উপ সম্পাদকীয়

বঙ্গবন্ধু ও আমাদের শিশুরা

শাহজাহান কিবরিয়া প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০৩-২০২০ ইং ০০:৩৬:৫২ | সংবাদটি ৫৫ বার পঠিত

বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মনীষীদের জীবনী পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, চরিত্রের কতগুলো বৈশিষ্ট্য তাদের মহামানবে পরিণত করেছে। এই বিশেষ দিকগুলোর কয়েকটা হচ্ছে:নির্যাতিত ও অবহেলিত মানুষের প্রতি তাদের অসীম মমত্ববোধ সব রকম অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হওয়া এবং মহৎ কিছু করার প্রচণ্ড জেদ। চরিত্রের এই তিনটি দিক আমরা দেখতে পাই বাংলার তিন মনীষীর মধ্যে। এদের এক জন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, দ্বিতীয় জন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং তৃতীয় জন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলার হিন্দু সমাজে যুগ যুগ ধরে নির্যাতিত ও বঞ্চিত বিধবাদের দুঃখ-কষ্ট বিদ্যাসাগরকে দারুণভাবে আলোচিত করেছিল এবং বঞ্চনার হাত থেকে তাদের রক্ষা করার জন্য একটি বড়ো জেদ তাকে পেয়ে বসেছিল। এজন্য তাদের বহু বাধাবিপত্তি এবং লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছিল। কিন্তু কোনো বাধাই বিদ্যাসাগরকে লক্ষ্যচুত করতে পারেনি। বিধবাদের তিনি মানুষের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কোনো অন্যায়ের কাছে তিনি মাথা নত করেননি। অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি। এজন্য বিদ্যাসাগর আজো সবার নমস্য।
তার সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন পর্যালোচনা করলে দেখতে পাই তিনি একদিকে যেমন ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও পরিশ্রমী এবং অপরদিকে তিনি কখনো অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি। অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। ঢাকার মাটিতে যেদিন পাকিস্তান রাষ্ট্রের জনক মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা বলে ঘোষণা করেছিলেন, সেদিনই বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর আসল চেহারা দেখতে পেয়েছিলেন। বাঙালি জাতি যে দ্বিতীয়বারের মতো পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হতে যাচ্ছে- এই উপলব্ধি তার হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে তিনি কীভাবে অত্যন্ত স্থির মস্তিষ্কে বাঙালির সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে অগ্রসর হচ্ছিলেন। কোনো রকম হঠকারিতা তার মধ্যে ছিল না। নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার ব্যাপারে তিনি অনড় ছিলেন। রাজনৈতিক দলকে সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করেছিলেন। পাকিস্তানের রাজনীতিতে মন্ত্রিত্ব ত্যাগের ঘটনা বিরল। দীর্ঘ ১৪ বছর কারাগারে জীবন কাটিয়েছেন। ভাষা আন্দোলনের সময় কারাগারে বসে আপসহীন সংগ্রামের নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে তার মত ব্যক্ত করেছিলেন।
১৯৬৪ সালে দাঙ্গা বন্ধ করার জন্য বঙ্গবন্ধু ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ আহ্বান জানিয়েছিলেন। ছয়দফা দাবির আন্দোলনের মাধ্যমে প্রথমে স্বাধিকার এবং পরে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। ধর্মের প্রগাঢ় বিশ্বাসী হয়েও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। আজন্ম সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ থাকার কারণে মানুষের মুক্তির জন্য তিনি শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং তাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য তিনি নিজ দল আওয়ামী লীগের অবলুপ্তি ঘটিয়ে গঠন করে ছিলেন নতুন রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ। যাকে সংক্ষেপে বলা হয় ‘বাকশাল’।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু বুঝেছিলেন, দেশের আগামী দিনের নাগরিক আজকের শিশুদের স্বার্থ সংরক্ষণ করা দরকার। আগামী দিনে তারাই জাতির নেতৃত্ব দেবে। সুতরাং তাদের আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা হবে প্রথম এবং প্রধান কাজ। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত এ দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও রাজনৈকিতক আন্দোলনে আমাদের শিশু-কিশোররাও অংশগ্রহণ করেছিল। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে দশম শ্রেণির ছাত্র মতিউর রহমান মল্লিক বীরের মতো শহিদ হয়েছিলেন। আরো অনেক শিশু-কিশোরের অপূর্ব আত্মত্যাগের খবর আমরা জানি না। তাদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল এই সব শিশু-কিশোরদের সার্বিক মুক্তি ও উন্নয়নের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে শিশু আইন প্রণয়ন করেছিলেন।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর স্বাধীনতার শত্রুরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করার পর শিশুদের মন থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরব গাথা মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধের বিকৃত ইতিহাস সংযোজন করছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে শিশুমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছিল। স্বাধীনতাবিরোধীদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসিয়ে জাতিকে কলঙ্কিত করেছে। একটি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন, সর্বশ্রেষ্ট অহঙ্কারকে নস্যাত্ করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছিল।
বিলম্বে হলেও স্বাধীনতার সপক্ষ শক্তি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু ও জেলে জাতীয় চার নেতার হত্যাকারীদের প্রাণদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদেরও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দেশ বিচারহীনতার কলঙ্ক থেকে মুক্ত হয়েছে। বর্তমানে আমাদের হূত গৌরব পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে। দেশ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে আন্তর্জাতিকক স্বীকৃতি লাভ করেছে। আমাদের শিশুরা যে একটি গর্বিত জাতির বংশধর, এটা জানার ভেতর দিয়ে তারা দেশকে ভালোবাসতে শিখবে, দেশের মানুষকে ভালোবাসবে, দেশ গড়ার কাজে অনুপ্রেরণা পাবে। ইতিহাস-সচেতন শিশুদের কাছেই জাতির প্রত্যাশা অনেক, অনেক।
লেখক : শিশুসাহিত্যিক।

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ক্যাস্পিয়ান সাগরের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব
  • নিজগৃহে আমাদের এই উদ্বাস্তু জীবন
  • বেকারত্ব ও যুবসমাজ
  • আমার হাতেই আমার সুরক্ষা
  • কুড়িগ্রামের সুলতানা সরেবোর
  • স্মার্টফোনের আনস্মার্ট ব্যবহার
  • কোয়ারেন্টাইন না বলে ঘরবন্দি, একঘরে, ছোঁয়াচে বলুন
  • বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের বন্ধু
  • করোনা ভাইরাস ও করুণ পরিস্থিতি
  • পানির অপচয় রোধ করতেই হবে
  • বিশ্বনবী (সা) এর মিরাজ
  • বিদ্যুৎসাশ্রয় এবং আমাদের করণীয়
  • বেঁচে থাকি প্রাণশক্তির জোরে
  • রক্ত দিন জীবন বাঁচান
  • নদীকে না দেখলে নদীও আমাদের দেখবে না
  • করোনা ভাইরাসে থমকে গেল পৃথিবী
  • করোনা ভাইরাসে আমাদের করণীয়
  • বঙ্গবন্ধুর মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন
  • বঙ্গবন্ধু ও আমাদের শিশুরা
  • করোনা ভাইরাস ও দেশের অর্থনীতি
  • Developed by: Sparkle IT