উপ সম্পাদকীয়

নদীকে না দেখলে নদীও আমাদের দেখবে না

আবু আফজাল সালেহ প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৩-২০২০ ইং ২৩:২৫:১৬ | সংবাদটি ১০১ বার পঠিত

একটি জাতীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে সাম্প্রতিক দুটি গবেষণার সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশে গত ৫৭ বছরে ১৫৮টি নদী শুকিয়ে গেছে। ১৯৬৩ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত দেশে কত কমল সে সংক্রান্ত একটি সমীক্ষা ২০১০ সালে প্রকাশ করে বাংলাদেশ দুর্যোগ ফোরাম। সেখানে বলা হয়, দেশের ১১৫টি নদ-নদী শুকিয়ে মৃতপ্রায়। অন্যদিকে নদী, পানি প্রকৃতি নিয়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন ‘উত্তরণ’-র সমীক্ষা অনুযায়ী, গত ২০ বছরে (২০০০ থেকে ২০২০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত) দেশে ৪৩টি নদী শুকিয়ে গেছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বেতনাসহ অনেক নদী এখন শুকিয়ে বসতি এলাকায় পরিণত হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হচ্ছে, মূলত অপরিকল্পিতভাবে উপকূলীয় বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও নদীতে নানা অবকাঠামো নির্মাণ ও দখলের কারণে নদীর মৃত্যু ঠেকানো যাচ্ছে না।
চীনে একটা প্রবাদ আছে এ রকম ‘নদীকে না দেখলে, নদীও তোমায় দেখবে না। আর নদী দেখা বন্ধ করলেই... সব শেষ!’ নদী হচ্ছে সভ্যতার ভরকেন্দ্র। নদীকে কেন্দ্র করেই জনপদ-শহর গড়ে উঠেছে। সভ্যতাগুলো গড়ে ওঠার পেছনে নদীর অবদানই সবচেয়ে বেশি। যেমন মিসরকে ‘নীল নদের দান’ বলা হয়, তেমনি ভারতীয় সভ্যতার প্রাণ গঙ্গা, কিংবা প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতার প্রাণ ছিল সিন্ধু নদ।
আমরা প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশকেও বলি ‘নদীমাতৃক বাংলাদেশ’। কিন্তু দূষণ আর দখলে আক্রান্ত বাংলাদেশের প্রায় সব নদী। বিশেষ করে রাজধানী বা বড় শহরগুলোর নদীগুলোর অবস্থা শোচনীয়। আইন আছে, বাস্তবায়ন নেই। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালীদের ভয়ে সাক্ষ্য দেন না কেউ। বলা যায়, জনগণের সহায়তা নেই। এ কারণে রূপসা থেকে সুরমা, নাফ-হালদা-পুনর্ভবা, করতোয়া থেকে তিতাস-কর্ণফুলী সবই দূষণ আর দখলের শিকার। আর রাজধানীকেন্দ্রিক নদীগুলো তো এক একটা বিষফোঁড়া হয়ে গেছে।
বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যা-তুরাগের পানি বিষাক্ত, নীলচে-কালো হয়ে গেছে। অথচ নদীগুলো সম্ভাবনাময় পর্যটন খাতকে বিকশিত করতে পারত। এখনো ব্যবস্থা নিলে পর্যটন খাতকে বিকশিত করার পাশাপাশি পরিবেশ দূষণের হাত থেকে রেহাই দেবে। এজন্য আইনের যথাযথ প্রয়োগ, সময়োপযোগী আইন-বিধিমালা প্রণয়ন করে এবং ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করে আমরা এগিয়ে যেতে পারি। বিবিসির এক সমীক্ষায় দেখা যে, বাংলাদেশের ৪৩৫টি নদী এখন হুমকির মধ্যে। এর মধ্য ৫০-৮০টি নদী বিপন্ন। তবে আশার কথা সরকার কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে। আদালত থেকে দূষণ ও নদী দখল বন্ধের ব্যাপারে নির্দেশনাও রয়েছে। ২০০৯ সালে হাইকোর্টের রায়ে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরী নদীর অপমৃত্যু রোধ করে ঢাকা মহানগরকে রক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। নদীর মধ্যে অবৈধ স্থাপনা অপসারণের পাশাপাশি জরিপ কাজের পর সীমানা নির্ধারণ করে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করার নির্দেশও ছিল। কিন্তু সবক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্ত/কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়নি।
অবৈধ দখল আর অপরিকল্পিত নদীশাসনের ফলে ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে নদী, হারাচ্ছে নাব্য। অপরিকল্পিত ড্রেজিং বা একেবারেই ড্রেজিং না করা, আর ইচ্ছেমতো যেখানে-সেখানে বাঁধ নির্মাণের কারণে নদী মৃত্যুর মুখে পড়ছে। কপোতাক্ষ, ইছামতী, ভৈরব, মুক্তেশ্বরী, বেতনা, নরসুন্দা, ফুলেশ্বরী, ধনু, রূপসা, ডাকি, শিবসাসহ আরও কত নদ-নদী পরিণত হয়েছে সরু খালে! এমনকি অপরিকল্পিত রাস্তা ও কালভার্ট নির্মাণের কারণেও নদী ভরাট হয়। মূলত দীর্ঘ সময় অবহেলা করার কারণেই এ দেশে নদীমৃত্যুর হার বাড়ছে। কোনো-কোনোটির অবস্থা এত খারাপ যে, চেষ্টা করেও নাব্য ফিরিয়ে আনা যাচ্ছে না।
ঢাকা ঘিরে থাকা চার নদী শীতলক্ষ্যা, তুরাগ, বালু ও বুড়িগঙ্গা প্রায় একই দশায় পড়েছে। এগুলোতে পানির চেয়ে বর্জ্যই বেশি। মাত্রাতিরিক্ত দূষণে এ নদীগুলোর পানি ও রং হারিয়ে ফেলেছে। বর্জ্যরে মিশ্রণে নদীগুলোর পানি কালো, নীল বা লাল হয়ে গেছে। এ চার নদীকে সরকার ‘প্রতিবেশ সংকটাপন্ন’ ঘোষণা করেছে। আর বিশ্বব্যাংক বুড়িগঙ্গাকে অভিহিত করেছে ‘মরা নদী’ নামে। চামড়া শিল্পের বর্জ্য বুড়িগঙ্গা নদীকে দূষিত করে চলেছে প্রতিনিয়ত। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যাসহ ঢাকার চারপাশের নদীগুলো এতটাই দূষিত যে, এসব নদীর পানি এখন শোধনেরও অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। নদীগুলোতে একসময় প্রচুর মাছ ছিল। অথচ এখন শুধু মাছ নয়, কোনো জলজপ্রাণীই টিকে থাকতে পারছে না। বিপুল জনসংখ্যা অধ্যুষিত ঢাকা শহরের পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা না থাকার কারণে প্রতিদিন প্রায় ১৫ লাখ ঘনমিটারেরও বেশি বর্জ্যরে প্রায় সবটাই উন্মুক্ত খাল, নদী, নর্দমা বেয়ে অপরিশোধিত অবস্থায় বুড়িগঙ্গায় এসে পড়ছে। টঙ্গী, বাড্ডা প্রভৃতি অঞ্চলের বর্জ্য চলে যাচ্ছে বালু ও তুরাগে। বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ করতে হবে আরও। শুধু সায়েদাবাদেরটাতে কাজ হবে না।
বিআইডব্লিউটিএর তথ্যানুসারে, ১৯৭১ সালে এ দেশে নদী ছিল ২৪,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ, যা ১৯৮৪ সালে কমে গিয়ে দাঁড়ায় ৮৪০০ কিলোমিটার। আর বর্তমানে আমরা হারিয়েছি মোট ১৮,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীপথ এবং অবশিষ্ট আছে মাত্র ৬০০০ কিলোমিটার। গবেষকরা মতপ্রকাশ করেছেন এ অবস্থা চলমান থাকলে আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ ‘নদীমাতৃক বাংলাদেশ’ কেবল ইতিহাসের ‘অভিধা’ হয়েই থাকবে। ভারতের যমুনাতেও দূষণের মাত্রা অনেক। এখানেও কার্যত কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। সেখানে একমাত্র আশার দ্বীপ ‘জাতীয় গ্রিন ট্রাইব্যুনাল’। এর প্রধান বিচারপতি স্বতন্ত্র কুমার হুঁশিয়ারি জারি করেছেন, কোনো সংস্থা যদি যমুনায় রাবিশ ফেলে তাহলে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে। এ রকম ব্যবস্থা বাংলাদেশও গ্রহণ করতে পারে। যমুনা ভারতের রাজধানী, রাজস্থান ও হরিয়ানার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত।
ঢাকার চারপাশের চারটি নদী বাঁচাতে ২০০৯ সালের ২৫ জুন হাইকোর্ট ১২ দফা নির্দেশনা দেয়। এর মধ্যে ছিল নদীগুলোর সীমানা নির্ধারণ করে সীমানায় পাকা খুঁটি বসানো, তীরে হাঁটার পথ নির্মাণ ও বনায়ন করা, খনন করা, তীরের জমি জরিপ করা, যমুনার সঙ্গে ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদের পানিপ্রবাহ বাড়ানোর জন্য নিয়মিত খননকাজ পরিচালনা করা
প্রভৃতি নির্দেশনা দেওয়া হয়। এগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হবে। আজ নদী দখল হচ্ছে, কাল হাইকোর্ট থেকে একটি আদেশ দেওয়া হচ্ছে। এর কয়েকদিন নিরিবিলি থাকার পর আবার দখল-দূষণ শুরু হয়ে যায়। এই কানামাছি খেলাটা বন্ধ হওয়া উচিত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার চার নদীর দূষণের জন্য প্রধানত দায়ী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো। এসব প্রতিষ্ঠান ইটিপি (বর্জ্য শোধনাগার) ছাড়াই পরিচালনা চালাচ্ছে। ফলে তার দূষিত তরল বর্জ্য সরাসরি পড়ছে নদীতে। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে বারবার অভিযান চালিয়েও দূষণ বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। অভিযান চালিয়ে নদী দূষণের জন্য দায়ী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে জরিমানাও করা হচ্ছে। পরিবেশ আইনে মামলা করা হলেও ওইসব মামলায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে এমন নজির কম। এ কারণেই শুধু জরিমানা দিয়ে তারা আবার শুরু করছে দূষণের কাজ।
১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮ রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের শহরগুলোয় পরিবেশ দূষণের কারণে বছরে ৬৫০ কোটি ডলারের (৫৪ হাজার কোটি টাকা) ক্ষতি হয়, যা ২০১৫ সালের জিডিপির ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। শহরের পরিবেশ দূষণজনিত কারণে বছরে ৮০ হাজার লোকের মৃত্যু হয়, যা মোট মৃত্যুর ২৮ শতাংশ। অনেকের অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কিন্তু প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ এর কয়েকগুণ বেশি। ঊহযধহপরহম ড়ঢ়ঢ়ড়ৎঃঁহরঃু ভড়ৎ পষবধহ ্ জবংরষরবহঃ এৎড়ঃিয রহ টৎনধহ ইধহমষধফবংয প্রতিবেদনে শহরগুলোয় মানুষের জীবনমানের ক্ষতির কথাই শুধু বলা হয়েছে। দেখা গেছে, ঢাকা নগরীর নদ-নদীগুলোর দূষণের কারণে ঢাকাসহ এর আশপাশের কয়েকটি জেলায় আমরা বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি মাছ থেকে বঞ্চিত হই।
শিল্প, গৃহস্থালি, পয়ঃবর্জ্যে ঢাকার আশপাশের নদীগুলোর দূষণ ভয়াবহ হয়ে উঠছে। নদীরক্ষায় পরিকল্পনা, প্রতিবেদনের কমতি নেই। অভাব শুধু দূষণকারীর শাস্তি নিশ্চিত করা, দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণের। আইনের যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়ন করতে হবে। ঢাকায় প্রতিদিন চার হাজার ২০০ টন কঠিন বর্জ্য তৈরি হয়। সিটি করপোরেশন এর মধ্যে মাত্র ৪৫ শতাংশ সংগ্রহ করে। বাকিটা উন্মুক্ত জায়গায়, নিম্নাঞ্চলে পড়ে থাকে। শেষ গন্তব্য নদী। বর্জ্য নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ওয়েস্ট কনসার্নের হিসাবে, ১০ বছর পর এই বর্জ্যরে পরিমাণ হবে সাড়ে আট হাজার টন। প্রায় অনুচ্চারিত থাকা আরেকটি দূষণের এলাকা হলো ঢাকা সদরঘাট। সদরঘাটের দায়িত্বে থাকা অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সূত্র থেকে জানা যায়, সেখান থেকে প্রতিদিন ৪০ হাজার মানুষ চলাচল করে। সেসব মানুষের বর্জ্য আর শত শত নৌযানের তেল-ধোঁয়াসহ নানা বর্জ্য পড়ে নদীর পানিতেই।
নদী বাঁচালে বেশ কয়েকটা সম্ভাবনাময় সেক্টর জেগে উঠবে। যোগাযোগ, পর্যটন, কৃষি, মৎস্য তো সরাসরিই উপকৃত হবে। আর পরোক্ষভাবে অনেক সেক্টরের অক্সিজেন সরবরাহ হবে। জেলেসহ কয়েকটি সম্প্রদায়ের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। আর দীর্ঘমেয়াদি বা স্বল্পমেয়াদি ক্ষুদ্র/মাঝারি কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ তৈরি হবে।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

শেয়ার করুন

ফেসবুকে সিলেটের ডাক

উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ক্যাস্পিয়ান সাগরের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব
  • নিজগৃহে আমাদের এই উদ্বাস্তু জীবন
  • বেকারত্ব ও যুবসমাজ
  • আমার হাতেই আমার সুরক্ষা
  • কুড়িগ্রামের সুলতানা সরেবোর
  • স্মার্টফোনের আনস্মার্ট ব্যবহার
  • কোয়ারেন্টাইন না বলে ঘরবন্দি, একঘরে, ছোঁয়াচে বলুন
  • বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের বন্ধু
  • করোনা ভাইরাস ও করুণ পরিস্থিতি
  • পানির অপচয় রোধ করতেই হবে
  • বিশ্বনবী (সা) এর মিরাজ
  • বিদ্যুৎসাশ্রয় এবং আমাদের করণীয়
  • বেঁচে থাকি প্রাণশক্তির জোরে
  • রক্ত দিন জীবন বাঁচান
  • নদীকে না দেখলে নদীও আমাদের দেখবে না
  • করোনা ভাইরাসে থমকে গেল পৃথিবী
  • করোনা ভাইরাসে আমাদের করণীয়
  • বঙ্গবন্ধুর মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন
  • বঙ্গবন্ধু ও আমাদের শিশুরা
  • করোনা ভাইরাস ও দেশের অর্থনীতি
  • Developed by: Sparkle IT