বিশেষ সংখ্যা

বঙ্গবন্ধুকে কাছে থেকে দেখার টুকরো স্মৃতি

রফিকুর রহমান লজু প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-০৩-২০২০ ইং ০০:০৭:৪২ | সংবাদটি ৭২ বার পঠিত


বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উঁচু মাপের এক রাষ্ট্রনায়ক ও স্বাধীনতা সংগ্রামী। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি এবং ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। তিনি বাঙালি জাতির স্রষ্টা এবং দেশবাসীর অবিসংবাদিত নেতা। সংগ্রামমুখর জীবন এবং সংগ্রামে সাফল্যের জীবনের অধিকারী বঙ্গবন্ধু জীবনের কোনো পর্যায়েই আপোষ করেন নাই বরং সাহস আর দৃঢ়তার যে পরাকাষ্ঠা তিনি দেখিয়েছেন, তা ইতিহাসে নজিরবিহীন। তাঁকে পশ্চিম পাকিস্তানে বন্দি করে রেখে তাঁর জন্য কবর তৈরি করা হয়েছিলো তবুও তিনি ভয় পান নাই, বাংলার স্বাধীনতার দাবি থেকে সরেননি। জেল জীবন তাঁর জীবনের অংশই হয়ে গিয়েছিলো। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীত্বের জন্য তিনি বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেননি। এই হলেন বঙ্গবন্ধু, এই হলেন বাংলার স্বাধীনতার স্রষ্টা, এই হলেন জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালির আসন তো তাঁরই প্রাপ্য।
বঙ্গবন্ধু যেমন শ্রেষ্ঠ বাঙালি হয়ে ওঠেছিলেন, তেমনই তিনি একজন শ্রেষ্ঠ মানবতাবাদীও ছিলেন। নানা মহৎ গুণাবলীর সমন্বয় ঘটেছিলো তাঁর মধ্যে। তা সত্ত্বেও তিনি মানুষই ছিলেন, অতিমানব ছিলেন না। ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে ছিলেন না নিশ্চয়ই। দেশের জন্য, দেশবাসীর জন্য তাঁর অবদান ছিলো অসামান্য, তাঁর ত্যাগ ছিলো তুলনাহীন। তাই তার অসামান্য গুণাবলীর পাশে, তাঁর ত্যাগ অবদানসমূহের ভিড়ে সেই সব ভুল-ত্রুটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু কি ছিলেন, কেমন ছিলেন, নিজের সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন কি-১৯৭৩ সালে একটি ব্যক্তিগত নোট বই-এ তিনি এ বিষয়ে একটি মন্তব্য করেছেন। এই অসম্ভব মন্তব্যটি তাঁর প্রতি আমাকে আশ্চর্য শক্তির চুম্বকে আকর্ষণ করেছে, তাঁর প্রতি আগ্রহী করেছে। তখন থেকেই বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি, তাঁর সম্পর্কে যত ইতিবাচক মহৎ কর্মের কথা শুনেছি, সেগুলো হৃদয়পটে গেঁথে গেছে। তাঁর স্মৃতি তখন থেকেই উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে চোখের মণিতে, হৃদয়ের স্মৃতিতে। বঙ্গবন্ধুর মন্তব্য হলো : একজন মানুষ হিসাবে, যা কিছু মানবজাতির সঙ্গে সম্পর্কিত আমি তাতে উৎসাহী। একজন বাঙালি হিসাবে, যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত আমি তার সঙ্গে নিজেকে গভীরভাবে সম্পৃক্তবোধ করি। এই চিরন্তন সম্পৃক্ততার জন্ম হয়েছে এবং পুষ্টি ঘটেছে ভালবাসা দ্বারা, স্থায়ী ভালবাসা, যা আমার রাজনীতি এবং আমার একান্ত অস্তিত্বকে অর্থময় করে তোলে। -এমন অর্থময় এবং হৃদয় ছোঁয়া কথা যে নেতার, তাঁকে দেখার আগে দেখার চাইতে বেশি স্মৃতি গেঁথে গেছে মনের পর্দায়। বঙ্গবন্ধু তাঁর দেশপ্রেম, মানবতা, ত্যাগ, সংগ্রাম ও সাফল্যের উজ্জ্ব আলোতে এবং তাঁর মহৎ কর্মকান্ড ও অবদানের কারণে দেশের গন্ডির বাইরেও স্বমহিমায় ঈর্ষান্বিত পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা লাভ করেন। এভাবে তাঁর সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ, সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ না হলেও এবং দূরে থেকেও হাজারো বাঙালি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সখ্য ও স্মৃতিসুখ অনুভব করেন। এমনই ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও বড় মাপের মানুষ ছিলেন তিনি।
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার স্মৃতির যোগাযোগের সূত্রপাত ১৯৫৬-৫৭ সালে। তখন তিনি শিল্প-বাণিজ্য, শ্রম ও দুর্নীতি দমন দফতরের প্রাদেশিক মন্ত্রী। মন্ত্রী হিসেবে তিনি সিলেট সফরে এসেছিলেন। আমি তখন সম্ভবত সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। তখন রাজনীতির এত জৌলস ছিলো না। আমার আবছা আবছা মনে আছে। নাম শুনেছি মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান। এইটুকুই। নাম শোনার ওই আবছা আবছা কথাই আজ বৃহৎ মহীরুহ হয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি জাগানিয়া হয়ে অন্তরে অনাবিল আনন্দ ছড়াচ্ছে।
এরপর বিভিন্ন সময়ে বিশেষ করে ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসনামলে ধরপাকড়ের সময়, ’৬২ সালে ছাত্র আন্দোলনের সময়, ’৬৫ সালে ফাতেমা জিন্নাহ’র নির্বাচন কালে বঙ্গবন্ধুর নাম খুব বেশি শুনেছি। বঙ্গবন্ধু তখন ক্রমে ক্রমে ওঠে আসছেন বড় নেতা হিসেবে।
বঙ্গবন্ধুর জন্য বা বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্বের চাকচিক্যে সবচেয়ে বেশি আলোড়িত ও প্রভাবান্বিত হয়েছি ১৯৬৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি লাহোরে ঐতিহাসিক ৬ দফা ঘোষণার পর। ৬-দফা কর্মসূচির প্রশ্নে খোদ আওয়ামী লীগ দ্বি-খন্ডিত হয়ে যায়। এই কারণে বঙ্গবন্ধু তখন আরো বেশি আলোচিত ও পাকিস্তানের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন। এই সময় নানা আকারে, নানা বর্ণে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির প্রতিরূপ জন্ম নেয় স্মৃতিপটে।
৬-দফা নিয়ে বঙ্গবন্ধু সিলেট এসেছিলেন, রেজিস্ট্রারি মাঠে ভাষণ দিয়েছিলেন। এই প্রথম কাছে থেকে চাক্ষুষ দেখলাম বঙ্গবন্ধুকে। বঙ্গবন্ধুকে প্রথম দেখার এই স্মৃতি অমলিন হয়ে আছে স্মৃতির ক্যানভাসে।
একাত্তর সালের ২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি করা হয়। বন্দি হওয়ার আগে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যান। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাহাত্তরের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু বীরদর্পে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।
মুক্তিযুদ্ধের পর বাহাত্তর সালে দু’বার এবং তিয়াত্তর সালে একবার বঙ্গবন্ধুকে কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিলো আমার। ওই সুখস্মৃতি এখনো তাজা হয়ে জাগরুক রয়েছে হৃদয় মাঝে। মুক্তিযুদ্ধের পরপর বাহাত্তর সালের প্রথমার্ধে বঙ্গবন্ধু সিলেটে সুভাগমন করেছিলেন মাজার জিয়ারত করার জন্য। ওই সময় হযরত শাহপরান (রা:)-এর মাজারে যাওয়ার পথে আওয়ামী লীগ নেতা দেওয়ান ফরিদ গাজী সাহেবের সহায়তায় সোনারপাড়ায় বখতিয়ার বিবি প্রাথমিক স্কুলের সামনে রাস্তায় বঙ্গবন্ধুর গাড়ি দাঁড় করিয়েছিলাম। তিনি আমাদের কয়েকজনের সঙ্গে করমর্দন করেছিলেন এবং স্কুলকে দশ হাজার টাকা দান করেছিলেন। ’৪৭ সালে রেফারেন্ডামের সময় বঙ্গবন্ধু কয়েকদিন এই স্কুলে অবস্থান করেছিলেন।
বাহাত্তর সালের ৯ এপ্রিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যোনে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু প্রধান অতিথি হিসেবে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন এবং ভাষণ দেন। ওই সম্মেলনে একেবারে কাছে থেকে তাঁকে দেখেছি এবং ভাষণও শুনেছি।
স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির ২য় এবং প্রথম প্রকাশ্য কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় ঢাকায়। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন এবং ভাষণ দান করেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃবৃন্দসহ অন্যান্য দেশের পার্টির নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বভাবসুলভ দরাজ গলায় ভাষণ দেন। স্মৃতিতে ভাসছে দীর্ঘদেহী বঙ্গবন্ধু কলরেডি মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছেন, কানে যেনো বাজছে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠনিঃসৃত বাণী। বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে ওই টুকরো স্মৃতিগুলো জীবনের অমর সঞ্চয় ও অমূল্য সম্পদ হয়ে আমাকে সমৃদ্ধ করছে আজও।

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

বিশেষ সংখ্যা এর আরো সংবাদ
  • বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় কবি নজরুল
  • বঙ্গবন্ধুর জীবনালোচনায় কিছু কথা ও কাহিনী
  • বঙ্গবন্ধুকে কাছে থেকে দেখার টুকরো স্মৃতি
  • মুজিববর্ষের তাৎপর্য
  • মাতৃভাষা আন্দোলন ও সিলেট
  • ভাষাশহীদদের প্রতি কৃতজ্ঞতা : ইসলামি দৃষ্টিকোণ
  • দেশে বিদেশে গৌরবের শহীদ মিনার
  • বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষা চর্চা
  • মানুষ জন্মগত বিজয়ী, পরাজয় মানে না
  • মুক্তিযুদ্ধ ও নদী
  • আমাদের মুক্তিযুদ্ধ
  • তিনি আজও আমার সব কর্মের প্রেরণা
  • রাগীব আলীর উন্নয়নের পৃষ্ঠপোষক
  • একজন বিচক্ষণ সম্পাদক আমার মা
  • একজন মহীয়সী নারী
  • রাবেয়া খাতুন চৌধুরী ও সিলেটের ডাক
  • অনন্যা
  • স্মৃতিতে ভাস্বর রাবেয়া খাতুন চৌধুরী
  • বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী এক মহীয়সী নারীর কথা
  • তিনি বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী
  • Developed by: Sparkle IT