বিশেষ সংখ্যা

মুজিববর্ষের তাৎপর্য

মো. রফিকুল হক প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-০৩-২০২০ ইং ০০:০৪:১১ | সংবাদটি ৬৬ বার পঠিত


বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম বর্ষকে মুজিববর্ষ ঘোষণা করা হয়েছে ২০২০ সালের ১৭ই মার্চকে। একশত বৎসর পূর্বে তিনি এই বাংলার গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গীপাড়া নামে এক অজপাড়া গাঁয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর জন্ম গ্রহণ যে একটা নিষ্পেষিত ও শোষিত জাতির মুক্তি উৎস হবে তা কেউ ভাবতে পারেনি। কিন্তু বিধাতা যাকে সৃষ্টি করেছেন এই বাঙালি জাতির মুক্তিদাতা হিসেবে তাঁকে আর ঠেকায় কে? ছোট্ট শিশু অবস্থায় স্কুল জীবনে তিনি তাঁর সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। যখন উনার স্কুলে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দি গিয়েছিলেন, তখন তিনি তার স্কুলের নানা সমস্যা সাহসের সহিত উপস্থাপন করেছেন সেদিনই অনেকে মনে করেছিলেন ছেলেটি বড় হলে কিছু একটা হতে পারে। তার ধারাবাহিকতায় লেখাপড়ার পাশাপাশি এলাকার মানুষ জনের সুবিধা অসুবিধা, কার ঘরে খাবার আছে, কার ঘরে নেই তা নিয়ে ভাবতেন। প্রায়শ তিনি তাঁর পিতার গোলা ভরা ধান থেকে অসহায় ও নিরন্ন মানুষজনকে সাহায্য করেছেন। এটা তার স্বভাবের মধ্যে অন্যতম একদিক ছিল।
বঙ্গবন্ধু যখন তৎকালীন সময়ে স্কুলের গন্ডি পাড়ি দিয়ে এন্ট্রাস পাশ করে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনার জন্য যান, তখন তিনি ছাত্র রাজনীতি সচেতন ছিলেন। তিনি আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের বেকার হোস্টেলে থেকে দেশের কথা, নানা বৈষম্যের কথা উপলব্দি করেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে ঊর্ধ্বতন নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং ঐ নেতৃবৃন্দের সফরকালে বিভিন্ন প্রোগ্রামে হাজির থেকে নিজেকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার দৃঢ় প্রত্যয় করতে থাকেন। বাংলার প্রবাদ প্রতীম পুরুষ সোহরাওয়ার্দী শেরে বাংলাসহ সাবেক বাংলার মুখ্যমন্ত্রীদের স্নেহ লাভ করেন। তাঁরাও শেখ মুজিবের মাঝে রাজনৈতিক দূরদর্শিতা যে আছে এবং তাঁর দ্বারা যে একটা কিছু হবে তা বুঝতে পারতেন। বিধায় প্রায় সকল সময় তাদের সাথে ঐতিহাসিক ক্ষণে সফরসঙ্গী হয়েছেন। অখন্ড ভারতে বিভিন্ন সময়ে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা তিনি দেখেছেন। এই সব দাঙ্গা থামাতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তৎকালীন ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সাথে কাজ করেছেন। কিন্তু এসব সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সাময়িক ধামাচাপা দিয়ে চললেও কখন কোন সময় দামামা বেজে উঠে তা নির্দিষ্ট করে কোন গ্যারান্টি ছিল না। তখন দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ইন্ডিয়া-পাকিস্তানকে বৃটিশরাই দু’টি ডোমিনিয়নে ভাগ করে দেয় ১৯৪৭ সালের আগস্টে। কারণ কথা ছিল যেখানে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল সেখানে হিন্দুরাজ্য আর যেখানে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ট সেখানে মুসলিম রাজ্য গঠিত হবে। তখন কায়েদে আযমের নেতৃত্বে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়। মুসলমানরা আশ্বস্থ হয়েছিলো আর কখনো বৈষম্য ও বঞ্চনার কিংবা দাঙ্গা-হাঙ্গামার শিকার হবে না। গোটা পাকিস্তান একটি শক্তি হয়ে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকতে পারব। নিজেদের মতামত, স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও সর্বোপরি মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে এটাও একটা গর্বের বিষয়। কিন্তু সবই হিতে বিপরীত হয়ে গেল।
দুইশত বৎসর বৃটিশের গোলামীর পর পূর্ব পাকিস্তান আবার পশ্চিম পাকিস্তানের গোলামীর শিকার হতে লাগল। এই গোলামীর শৃঙ্খল হতে বের হতে আরো দীর্ঘ ২৪ বৎসর পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি আন্দোলন সংগ্রাম, জেল জুলুম নির্যাতন, বঞ্চনার শিকার হলো। অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় সহ প্রশাসনিক উন্নয়নে পূর্ব পাকিস্তান বৈষম্যে চরম অবহেলিত হতে লাগল। পূর্ববঙ্গের পাট, চা চামড়া শিল্পের অর্জিত সম্পদ দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে ইমারত ও প্রশাসনিক অবকাঠামো গড়ে ওঠতে লাগল। পূর্ববঙ্গ যে তিমিরে বৃটিশ আমলে ছিল, সে তিমিরে-ই রয়ে গেল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এতসব অত্যাচার ও অনাচারের বিরুদ্ধে গর্জে উঠলেন। দ্বিজাতিত্তত্বের ভিত্তিতে যে রাষ্ট্র সৃষ্টি হলো তার কোনকিছুর বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ভাষা থেকে আরম্ভ করে কোন কিছুতেই তারা পূর্ব বাংলার মানুষকে মূল্যায়ন করতে এমনকি ন্যায্য অধিকারটুকু দিতে রাজি হয় নাই। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে জয়লাভ করেও মাত্র এক বৎসর টিকতে পারে নাই। পূর্ব বাংলার জুট শিল্পগুলোতে দাঙ্গা বাধিয়ে ১৯৫৮ সালে আয়ুব খান মার্শাল ’ল জারি করে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে সামরিক আইন জারি করে দেয়।
সামরিক আইন দ্বারা সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রাম স্তব্ধ করেছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ অসহায় হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় কুখ্যাত আব্দুল হামিদ খানের শিক্ষানীতি ১৯৬২ সালে পূর্ববঙ্গের বঞ্চিত মানুষের বিরুদ্ধে আগুনে ঘি ঢেলে দেওয়ার অবস্থার সৃষ্টি হলে বঞ্চনার বিস্ফোরণ ঘটতে থাকে। সামরিক আইন মাথায় নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উক্ত শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে গর্জে উঠেন। তাতে করে আইয়ুব খান আগরতলা ষড়যন্ত্রের ফন্দি এঁটে-আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা করে তাঁকে সহ ৩৪ জন নেতৃবৃন্দকে জেলে পুরে দেয়। এমনকি সামরিক কোর্টে বিচার চালিয়ে বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলানোর প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু বাংলার মানুষের আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুসহ সকল নেতৃবৃন্দকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। শেখ মুজিবুর রহমান জেল থেকে বের হওয়ার পর দেখলেন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠির সাথে স্বাধিকার আন্দোলনের পথে যাওয়া ছাড়া কোন পথ খোলা নেই। তিনি সারা পূর্ববাংলায় সভা সমাবেশ মিছিল মিটিং করে ঐতিহাসিক ছয় দফা ঘোষণা করেন ১৯৬৬ সালের জুন মাসে। তাকে বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে উল্লেখ করেন। আপামর জনগণ তাতে সাড়া দিলে আইয়ুব খানের মসনদে কাঁপন শুরু করে দেয়। তখন অবস্থা বেগতিক দেখে আইয়ুব খান ক্ষমতা ছেড়ে ইয়াহিয়া খানের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করে কেটে পড়ে। উত্তাল বাঙালি তখন ছয় দফার দাবি নিয়ে পূর্ব পশ্চিম উভয় পাকিস্তানকে তাক লাগিয়ে দেয়।
ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা নিয়ে পাকিস্তানের মানুষকে আশ্বস্থ করে বলেছিলেন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার পালাবদল হবে। তিনি জাতীয় নির্বাচন দিবেন। জনগণ ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে যে কোন দলকে নির্বাচিত করবেন। তখন পশ্চিম পাকিস্তানের দল ছিল মুসলিম লীগ। ৬৬ সালের ছয় দফা তখন ধীরে ধীরে গণদাবিতে রূপ নিতে লাগল। পূর্ব বাংলার সকল দলমত নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু উপাধি দিয়ে তাঁর নেতৃত্বে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার অপেক্ষায় থাকে। অর্থাৎ ছয় দফা তখন এক দফায় রূপান্তরিত হতে থাকল। ইয়াহিয়া খান পরিস্থিতি উপলব্ধি করে ১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচন দেয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। জাতীয় অধিবেশনের তারিখ ঘোষণা করেও হঠাৎ করে তারিখ স্থগিত করলে বাংলার মানুষ আন্দোলনে ফেটে পড়ে। ইয়াহিয়া খান তার দলবল নিয়ে এসে ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর সাথে প্রহসনের আলোচনা করে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের ওপর তাঁর সশস্ত্র বাহিনীকে ২৫শে মার্চ অপারেশন সার্চ লাইটের নির্দেশ দিয়ে রাতের আঁধারে ঢাকা ত্যাগ করে রাওয়ালপিন্ডিতে চলে যায়। এদিকে বঙ্গবন্ধুকে ২৫ শে মার্চের মধ্যরাতে এরেস্ট করে পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে অন্ধকার কারা প্রকোষ্টে নিপতিত করে। বঙ্গবন্ধু এরেস্ট হওয়ার সাথে সাথে ওয়ারলেসের মাধ্যমে স্বাধীনতা ঘোষণা করে যান। পরবর্তীতে অনেকে বঙ্গবন্ধুর নামে বাংলাদেশ বেতারে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে মুক্তি পাগল বাঙালিকে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ার আহবান জানাতে থাকেন। ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলার স্বাধীনতা অর্জিত হয়। বঙ্গবন্ধু এভাবে সমস্ত জীবন সংগ্রাম আন্দোলন করে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। তাঁর আগমন ও জন্মটাই হয়েছিল এই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য।
তাই আজকের ২০২০ সালের ১৭ই মার্চ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শতমত জন্মদিনে সারা বছর ব্যাপি মুজিববর্ষ বর্তমান সরকার পালন করছে। দেশের মানুষকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর অবদানের জন্য শততম জন্মবার্ষিকী পালন সরকারী বেসরকারী সর্বপর্যায়ে পালিত হবে। ২০২০ সালের ১৭ই মার্চ থেকে ২০২১ সালের ১৭ই মার্চ পর্যন্ত নানা কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা জানানো হবে। শেখ মুজিবুর রহমানের আজীবনের লালিত সোনার বাংলার সোনার মানুষগুলো যেন সুখে থাকে, সমৃদ্ধির সোপানে পৌঁছতে পারে মুজিববর্ষে তাই যেন সকলের প্রত্যাশা থাকে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতিমধ্যে বলে দিয়েছেন যে, মুজিববর্ষ নিয়ে যেন কোন ধরনের অতিরিক্ত সরকারি খরচ কিংবা দলের লোকজনেরা যাতে কোন ধরনের হানাহানি চাঁদাবাজিতে নিপতিত না হয় সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বুকে মাথা উন্নত করে চলেছে। সার্বিক উন্নয়নে শুধু দক্ষিণ এশিয়াই নয় পুরো এশিয়াতে এগিয়ে চলেছে। দেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে। বিভিন্ন দেশের কাছে ইতিমধ্যে রোল মডেল আখ্যায়িত হচ্ছে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, ওড়াল সেতু, বড় বড় বিদ্যুৎ প্লান্টসহ সব মেঘা প্রকল্পগুলো দ্রুত চালিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হতে চলেছে। যেখানে জিডিপি-৮.১৫ শতাংশসহ রিজার্ভ ব্যাংকে ৩৪ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত রক্ষিত আছে। আশা করি ২০৪১ সালে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা পৃথিবীর উন্নত সারির একটি দেশে রূপান্তরিত হবে। মুজিববর্ষে আজ তাই প্রত্যাশা করছি।

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

বিশেষ সংখ্যা এর আরো সংবাদ
  • বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় কবি নজরুল
  • বঙ্গবন্ধুর জীবনালোচনায় কিছু কথা ও কাহিনী
  • বঙ্গবন্ধুকে কাছে থেকে দেখার টুকরো স্মৃতি
  • মুজিববর্ষের তাৎপর্য
  • মাতৃভাষা আন্দোলন ও সিলেট
  • ভাষাশহীদদের প্রতি কৃতজ্ঞতা : ইসলামি দৃষ্টিকোণ
  • দেশে বিদেশে গৌরবের শহীদ মিনার
  • বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষা চর্চা
  • মানুষ জন্মগত বিজয়ী, পরাজয় মানে না
  • মুক্তিযুদ্ধ ও নদী
  • আমাদের মুক্তিযুদ্ধ
  • তিনি আজও আমার সব কর্মের প্রেরণা
  • রাগীব আলীর উন্নয়নের পৃষ্ঠপোষক
  • একজন বিচক্ষণ সম্পাদক আমার মা
  • একজন মহীয়সী নারী
  • রাবেয়া খাতুন চৌধুরী ও সিলেটের ডাক
  • অনন্যা
  • স্মৃতিতে ভাস্বর রাবেয়া খাতুন চৌধুরী
  • বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী এক মহীয়সী নারীর কথা
  • তিনি বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী
  • Developed by: Sparkle IT