শিশু মেলা

বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা

অনন্ত পাল প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০৩-২০২০ ইং ০০:৩৫:৪৩ | সংবাদটি ৮২২ বার পঠিত
Image

আজ আব্দুল্লাহর মন খারাপ। সন্ধ্যায় আব্বু অফিস থেকে ফিরে এসে দেখলেন সে এখনো পড়তে বসেনি। আব্বু বললেন কী রে আব্দুল্লাহ তুই এখনো পড়তে বসলে না যে? আব্দুল্লাহ বললো আব্বু আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি, তুমি এলেই পড়তে বসবো। আব্বু বললেন কেন, আমি না এলে কী তুই পড়তে বসবে না?
আব্দুল্লাহ বললো-কেন পড়বো না আব্বু, তবে আজ একটি জিনিস না জেনে পড়তে যেমন একদম ভাল্লাগছে না। আব্দুল্লাহর কথায় আব্বু থমকে গেলেন। মনে মনে ভাবলেন আব্দুল্লাহ তো এমন করে আর কোনদিন কিছু বলেনি। আচ্ছা দেখা যাক কি বলে। বললেন-বল তো আব্দুল্লাহ তুমি কী জানতে চাও?
আব্দুল্লাহ আব্বুর গলায় জড়িয়ে ধরে বললো- আচ্ছা আব্বু ঐ যে ‘বঙ্গমাতা’ উনি কার কী লাগেন, উনার বাড়ি কোথায়? আব্বু হেসে বললেন-আচ্ছা, তুই ‘বঙ্গমাতা’ কে চিনিস না? আব্দুল্লাহ বললো-শুধু নাম তো শুনেছি কিন্তু কার কী লাগেন তা তো জানি না। আব্বু বললেন-বঙ্গমাতা হলেন হাসুর মা। হাসু বলতেই আব্দুল্লাহ হেসে বললো-তাহলে আব্বু, আমার যে হাসু চাচা উনার আম্মা না কী?
আব্বু বললেন-না রে পাগল, তোর হাসু চাচার আম্মা না। আমাদের যে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা উনাকে বঙ্গবন্ধু আদর করে ‘হাসু’ নামে ডাকতেন। হাসু থেকে হাসিনা হয়েছে বুঝতে পারছিস? আব্দুল্লাহ ফোকলাদাঁতে হেসে বললো-তাহলে আব্বু প্রধানমন্ত্রীর নাম হাসু ছিল! হ্যাঁরে হ্যাঁ। আর বঙ্গমাতা হলেন বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী, অর্থাৎ শেখ মুজিবের সহধর্মিনী। হাসিনার মা। বঙ্গমাতার ডাক নাম ছিল রেণু। রেণুর জন্ম ১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে। পিতার নাম শেখ জহুরুল হক এবং মাতার নাম হোসনে আরা বেগম। আর রেণুর আসল নাম হলো শেখ ফজিলাতুননেছা।
মাত্র তিন বছর বয়সে পিতা এবং পাঁচ বছর বয়সে মাতাকে হারান। সম্পর্কে চাচাতো ভাই শেখ মুজিবের সাথে ১৯৩৮ সালে রেণুর বিবাহ হয়। তখন থেকে রেণুর শাশুড়ি সায়েরা খাতুন তাঁকে নিজের মেয়ের মতো মাতৃস্নেহে লালন পালন করে বড় করে তুলেন। আব্বুর কথা শুনে আব্দুল্লাহ নীরবে কান পেতে শুনতে লাগলো। বললো-তার পরে কী হলো আব্বু?
আব্বু বললেন-তারপর রেণু একদিন শাশুড়ির কাছে থেকে বড় হয়ে তোমার মায়ের মতো তিনিও মা হলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ছাত্র রাজনীতি করতে গিয়ে সব সময় বাহিরে বাহিরে থাকতে হতো। সংসারের প্রতি তেমন সময় দিতে পারতেন না। রাজনীতি করতে গিয়ে অনেক সময় অতিরিক্ত টাকার প্রয়োজন হতো তখন বঙ্গমাতা পিতার সম্পত্তির অর্জিত টাকা থেকে বঙ্গবন্ধুর নিকট প্রেরণ করতেন।
আব্দুল্লাহ বললো-আচ্ছা আব্বু, বঙ্গমাতা যে, বঙ্গবন্ধুর নিকট টাকা পাঠাতেন তাতে তাঁর আব্বা কী কিছু বলতেন না? আব্বু বললেন-না রে, তাঁর আব্বা তো সবসময় তাঁকে সাহস যুগিয়ে দিয়েছিল, এই জন্য তো বঙ্গবন্ধু আজ এতো বড় হতে পেরেছেন।
বঙ্গবন্ধু রাজনীতি করতে গিয়ে জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সময় জেলখানায় কাটিয়েছেন। বছরের পর বছর জেলখানায় থাকতে হতো। তাঁর অবর্তমানে বঙ্গমাতা একজন সাধারণ গৃহিণী হয়েও মামলা পরিচালনা, দলকে সংগঠিত করা, আন্দোলন পরিচালনায় পরামর্শ দেয়া সহ প্রতিটি কাজ তিনি দক্ষতার সহিত শ্রেষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন। আব্দুল্লাহ বললো-আব্বু একজন নারী হয়ে এতো কিছু করলেন কিভাবে-ভয় পাননি? আব্বু তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন-করতে পেরেছিলেন বলেই তো আজ তিনি বঙ্গমাতা।
আব্দুল্লাহ বললো তারপর কী হলো আব্বু? তারপর বঙ্গবন্ধু ১৯৫৪ সালে টুঙ্গিপাড়া থেকে পরিবার নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকায় এসে আবার যখন জেলে ঢুকেন তখন ১৯৫৯ সালে জেলখানা থেকে লেখা প্রিয়তমা স্ত্রী ফজিলাতুননেছাকে লেখা একটি চিঠি হুবহু তুলে ধরছি-
ঢাকা জেল
১৬-৪-৫৯
রেণু,
আমার ভালোবাসা নিও। ঈদের পরে আমার সাথে দেখা করতে এসেছো। ছেলেমেয়েদের নিয়ে আস নাই। কারণ তুমি ঈদ কর নাই। ছেলেমেয়েরাও করে নাই। খুবই অন্যায় করেছো। ছেলেমেয়েরা ঈদে একটু আনন্দ করতে চায়, কারণ সকলেই করে। তুমি বুঝতে পার ওরা কতো দুঃখ পেয়েছে। আব্বা ও আম্মা শুনলে খুবই রাগ করবেন। আগামী দেখার সময় ওদের সকলকে নিয়ে আসিও। কেন যে চিন্তা কর বুঝি না। আমার যে কবে মুক্তি হবে তার কোন ঠিক নাই। তোমার একমাত্র কাজ হবে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শিখানো। টাকার দরকার হলে আব্বাকে লিখিও। কিছু টাকা সাথে সাথে দিতে পারবেন। হাছিনাকে মন দিয়ে পড়তে বলিও। কামালের স্বাস্থ্য মোটেই ভালো হচ্ছে না। ওকে নিয়ম মত খেতে বলিও। জামাল যেন মন দিয়ে পড়ে আর ছবি আঁকে। এবার একটা ছবি এঁকে যেন নিয়ে আসে আমি দেখব। রেহানা খুব দুষ্ট ওকে কিছুদিন পর স্কুলে দিয়ে দিও জামালের সাথে। যদি সময় পাও নিজেও একটু লেখাপড়া করিও। একাকী থাকতে একটু কষ্ট প্রথমে হতো। এখন অভ্যাস হয়ে গেছে কোন চিন্তা নাই। বসে বসে বই পড়ি। তোমার শরীরের প্রতি যত্ন নিও।
ইতি-
তোমার মুজিব।
আব্দুল্লাহ শেখ মুজিবের লেখা চিঠি পড়া শুনে অশ্রুসিক্ত নয়নে আব্বাকে বললো- আব্বা, তাহলে শেখ মুজিব কী আর কোন দিন জেল থেকে বের হননি? আব্বু বললেন-হ্যাঁ বের হয়েছেন, আবার ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালো রাতে পাক হানাদার বন্দি করে পাকিস্তানে নিয়ে যায়। ২৬শে মার্চ ১৯৭১ (তাঁর লেখা পাঠ) কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ‘স্বাধীনতা’ পত্রটি ঘোষণা করলে দেশের মানুষ যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে এবং দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ করে ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ বিজয় অর্জন করে।
তারপর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর স্বপরিবারকে ঘাতকেরা নির্মমভাবে হত্যা করে। শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা দেশের বাহিরে থাকায় ভাগ্যচক্রে বেঁচে যান। শেখ হাসিনা দেশে ফিরে বাবার ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে আত্মজীবনীতে তাঁর নামের পাশে ‘বঙ্গমাতা’ উপাধি পান বুঝলে?

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT