ্যমা আঙুলের নখ উল্টে গিয়ে রক্ত বেরুতে লাগলো। বাবার হাসিমুখ রক্তাভ আকার ধারণ করলো, রাস্তায় লোকজন না থাকলে ছেলের এইটুকু রক্তঝরা দেখে বাবা বোধহয় সেদিন কেঁদেই ফেলতেন।
আরেকবার সম্ভবত তখন তার ১৫-১৬ বয়স, বন্ধুরা মিলে ঘুরতে গিয়েছিলেন সিলেটের জাফলংয়ে। রাত ৯টার জয়ন্তিকা এক্সপ্রেসে ফেরার ট্রেনে উঠে বাবা মায়ের সাথে কথা বলেছিলেন। তারপর সারারাত বন্ধুরা মিলে আড্ডা এবং গান শোনায় শেষ রাতে তাদের সবার মোবাইল বন্ধ হয়ে যায়। ভোরে ঢাকা বিমানবন্দরে নেমে দূর্জয়ের পীড়াপীড়িতে তার বাসায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন, ঘুমের ঘোরে মোবাইল চার্জ দেয়ার কথাও ভুলে যান। ঘুম থেকে উঠে যখন বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন তখন বিকেল তিনটা বাজে। বাড়িতে পৌঁছে দেখেন সারা বাড়ি নিশ্চুপ নিস্তব্দ। তার মা ছুটে আসেন, বাবা এসে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকেন, মিনহাজ সাহেব সেদিন বিস্ময়ের ঘোরে সবার দিকে শিশুর মতো নিষ্পাপ চোখে তাকান, কিছুই বুঝতে পারেন না। খেতে বসে বড় আপু জিজ্ঞেস করেন, তোর মোবাইল বন্ধ ছিলো কেন মিনহাজ? এদিকে কি হয়েছে জানিস?
মোবাইলে চার্জ নাই। তোমরা সবাই এভাবে কান্নাকাটি করছিলে কেন?
আপু ম্লান হেসে বলেন, ফজরের নামাজ শেষে আব্বু তোকে কল দিয়ে তোর নাম্বার বন্ধ পেয়েছেন, তোর বন্ধুদের নাম্বারও বন্ধ। সকাল ৯টা পরেও যখন তোদের কারো মোবাইল খোলা পেলেন না তখন তো আব্বু ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলেন, বারবার কল দেন আর বলেন, ওদের কী হলো? ওরা কী কোনো বিপদে পড়েছে?
সকাল ১১টার পরে তো আব্বু ভীষণ কান্না জুড়ে দিলেন, কোনোভাবেই বুঝানো যায় না। আম্মু বললেন, মোবাইল বন্ধ তো সমস্যা কি? হয়তো চার্জ নেই। আপনি খামোখা কান্নাকাটি করছেন কেন?
কিন্তু আব্বু কারো কথা শুনেন না, শুধু কাঁদেন আর কতক্ষণ পর পর কল দেন। তুই বাড়ি ফেরার কিছুক্ষণ আগে দূর্জয়ের মোবাইলে কল ঢুকলো, সে জানালো তুই তার ওখানে ছিলি আর এখন বাসায় পৌঁছার জন্য রওয়ানা দিয়েছিস। তারপর আব্বুর কান্না থামলো। আব্বু আম্মু তোকে ভীষণ ভালোবাসেন রে মিনহাজ।
মিনহাজের বাবার জন্য মায়া হয়, ভাবেন বাবাকে খামোখা দুঃশ্চিন্তা দিলেন। বন্ধুদের উপর ভীষণ রাগ হয়, ওরা দুষ্টুমি করে যদি মোবাইলের চার্জ শেষ না করতো, তবে বাবা এই কষ্টটা পেতেন না। জাফলংয়ের আনন্দভ্রমণ ফিঁকে হয়ে যায় তার কাছে। বাবার ভালোবাসার গভীরতার কথা চিন্তা করে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, ভাতের লোকমা গলা দিয়ে ঢুকেও হজম হয় না। মনে হয়, ভীষণ অপরাধ করে ফেলেছেন।
ধীরে ধীরে সূর্য অস্ত যায়, কাছের মসজিদ থেকে আজানের সুর ভেসে আসে, মিনহাজ সাহেব স্মৃতির শহর থেকে বেরিয়ে বাস্তবে ফিরেন। বাসা থেকে বের হন নামাজের উদ্দেশ্যে। সন্ধ্যায় বেলকনিতে বসে সেলিনা হোসেনের নুন পান্তার গড়াগড়ি বইটি পড়েন মিনহাজ সাহেব। গল্পে গল্পে জীবনের নিখাদ বিশ্লেষণের জন্য সেলিনা হোসেনকে কৃতজ্ঞতা জানাতে ইচ্ছে হয় তার।
নুন পান্তার গড়াগড়ি শিরোনামের গল্পে আরজ আলী মাতব্বরের নির্মম পরিণতিতে দরদের উত্তাল সমুদ্রে ডুবে যায় তার চোখ, ডুবে যায় তার বোধের আলোর ঝলসানি। নুন পান্তার গড়াগড়িতে তিনি নিজেকে ভীষণ একা অনুভব করেন, বুকের ভেতর শূন্যতার হৈ-হুল্লোড় টের পান। দেখেন একটা তুমুল সন্ধ্যা ছাই হয়ে উড়ে যাচ্ছে। তার দীর্ঘশ্বাস বাড়ে, রাত বাড়ে, আক্ষেপ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ হয়। ঝাপসা চোখে দেয়ালের দিকে তাকান, দেখেন দেয়ালে ঝুলে আছে বিষাদ। তার প্রথম যৌবনের কথা মনে পড়ে, এক কিশোরীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন ‘বেঁচে থাকা মানে তুমি’। তখন তার কাছে জীবন মানে ছিলো উচ্ছল কিশোরীর বুক ছুঁয়ে যাওয়া আলিঙ্গন। এখন জীবন মানে কী? উত্তর খুঁজতে গিয়ে ক্লান্তি অনুভব করেন মিনহাজ সাহেব। তার মনে হয় জীবন পাখির বাসার মতো নড়বড়ে, টিকটিকি স্বভাবের মতো সহীহ, ঠিক ঠিক ঠিক।
অনিকের ডাকে চেতনালোকে ফিরেন মিনহাজ সাহেব। ভালো করে চোখ মুছে ডাইনিংরুমে গিয়ে দেখেন ছেলের কয়েকটা বন্ধু এসেছে। সবার সাথে সৌজন্যবোধ শেষে জীবনের ব্যাকরণ নিয়ে কথা ওঠে। অনিকের বন্ধুদের মধ্যে শুরু হয় তুমুল বিতর্ক। কারো কাছে জীবন মানে পাঁচ টাকার রঙ চায়ের সাথে তৃপ্তির ঢেকুঁর, কারো পছন্দ জয় গোস্বামী, আবার কারো পছন্দ অ্যাশেজের জুনায়েদ ইভান। কারো কাছে জীবন মানে শৈশব, শৈশবের রঙিন ঘুড়ি, বন্ধুদের সাথে গানের কলি খেলা। কারো পছন্দ রাজনীতি, রাজনৈতিক নেতা, মিছিল, মিটিং শাহবাগের স্লোগান। আবার কারো পছন্দ ফুটবল, মেসির বাঁ পায়ের জাদু, বার্সোলোনা-রিয়ালের দ্বৈরথ।
মিনহাজ সাহেব সবাইকে থামান, বলেন এগুলোর কিছুই পূর্ণ জীবন না, জীবনের আংশিক অংশ মাত্র। জীবন হলো নিয়তির কেতাদুরস্থ বিজ্ঞাপন। তোমাদের একটা ঘটনা বলি বাবারা, আমার এক বন্ধু ছিলো, নাম তন্ময়। পড়ালেখায় টপার, খেলাধূলায় ভালো, যা কিছুতে হাত দিতো, সেখানে সোনা ফলতো। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, কবিতা ছিলো তার কাছে বিরক্তিকর। আর কবি-সাহিত্যিকে ছিলো তার অগাধ ঘৃণা। সে ক্লাসের কবিতা পর্যন্ত পড়তে চাইতো না। এসএসসির পরে সে পুলিশে চাকরি নিলো, তার বাবার দুটো পরিবার। বড় পরিবারের সে বড় ছেলে। তার বাবা ছোট মাকে নিয়ে আলাদা হয়ে গেলেন। পরিবারের সম্পূর্ণ দায়িত্ব পড়লো তার উপর। ভাই-বোনদের পড়াচ্ছিলো, চাকরিতেও মেধার জোরে উন্নতি করলো। একদিন হুট করে ডিউটিতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে । মেডিকেলে নিয়ে গেলে ডাক্তার রোগ ধরতে পারলো না, জানালো বিশ্রামে রাখতে হবে। বাড়িতে বিশ্রামে রাখা হলো, বিভিন্ন ডাক্তারের পাশাপাশি মোল্লা- মৌলভীও দেখানো হলো। কিন্তু সে প্রতিদিন আরো বেশি অসুস্থ হতে থাকলো। ধীরে ধীরে সে অদ্ভুদ আচরণ শুরু করে। যে ছেলেটা কবিতা শব্দটাই শুনতে চাইতো না , সে চিৎকার করে কবিতা বলে, মানুষ দেখলেই মারতে উদ্যত হয়। তার কবিতার স্টাইলও ছিলো একেবারে আলাদা। লোকজন বলাবলি করলো, তার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। একদিন সকালে সে কাপড়-চোপড় খুলে উঠোনে নাচতে নাচতে বলতে লাগলো
"বন্ধু তোমার পেঁয়াজ লাগলে আমায় দিও ডাক/ আমার সাথে নিয়ে আসবো হাজার হাজার কাক।/ তুমি দিবে কিছু, আমি দিবো কিছু/ তাই দেখে শেয়াল রাজা করে দিবে হিসু।
ইত্যাদি আজব আজব কথা বলতে লাগলো। একজন মৌলভী আনা হলো, তিনি নাকি অনেক ভালো তাবিজ দেন। মৌলভী তার এই কান্ড দেখে বললেন, মারাত্মক ভূত, সর্বনাশা ভূত। সবাই জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, এই ভূতের নাম কবি ভূত। এই ভূত তাড়াতে হলে তার নাক দিয়ে চল্লিশ কলস পানি ঢালতে হবে। মৌলভীর কথামতো নাক দিয়ে পানি ঢালা শুরু হলো, কয়েক কলস পানি ঢালার পর তন্ময় অজ্ঞান হয়ে পড়ে। গ্রামের কিছু সচেতন মানুষ জোর করে পানি ঢালা বন্ধ করান। কিন্তু ততক্ষণে যা ক্ষতি হবার হয়ে গেছে। তন্ময় আরো বেশি অসুস্থ হয়। তারপর আর বেশিদিন বাঁচেনি সে। কিন্তু যতদিন বেঁচে ছিলো গ্রামের দুষ্ট ছেলেরা তাকে ভূত কবি বলে ঠাট্টা করতো। নিয়তির কাছে তন্ময়ের এই হেরে যাওয়া আমাকে ভীষণ পীড়া দিয়েছিলো, আজও সেই পীড়া থেকে আমি মুক্ত হতে পারিনা।

 

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT