ধর্ম ও জীবন

মি’রাজের পটভূমি

মোঃ আব্দুশ শহীদ নেগালী প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৩-২০২০ ইং ২৩:৩১:৩৫ | সংবাদটি ৫১৬ বার পঠিত
Image

মহান আল্লাহতায়ালা তার প্রিয় হাবীব মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে প্রায় দশ হাজার মু’জিযা দান করেছিলেন। তন্মধ্যে শ্রেষ্ঠ মু’জিযার তালিকায় রয়েছে (ক) পবিত্র কোরআন শরীফ (খ) মি’রাজ (গ) চন্দ্রকে মোবারক আঙ্গুলের ইশারায় দ্বিখন্ডিত করণ। আসরে আলোচনা হচ্ছে মি’রাজ সম্পর্কে।
মি’রাজের মত অত্যাশ্চর্য ঘটনাটি ঘটেছিল নবুয়্যত প্রকাশের ১১ বছর ৫ মাস ১৫ দিনের মাথায়। সে সময় হুযুরে আকরাম (সাঃ) এর বয়স ছিল একান্ন বছর পাঁচ মাস পনেরো দিন। পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তিকে পদ্বলিত করে নভোযান বা মহাকাশ যান ছাড়া কোন স্থূলদেহী ব্যক্তি উর্ধ্ব জগতে আরোহণ করা যেভাবে কল্পনাতে আনা যায় না। অনুরূপভাবে রাসূলে করীম (সাঃ) এর স্বশরীরে মি’রাজ গমনকেও অস্বীকার করা যায় না। মি’রাজের ঘটনাটি পয়তাল্লিশ জন শীর্ষস্থানীয় সাহাবায়ে কেরাম থেকে নকল করা হয়েছে। যে সকল কারণে পবিত্র মি’রাজ সংঘটিত হয়েছে, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কতেকটি কারণ নি¤েœ পেশ করলাম।
১। রাসূলে করীম (সাঃ) ইসলামের তাবলীগ করতে গিয়ে সহ্য করতে হয়েছে কত জুলুম, অত্যাচার, আর নির্যাতন। ঘরের বাহিরে সাহস ও সান্ত¦না দেবার মত একমাত্র প্রিয় ব্যক্তি ছিলেন চাচা আবু তালিব। দ্বীনের কাজ শেষে যখন ক্লান্ত হয়ে দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ঘরে তশরীফ আনতেন, হযরত খাদিজা (রাঃ)-কে শোনাতেন মুশরিকদের অবিচারের কথা। তখন হযরত খাদিজা (রাঃ) রাসূল (সাঃ)-কে সান্ত¦না দান করতেন এবং বিভিন্ন ধরণের কথা বলে তাঁর অন্তরে আনন্দ দান করতেন। কিছু দিনের ব্যবধানে একই বছরে যখন মহান আল্লাহতায়ালা রাসূলে করীম (সাঃ)-এর এ দু’জন প্রিয় ব্যক্তিদ্বয়কে দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নিলেন, তখন হযরত (সাঃ) অত্যন্ত ব্যথিত ও মর্মাহত হন। তখন মহান আল্লাহ পাক তাঁর প্রিয় হাবীব (সাঃ)-কে খুশি করতে গিয়ে তাঁর সান্নিধ্য ডেকে নেবার জন্য আয়োজন করলেন মি’রাজের মত একটি আনন্দ ভ্রমণের।
২। মহান আল্লাহতায়ালা হচ্ছেন ‘রাব্বুল আলামীন’। অপর দিকে রাসূলে করীম (সাঃ) হচ্ছেন রাহমাতুল লিল আলামীন। মহান আল্লাহপাকের রাজত্ব যে পর্যন্ত রাসূলে করীম (সাঃ) এর রহমত ও রিসালত সে পর্যন্ত। অতএব রাসূলে করীম (সাঃ)-এর রহমত ও রিসালতের সীমা জরিপ করিয়ে দেবার জন্যই মি’রাজের আয়োজন।
৩। হাদীসে কুদসির মধ্যে এসেছে মহান আল্লাহ পাক বলেন-‘লাওলা-কা-লামা খালাক্বতুল আফলাক’ অর্থ-আপনি নবীকে সৃষ্টি না করলে আমি আসমান সমূহ সহ কিছুই সৃষ্টি করতাম না। এবার যার জন্য সমস্ত সৃষ্টি, তিনি যদি তা-না দেখেন তাহলে এ সৃষ্টির স্বার্থকতা কি? এ জন্য মহান রাব্বে করীম তার প্রিয় রাসূল (সাঃ) কে সাত আসমান সহ তথায় অবস্থানরত নবীগণ ও ফেরেস্তাকুল, জান্নাত, জাহান্নাম, সিদরাতুল মুনতাহা, লা মাকান আরশ-কুরছি, লওহো কলম ইত্যাদি স্বচক্ষে দেখার জন্যই মি’রাজের আয়োজন।
৪। রাসূলে করীম (সাঃ) হচ্ছেন মহান রাব্বুল আলামীনের বন্ধু, রাসূলে করীম (সাঃ)-কে মহান আল্লাহতায়ালা কি পরিমাণ ভালবাসেন, তা প্রত্যক্ষ করা যায় পবিত্র কালামে পাকের দিকে লক্ষ্য করলে। পবিত্র কুরাান শরীফের অসংখ্য অগণিত আয়াতে মহান আল্লাহতায়ালা তার নামের পাশাপাশি তার হাবীব (সাঃ) এর নামকে সংযুক্ত করে রেখেছেন। যেমন ঃ সূরা আল-ইমরানের ৩২ ও ১৩২ নং আয়াতে সূরা নিসার ৬৪ ও ১৩৬ নং আয়াতে, সূরা মায়েদার ৫৫ ও ৫৬ নং আয়াতে, অনুরূপ বহু আয়াতে। এখন কথা হলো বন্ধুর সাথে যদি বন্ধুর সরাসরি সাক্ষাৎ না হয়, তাহলে বন্ধুত্বের পূর্ণতা আসেনা। বিশ্ববাসীর কাছে বন্ধুত্বের প্রমাণ পেশ করার জন্য মি’রাজের আয়োজন।
৫। রাসূলে করীম (সাঃ) সৃষ্টিকুলের মূল হলেও আগমনের দিক দিয়ে সকল নবী-রাসূলগণের শেষে। প্রত্যেক পয়গাম্বরগণের স্বতন্ত্র মর্যাদা রয়েছে, মহান আল্লাহপাকের ইচ্ছা তার প্রিয় হাবীব (সাঃ)-কে সকল পয়গম্বরগণহতে অন্যতম আলাদা একটি মর্যাদায় ভূষিত করবেন। সে মর্যাদাটি হচ্ছে ‘ইমামুল মুরছালিন’ বা রাসূলগণের ইমাম। মি’রাজ রজনীতে এক লক্ষ চব্বিশ হাজার পয়গাম্বরগণকে মিছালি ছুরতে বায়তুল মুক্কাদাসে একত্রিত করে দাঁড় করালেন মুক্তাদিদের সারিতে। অপর দিকে তার প্রিয় হাবীব (সাঃ)-কে হযরত জিবরীলে আমীন নিয়ে গেলেন ইমামতির স্থানে ইমাম হয়ে দু’রাকাত নামায পড়ালেন। সেই সাথে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে লাভ করলেন ইমামুল মুরছালীনের মত মহামূল্যমান উপাধি।
৬। মি’রাজের আরেকটি অন্যতম কারণ হচ্ছে দিদারে এলাহী বা মহান আল্লাহতায়ালার দিদার লাভ। মহান রাব্বুল আলামীনকে দেখার জন্য হযরত মুসা (আঃ)-খোদার দরবারে আবেদন করেছিলেন। তিনির আবেদনের প্রেক্ষিতে হযরত মুসা (আঃ)-কে আল্লাহতায়ালা তুর পাহাড়ে ডেকে নিয়ে তাঁর নূরের সামান্য ঝলক হযরত মুসা (আঃ) এর সামনে ঢেলে দিলেন। হযরত মুসা স্থীর থাকতে পারেন নি। অথচ কি আশ্চর্য্য! মহানবী (সাঃ) কে স্বয়ং আল্লাহতায়ালা তার সান্নিধ্যে ডেকে নিয়ে আরশে আযীমে অবস্থান করান। মহান আল্লাহ পাকের নূর রাসূলে করীম (সাঃ)-কে আচ্ছাদন বা ঢেকে ফেলে, মহান আল্লাহর সাথে মোয়ানাক্বা বা কোলাকুলি করেন তার প্রিয় হাবীব (সাঃ)। তখনও তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। দিদারে এলাহী প্রাপ্তির সাথে তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণও বটে। এ ঘটনার প্রমাণ (সূরা নজমের ৮-১০ নং আয়াত)।
৭। পৃথিবী আকাশের সাথে অহংকার করে বলতো যে, আমার মর্যাদা কত উর্ধ্বে, আমার বুকের উপর সমাসীন দু’জাহানের সর্দার প্রিয় হাবীব (সাঃ)। তখন আকাশ সমূহ আবেদন করে যে, হে আল্লাহ তোমার হাবীব (সাঃ) কে একবার হলেও আমার বুকে এনে দাও, আবেদনের প্রেক্ষিতে আসমান ও যমীনের মধ্যে সমতা বিধানের লক্ষ্যে মহান আল্লাহপাক মে’রাজের আয়োজন করেন। অন্যদিকে বলা যায় যে, আসমান সমূহে অনেক দায়িত্বশীল ফিরিস্তাগণ রয়েছেন যারা কখনও কোনদিন যমীনে আমার হুকুম নেই তাদের আশা ছিল, রাসূল (সাঃ)-কে দেখার, এ সকল ফিরিস্তাগণের আশা পূরণের জন্য মহান আল্লাহতায়ালা আরশে আযীমে মি’রাজের আয়োজন করেছিলেন।
৮। মহান রাব্বুল আলামীনের উদ্দেশ্য হলো মক্কী জীবনের পরিসমাপ্তি এবং মাদানী জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে খোদায়ী শাসন ব্যবস্থা এ জন্য প্রয়োজন খোদায়ী সংবিধান। অপরদিকে শরীয়ত ও মা’রিফতের নিগূঢ় রহস্য জিবরাইল মাধ্যমে না পৌঁছিয়ে নিজের কাছে ডেকে এনে দান করাই ছিল সর্বোত্তম পন্থা, এ কারণেই মি’রাজের আয়োজন।
৯। কোন বিষয় সম্পর্কে দেখে বলা আর না দেখে বলার মধ্যে অনেক তফাৎ রয়েছে। তাই মি’রাজের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালাকে দেখা সহ তার নিদর্শনাবলি বেহেস্তের নেয়ামত সমূহ দোযখের আযাব, ভিন্ন ধরনের পাপের ভিন্ন রকমের শাস্তি মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর প্রিয় হাবীব (সাঃ)কে দেখিয়ে দিয়েছেন যাতে নির্দ্ধিধায় দাওয়াতে দ্বীনের কাজ চালিয়ে যেতে পারেন এবং ইসলাম গ্রহণকারী মুসলমানদের ঈমানী মনোবল যাতে সুদৃঢ় হয় এজন্য মে’রাজ সংঘটিত।
১০। মি’রাজ হলো নবুয়তের পূর্ণতার প্রমাণ। হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) এর মাধ্যমে যে নবুয়ত পূর্ণতা লাভ করেছে এটাই প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে মি’রাজের মাধ্যমে।

শেয়ার করুন

Developed by:Sparkle IT