ইতিহাস ও ঐতিহ্য

বালাগঞ্জের প্রাচীন জনপদ শিওরখাল গ্রাম

মোহাম্মদ জুয়েল প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০৩-২০২০ ইং ০০:০৯:৪৮ | সংবাদটি ৪৪৬ বার পঠিত
Image

বালাগঞ্জ উপজেলার দেওয়ান বাজার ইউনিয়নের একটি প্রাচীন জনপদ শিওরখাল গ্রাম। মধ্যপ্রাচ্যের ইয়েমেন থেকে আগত আধ্যাত্মিক মহা পুরুষ হযরত শাহ্ জালাল (রহ.) ও হযরত শাহ্ পরান (রহ.) ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে সিলেট আগমন করেন। হযরত শাহ্ জালাল (রহ.) এর সঙ্গীঁ ৩৬০ জন ওলী আউলিয়া অনেকের মাজার বালাগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামে রয়েছে। বিভিন্ন গ্রন্থে ও তথ্যে জানা যায় ৩৬০ আউলিয়ার সফরসঙ্গীঁ হযরত কালা শাহ্ (রহ.) উরফে শাহ্ ছহইয়েল আহমেদ (রহ.) মাজার শিওরখাল গ্রামে রয়েছে। এছাড়া এ গ্রামে আওলিয়া, দরবেশ তথা আধ্যাত্মিক ক্ষমতা সম্পন্ন পুরুষ হযরত পিয়ার মনি শাহ্ (রহ.), হযরত চাঁন্দ ঠাকুর (রহ.), হযরত ফুল মিয়া (রহ.) ও হযরত জাকির শাহের মাজার রয়েছে। তাঁদের দোয়ায় এলাকার অনেক জ্ঞানী-গুণীর জন্ম হয়েছে। আয়তন ও জনসংখ্যার দিক দিয়ে শিওরখাল একটি বৃহৎ গ্রাম। গ্রামের অনেক কৃতি সন্তানেরা জন্মগ্রহণ করেছেন। সমাজে যারা স্বীয় কর্মগুণে নিজের আসনটি মানুষের বুকে অঙ্কিত করতে পারেন তাঁরা প্রকৃত গুণী। তাঁরা নিজ নিজ যোগ্যতা, মেধা ও প্রতিভার দ্বারা দেশ জাতির কল্যাণে ও জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। এলাকার জনসাধারণ তাঁদের নিয়ে গর্ব করে থাকেন এবং তাঁদের অবদানের কথা শ্রদ্ধার সহিত স্মরণ করেন। এ লেখার মাধ্যমে এলাকার জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিদের সম্পর্কে আগামী প্রজন্মের নিকট সংক্ষিপ্ত আকারে তোলে ধরা। তাঁরা হচ্ছেন; মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরীর বীর বিক্রম। তিনি ১৯৪৩ খ্রিঃ শিওরখাল গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা প্রয়াত নুরুল হোসেন চৌধুরী। তিনি ১৯৬২ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। ১৯৬৪ খ্রিঃ তিনি প্রথম দশজনের মধ্য থেকে কমিশন লাভ করেন এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পদাতিক ডিভিশনে যোগ দেন। পাক-ভারত যুদ্ধে অংশ নিয়ে ১৯৬৫ সালে তিনি অপারেশন এ্যান্ড সার্ভিস পদক লাভ করেন। ১৯৬৯-৭০ সালে মইনুল হোসেন চৌধুরী ঢাকার জিওসি ও সাময়িক আইন প্রশাসকের এডিসি ছিলেন। ১৯৭০ সালে তিনি মেজর পদে উন্নীত হন। ১৯৭১ সালে জয়দেবপুর সেনানিবাস থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং আগস্ট মাস পর্যন্ত দেশের ভিতরে একটি নিয়মিত ও অনিয়মিত বাহিনীর নেতৃত্ব দেন। ১৬ ডিসেম্বর মইনুল হোসেন চৌধুরী ৯০০ সৈন্যের একটি ব্যাটালিয়ন নিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করেন। সরাসরি মাঠ থেকে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য ‘বীর বিক্রম’ উপাধিতে ভূষিত হন। তিনি ১৯৭৮ সালে ব্রিগেডিয়ার হন এবং ১৯৮০ সালে পদোন্নতি পেয়ে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে সেনাবাহিনীর সবচেয়ে কম বয়সে মেজর জেনারেল হন। ১৯৮২ সালে তিনি ফিলিপাইনে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত হন। ঐ বৎসরের আগস্ট থেকে ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর থাইল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হন। এছাড়া তিনি অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ফিজির রাষ্ট্রদূত ছিলেন। বালাগঞ্জের এ কৃতি সন্তান ২০০১ খ্রিঃ ১৬ জুলাই নির্দলীয় তত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্ঠা হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং তিনি শিল্প, বাণিজ্য, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য’ ও স্বাধীনতার প্রথম দশকসহ অনেক মূল্যবান গ্রন্থের লেখক। ২০০৭ সালে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক এয়ারপোর্ট রোড থেকে বনানী গোরস্থানের সামন দিয়ে কামাল আতার্তুক এ্যাভিনিউয়ের সাথে সংযুক্ত সড়কটি তাঁর নামে ‘বীর বিক্রম মইনুল হোসেন চৌধুরী সড়ক’ নামকরণ করেছে। একজন খাঁটি দেশ প্রেমিক মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরী ১০ অক্টোবর ২০১০ খ্রিঃ ইহকাল ত্যাগ করেন। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী, তিনি ১৩ ডিসেম্বর ১৯৪৮ সালে এ গ্রামের এক সম্ভ্রান্তÍ পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম গোলাম মোস্তফা চৌধুরী। তিনি ১৯৬৪ সালে দেওয়ান আব্দুর রহিম হাই স্কুল এন্ড কলেজ থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। পরবর্তীতে সিলেট ও ঢাকার বিভিন্ন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন। লেখাপড়া শেষ করে সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতিতে আইন পেশায় যোগদান করেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আইন পেশায় যোগদান করেন। ১৯৯১ সালে সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক নির্বাচিত হন। তিনি ৩রা জুলাই ২০০১ খ্রিঃ সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন। ২০১৫ খ্রিঃ ডিসেম্বর মাসে হাই কোর্টের বিচারক হতে অবসরে চলে যান। তাঁর ছেলে ব্যরিস্টার আহমেদ জাকের চৌধুরী ২০০৫ সালে আইন পড়তে লন্ডনে চলে যান। ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধীনে কুইন মেরি কলেজ থেকে আইন পড়া শেষ করেন। ২০০৯ সালে অক্টোবর মাসে বার-এট-ল ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁরই স্ত্রী ব্যরিস্টার নিলুফার চৌধুরী ইংল্যান্ড থেকে ব্যারিস্টার ডিগ্রি অর্জন করে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টে আইন পেশায় জড়িত আছেন। মো. গোলাম কাইয়ূম চৌধুরী ০১.০৩.১৯৩০ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি একজন শিক্ষা দরদী, দানশীল, উদার হৃদয়ের ব্যক্তি ছিলেন। শিক্ষার প্রতি যে, অনুরাগ এবং মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) প্রতি ভালোবাসার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা ইতিহাসে সত্যিই বিরল। তাঁর পিতা গোলাম সাজিদ চৌধুরী, মাতা মহসুদা খাতুন চৌধুরী। দেশের অন্যতম শীর্ষ আলেমে দ্বীন, বাংলাদেশ কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের প্রাক্তন চেয়ারম্যান, জামেয়া ইসলামীয়া হোসাইনিয়া গহরপুর মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা হাফিজ মাওলানা নুর উদ্দিন আহমদের অনুপ্রেরণায় তাঁরই কলিজার টুকরা প্রিয় কন্যার স্মৃতি রক্ষার্থে ০৫.০৬.১৯৯৮ খ্রিঃ ৪৫ শতক নিজস্ব ভূমির উপর খায়রুন্নেছা দারুসসুন্নাহ ইসলামীয়া আরাবিয়া মহিলা মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এ মাদরাসায় ১ম থেকে ১০ শ্রেণি পর্যন্ত ২২০ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। ১৩ জন শিক্ষক শিক্ষিকা পাঠদান করান। সৌন্দর্য মন্ডিত দ্বিতল ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম চলে। মুহতামীম মাওলানা ফয়জুর রহমান জানান, শিক্ষক মন্ডলীর বেতন, কর্মচারীর সকল ব্যয়ভার বহনের জন্য মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ্ব গোলাম কাইউম চৌধুরী সিলেট শহরের এয়ারপোর্ট রোডে একটি হাউজিং প্রকল্প করে গেছেন। হাউজিং প্রকল্পের আয়ে মাদরাসার শিক্ষকমন্ডলী, কর্মচারীসহ সকল ব্যয়ভার বহন করা হয়। এ মহান ব্যক্তি গোলাম কাইউম চৌধুরী (নেছাওর মিয়া) ২০০৭ সালের ১১ মার্চ ইহকাল ত্যাগ করেন। এছাড়া আরজাদ হাসান চৌধুরী, গোলাম ছোবহান চৌধুরী, গোলাম নুরানী চৌধুরী, গৌছুল হাসান চৌধুরী গ্রামের বিশিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব ছিলেন, মেজর (অব.) মাহবুবুল আলম চৌধুরী, তিনি সপরিবারে ইংল্যান্ডে বসবাস করেন। জি.এ চৌধুরী, প্রাক্তন চেয়ারম্যান পানি উন্নয়ন বোর্ড। প্রয়াত গোলাম মোস্তফা চৌধুরী, একজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি শিওরখাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভূমি দাতা। অ্যাডভোকেট গোলাম রাজ্জাক চৌধুরী (জুবের) তিনি আইন পেশায় নিয়োজিত। সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির প্রাক্তন যুগ্ম সম্পাদক, আন্তর্জাতিক সেবাধর্মী সংগঠন Apex Club of Bishwanath এর অতীত প্রেসিডেন্ট। প্রয়াত আমিরখান প্রাক্তন মেম্বার, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ছিলেন। মনোহর খান, সমাজকর্মী। স্থানীয় ইউনিয়ন বিএনপি’র প্রাপ্তন সভাপতি। বাহরাম খান একজন দানশীল ও সমাজকর্মী। মো. ছমির আলী একজন সংগঠক। আসলাম খান প্রাক্তন কৃতি ফুটবলার। এস.এম হেলাল স্থানীয় সাংবাদিক। সিলেটের একটি দৈনিক পত্রিকার বালাগঞ্জ উপজেলা প্রতিনিধি। তাঁরা এলাকার উন্নয়নে বিভিন্নভাবে সহযোগীতা করেন। পরিশেষে বলতে হয় দেশ, জাতি বা স্বীয় জনপদের ইতিহাস না জানলে কোনো মানুষের পক্ষে সত্যিকারভাবে নিজেকে চেনা সম্ভব নয়। এ প্রবন্ধে প্রদত্ত ব্যক্তিগণের তালিকাটি স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়; অতএব বাদ পড়া বা ভুল থাকাটা প্রত্যাশিত ও স্বাভাবিক। এছাড়া প্রয়াত সুলেমান খান, একজন সৎ, স্বজন সমাজসেবী ছিলেন। তিনি ৩নং দেওয়ান বাজার ইউনিয়নের প্রাক্তন মেম্বার। শাহ্ জামাল দারুস সুন্নাহ নুরীয়া ইসলামীয়া মাদরাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি ছিলেন। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্ঠা ও উদ্যোগে শিওরখাল-জামালপুর মৌজার মধ্যবর্তী বড়ভাগা নদীর উপর ব্রিজ ও সংযোগ সড়ক নির্মাণ হয়েছে। কিন্তু সংযোগ রাস্তা এখনও পাকা না হওয়ার ফলে এ অঞ্চলের মানুষ অনেক দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। ২৫০-৩০০ মিটার সংযোগ রাস্তা পাকাকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছি। আশা রাখি আগামী প্রজন্ম শিওরখাল গ্রামের ইতিহাস ঐতিহ্যকে অক্ষুন্ন রেখে এ গ্রামের ঐতিহ্য আরো সুদৃঢ় করবে।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বালাগঞ্জের বাতিঘর বাংলাবাজার উচ্চ বিদ্যালয়
  • বঙ্গবন্ধু ও গান্ধীজী
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক ছিলেন ‘মেশিনম্যান’
  • একটি যুদ্ধ : একটি শতাব্দী
  • বালাগঞ্জের প্রাচীন জনপদ শিওরখাল গ্রাম
  • ভাটিপাড়া
  • সময়ের সোচ্চার স্বর সোমেন চন্দ
  • বঙ্গবন্ধুর সিলেট সফর ও কিছু কথা
  • বায়ান্নতেই লিখেছিলেন ‘ঢাকাই কারবালা’
  • জীবনের শেষক্ষণে অর্থ-স্বর্ণ সবই জড়পদার্থ
  • কমরেড বরুণ রায়
  • বঙ্গবন্ধু ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
  • নারী ভাষাসৈনিকদের কথা
  • মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবীর ওসমানী
  • ভাটির বাতিঘর সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ
  • মাওয়ের লংমার্চের ৪ বছর পর সিলেটিদের লং মার্চ
  • শহীদ মিনারের ইতিকথা
  • সিলেটের লোকসংগীত : ধামাইল
  • পর্যটক ইবনে বতুতার কথা
  • বই এল কোথা থেকে?
  • Image

    Developed by:Sparkle IT