বিশেষ সংখ্যা

বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় কবি নজরুল

আবদুল হামিদ মানিক প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-০৩-২০২০ ইং ০০:১৩:১৭ | সংবাদটি ৩৬৬ বার পঠিত
Image

বাংলা সাহিত্যে যুগস্রষ্টা কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদায় আসীন। সাহিত্য নির্দিষ্ট কোনো স্থান কালে সীমাবদ্ধ নয়। সাহিত্য জাত ধর্ম দেশ কাল নির্বিশেষে সকলের সম্পদ। নজরুলের সৃষ্টিও তেমনি সকলের। তবু তিনি আমাদের জাতীয় কবি। কারণ তার সাহিত্যে এ দেশের গণমানুষের চিন্তা-চেতনা, মন মানসিকতা সর্বোচ্চ মাত্রা ও বিশ্বস্ততায় প্রতিফলিত। ফ্রান্সে বদলেয়ার, যুক্তরাষ্ট্রে এমিলি ডিকিনসন ও ওয়ালট হুইটম্যান, ভারতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সুব্রমারিয়াম ভারতী এবং নেপালে মাধব প্রসাদের মতো কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় কবি। কবিকে জাতীয় কবির মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে বলা যায় একক অবদান রেখেছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু আজীবন রাজনীতির অঙ্গনে নিবেদিত ছিলেন। ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে শেষদিন পর্যন্ত রাজনীতির ময়দানে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ব্যস্ত এই নেতার সাহিত্যপ্রীতি বাড়তি একটি গুণ হিসেবে সকল মহলে প্রশংসিত। রাজনীতির উত্তাপ, উত্তেজনা, সংগ্রাম আন্দোলনের মধ্যেও বঙ্গবন্ধু সময় বের করে বই পড়তেন। তাঁর জীবনী লেখকদের প্রায় সবাই এ তথ্যটি উল্লেখ করেছেন। তাঁর প্রিয় কবি ছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর বক্তৃতায় প্রায়ই রবীন্দ্র-নজরুলের উদ্ধৃতি থাকতো। বঙ্গবন্ধুর এই সাহিত্যপ্রীতি এবং বিশেষ করে নজরুলপ্রীতির ফলেই আজ কবি নজরুল বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশেই শেষ শয্যায় সমাহিত।
কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে ১৮৯৯ সালে। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির ফলে বর্ধমান ভারতভুক্ত হয়ে যায়। নজরুল তাই ভারতীয় নাগরিক। ১৯৪২ সালে কবি অসুস্থ হয়ে বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন। এক পর্যায়ে ভারতীয় সরকার কলকাতায় একটি ভবনে কবিকে সপরিবারে বসবাসের ব্যবস্থা করেন। অসুস্থ কবিকে অনেকেই সেখানে গিয়ে দেখে আসতেন। এভাবেই তার দিন কাটছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর কবির জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। এর আগে শেখ মুজিবুর রহমান এবং পরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী কলকাতায় কবি ভবনে কবিকে দেখে এসেছিলেন। দুজনই ছিলেন কবির অনুরাগী। তাই স্বাধীন বাংলাদেশে কবির আগমন সহজ এবং দ্রুত সম্ভব হয়েছিল। কবি নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্র বলয় অতিক্রম করে এক নতুন ধারার সূচনা করেন। তাঁর বজ্রকণ্ঠী কবিতা, প্রেম, বিদ্রোহ এবং ধর্মীয় ভাবধারাপুষ্ট সঙ্গীত বাঙালিকে দান করে নতুন স্বর ও সুর। অন্যায় অবিচারের এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর গান ও কবিতা হয়ে উঠে শব্দাস্ত্রের মতো। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় কবির গান ও কবিতা মুক্তিকামী বাঙালিকে দান করে সাহস ও প্রেরণা। সেই সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন পাকিস্তানে বন্দী। ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ হানাদার বাহিনী তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। ন’মাস সশস্ত্র যুদ্ধে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু স্বাধীন স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন ১৯৭২ এর ১০ জানুয়ারি। সদ্য স্বাধীন দেশে স্বাভাবিকভাবেই তখন নানামুখী সমস্যার মুখে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে সেসব সমস্যার সমাধানে সচেষ্ট হন। এরই মধ্যে ৭২ সালেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সোনার বাংলা গানকে জাতীয় সঙ্গীত এবং কবি নজরুলের-‘চল চল চল গানকে রণসঙ্গীত ঘোষণা করা হয়। একই বছর কেবিনেট মিটিংয়ে নজরুলকে জাতীয় কবির মর্যাদায় গ্রহণ করা হয়। সেই চল্লিশের দশকে কলকাতার এলবার্ট হলে কবি নজরুলকে নাগরিক সংবর্ধনা দেয়া হয়েছিল। সেই সংবর্ধনা সভায় নেতাজী সুভাস বসু নজরুলকে অবিভক্ত বাংলার জাতীয় কবি অভিহিত করেছিলেন। কিন্তু তা ছিল বেসরকারী নাগরিক পর্যায়ের স্বীকৃতি। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকারী পর্যায়ে কবি নজরুলকে জাতীয় কবি ঘোষণা করা হয়।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন নজরুল অনুরাগী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। নজরুলকে এই মর্যাদা দান করেই বঙ্গবন্ধু সন্তুষ্ট হয়ে বসে থাকেননি। কবিকে বাংলাদেশে নিয়ে আসার জন্য সরকারী পর্যায়ে চেষ্টা শুরু করেন। ভারতীয় সরকার প্রথমে অনিচ্ছুক হলেও বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে অর্থাৎ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশেষ প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত সম্মত হয়। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের চার মাসের মধ্যেই কলকাতা থেকে কবি নজরুলকে নিয়ে আসা হয় বাংলাদেশে। ঐতিহাসিক সে দিনটি ছিল ১৯৭২ এর ২৪ মে। বাংলাদেশ বিমান সকাল ১১-৪০ মিনিটে তেজগাঁও বিমানবন্দরে অবতরণ করে। হাজার হাজার মানুষ বিমানবন্দরে কবিকে সানন্দে বরণ করে নেয়। ধানমন্ডি ২৮নং সড়কে নির্ধারিত কবি ভবনে এম্বুলেন্সে নিয়ে আসা হয় তাঁকে। বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগে বরাদ্দ করা এ ভবনেই কবির শেষ জীবন অতিবাহিত হয়। রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান কবি ভবনে গিয়ে কবিকে শ্রদ্ধা জানান। তাঁর জন্য এক হাজার টাকা মাসিক ভাতা বরাদ্দ করা হয়। বাংলাদেশে কবিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় রাখা হয়েছিল। প্রতিদিন কবি ভবনে জাতীয় পতাকা উড্ডীন থাকতো। কবির চিকিৎসার জন্য গঠন করা হয়েছিল মেডিকেল বোর্ড। প্রতিদিন কবি ভবনে দর্শনার্থীরা গিয়ে শ্রদ্ধা জানাতেন। তাঁর যত্ন ও দেখাশোনার জন্যও লোক নিয়োগ করা হয়েছিল। এছাড়া কবি পুত্র সব্যসাচীর স্ত্রী উমা কাজী এবং নজরুল ভক্ত শফি চাকলাদার সার্বক্ষণিক ছিলেন কবি ভবনে। কবি আনন্দেই ছিলেন। সিঁড়ি দিয়ে একা উঠতে পারতেন। হাসি-খুশির মধ্যেই ছিলেন কবি নজরুল।
কবিকে যথাযথ মর্যাদা দানের ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা সারাদেশে প্রশংসিত হয়। ১৯৭৪ এর ৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ সমাবর্তনে কবিকে ডি-লিট ডিগ্রি প্রদান করা হয়। ১৯৭৫ এর জানুয়ারি মাসে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়। এ বছরই একুশে ফেব্রুয়ারিতে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় এসব উদ্যোগই কবি নজরুলকে জাতীয় কবির মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে।
১৯৭৫, এর আগস্ট মাসের মর্মান্তিক হত্যাকান্ডে বঙ্গবন্ধু প্রাণ হারান। কিন্তু এরপরও কবির মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়নি। ১৯৭৬ এর ২৯ আগস্ট কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। রেডিও টেলিভিশন নিয়মিত প্রচার বন্ধ রেখে শোক পালন করে। পিজি হাসপাতালের সামনে ভীড় জমতে থাকে। পনের মিনিটের মধ্যে হাসপাতালে ছুটে আসেন তখনকার সরকার প্রধান সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সহ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যবৃন্দ। কবিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশে। কবি আজ সশরীরে নেই। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকায় কবি জাতীয় কবির মর্যাদায় মিশে আছেন আমাদের চেতনায়-আছেন জাতীয় জীবনে। সেই সঙ্গে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুও তাঁর ভূমিকার জন্য জাতির শ্রদ্ধার আসনে অমর হয়ে আছেন।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক সিলেটের ডাক।

 

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

বিশেষ সংখ্যা এর আরো সংবাদ
  • বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় কবি নজরুল
  • বঙ্গবন্ধুর জীবনালোচনায় কিছু কথা ও কাহিনী
  • বঙ্গবন্ধুকে কাছে থেকে দেখার টুকরো স্মৃতি
  • মুজিববর্ষের তাৎপর্য
  • মাতৃভাষা আন্দোলন ও সিলেট
  • ভাষাশহীদদের প্রতি কৃতজ্ঞতা : ইসলামি দৃষ্টিকোণ
  • দেশে বিদেশে গৌরবের শহীদ মিনার
  • বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষা চর্চা
  • মানুষ জন্মগত বিজয়ী, পরাজয় মানে না
  • মুক্তিযুদ্ধ ও নদী
  • আমাদের মুক্তিযুদ্ধ
  • তিনি আজও আমার সব কর্মের প্রেরণা
  • রাগীব আলীর উন্নয়নের পৃষ্ঠপোষক
  • একজন বিচক্ষণ সম্পাদক আমার মা
  • একজন মহীয়সী নারী
  • রাবেয়া খাতুন চৌধুরী ও সিলেটের ডাক
  • অনন্যা
  • স্মৃতিতে ভাস্বর রাবেয়া খাতুন চৌধুরী
  • বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী এক মহীয়সী নারীর কথা
  • তিনি বেগম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী
  • Image

    Developed by:Sparkle IT